সুচিপত্র
১/ আবেগের ২৫শে ডিসেম্বর - ঋতম পাল (কলকাতা)
২/ ত্রিদিববাবু এবং সেই লোক - সাহানা (কলকাতা)
৩/ প্ল্যানচেট - ভাস্কর সিনহা (দুবাই)
৪/ কলকাতার মশা - কোয়েল হালদার রায় (কলকাতা)
৫/ গুজব - অগ্নিমিত্র ( ডাঃ সায়ন ভট্টাচার্য)
৬/ এক মুঠো উষ্ণতা - মমতা খাতুন (জলপাইগুড়ি)
------//*//-----
আবেগের ২৫শে ডিসেম্বর
ঋতম পাল (কলকাতা)
"কইরে ছেলেটা, ওঠ ওঠ..... উঠে পড় তাড়াতাড়ি...... " এই বলে রিভুর মা ডাকতে থাকে রিভুকে।
মায়ের ডাকাডাকি শুনে এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠলো বছর সাতেকের ছেলে ছোট্টো রিভু। ঘুমচোখে চোখ রগড়াতে রগড়াতে রিভু বললো, "মা আজকে এতো তাড়াতাড়ি ডাকলে কেন? আজতো ২৫শে ডিসেম্বর।"
তার মা মুচকি হেসে বললো, "উঠে পড়, যাবি না ঘুরতে চিড়িয়াখানায়?"
এই শুনে রিভু তাড়াতাড়ি করে উঠে যায়।
এরপর স্নান সেরে সুন্দর জামাকাপড় পড়ে তৈরি হয় রিভু। পরিবারের সবার সাথে ঘুরতে বেড়িয়ে রিভু শীতের সকালটাকে প্রাণভরে উপভোগ করে, শীতের দূষণমুক্ত তরতাজা বাতাসে রিভু প্রাণভরে শ্বাস নেয়, গাছে গাছে সুন্দর ফুল ফুটে থাকা, পরিযায়ী পাখিদের কুহু কুহু সুরে গান গাওয়া, খোলামাঠের সবুজ ঘাসের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা শিশির প্রভৃতি রিভু প্রাণভরে উপভোগ করতে থাকে।
ডিসেম্বরের শীতের সকাল, তাই শহরজুড়ে ঠান্ডার মরশুমে রাস্তার ফুটপাতে থাকা রিভুর বয়সী অনেক ছোটোছোটো শিশুদের কষ্ট করে শীত সহ্য করতে হয়। শীতটা যেন তাদের কাছে একটা দুঃখের কাল, একটা অভিশাপ। চিড়িয়াখানা যাওয়ার পথে এসব দেখে রিভুর খুব কষ্ট হয়।
এসব দেখে রিভুর মায়ের মনে পড়ে যে ঠিক গতকাল রাতে রিভু তাকে বলেছিল, "মা, কালতো ২৫শে ডিসেম্বর, ক্রিসমাস।"
তখন তার মা মুচকি হেসে বলেছিল, "বুঝেছি তোর গিফ্ট চাই তাইতো?"
তখন ছোট্ট রিভু বলেছিল যে, " না আমার কিচ্ছু চাইনা, তবে আমার মতোই অনেক গডগিফ্টেড চাইল্ড আছে, যারা রাস্তায় থেকে শীতের এই ঠান্ডাতে কষ্ট পাচ্ছে, সান্তা ওদের কেনো গিফ্ট দেয় না মা? ওদের জন্য আমার খুব কষ্ট হয়, আমরা কী কিছু করতে পারি না?"
