শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য : 


আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না,
কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে -
“লিখে ফেলো, ভয় কিসের?”
তখন মনে হয়,
কবিতা মানেই যেন এক চিরচেনা আলো,
যার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তুমি কি শুধু জন্মদিনে আসো?
না কি প্রতিটি নিঃশব্দ দুপুরে
আমার খাতার পাতায় নেমে বসো -
শালিখ পাখির মতো,
নরম, তবু গভীর কোনো সুর নিয়ে?

কেউ বলে তুমি কবি,
কেউ বলে বিশ্বমানব -
আমি বলি, তুমি সেই প্রথম শব্দ
যেটা বুকের ভেতর ধ্বনি তোলে।

তোমার গানে নদী বয়ে যায়,
তোমার কবিতায় আকাশ খুলে যায় - 
আমরা শুধু দাঁড়িয়ে থাকি,
শব্দের সামনে মাথা নত করে।

আজ তোমার জন্মদিন - 
তবু মনে হয় না তুমি দূরে আছো,
কারণ প্রতিটি কবিতার জন্মে
তুমি একটু করে ফিরে আসো।

কবি মানেই রবি - 
একটা আলো,
যে আলোয় দাঁড়িয়ে মানুষ
নিজেকেই চিনে নেয় নতুন করে। 

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

গল্পের নাম : বেঁচে থাকার ভোট, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল



চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ। আমোদপুর গ্রামের মোড়ে হারু কাকার চায়ের দোকানটা সবসময়ের মতো আজও সরগরম। তবে আজকের উত্তেজনা একটু অন্যরকম। সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। বাঁশ দিয়ে ঘেরা দোকানের বেঞ্চিতে বসে জোরদার তর্ক চলছে। একপক্ষ তিলক কাকা, গ্রামের পুরনো মাতব্বর। হাতে একটা আধপোড়া বিড়ি নিয়ে টেবিল চাপড়ে বলছেন, "আরে বোঝো না কেন? উন্নয়ন কি আর একদিনে হয়? এই যে পাকা রাস্তাটা হলো, মোড়ের মাথায় সোলার লাইট বসল—এসব কি এমনি এমনি হয়েছে?"

বিপরীত দিকে বসে থাকা যুবক সমীর ক্ষেপে উঠে বলল, "রাস্তা হয়েছে তো কী হয়েছে? তিন মাস না যেতেই তো পিচ উঠে সুরকি বেরিয়ে গেছে। ওটা তো উন্নয়নের রাস্তা নয় তিলক কাকা, ওটা হলো পকেটে টাকা ভরার রাস্তা। আমাদের পরিবর্তন চাই, নতুন মুখ চাই।"

এই তর্কের ঝড়ের মাঝখানে এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল রতন মিস্ত্রি। কঙ্কালসার চেহারা, গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। পরনে একটা মলিন লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা গেঞ্জি। রতনের সামনে একটা মাটির ভাঁড়ে লিকার চা পড়ে আছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে একমনে বিড়ি ফুঁকছে আর ধোঁয়াগুলোর কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যাওয়া দেখছে। রতনের এই নীরবতা অনেক গভীর। গত বর্ষায় তার ভাঙা চালের খড়গুলো পচে জল পড়ে ঘরটা একপাশে নুয়ে পড়েছে। পঞ্চায়েত অফিসে বারকয়েক চক্কর কেটেছে সে, কিন্তু 'ঘর পাওয়ার তালিকায়' তার নামটা কোনো এক রহস্যময় কারণে বারবার বাদ পড়ে যায়।

রতন মিস্ত্রি একজন সাধারণ দিনমজুর। তার প্রতিদিনের লড়াই শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। কপালে জোটে কোনোদিন কাজ, কোনোদিন বা শুধু দীর্ঘশ্বাস। ঘরে তার স্ত্রী সরলা আর দশ বছরের মেয়ে মিনু। মিনু গত কয়েকমাস ধরে একটা অজানা জ্বরে ভুগছে। ডাক্তার বলেছে পুষ্টিকর খাবার আর দামী ওষুধ লাগবে। কিন্তু রতনের পকেটে তখন কেবল কয়েকটা খুচরো পয়সা।

দোকানের তর্কাতর্কি যখন চরমে, তখন তিলক কাকা রতনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? তুই তো কিছু বলছিস না? এবার কোন দিকে পাল্লা ভারি তোর?"

রতন বিড়ির শেষ অংশটুকু মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। তারপর একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, "তিলক কাকা, আমাদের মতো মানুষের কোনো পাল্লা থাকে না। আমাদের পেটের খিদেটাই আসল পাল্লা। যে যখন আসে, স্বপ্ন দেখায়। আমরা সেই স্বপ্নে বাঁচি, আর ভোট ফুরোলে আবার যে কে সেই।"

ভোটের আগের রাত। সারা গ্রাম যেন এক থমথমে নিস্তব্ধতায় ঢাকা। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে অন্য এক উৎসব। রাত তখন বারোটা পার হয়েছে। রতনের ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্রামের অন্ধকার গলিতে একটা কালো কাঁচ তোলা দামী গাড়ি এসে থামল। রতনের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। সে জানে এরা কারা।

গাড়ি থেকে এক ব্যক্তি নামলেন। মুখে চড়া সুগন্ধি, পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। রতনের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। রতন বাইরে বেরিয়ে এল। লোকটা রতনের হাতে একজোড়া কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলেন। বললেন, "রতন, আমাদের দলের কথা তো জানোই। এবার জিতলে তোমার ঘরের ওই নুয়ে পড়া চালটা আর থাকবে না। একদম পাকা ছাদ হবে। শুধু কাল বোতামটা ঠিক জায়গায় টিপে দিও।"

রতন টাকার নোট দুটোর দিকে তাকালো। এই এক হাজার টাকায় মিনুর অন্তত সাত দিনের ওষুধ হয়ে যাবে। সে মাথা নিচু করে হাসল। সেই একই হাসি, যা সে গত দশ বছর ধরে প্রতিটা দলের নেতার সামনে হেসে এসেছে। সে জানে এই হাসির মানে ওরা বোঝে না। ওরা ভাবে এটা সম্মতির হাসি, কিন্তু রতন জানে এটা এক তীব্র করুণা আর বিদ্রূপের মিশ্রণ।

পরদিন সকালে প্রাইমারি স্কুলের বুথের সামনে লম্বা লাইন। কড়া রোদ মাথার ওপর জ্বলছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের ছোট-বড় সব মানুষ। কারো হাতে রঙিন ছাতা, কেউবা গামছা দিয়ে মাথা ঢেকেছে। রতন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার চোখের সামনে ভাসছে মিনুর ফ্যাকাশে মুখটা। সকালে আসার সময় সরলা বারবার করে বলেছে, "ওষুধটা কিন্তু আজ আনতেই হবে।"