রিভুর মুখে এ কথা শুনে তার মা তার ছেলের সরল মনে মহৎ হৃদয়ের পরিচয় পায় এবং তার চোখ ছলছল করে ওঠে আর তার ছেলের এই মহৎ চিন্তাভাবনার জন্য সে গর্ববোধ করে রিভুর প্রতি।
তবে আজ যখন রিভু তাদেরকে দেখে কষ্ট পাচ্ছে, তখন তার মা রিভুর হাতে অনেকগুলো সোয়েটার দিয়ে বলে, "যাও ওদেরকে গিয়ে দিয়ে এসো।"
এই দেখে রিভুর খারাপ মন ভালো হয়ে যায় এবং সে ওই পথশিশুদের সোয়েটারগুলো দিয়ে বলে, "এই নাও তোমাদের জন্য সান্তা এই গিফ্টগুলো পাঠিয়েছে।"
সোয়েটারগুলো পেয়ে ওই শিশুগুলোতো খুশি হয়েছেই, তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি খুশি হয়েছে ছোট্টো রিভু। তার মা তার ছেলের এই আনন্দ দেখেই মনে মনে খুব শান্তি পাচ্ছেন এবং ভাবছেন তার ছেলে বড়ো হয়ে এই সমাজের এক আদর্শ নাগরিক হয়ে উঠবে।
রিভুর এই সরল মন এবং মহৎ কাজের মধ্যে দিয়ে মিষ্টি শীতের সকালের ২৫শে ডিসেম্বর হয়ে উঠেছে বেশ অন্যরকম, যেন এক "আবেগের ২৫শে ডিসেম্বর।"
------//*//------
ত্রিদিববাবু এবং সেই লোক
সাহানা (কলকাতা)
ত্রিদিববাবু বেশ কিছুদিন ধরেই লোকটাকে দেখছেন! বেশ কালো, রোগা আর লিকলিকে লোকটা ভিড়ে মিশে থাকে। একদম যেন হারিয়ে যায়! আলাদা করে ঠিক চেনা যায় না! সেদিন মাছের বাজারে সবে এককিলো পাবদা কিনে চিংড়ির দিকে ফিরেছেন, কোত্থাও কিছু নেই, লোকটা পাশে... একদম পাশে এসে ফিসফিসিয়ে বললো, "মাছটার ওজন কম আছে, কর্তা!"
অবাক হলেন।
কিছু না বলে অন্য মাছওলাকে ধরলেন। কি কান্ড! পুরোপোরি একশো তিরিশ গ্রাম!
আবার সেদিন।
ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য খবর দিয়েছিলেন, কিন্তু লোক আর আসে না! এদিকে মশা, মাছি যাচ্ছেতাই কান্ড!
হঠাৎ কোত্থেকে লিকলিকে লোকটা একটা বালতি দড়ি এনে কাজে লেগে পড়লো! তার আগে অবশ্য তাঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলো!
কেরে বাবা! দিন দুপুরে ভূত!
গিন্নি সব শুনে নাক সিঁটকে বললেন, "ধুর্! ওসব আমি খুব জানি। ধরে দু-ঘা দিলেই..." ইত্যাদি!
ঘটনাটা ঘটলো ঠিক এক মাসের মাথায়!
পাড়ায় চোর-ডাকাতের উৎপাত বেড়েছে! সন্ধ্যায় সব দরজা জানলা আটকে সন্ধ্যাদেবী সবে বাতি জ্বেলেছেন, এমন সময় দরজায় করাঘাত। কি ব্যাপার?
বাড়িতে ত্রিদিব নেই, গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন। দুই মেয়ে নিয়ে তিনি একটু সতর্ক!
নীচে নেমে সদরের দরজা খুলতেই, চারটে জোয়ান ছেলে..
"মাসিমা, আমরা স্যারের ছাত্র। এ পাড়ায় এসেছিলাম.. উনি আছেন?
হাবভাব দেখে ছাত্র মনে হয় না! একজন বললো, "একটু জল হবে?"
কাজের লোক পূর্ণিমা আর বড়ো মেয়ে দোদুল জলের বোতল আনতেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো চারজন!
-"একি! চ্যাঁচাবো কিন্তু!"
-"যত খুশি। কেউ নেই এখানে।" দাঁত বের করে লম্বা ছেলেটা হিসহিস করে উঠলো... "একটা শব্দ হলে টুঁটি টিপে..."
এরপর যেটা হলো, এখনও সন্ধ্যা দেবী বলতে পারেন না ঠিকঠাক করে ...
লিকলিকে কালো লোকটা সুড়ুৎ করে ঠিক আধ বিঘেত ফাঁকের জানলা দিয়ে নামল....পরের কিছুক্ষণ ঝড় বয়ে গেলো। চারটে উঠতি মস্তানকে ঘাড় ধরে বাগানে বের করলো লাথি মেরে!
-"আর ভয় নেই!"হেসে, হাত ঝেড়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
ত্রিদিববাবু থানায় কমপ্লেন লিখিয়েছিলেন। কিন্তু রোগা কালো আর লিকলিকে লোকটার কথা শুনে বড়বাবু যেভাবে তাকালেন....
লোকটা আর আসেনি!
ত্রিদিব ঠিক করেছেন, ম্যাগাজিনে লিখবেন... জীবনের এক টুকরো ছবি আর উপকারীর গল্প.....এইভাবেই নাহয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হোক্!
------//*//-------
প্ল্যানচেট
ভাস্কর সিনহা (দুবাই)
“আপনি কখনও ভূত নামিয়েছেন?” তপু জিজ্ঞেস করতেই মানুদা পাইপের আগুনটা নিভিয়ে হাসলেন। শুভর ড্রয়িংরুমে আমরা চারজন—তপু, শুভ, আমি, আর মানুদা; বাইরে শিলিগুড়ির রাত, ভেতরে কফির গন্ধ আর কাগজের খবর: এক ওঝা টাকা নিয়ে ‘ভূত ধরার‘ দোকান খুলেছে। তপু মুম্বাইয়ের ব্যাঙ্কে চাকুরী করে, তবু আজ তার গলা ছোটদের মতো কাঁপে—“ভূত নয়, ব্যবসা; তবু প্ল্যানচেটটা করি?”
মানুদা আমাদের থেকে অনেক বড়, তাঁর চোখে কোন বয়সের ছাপ নেই—কেমন একটা সুরক্ষার দৃষ্টি আছে। আমরা তিনজনেই জানি, ঐ সুরক্ষাই একদিন আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে: কলেজ থেকে ফেরার পথে পাহাড়ি মোড়, গাড়ীর ব্রেক ফেল, গিরিখাতে ঝুলে যাওয়া বাস—মানুদাই প্রথম লাফ দিয়েছিলেন। তাই তাঁকে ডাকলে আড্ডাও হয়, তবে ভিতরে কৃতজ্ঞতার কাঁটাও খচখচ করে। অবশ্য মনে হয় না মানুদা আর ঐসব নিয়ে কিছু ভাবেন কিনা।
মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলে কাগজ পাতলাম। প্ল্যানচেটের কাঠে আঙুল রাখতেই এক শীতল স্রোত উঠল, যেন কারও শ্বাস কাঁচে জমছে। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ে। বাইরে দাঁড়িয়ে এক বছর আঠেরোর মেয়ে, চোখের তলায় কালো কালি। ফিসফিস করে বলে, “বাবাকে হারিয়েছি। বাবাজি বলেছে আজ রাতে বাবাকে নামিয়ে আনবে।”
আমরা তাকে ভিতরে নিয়ে এলাম। ও যা বলল, শুনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ—বাবাজি নাকি ‘সিগন্যাল‘ পায়, মোমের মধ্যে টাকা গুনে, আর মেয়েটির কান্নাকে বাজারদর বানিয়ে; কাঁদলে বেশি, থামলে কম। মানুদা শুধু বললেন, “কাঁদা মাপা যায়, সত্যি মাপা যায় না।”
তপু নরম গলায় বলল, “তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে—আজ আমরা কথা বলব, কোন দাম লাগবে না।”
প্ল্যানচেট নড়ল। কেউ ঠেলছে না, তবু ঘড়ির কাঁটার মতো এগোল—অ, ম,া… তারপর থামল: “বাঁচো।” আবার লিখল: “প্রমাণ।”
মানুদা টর্চ জ্বালালেন, তাঁর পুরোনো সেনাবিভাগের সময়কার আলো। মেয়েটার ব্যাগের মধ্যে চকচকে একটা রসিদ—ক্যাশ, সিল, বাবাজির নাম। শুভ মোবাইলে ভিডিও চালু করল। তপু বলল, “ব্যাঙ্কের মতোই—ফ্রড ধরতে হয় ট্রেইল ধরে ধরে।”
মেয়েটা কেঁদে উঠল, কিন্তু সেই কান্না ভাঙা নয়—মেরামতির কান্না। মানুদা ধীরে হাত সরালেন; পাইপের ধোঁয়ার ভিতর তাঁর চোখ জ্বলল, “ভূত মানে মৃত্যু নয়। ভূত মানে অনুচ্চারিত সত্য।”
মোমবাতি কাঁপল। বাইরে দূরে ট্রেনের হুইসেল। আমরা চারজনেই বুঝলাম—আজ রাতেই বাবাজির দোকানে তালা পড়বে, আর মেয়েটা প্রথমবার শ্বাস নেবে সহজভাবে। আর আমাদের আড্ডা, প্রথমবার, সেই রাতে ভয়কে নয়—সাহসকে ডাকল।
------//*//------
কলকাতার মশা
কোয়েল হালদার রায় (কলকাতা)
বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রাম কুমরো পটাশ থেকে অয়ন কলকাতায় এসেছে তার ছোটবেলার বন্ধু কানাইয়ের বিয়ে খেতে। কলকাতা—আলো ঝলমলে শহর!