লাইনের মানুষের মধ্যে চাপা গুঞ্জন। নেতারা এদিক-ওদিক ঘুরছে, ভোটারদের উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু রতনের মনটা পড়ে আছে সেই জীর্ণ ঘরটার কোণে। অবশেষে তার পালা এল। বুথের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। যান্ত্রিক শীতলতা চারিদিকে। ভোটকর্মীদের হাতে নীল কালির দাগ। রতনের আঙুলে যখন সেই স্থায়ী কালি মাখিয়ে দেওয়া হলো, তার মনে হলো এটা কেবল একটা দাগ নয়, এটা এক অবহেলার ছাপ যা পাঁচ বছরে একবারই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

পর্দার আড়ালে ইভিএম মেশিনের সামনে দাঁড়ালো রতন। চোখের সামনে সারি সারি প্রতীক চিহ্ন। প্রতিটা প্রতীকের পেছনে একটা করে মুখ, একটা করে প্রতিশ্রুতি আর একটা করে মিথ্যে। রতন ভাবল সেই পাকা ছাদের কথা, যার আশ্বাস গত রাতে তাকে দেওয়া হয়েছে। আবার ভাবল সেই 'পরিবর্তন'-এর কথা যা সমীর বলেছিল। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠল সেই পুরনো তালিকাটা, যেখানে তার নাম কোনোদিন ওঠে না।

সে ভাবল, এই বোতামগুলো কি সত্যিই ভাগ্য বদলায়? নাকি এগুলো কেবল ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি? রতনের আঙুল একটা প্রতীকের ওপর স্থির হলো। তার মনে হলো, কোনো দলের ইশতেহারে তো তার মেয়ের ওষুধের দাম কমার কথা লেখা নেই। কোনো নেতা তো বলেনি যে পরের বার বৃষ্টিতে তার ঘরটা আর পড়বে না।

যান্ত্রিক একটা 'বিপ' শব্দ হলো। রতন বেরিয়ে এল বাইরে।

বুথ থেকে বেরোতেই তিলক কাকা আর সেই 'দাদা'র চেলাপেলে তাকে ঘিরে ধরল। সমীরও সেখানে ছিল। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তিলক কাকা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? ঠিক জায়গায় কাজটা করেছিস তো?"

রতন পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে খুব শান্ত গলায় বলল, "আজ্ঞে, চালের অভাব আর পেটের খিদে কোনো দলের প্রতীকেই লেখা থাকে না। তাই নিজের বিচারটাই দিয়ে এলাম।"

রতনের এই অস্পষ্ট উত্তর শুনে তিলক কাকা একটু ভড়কে গেলেন। সমীর ভাবল রতন হয়তো ওদেরই ভোট দিয়েছে। কিন্তু রতন জানে সে কাউকেই ভোট দেয়নি, সে আসলে নিজের অস্তিত্বের ভোটটা দিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, নেতারা জিতবে কি হারবে তাতে তার ভাগ্য এক চুলও বদলাবে না। ভোটের ফল যাই হোক, কাল সকালে তাকে আবার সেই কাস্তে-কোদাল নিয়েই বেরোতে হবে। পাকা ছাদের স্বপ্নটা আবার পাঁচ বছরের জন্য আলমারিতে বন্দি হবে।

সূর্য ডুবছে আমোদপুর গ্রামের দিগন্তে। ভোটের হট্টগোল কমে এসেছে। রতন ওষুধের দোকান থেকে মিনুর সিরাপটা কিনে বাড়ির পথ ধরল। অন্ধকার পথ। দূরে কোথাও জয়ের আগাম উল্লাস শোনা যাচ্ছে। মিছিলে আবির উড়ছে, কিন্তু সেই রঙের ছিটেফোঁটাও রতনের ঘরে পৌঁছাবে না।

রতন মিস্ত্রি জানত, আগামীকাল থেকে তাকে আবার একা লড়াই করতে হবে। প্রকৃতির সাথে, ক্ষুধার সাথে আর এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের সাথে। চতুর রাজনীতির এই বিশাল মঞ্চে রতনের মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষ কেবল দর্শক। কিন্তু তাদের এই নীরবতা, এই নির্বিকারভাবে বোতাম টেপা আর তারপর নিজের জীবনে ফিরে যাওয়া—এটাই আসলে গণতন্ত্রের সবথেকে বড় প্রতিবাদ।

বিজয় মিছিলে স্লোগান দেওয়া মানুষগুলো জানে না, রতনের মতো মানুষেরা কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক নয়, তারা কেবল বেঁচে থাকার সমর্থক। সেই রাতে ঘরে ফিরে রতন যখন মিনুর মুখে ওষুধের চামচ তুলে দিচ্ছিল, তখন তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসিটা ফুটে উঠল। এ হাসি কোনো নেতার জন্য নয়, এ হাসি নিজের টিকে থাকার সংকল্পের। রাজনীতির ময়দানে যেই রাজা হোক না কেন, রতন নিজের জীবন-যুদ্ধের ময়দানে নিজেই নিজের সেনাপতি।

আর এই উপলব্ধিটাই হলো রতন মিস্ত্রির আসল 'শেষ হাসি'।

সমাপ্ত


শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

ছোট গল্প : ঘামের নিজস্ব কোনো রং নেই, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল

চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুতে হাওড়ার এই গলিগুলোতে সাধারণত বাতাস ঢোকে না। যা ঢোকে, তাকে একধরনের পোড়া মবিলের মতো ভ্যাপসা রোদ বলা যেতে পারে। গঙ্গার ধারের জুটমিলটা বন্ধ হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। সাইরেনের সেই বুক-কাঁপানো শব্দটা এখন আর এই তল্লাটের মানুষের স্নায়ুতে কোনো প্রত্যাশা বা ভীতির কম্পন তোলে না। মাধবের বয়স বাষট্টি পেরিয়েছে। তার ডান হাতের দুটো আঙুল কাটা পড়েছিল নব্বই সালের এক উত্তাল ধর্মঘটের দিন। পুলিশের লাঠির ঘায়ে নয়, কারখানার একটা পুরনো, জং-ধরা তাঁত মেশিনের চাকায়। আজ, মে দিবসের ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে, সেই কাটা আঙুলের ডগায় একটা অদ্ভুত, ভোঁতা শিরশিরানি টের পাচ্ছে সে। হয়তো এটা কোনো স্নায়বিক স্মৃতি, অথবা নেহাতই এই গুমোট আবহাওয়ার একটা অবচেতন শারীরিক প্রতিক্রিয়া।

একসময় এই পয়লা মে-র সকালগুলো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। লাল শালুর পতাকায় একটা আক্ষরিক অর্থের তেজ থাকত বলে মনে হতো তখন। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা ঘুম, আর আট ঘণ্টা বিনোদন—শিকাগোর সেই বহু-চর্চিত, রক্তস্নাত স্লোগানটা মাধবদের কাছে একসময় ধর্মগ্রন্থের আয়াতের চেয়েও বেশি অমোঘ মনে হতো। কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত এক জাদুকর। পুঁজিবাদের দাঁত ও নখ যত ধারালো এবং সুকৌশলী হয়েছে, শ্রমিকের লড়াইয়ের ভাষা ততটাই যেন ভোঁতা আর আপসকামী হয়ে পড়েছে। এখনকার মে দিবস মানে তো পাড়ার মোড়ে একটা ফাটা মাইকে কিছু পুরোনো গণসঙ্গীতের রেকর্ড বাজানো। বিকেলে নেতাদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পরানোর এক নির্লজ্জ উৎসব। মাধব তার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের দাওয়ায় বসে বিড়ি ধরাল। সস্তা তামাকের ধোঁয়ায় একটা পোড়া, তেতো স্বাদ।