কানাইয়ের বিয়ে হলো উত্তর কলকাতার এক পুরনো মেস বাড়ির লাগোয়া ঘর থেকে। মেস বাড়ির পরিবেশ দেখেই অয়নের মন ভরে গেল। সে নিজের মনে ভাবল, আহা, শহরের ব্যাপারই আলাদা! আমাদের গাঁয়ে কত মশা, সন্ধ্যা নামতেই কেমন জানো মশার উৎপাত হয়, কিন্তু এখানে কোনো মশায় নেই!
কানাইয়ের বিয়ে মিটে যাওয়ার পর অয়ন সিদ্ধান্ত নিল, সে আরও দু'দিন এখানে থাকবে। শহরটা ঘুরে দেখবে। নিধু-দা, মেস বাড়ির কেয়ারটেকার, তাকে একটা ঘর দেখিয়ে দিলেন।
নিধু-দা অয়নের হাতে একটা ভাঁজ করা মশারি দিয়ে বললেন, ভাইপো, এটা টাঙিয়ে নাও রাতে। নাহলে কিন্তু...
অয়ন একটা বুক-ফোলানো হাসি দিয়ে বলল, আরে নিধু-দা! এ হলো কলকাতা! এখানে মশা-টশা থাকে না। ওসব আমাদের গাঁয়ের ব্যাপার। আমি জানি, কলকাতায় এত আধুনিক ব্যবস্থা যে মশা জন্মাবার সুযোগই পায় না। আপনি এটা রাখুন। এই দেখুন, আমার মশাই লাগবে না।
অয়ন মশারির দিকে চোখ না দিয়ে শুয়ে পড়ল। তার ধারণা, মশা কেবল গ্রামের গরিব মানুষদেরই কামড়ায়, শহরের অভিজাত জীবনযাত্রার ধার তারা ধারে না।
রাত তখন গভীর। অয়নের ঘুমটা ভাঙল। কিন্তু কেন?
ভন ভন ভন। না, এটা মশা নয়। শব্দটা যেন এয়ারপোর্টের ট্যাক্সির আওয়াজ!
অয়ন চোখ কচলে দেখল, তার চারপাশে যেন একটা কালো মেঘ জমেছে। কিন্তু এই মেঘ উড়ছে আর গান গাইছে।
একটা মশা এসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, শোন রে কুমরো পটাশ বীর! আমরা কলকাতার মশা। গ্রামের মশার মতো গরীব নই। আমরা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর । তুই নাকি মশারি টাঙাবি না? দাঁড়া, তোর রক্ত দিয়ে আমাদের ককটেল হবে!
অয়ন তার জীবনে প্রথমবার দেখল যে মশা একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করে। যেদিকেই সে হাত চালায়, সেদিকেই দশটা কামড় খায়। তারা তার কানের চামড়া, নাকের ডগা, এমনকি চোখের পাতা পর্যন্ত কামড়ে ফুলিয়ে দিল।
অয়ন পাগলের মতো লাফাচ্ছে। একসময় মশাগুলো যেন দল বেঁধে তার মুখের ওপর এসে বলল, এক রাউন্ড হলো। এবার বিরতি। কাল আসছি!
অয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে আলো জ্বেলে দেখল—তার সারা শরীর লাল-লাল চাকা, যেন কোনো চিত্রকর তার শরীরে মশার কামড়ের মডার্ন আর্ট এঁকে দিয়েছে। তার ঘুমের বারোটা বাজলো, সারারাত পাইচারি করে, সকালে একটু ঘুমিয়েছে।
অয়ন ঘুম থেকে উঠলে, নিধু-দা অয়নের ফোলা ফোলা মুখ দেখে হাসতে হাসতে বললেন, কী ভাইপো? মশার সাথে কলকাতা ট্যুর কেমন করালো?
অয়ন করুণ মুখে বলল, নিধু-দা, দয়া করে মশারিটা টাঙানোর ব্যবস্থা করুন। এগুলো মশা নয়, এক একটা গুন্ডা!
বিকেলে অয়ন বাজারে গিয়ে একটা মশারি কিনে আনলো। নিধু-দা সযত্নে মশারি টাঙিয়ে দিলেন।
রাত হলো। মশারি টাঙানো হয়েছে। অয়ন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়ল। তার মনে হলো, যাক এবার শান্তি।
কিন্ত ঘুমের ঘোরে সে কখন তার হাঁটু দিয়ে মশারিটা তক্তপোশের বাইরে একটু ঠেলে দিয়েছে, খেয়ালই করেনি। সেই সামান্য ফাঁক!
বাইরে থেকে মশার দল সেই ফাঁকটা আবিষ্কার করল। তাদের সর্দার (যাকে ভোলা আগের রাতে নাকের ডগায় দেখেছিল), চেঁচিয়ে বলল, অ্যাটাক! এইটুকু ফাঁকই যথেষ্ট। চল, ভেতরে যা আছে সব লুট করে নিয়ে আসি!
দশ-বারোটা মশা সেই ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। তারা অয়নের শরীর থেকে যেন কেজি দেড়েক রক্ত শুষে ফেলেছে । মশারির ভেতরে ঢুকেও ভোলা রক্ষা পেল না। তার সেই সামান্য অসাবধানতার ফল হলো মারাত্মক। সে রাতেও অয়নের ঘুম হলো না।
পরের দিন সকালে অয়ন আর এক মুহূর্তও থাকতে পারল না। তড়িঘড়ি সব গুছিয়ে ট্রেন ধরলো। ফেরার পথে সে দেখল, সারা শরীরে তার ফোলা ফোলা লাল দাগ । শরীর দুর্বল হয়ে আসছে, আর শীত করছে খুব।
বাড়িতে ফিরে সে ধুম জ্বর নিয়ে শুয়ে পড়ল। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন, ম্যালেরিয়া।
গ্রামের সকলে ভিড় করে দেখতে এল অয়নের এই দশা।
মা কপালে হাত দিয়ে বললেন, বলেছিলাম না, শহরটা ভালো নয়! দেখ, মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া বাঁধালি!
অয়ন দুর্বল গলায় বলল, মা, আর শহরে না! শহরের সবকিছুই মারাত্মক। ওখানকার মশাগুলোও গ্রামের মশার থেকে অনেক বেশি ডেঞ্জারাস। ওরা সাধারণ মশা নয়, ওরা হাই-টেক খুনি!
এরপর থেকে, অয়ন যখনই কলকাতার নাম শুনত, তখনই ভয়ে তার গা কেঁপে উঠত। সে বুঝতে পেরেছিল, কলকাতার "সিটি অফ জয়" উপাধিটা কেবল মানুষকে বোঝানোর জন্য। আসলে ওটা হলো "সিটি অফ জয় অফ মশা"।
------//*//------
গুজব
অগ্নিমিত্র ( ডাঃ সায়ন ভট্টাচার্য)
কথাটা অণিমা অনেকদিন ধরেই শুনছে । চয়ন নাকি তাকে পছন্দ করে । চয়নও শুনছে যে অণিমা তাকে পছন্দ করে ।
নেগন বললো-' পরীক্ষার আগে তো হস্টেলে থাকতে এসেছিস..। জানিস, অণিমা কতবার এখানে ফোন করে তোর কথা জানতে চেয়েছে?!'