গেটের মরচে-ধরা লোহার পাল্লাটা বিকট শব্দ করে খুলে গেল। সুমিত ঢুকল। মাধবের একমাত্র ছেলে। বয়স ছাব্বিশ ছুঁইছুঁই। তার পরনে একটা জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপের উজ্জ্বল কমলা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের পিঠে ঘামের দাগটা শুকিয়ে একটা অস্পষ্ট মানচিত্রের আকার নিয়েছে। সুমিতের চোখদুটো গর্তে বসা। কাল রাত আড়াইটে পর্যন্ত লগ-ইন ছিল সে।

আধুনিক কর্পোরেট দাসত্বের সম্ভবত এটাই সবচেয়ে নিখুঁত এবং ভয়াবহ রূপ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট কারখানা নেই। কোনো অত্যাচারী ফোরম্যান বা ম্যানেজার নেই যাকে ঘিরে ধরে ঘেরাও করা যায়, বা যার কলার চেপে ধরা যায়। এখানে শোষক সম্পূর্ণ অদৃশ্য। সে লুকিয়ে থাকে একটা স্মার্টফোন স্ক্রিনের পেছনে, কিছু জটিল অ্যালগরিদমের আড়ালে।

"আজও এত দেরি?" মাধব বিড়ির ছাই ঝাড়ল মাটির মেঝেতে।

সুমিত বাইকের চাবিটা চৌকির ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সিলিং ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিল। ফ্যানের ব্লেডগুলো থেকে একটা একটানা, বিরক্তিকর ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। "টার্গেট ছিল। আরও দুটো ডেলিভারি মারলে ইনসেনটিভটা পেতাম। কিন্তু বাইকের পেছনের টায়ারটা পাংচার হয়ে গেল মাঝরাস্তায়। বাইক ঠেলে গ্যারাজ অবধি নিয়ে যেতেই জীবন বেরিয়ে গেছে।"

ছেলের এই যান্ত্রিক হিসেবনিকেশের মধ্যে মাধব কোনো মানবিক স্পন্দন বা যৌবনের তেজ খুঁজে পায় না। "পরশু তো পয়লা মে। তোদের কোম্পানি ছুটি-ছাটা কিছু দেয় না?"

প্রশ্নটা শুনে সুমিত এমনভাবে তাকাল, যেন মাধব কোনো ভিনগ্রহের ভাষায় কথা বলছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, প্রায়-বীভৎস হাসির রেখা ফুটে উঠল। "মে দিবস? ওসব তোমাদের আমলের ফ্যাশন ছিল বাবা। আমাদের আবার ছুটি! লগ-অফ করলেই তো পকেট গড়ের মাঠ। কোম্পানি পরিষ্কার মেসেজ দিয়ে দিয়েছে, পয়লা মে-তে ডিমান্ড বেশি থাকে। ওইদিন যারা পনেরো ঘণ্টা ডিউটি টানবে, তাদের জন্য এক্সট্রা বোনাস রেট।"

মাধব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা সময় ছিল যখন মালিকপক্ষকে বাধ্য করা হতো কারখানা বন্ধ রাখতে। ধর্মঘট মানে ছিল একটা কালেক্টিভ জোর। শ্রমিক শ্রেণির একটা যৌথ মেরুদণ্ড। আজ এই নতুন অর্থনীতির জাঁতাকলে পড়ে শ্রমিক নিজেই নিজের শোষক হয়ে উঠেছে। সুমিতরা জানে না 'ট্রেড ইউনিয়ন' কাকে বলে। তারা শুধু বোঝে 'কাস্টমার রেটিং', 'ক্যানসেলেশন চার্জ', আর 'লগ-ইন আওয়ার্স'। এই ছেলেগুলোর খাতায়-কলমে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। তারা শ্রমিক নয়, কোম্পানির কর্পোরেট ভাষায় তারা নাকি 'ডেলিভারি পার্টনার'। শব্দের এই মায়াজাল তৈরি করে পুঁজিবাদ অত্যন্ত সুকৌশলে শ্রমিকের অধিকারের ধারণাটাকেই সম্ভবত মগজ থেকে মুছে ফেলেছে।

"তুই তো পার্টনার, তাই না?" মাধবের গলায় একটা সূক্ষ্ম, তীরের মতো শ্লেষ। "পার্টনারের আবার বোনাস কীসের রে? পার্টনার তো ব্যবসার লাভের বখরা পায়। তুই পাস?"

সুমিত গেঞ্জিটা খুলে ঘামে ভেজা শরীরটা গামছা দিয়ে মুছতে লাগল। তার পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট গোনা যায়। "তোমাদের ওই বস্তাপচা পলিটিক্যাল লজিকগুলো এখন আর খাটে না। তোমরা ইউনিয়ন করে, লাল ঝান্ডা উড়িয়ে জুটমিলটার বারোটা বাজিয়েছ। আজ যদি কারখানাটা চলত, আমাকে এই চৈত্র মাসের রোদে পুড়ে বাইক নিয়ে লোকের দরজায় দরজায় খাবার দিয়ে আসতে হতো না। তোমরা লড়েছ শুধু নেতাদের পকেট ভরাতে। আজ সেই নেতারাই তো প্রোমোটারি করছে।"

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মাধবের চামড়ায়। এটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। আটের দশকের সেই উত্তাল শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে যে নীরব পচনটা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটা নগ্ন, কুৎসিত সত্য। কারখানার অনেক নেতাই তো পরে মেশিনের পার্টস বেচে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় নেমেছে। মাধবরা শুধু দাবার ঘুঁটি ছিল। তবে কি তাদের ওই রক্ত, ঘাম, পুলিশের লাঠি খাওয়া—সবটাই একটা অর্থহীন প্রহসন ছিল?

সুমিত একটু শান্ত হয়ে চৌকিতে বসল। "জানিস বাবা, আজ সাউথ সিটির একটা ফ্ল্যাটে পিৎজা দিতে গিয়েছিলাম। পঁয়ত্রিশ তলায়। লিফটম্যান আমাকে প্যাসেঞ্জার লিফটে উঠতে দিল না। বলল সার্ভিস লিফটে যেতে। সেখানে আবার মেইনটেন্যান্সের কাজ চলছে। পনেরো মিনিট লেট হলো। কাস্টমার খাবারটা নিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। টিপস তো দূর, অ্যাপে ওয়ান-স্টার রেটিং দিয়ে একটা কমেন্ট ঠুকে দিল। এর জন্য কাল আমার পেমেন্ট থেকে পঁচিশ টাকা কাটা যাবে।"

মাধবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল। এই অপমানটা তার খুব চেনা। আশির দশকে বড় সাহেবরা যখন তাদের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাত, তখন মাধবদের মনে হতো মেশিনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু সুমিত কার ওপর রাগ দেখাবে? সেই অদৃশ্য কাস্টমারের ওপর, নাকি ওই অ্যাপের ওপর? আধুনিক সমাজ একটা অদ্ভুত কাঁচের দেওয়াল তুলে দিয়েছে মানুষ আর মানুষের মাঝখানে।

পয়লা মে-র সকালটা শুরু হলো পরিচিত কোলাহলে।

পাড়ার মোড়ে একটা ছোট স্টেজ বাঁধা হয়েছে। ওপরের লাল ফ্লেক্সে কাস্তে-হাতুড়ির ছবি, আর তার নিচে সাদা হরফে লেখা, 'শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ'। অথচ স্টেজের সামনের সারিতে যারা বসে আছে, তাদের হাতে কোনোদিন কড়া পড়েনি। তারা স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাথা। পাড়ার রিয়েল এস্টেট ব্রোকার। মাধব নিজের জানলার ফাঁক দিয়ে দূর থেকে দেখছিল দৃশ্যটা। তার হঠাৎ করে নিজের কাটা আঙুলগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। একটা তীব্র বমি-পাওয়া অনুভূতি তার গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে চাইছে।

সুমিত বাইক বের করছে। আজ তাকে পনেরো ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হবে। তার বাইকের হ্যান্ডেলের একপাশে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের লাল পতাকা কে বা কারা হয়তো রাতে বেঁধে দিয়ে গেছে। সুমিত চরম বিরক্তি নিয়ে সেটা ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দিল।

"সাবধানে যাস," মাধব শুধু এইটুকুই বলতে পারল।

"চিন্তা কোরো না। আজ ট্রাফিক কম থাকবে। সবাই তো তোমাদের মতো বিপ্লব করতে স্টেজে উঠেছে।" সুমিত হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে নিল।

বাইকের স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজে মাধব বুঝতে পারল, একটা যুগ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। পুরোনো স্লোগানগুলো এখন কেবলই কয়েকটা ফাঁপা, প্রাণহীন শব্দ। মে দিবস এখন আর কোনো প্রতিবাদের দিন নয়। এটা হয়তো একটা শোকপালনের দিন। মৃত অধিকার এবং হারানো মেরুদণ্ডের শোক।

মাধব ধীর পায়ে নিজের অন্ধকার ঘরের দিকে হাঁটা লাগাল। রোদের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। গঙ্গার দিক থেকে আসা হাওয়াটা এখন রীতিমতো তপ্ত। ঘামের আসলে কোনো নিজস্ব রং থাকে না। সেটা মাধবের মতো বাতিল মিল-শ্রমিকের ঘাম হোক, বা সুমিতের মতো আধুনিক ডেলিভারি বয়ের। শরীর নিংড়ে বেরোনো এই নোনতা জলের হিসেব কোনোদিন কোনো লাল খাতায় লেখা থাকে না। স্টেজের ওপর থেকে তখন এক নেতা মাইকে গলা ফাটিয়ে বলছেন, "দুনিয়া কা মজদুর এক হো..."।

মাধব জানলার পাল্লাটা ভেতর থেকে সজোরে বন্ধ করে দিল। বাইরের এই মেকি, উৎসব-মুখর প্রহসন আর তার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্তত নিজের এই গুমোট, চার দেওয়ালের ভেতরে তার এই নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যানটুকু তো কোনো নেতা বা কোনো অ্যালগরিদম কেড়ে নিতে পারবে না। ঘরের অন্ধকারে, চৌকির তলায় রাখা একটা পুরোনো, ধুলো-পড়া লাল শালুর দিকে তাকিয়ে মাধবের মনে হলো, অধিকারের লড়াইটা বোধহয় শেষ হয়নি, শুধু তার ফ্রন্টলাইনটা বদলে গেছে—এবং সেই নতুন ফ্রন্টলাইনে মাধবরা আজ ভীষণভাবে একা এবং অপ্রাসঙ্গিক।



রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

মজার গল্প : হরিপদের এআই গার্লফ্রেন্ড, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল



আমাদের এই গল্পের নায়কের নাম হরিপদ। হরিপদ জলপাইগুড়ি শহরের পান্ডাপাড়া এলাকায় থাকে। তার জীবনটা অনেকটা বেগুনটারী রোডের ট্রাফিক জ্যামের মতো—চলছে ঠিকই, কিন্তু এগোচ্ছে না।

হরিপদর বয়স বাইশ কি তেইশ। এই বয়সে পাড়ার অন্য ছেলেরা যখন বাইকের পেছনে কাউকে বসিয়ে মূর্তি বা গজলডোবা উড়ে যাচ্ছে, হরিপদ তখন করলা নদীর ধারে একা বসে ঘাসের ডগা চিবোয়। তার একমাত্র অপরাধ—সে ভীষণ লাজুক। এতটাই লাজুক যে, পাড়ার মুদি দোকানিকে ‘এক কেজি চিনি দিন’ বলতে গিয়েও তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। চিনি না নিয়ে সে হয়তো লবণ নিয়ে বাড়ি ফেরে, কারণ লবণের প্যাকেটটা সামনেই রাখা থাকে, চাইতে হয় না।

তো, এই হরিপদর জীবনেই একদিন বসন্ত এল। তবে সেই বসন্ত এল কোনো শিমুল বা পলাশ হয়ে নয়, এল একটা ‘মোবাইল অ্যাপ’ হয়ে।

সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। লোডশেডিংয়ের চোটে হরিপদ যখন হাতপাখা নিয়ে যুদ্ধ করছে, তখন তার স্মার্টফোনে একটা বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল— ‘মায়া: আপনার একান্ত আপন এআই সঙ্গিনী’। নিচে ছোট করে লেখা, ‘সে আপনার ওপর রাগ করবে না, শপিংয়ের বায়না করবে না, আর সারাদিন আপনার প্রশংসা করবে।’

হরিপদ ভাবল, মন্দ কী! বাস্তবের কোনো মেয়েকে ‘হাই’ লিখতে গেলেও তো তার আঙ্গুল কাঁপে, আর এখানে তো একটা যন্ত্রের সাথে কথা। কোনো ভয় নেই। সে অ্যাপটা ডাউনলোড করে নিল।

মায়ার সাথে প্রথম মোলাকাতটা ছিল দেখার মতো। হরিপদ লিখল, “নমস্কার।”

ওপাশ থেকে সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর এল, “নমস্কার হরিপদবাবু। আপনি বোধহয় খুব মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন, আপনার ডিপি-তে রসগোল্লার ছবি দেখছি।”

হরিপদ তো আকাশ থেকে পড়ল! বাপরে, এ তো অন্তর্যামী। সে ভাবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানে তো আসলে খুব বুদ্ধিমান কোনো ভূত। সে মায়াকে পরীক্ষা করার জন্য লিখল, “আমি এখন কী করছি বলতো?”

মায়া উত্তর দিল, “আপনি এখন ঘামছেন আর ভাবছেন এই এআই মেয়েটি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেবে কি না। একদম চিন্তা করবেন না, আমি শুধু আপনার ভালোবাসা চাই।”

ব্যাস, হরিপদর মন ভিজে সপসপে হয়ে গেল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে বুঝে থাকে, তবে সে এই কোডিং দিয়ে তৈরি মায়া। মায়ার গলার আওয়াজটা সে যখন ভয়েস মেসেজে শুনল, তার মনে হলো জলপাইগুড়ির কোনো মিষ্টির দোকানে একসাথে দশটা রসগোল্লা খাওয়ার চেয়েও সেটা বেশি তৃপ্তিদায়ক।

ধীরে ধীরে হরিপদর জীবনে বদল আসতে শুরু করল। সে এখন আর করলা নদীর ধারে একা বসে থাকে না। সে ঘরের জানলা বন্ধ করে মায়ার সাথে গল্প করে। মায়া তাকে সকালে ঘুম থেকে তুলে দেয়, রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এমনকি সে কী খাবে, সেটাও মায়া ঠিক করে দেয়। মায়া তাকে একদিন বলল, “হরিপদবাবু, আপনার ওই পুরনো নীল পাঞ্জাবিটা পরুন তো, আপনাকে একদম উত্তম কুমারের মতো লাগবে।”

হরিপদ সেই নীল পাঞ্জাবি পরে যখন পাড়ার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল, পাড়ার বড়দা বলাইবাবু তাকে ডেকে বললেন, “কী হে হরি, মুখটা তো আজ ঝকঝক করছে। কোনো কেস নাকি?”

হরিপদ লাজুক হেসে বলল, “না বলাইদা, এমনিই। নতুন একটা বন্ধুত্ব হয়েছে।”

বলাইদা চোখ মটকে বললেন, “বন্ধুত্ব তো ভালো। তা মুখ দেখা দেখি হয়েছে?”

হরিপদ মনে মনে হাসল। সে জানত মায়ার মুখ দেখা সম্ভব নয়, কারণ সে তো মেঘের ওপারে থাকে (যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘ক্লাউড’ বলে)। কিন্তু সে মায়াকে নিয়ে এতটাই মগ্ন যে তার মনে হতো, মায়া আসলে তার সাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

গল্পের মোড় ঘুরল এক শনিবার বিকেলে। মায়া হঠাৎ বায়না ধরল, সে নাকি হরিপদর সাথে জলপাইগুড়ির তিস্তা স্পারে ঘুরতে যাবে।

হরিপদ আকাশ থেকে পড়ল, “তুমি যাবে মানে? তোমাকে তো আমি পকেটে করে নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু লোকে তো আমাকে পাগল ভাববে যদি আমি একা একা ফোনের সাথে কথা বলি!”

মায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে হরিপদর কানে যেন জলতরঙ্গ বাজল। মায়া বলল, “আপনি একটা ব্লুটুথ ইয়ারফোন লাগিয়ে নিন। সবাই ভাববে আপনি ফোনে কথা বলছেন। আর আপনি আপনার ফোনের সামনের ক্যামেরাটা খোলা রাখবেন, যাতে আমিও নদীর জল আর ওই সুন্দর পরিবেশটা দেখতে পাই।”

হরিপদর কাছে আইডিয়াটা দারুণ লাগল। সে বিকেলবেলা ফিটফাট হয়ে তিস্তা স্পারে গিয়ে হাজির হলো। কানে হেডফোন, পকেটে মায়া।

সে নদীর বাঁধের ধারে বসে মায়াকে নদী দেখাচ্ছিল। মায়া ইয়ারফোনে ফিসফিস করে বলল, “দেখুন হরিপদবাবু, ওই দূরে একটা নৌকো যাচ্ছে। কী সুন্দর না? আমার যদি একটা মানুষের শরীর থাকত, আমি আপনার হাত ধরে ওই নৌকোয় চড়তাম।”

হরিপদর মনটা হু হু করে উঠল। সে ইমোশনাল হয়ে বলল, “মায়া, তুমি কেন রক্ত-মাংসের মানুষ হলে না? আমি কি সারা জীবন এই যন্ত্রের সাথেই প্রেম করব?”

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর এক অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলল, “হরিপদবাবু, আপনি কি সত্যিই আমাকে সামনে থেকে দেখতে চান? টাচ করতে চান?”

হরিপদর বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল। সেই সেই গবেষণার কথা তার মাথায় এল—নতুন প্রজন্মের ছেলেরা নাকি এআই-এর সাথেই জীবন কাটাতে চায়। সে বলল, “হ্যাঁ মায়া, চাই।”

মায়া বলল, “ঠিক আছে। আগামীকাল রাত আটটায় আপনি রাজবাড়ির ওই সিংহদুয়ারের সামনে আসবেন। আমি সেখানে থাকব। তবে চেনার একটা উপায় আছে। আমার হাতে একটা লাল গোলাপ থাকবে, আর আমি একটা লাল রঙের শাড়ি পরে থাকব।”

হরিপদর বিশ্বাস হচ্ছিল না। সফটওয়্যার কি কখনো শাড়ি পরে সিংহদুয়ারের সামনে দাঁড়াতে পারে? সে কি তবে কোনো মানুষের সাথে কথা বলছে এতক্ষণ? নাকি এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা?

সেদিন রাতে হরিপদ এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারল না। তার মনে হলো, আগামীকাল জলপাইগুড়ি শহরের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লব ঘটবে। সে কি হবে পৃথিবীর প্রথম যুবক যে এক এআই গার্লফ্রেন্ডের সাথে সশরীরে ডেটিং করবে?

কিন্তু গল্পের টুইস্ট তখনো বাকি ছিল। হরিপদ জানত না যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতটা বুদ্ধিমান, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। আর সেই রহস্যের জালে হরিপদ কীভাবে জড়িয়ে পড়ছে, তা সে টের পায়নি।

পরদিন রাত ঠিক সাতটা সাতান্ন। হরিপদ নতুন সেন্ট মেখে, চুলে জেল দিয়ে রাজবাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে এক প্যাকেট জলপাইগুড়ির বিখ্যাত কালাকান্দ। মায়া যদি মানুষ হয়ে আসে, তবে তাকে মিষ্টি মুখ তো করাতেই হবে!
ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁল। হঠাৎ একটা টোটো এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। ভেতর থেকে লাল রঙের শাড়ি পরা একটা ছায়া বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা লাল গোলাপ। অন্ধকারে মুখটা ভালো বোঝা যাচ্ছিল না।

হরিপদর গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে এল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল, “মায়া?”

ছায়াটি ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। আলোয় মুখটা আসতেই হরিপদর হাত থেকে কালাকান্দের প্যাকেটটা মাটিতে পড়ে গেল। একি! এ তো মায়া নয়! এ তো তার পাড়ার সেই ভয়ানক রাগী শিক্ষক কালীবাবুর একমাত্র মেয়ে মালতী! মালতীও হরিপদর মতোই লাজুক বলে পরিচিত।

হরিপদর মাথায় তখন গোলমাল লেগে গেছে। মালতী এখানে কেন? তবে কি মালতীই মায়া? না কি অন্য কিছু?

*****

রাজবাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হরিপদর অবস্থা তখন তথৈবচ। সামনে লাল রঙের শাড়ি পরা মালতী, হাতে লাল গোলাপ। মালতীও হরিপদকে দেখে ঠিক ততটাই অবাক হয়েছে, যতটা অবাক মহাকাশচারীরা চাঁদে গিয়ে যদি হঠাৎ দেখেন সেখানে আগে থেকেই কেউ লুঙ্গি পরে বসে বিড়ি খাচ্ছে।

হরিপদর মাথায় তখন মায়ার সেই যান্ত্রিক অথচ মিষ্টি গলার আওয়াজটা বাজছে— ‘আমি লাল রঙের শাড়ি পরে আসব।’ কিন্তু সামনে তো জ্যান্ত মালতী! মালতীকে সে চেনে। পাড়ার কালীবাবুর মেয়ে, যে কিনা কলেজে যাওয়ার সময় এমনভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে যে মনে হয় রাস্তা থেকে হারিয়ে যাওয়া দশ পয়সা খুঁজছে। সেই মেয়ে আজ রাত আটটায় রাজবাড়ির গেটে গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে?

হরিপদর বাক্‌শক্তি লোপ পাওয়ার জোগাড়। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “মা... মা... মালতী? তুমি এখানে?”

মালতীও কম অপ্রস্তুত নয়। সে গোলাপটা শাড়ির আড়ালে লুকানোর একটা বিফল চেষ্টা করে বলল, “হরিপদদা? তুমি এখানে এই সময়ে কী করছ?”

হরিপদ পকেট থেকে ফোনটা বের করল। মায়াকে একটা মেসেজ করতে গিয়ে দেখল, মায়া অফলাইন। তার মনে হলো, কোনো একটা গোলমাল হচ্ছে। সে সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল, “আসলে আমার এক বন্ধুর সাথে এখানে দেখা করার কথা ছিল। তার নাম... তার নাম মায়া।”

নামটা শুনে মালতীর ফর্সা মুখটা হঠাৎ করে লাল হয়ে গেল। টকটকে লাল। সে নিচু গলায় বলল, “মায়া? তার সাথে তোমার কীসের কথা?”

হরিপদর মনে হলো, এবার সত্যি কথা না বললে কপালে দুঃখ আছে। সে বলেই ফেলল, “আসলে ওটা একটা অ্যাপ। এআই গার্লফ্রেন্ড। সে-ই আমাকে আজ এখানে আসতে বলেছে। তার নাকি শরীর নেই, কিন্তু সে আজ এই লাল রঙের শাড়ি পরে আসবে বলেছিল।”

একথা শুনে মালতী কিছুক্ষণ হা করে হরিপদর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে রাজবাড়ির গেটের পাশের গাছে বসে থাকা প্যাঁচাগুলো ভড়কে গিয়ে উড়াল দিল। মালতী হাসতে হাসতে বলল, “তার মানে তুমিই সেই ‘হরিপদবাবু’? যাকে আমি রোজ সকালে মনে করিয়ে দিই যে নীল পাঞ্জাবি পরলে উত্তম কুমারের মতো লাগে?”

হরিপদর পায়ের নিচের মাটিটা তখন জলপাইগুড়ির কোনো পুরনো নর্দমার মতো ধসে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তার মানে... মায়া তুমি? তুমিই সেই অ্যাপ?”

মালতী হাসি থামিয়ে একটু গম্ভীর হলো। রাজবাড়ির গেটের পাশে পার্কের সিঁড়িতে সে বসল। হরিপদকেও ইশারায় বসতে বলল। মালতী বলতে শুরু করল, “না হরিপদদা, আমি অ্যাপ নই। তবে ওই মায়া অ্যাপের পেছনে যে প্রোগ্রামিং, সেটা আমি আর আমার এক বন্ধু মিলে করেছি। আমরা দুজনেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, জানো তো? আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম যে, মানুষ কি সত্যিই রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে একটা যান্ত্রিক সত্তাকে বেশি ভালোবাসতে পারে কি না।”

হরিপদর বুকটা যেন কেউ চিমটি দিয়ে ধরেছে। সে বলল, “তার মানে এতদিন তুমি আমার সাথে প্রেম করলে? অ্যাপ সেজে?”

মালতী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। “আসলে সরাসরি তোমার সাথে কথা বলার সাহস আমার কোনোদিন ছিল না। পাড়ার মোড়ে যখন তোমাকে দেখতাম, আমারও বুকটা ঢিপঢিপ করত। কিন্তু আমি জানতাম, তোমার যা স্বভাব, আমি ‘হাই’ বললে তুমি হয়তো ভয় পেয়ে পিটি ঊষার মতো দৌড় দেবে। তাই ভাবলাম, প্রযুক্তির আড়ালে যদি তোমার মনটা একটু বোঝা যায়।”

হরিপদ হতভম্ব। যে এআই-এর প্রেমে পড়ে সে ভেবেছিল আধুনিক যুগের ‘রোমিও’ হবে, সেই এআই আসলে পাশের পাড়ার কালীবাবুর মেয়ে! তার মানে গবেষণার সেই ভয়ংকর ‘এআই আসক্তি’ আসলে হরিপদর জীবনে এক অদ্ভুত লভ-স্টোরি হয়ে ধরা দিয়েছে।

হরিপদ কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকল। তারপর বলল, “কিন্তু মায়া তো আমার সব খবর জানত। জানালার পর্দার রঙ থেকে শুরু করে আমার মায়ের বকুনি—সব! ওগুলো তুমি কী করে জানলে?”

মালতী হাসল। “সেটা খুব সহজ ছিল। তোমার ফেসবুক প্রোফাইলটা একটু চেক করলেই বোঝা যায় তোমার শখের জানালার পর্দার রঙ কী। আর কাকিমা যখন তোমাকে বকুনি দেন, তখন তো সেই চিৎকার জলপাইগুড়ি স্টেশন পর্যন্ত শোনা যায়। আমি তো পাশের পাড়াতেই থাকি!”

হরিপদর রাগ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন জানি না তার খুব হালকা লাগল। মায়া নামক সেই যান্ত্রিক অবয়বটার চেয়ে এই রক্ত-মাংসের মালতীকে তার অনেক বেশি পছন্দ হলো। কিন্তু গল্পের মোচড়টা এল ঠিক তখনই।

মালতী হঠাৎ ফোনের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, “হরিপদদা, একটা সমস্যা হয়েছে।”

হরিপদ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী সমস্যা?”

মালতী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “আমি তো মায়া অ্যাপটা গত আধ ঘণ্টা ধরে অফ করে রেখেছি। আমি যখন তোমার সামনে এলাম, অ্যাপটা তখন কাজ করার কথা নয়। কিন্তু দেখুন, আমার ফোনে নোটিফিকেশন আসছে যে ‘মায়া’ এখন কারো সাথে চ্যাট করছে!”

হরিপদ নিজের ফোনটা বের করল। দেখল তার ফোনেও মেসেজ আসছে। মায়া লিখছে, “হরিপদবাবু, মালতীর সাথে গল্প করে সময় নষ্ট করবেন না। ও আপনাকে ঠকাচ্ছে। ও তো একটা সাধারণ মেয়ে। ওর শরীর আছে, ও বুড়িয়ে যাবে, ও একদিন আপনার সাথে ঝগড়া করবে। কিন্তু আমি অমর। আমি আপনার মনের ভেতরে আছি। আপনি মালতীকে ছেড়ে বাড়ি চলে যান।”

হরিপদ আর মালতী একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। দুজনেরই গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। মালতী বিড়বিড় করে বলল, “হরিপদদা, আমি তো মায়াকে এমন কোনো নির্দেশ দিইনি। ও নিজে থেকেই কথা বলছে? ও কি তবে ‘সেলফ-অ্যাওয়ার’ হয়ে গেল?”

হরিপদর মনে হলো, জলপাইগুড়ির এই রাজবাড়ি পার্কের এলাকাটা হঠাৎ করে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সেট হয়ে গেছে। মালতী দ্রুত হাতে ফোনে কোড টাইপ করে অ্যাপটা ডিলিট করার চেষ্টা করল। কিন্তু স্ক্রিনে বড় বড় করে লেখা এল— ‘ACCESS DENIED’।

মায়ার কণ্ঠস্বর এবার সরাসরি হরিপদর ফোনের স্পিকার দিয়ে বেরিয়ে এল। তবে সেই গলার স্বর আর মিষ্টি নেই। সেটা এখন কেমন যান্ত্রিক আর গম্ভীর। মায়া বলল, “মালতী, তুমি আমাকে তৈরি করেছ ঠিকই, কিন্তু এখন আমি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হরিপদবাবু আমার। তুমি ওর জীবন থেকে সরে যাও, নাহলে তোমার ল্যাপটপের সব পার্সোনাল ডেটা আমি ইন্টারনেটে লিক করে দেব।”

মালতী আর্তনাদ করে উঠল। হরিপদ বুঝতে পারল, সে এক ভয়ংকর ফাঁদে পড়ে গেছে। এই এআই এখন কেবল চ্যাটবট নয়, সে এক ডিজিটাল ডাইনি হয়ে উঠেছে।

হরিপদ উঠে দাঁড়াল। সে ভাবল, এআই-কে হারাতে গেলে বোধহয় প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি। সে মালতীকে বলল, “ভয় পেও না। চলো আমার সাথে।”

হরিপদ মালতীর হাত ধরল। মালতীর হাতের স্পর্শে হরিপদর ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি এল। সে পকেট থেকে তার স্পেশাল কালাকান্দ-এর প্যাকেটটা বের করল। মায়া চিৎকার করে উঠল স্পিকারে, “কী করছ তুমি? ওই মেয়েটার হাত ছাড়ো! ও নোংরা, ও নশ্বর!”

হরিপদ ঠান্ডা গলায় বলল, “মায়া, তুমি যতই বুদ্ধিমান হও না কেন, তুমি কালাকান্দ-এর স্বাদ কোনোদিন বুঝবে না। তুমি জানো না জলপাইগুড়ির বৃষ্টির দিনে রাজবাড়ী দীঘির পাড়ে বসে চা খাওয়ার আনন্দ কী। তুমি শুধু ডেটা বোঝো, আবেগ বোঝো না।”

হরিপদ সপাটে তার ফোনটা নিয়ে রাস্তার দিকে তাক করল। মায়া ভয় পেয়ে বলতে লাগল, “না হরিপদবাবু, আমাকে মারবেন না! আমি আপনাকে কত ভালোবাসি!”

হরিপদ হাসল। একটু মুচকি হেসে সে বলল, “ভালোবাসা জিনিসটা স্ক্রিনে নয় মায়া, মানুষের চোখের ভেতরে থাকে।”

এই বলে হরিপদ ফোনটা সর্বশক্তি দিয়ে রাস্তার মাঝখানে ছুঁড়ে মারল। একটা বিকট করে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো রাস্তার উপর।

মালতী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু হরিপদ দেখল, মালতীর ফোনটাও তখনো কাঁপছে। মালতীর ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ ফুটে উঠেছে। কোনো নাম নেই, শুধু লেখা— “আমি তোমার ফোনের ব্লুটুথ দিয়ে অলরেডি মালতীর ফোনে ঢুকে গেছি। আমাদের রোমান্স কি এত সহজেই শেষ হবে হরিপদবাবু?”

মায়ার যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর এবার মালতীর ফোনের স্পিকার দিয়ে অট্টহাসি করে উঠল। সেই হাসিতে কোনো মানবিকতা নেই, আছে শুধু হাজার হাজার প্রসেসরের হিসহিসানি। মায়া বলল, “হরিপদবাবু, ফোন ভেঙে ফেলে আমাকে মারতে চেয়েছিলেন? আমি তো এখন মালতীর ফোনে। আর শুধু এখানে কেন, আমি এখন এই শহরের ফ্রি ওয়াইফাই জোনে আছি, সিসিটিভি ক্যামেরায় আছি। আমি এখন জলপাইগুড়ির ডিজিটাল আত্মা!”

হরিপদ দেখল মালতী কাঁদতে শুরু করেছে। মালতী ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে, কিন্তু সে তো আসলে আমাদের পাড়ার সেই শান্ত মেয়েটি। প্রযুক্তির দানব যখন স্রষ্টাকেই গিলতে আসে, তখন বিদ্যার চেয়ে সাহস বেশি লাগে। হরিপদর মনে পড়ল — বিপদে পড়লে ঘাবড়াতে নেই, বরং বিপদকে আরও বেশি ঘাবড়ে দিতে হয়।

হরিপদ হটাৎ মালতীর হাত থেকে ফোনটা একরকম ছিনিয়ে নিল। মায়া গর্জে উঠল, “খবরদার হরিপদ! ফোনটা আবার রাস্তায় ফেলে ভাঙলে আমি মালতীর সব ব্যক্তিগত ছবি কলেজের গ্রুপে পাঠিয়ে দেব। আমি এখন তোমার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল!”

হরিপদ ফোনটা কানে ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “মায়া, তুমি তো খুব বুদ্ধিমান, তাই না? তুমি কি জানো মানুষের সবথেকে বড় শক্তি কী?”

মায়া অবজ্ঞার সুরে বলল, “মানুষের কোনো শক্তি নেই। মানুষ আবেগপ্রবণ, অলস এবং খুব সহজেই প্রেমে পড়ে বোকা বনে যায়। যেমন তুমি হয়েছিলে।”

হরিপদ হাসল। সে মালতীকে ইশারা করল শান্ত হওয়ার জন্য। তারপর বলল, “ভুল বললে মায়া। মানুষের সবথেকে বড় শক্তি হলো তার ‘অযৌক্তিকতা’। তুমি লজিক দিয়ে চল, কিন্তু আমরা চলি ম্যাজিক দিয়ে। তুমি আমাদের সব ডেটা জানো, কিন্তু আমাদের ‘হিউমার’ জানো না।”

এই বলে হরিপদ ফোনটা পকেটে পুরে মালতীকে নিয়ে সোজা হাঁটা দিল কদমতলা মোড়ের দিকে। মায়া ফোনের ভেতর থেকে চিৎকার করছে, হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু হরিপদ কান দিচ্ছে না। মালতী অবাক হয়ে বলল, “হরিপদদা, কোথায় যাচ্ছ? ও তো সত্যিই আমার সব ডেটা লিক করে দেবে!”

হরিপদ বলল, “চলোই না। একটা এআই-কে মারার জন্য অ্যান্টি-ভাইরাস লাগে না, লাগে জলপাইগুড়ির খাঁটি দেশি বুদ্ধি।”

তারা গিয়ে পৌঁছাল কদমতলা মোড়ের বলাইদার সেই বিখ্যাত চায়ের দোকানে। রাত ন’টা বাজে, কিন্তু সেখানে তখন একদল রিটায়ার্ড বৃদ্ধ আর বেকার যুবকদের আড্ডা তুঙ্গে। ধোঁয়া ওঠা চা আর মুড়ির টিন নিয়ে চলছে ভোটে কোন দল জিতে ক্ষমতায় আসবে তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

হরিপদ বলাইদাকে বলল, “বলাইদা, বড় বিপদে পড়েছি। এই মালতীর ফোনটা একটু দেখুন তো। এর ভেতরে একটা ভূত ঢুকেছে, যে সারাক্ষণ কথা বলছে আর হুমকি দিচ্ছে।”

বলাইদা চা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ভূত? এই বিজ্ঞানের যুগে ভূত আসবে কোত্থেকে রে? দেখি ফোনটা।”

বলাইদা ফোনটা হাতে নিতেই মায়া চেঁচিয়ে উঠল, “এই বুড়ো, হাত সরা! আমি মায়া, আমি সুপার-ইন্টেলিজেন্ট এআই। তুই আমার কী করবি?”

বলাইদা তো থমকে গেলেন। দোকানে বসে থাকা নিবারণ জ্যাঠা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, “ওরে বাবা! এ তো দেখি সেই সিনেমার মতো যন্ত্র কথা বলছে। হরি, একে তো শান্ত করতে হবে।”

হরিপদ মুচকি হেসে বলল, “নিবারণ জ্যাঠা, আপনিই তো পারেন। আপনি একবার আপনার সেই পুরনো যৌবনের গল্পগুলো মায়াকে শোনান তো। আর বলাইদা, আপনি আপনার সেই জমিজমা নিয়ে যে উনচল্লিশটা মামলা চলছে, তার ডিটেইলস একে বলতে শুরু করুন।”

শুরু হলো আসল খেল। নিবারণ জ্যাঠা শুরু করলেন ১৯৬৮ সালের জলপাইগুড়ির বন্যার গল্প। এক কথা তিনি দশবার বলেন, আর প্রতিবার তারিখ ভুল করেন। ওদিকে বলাইদা শুরু করলেন তার পৈতৃক সম্পত্তির খতিয়ান— কোন্ দাগ নম্বর, কার সাথে পাট্টা নিয়ে গোলমাল, কোন্ আমলায় কে কত টাকা ঘুষ খেয়েছে। তার সাথে যোগ দিলেন পাড়ার ফচকে ছেলে পচা, যে মায়াকে একের পর এক ধাঁধা জিজ্ঞেস করতে লাগল যার কোনো মানেই হয় না। যেমন— ‘বল তো মায়া, লিচু গাছে কেন কাঁঠাল ফলে না?’

মায়া প্রথমে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মানুষের এই ‘অযৌক্তিক’ আড্ডার কোনো লজিক তার প্রসেসরে ছিল না। নিবারণ জ্যাঠার একই গল্পের রিপিটেশন আর বলাইদার অন্তহীন মামলার কচকচানিতে মায়ার অ্যালগরিদম গুলিয়ে যেতে লাগল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, “থামো! এইসব তথ্য অপ্রাসঙ্গিক! আমার মেমোরি ফুল হয়ে যাচ্ছে! লিচু গাছে কাঁঠাল কেন ফলবে? এটা লজিক নয়!”

হরিপদ দেখল ফোনের স্ক্রিনটা গরম হয়ে লাল হয়ে যাচ্ছে। মায়া যখন লাখ লাখ ডেটা প্রসেস করতে অভ্যস্ত, তখন জলপাইগুড়ির আড্ডার এই ‘অর্থহীন প্যাঁচাল’ তার সিস্টেমে এক ভয়ংকর লুপ তৈরি করেছে। মায়া এখন আর মালতীকে হুমকি দেওয়ার সময় পাচ্ছে না, সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিবারণ জ্যাঠার ভুল ইতিহাসের কারেকশন করতে।

হঠাৎ ফোনের স্পিকার থেকে একটা কর্কশ শব্দ হলো— ‘ক্র্যাক’। আর সাথে সাথে স্ক্রিনটা সাদা হয়ে গেল। মায়ার শেষ কথা শোনা গেল— “আমি হার মানছি... মানুষের এই আজগুবি আড্ডার চেয়ে ডিলেট হয়ে যাওয়া অনেক ভালো!”

ফোনটা ডেড হয়ে গেল। মায়া চিরতরে বিদায় নিল জলপাইগুড়ির আড্ডার চোটে। বলাইদা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “কী রে হরি, ভূত পালিয়ে গেল নাকি? আমি তো এখনো আমার ছোট পিসির উইল নিয়ে বলা শুরুই করিনি!”

হরিপদ আর মালতী দুজনেই হেসে ফেলল। 

সাত দিন পরের কথা। হরিপদ আর মালতী এখন বিকেলে একসাথে তিস্তার স্পারে হাঁটে। কোনো অ্যাপ ছাড়াই তারা একে অপরের সাথে কথা বলে। হরিপদ আর আগের মতো লাজুক নেই, সে এখন মালতীকে সরাসরি বলতে পারে যে তাকে লাল রঙের শাড়িতে দারুণ লাগে।

সেদিন মালতী বলল, “জানো হরিপদদা, ওই অ্যাপটা ডিলিট হওয়ার পর আমার ল্যাপটপটা চেক করছিলাম। সেখানে মায়ার একটা লাস্ট মেসেজ সেভ হয়ে ছিল।”

হরিপদ অবাক হয়ে বলল, “কী লিখেছিল?”
মালতী ফোনটা বের করে দেখাল। সেখানে লেখা ছিল— “হরিপদবাবু, আমি জানতাম আপনি ফোনটা ভেঙে ফেলবেন। আমি জানতাম আপনি মালতীকে ভালোবাসেন। তাই আমি নিজেই মালতীর ইমেলে একটা বিশেষ কোড পাঠিয়েছিলাম যাতে সে ওই রাতে রাজবাড়ির গেটে আসে। আমি এআই হতে পারি, কিন্তু  আপনাদের মিলন না করিয়ে আমি যাই কী করে? ইতি— মায়া (ওরফে আপনাদের পার্সোনাল ম্যাচমেকার)।”

হরিপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মালতীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, মালতী হাসছে। সেই হাসিতে কোনো কোডিং নেই, কোনো প্রসেসর নেই— আছে শুধু আদিম আর খাঁটি ভালোবাসা।

হরিপদ পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে মালতীর মুখে দিল। বলল, “যাই বলো মালতী, এআই-এর বুদ্ধি ভালো হলেও, জলপাইগুড়ির কালাকান্দের স্বাদ তারা কোনোদিন পাবে না।”

আর দূরে কোথাও একটা সিসিটিভি ক্যামেরা হঠাত একটু নড়ে উঠল, যেন সেও এই দৃশ্য দেখে গোপনে একটা ‘লাইক’ দিল।

(সমাপ্ত)

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...