তখন মুঠোফোন ছিল না। ল্যান্ডফোন সম্বল । তাতে নাকি অণিমা ফোন করেছে ।..
চয়ন একটু লাজুক, তাই অণিমাকে আর ফোন করলো না । আর তখন ল্যান্ডলাইন নম্বর জানাও যেত না ।..
ওদিকে অণিমাও শুনেছে যে চয়ন তাকে ভালোবাসে । ফলে একবার সবাই মিলে রেস্তরাঁ যাওয়া হলো; সেখানে তখন চয়ন আর অণিমা একে অন্যের দিকে তাকিয় থাকলো; কথাটথা হলো না ।
সেই রাতে অণিমা ঘুমোতে পারলো না ঠিক করে । চয়ন খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখে ঘুমোলো ।...
পরীক্ষার পর কলেজ ফেস্টিভালে গিয়ে জানা গেল, এ সব নগেনের ছলনা । যাতে পরীক্ষায় চয়ন বা অণিমার ফল অত ভালো না হয়, তাই এই ব্যবস্থা ।..
নগেনকে ভুল প্রমাণ করার তাগিদে তাই লাভার্স লেনে দুজনের দেখা হতে থাকলো ..।।
------//*//------
এক মুঠো উষ্ণতা
মমতা খাতুন (জলপাইগুড়ি)
শীতের হাওয়ায় কাঁপছে সারা পাড়া। সকালের কুয়াশায় ডুবে আছে গলির মুখে দাঁড়ানো সেই ছোট্ট ছেঁড়া কাপরের মোড়ানো ঘরটা। ঘরের ভিতর একা থাকেন ঠাকুমা —সবাই ওনাকে বুড়ি ঠাকুমা বলে চেনে। একসময় ছিলেন পাড়ার গুনি ঠাকুমা, কিন্তু ছেলেমেয়ে সবাই এখন শহরে—নতুন জীবনে ব্যস্ত। ঠাকুমার খোঁজ নেওয়ার সময় কারও আর নেই।
আজ ভোরে পাড়ার কিশোর রাহুল হাঁটতে বেরিয়ে দেখে, ঠাকুমা ঘরের সামনে বসে আছেন, গায়ে পুরনো গামছা, ঠোঁট নীলচে হয়ে গেছে ঠান্ডায়। রাহুলের বুকটা হঠাৎ কেমন চেপে গেল। বাড়ি ফিরে গিয়ে বন্ধুদের ডাকল এই, ঠাকুমা ঠান্ডায় কাঁপছে, চল ওনার জন্য কিছু করি।
কয়েকজন মিলে শুরু হল ছোট্ট এক উদ্যোগ। কেউ আনল পুরনো কিন্তু পরিষ্কার একটা কম্বল, কেউ দিল নিজের অতিরিক্ত সোয়েটার, আর সুমন দৌড়ে গেল তার মাকে বলতে মা, একটু গরম ভাত দেবে? সবাই মিলে বিকেলের দিকে হাজির হল ঠাকুমার ঘরের সামনে।
ঠাকুমা প্রথমে একটু চমকে গেলেন। তারপর যখন দেখলেন ছেলেরা ওর ঘরে আলো লাগাচ্ছে, চুল্লিতে আগুন জ্বালাচ্ছে, হাতে গরম ভাত দিচ্ছে—চোখে জল চলে এল তাঁর। কাঁপা গলায় বললেন, তোমরা আমার আপন নাতির থেকেও বেশি আপন। শীতটা আজ যেন উষ্ণ হয়ে গেল।
সেদিন থেকে পাড়ার ছেলেরা ঠিক করল, প্রতি সন্ধ্যায় ঠাকুমা সঙ্গে এক ঘণ্টা গল্প করবে। কেউ পড়াশোনার কথা বলে, কেউ ঠাকুমা কাছে পুরনো দিনের কাহিনি শোনে।
শীত পড়ে আছে ঠিকই, কিন্তু সেই কাপর মোড়ানো ঘরের ভিতর এখন উষ্ণতা আছে—মানুষের ভালোবাসার, এক মুঠো যত্নের। কারণ কখনও কখনও, একটুখানি হৃদয়ই সবচেয়ে বড় কম্বল হয়ে যায়।
------//*//------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন