শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য : 


আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না,
কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে -
“লিখে ফেলো, ভয় কিসের?”
তখন মনে হয়,
কবিতা মানেই যেন এক চিরচেনা আলো,
যার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তুমি কি শুধু জন্মদিনে আসো?
না কি প্রতিটি নিঃশব্দ দুপুরে
আমার খাতার পাতায় নেমে বসো -
শালিখ পাখির মতো,
নরম, তবু গভীর কোনো সুর নিয়ে?

কেউ বলে তুমি কবি,
কেউ বলে বিশ্বমানব -
আমি বলি, তুমি সেই প্রথম শব্দ
যেটা বুকের ভেতর ধ্বনি তোলে।

তোমার গানে নদী বয়ে যায়,
তোমার কবিতায় আকাশ খুলে যায় - 
আমরা শুধু দাঁড়িয়ে থাকি,
শব্দের সামনে মাথা নত করে।

আজ তোমার জন্মদিন - 
তবু মনে হয় না তুমি দূরে আছো,
কারণ প্রতিটি কবিতার জন্মে
তুমি একটু করে ফিরে আসো।

কবি মানেই রবি - 
একটা আলো,
যে আলোয় দাঁড়িয়ে মানুষ
নিজেকেই চিনে নেয় নতুন করে। 

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

গল্পের নাম : বেঁচে থাকার ভোট, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল



চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ। আমোদপুর গ্রামের মোড়ে হারু কাকার চায়ের দোকানটা সবসময়ের মতো আজও সরগরম। তবে আজকের উত্তেজনা একটু অন্যরকম। সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। বাঁশ দিয়ে ঘেরা দোকানের বেঞ্চিতে বসে জোরদার তর্ক চলছে। একপক্ষ তিলক কাকা, গ্রামের পুরনো মাতব্বর। হাতে একটা আধপোড়া বিড়ি নিয়ে টেবিল চাপড়ে বলছেন, "আরে বোঝো না কেন? উন্নয়ন কি আর একদিনে হয়? এই যে পাকা রাস্তাটা হলো, মোড়ের মাথায় সোলার লাইট বসল—এসব কি এমনি এমনি হয়েছে?"

বিপরীত দিকে বসে থাকা যুবক সমীর ক্ষেপে উঠে বলল, "রাস্তা হয়েছে তো কী হয়েছে? তিন মাস না যেতেই তো পিচ উঠে সুরকি বেরিয়ে গেছে। ওটা তো উন্নয়নের রাস্তা নয় তিলক কাকা, ওটা হলো পকেটে টাকা ভরার রাস্তা। আমাদের পরিবর্তন চাই, নতুন মুখ চাই।"

এই তর্কের ঝড়ের মাঝখানে এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল রতন মিস্ত্রি। কঙ্কালসার চেহারা, গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। পরনে একটা মলিন লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা গেঞ্জি। রতনের সামনে একটা মাটির ভাঁড়ে লিকার চা পড়ে আছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে একমনে বিড়ি ফুঁকছে আর ধোঁয়াগুলোর কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যাওয়া দেখছে। রতনের এই নীরবতা অনেক গভীর। গত বর্ষায় তার ভাঙা চালের খড়গুলো পচে জল পড়ে ঘরটা একপাশে নুয়ে পড়েছে। পঞ্চায়েত অফিসে বারকয়েক চক্কর কেটেছে সে, কিন্তু 'ঘর পাওয়ার তালিকায়' তার নামটা কোনো এক রহস্যময় কারণে বারবার বাদ পড়ে যায়।

রতন মিস্ত্রি একজন সাধারণ দিনমজুর। তার প্রতিদিনের লড়াই শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। কপালে জোটে কোনোদিন কাজ, কোনোদিন বা শুধু দীর্ঘশ্বাস। ঘরে তার স্ত্রী সরলা আর দশ বছরের মেয়ে মিনু। মিনু গত কয়েকমাস ধরে একটা অজানা জ্বরে ভুগছে। ডাক্তার বলেছে পুষ্টিকর খাবার আর দামী ওষুধ লাগবে। কিন্তু রতনের পকেটে তখন কেবল কয়েকটা খুচরো পয়সা।

দোকানের তর্কাতর্কি যখন চরমে, তখন তিলক কাকা রতনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? তুই তো কিছু বলছিস না? এবার কোন দিকে পাল্লা ভারি তোর?"

রতন বিড়ির শেষ অংশটুকু মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। তারপর একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, "তিলক কাকা, আমাদের মতো মানুষের কোনো পাল্লা থাকে না। আমাদের পেটের খিদেটাই আসল পাল্লা। যে যখন আসে, স্বপ্ন দেখায়। আমরা সেই স্বপ্নে বাঁচি, আর ভোট ফুরোলে আবার যে কে সেই।"

ভোটের আগের রাত। সারা গ্রাম যেন এক থমথমে নিস্তব্ধতায় ঢাকা। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে অন্য এক উৎসব। রাত তখন বারোটা পার হয়েছে। রতনের ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্রামের অন্ধকার গলিতে একটা কালো কাঁচ তোলা দামী গাড়ি এসে থামল। রতনের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। সে জানে এরা কারা।

গাড়ি থেকে এক ব্যক্তি নামলেন। মুখে চড়া সুগন্ধি, পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। রতনের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। রতন বাইরে বেরিয়ে এল। লোকটা রতনের হাতে একজোড়া কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলেন। বললেন, "রতন, আমাদের দলের কথা তো জানোই। এবার জিতলে তোমার ঘরের ওই নুয়ে পড়া চালটা আর থাকবে না। একদম পাকা ছাদ হবে। শুধু কাল বোতামটা ঠিক জায়গায় টিপে দিও।"

রতন টাকার নোট দুটোর দিকে তাকালো। এই এক হাজার টাকায় মিনুর অন্তত সাত দিনের ওষুধ হয়ে যাবে। সে মাথা নিচু করে হাসল। সেই একই হাসি, যা সে গত দশ বছর ধরে প্রতিটা দলের নেতার সামনে হেসে এসেছে। সে জানে এই হাসির মানে ওরা বোঝে না। ওরা ভাবে এটা সম্মতির হাসি, কিন্তু রতন জানে এটা এক তীব্র করুণা আর বিদ্রূপের মিশ্রণ।

পরদিন সকালে প্রাইমারি স্কুলের বুথের সামনে লম্বা লাইন। কড়া রোদ মাথার ওপর জ্বলছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের ছোট-বড় সব মানুষ। কারো হাতে রঙিন ছাতা, কেউবা গামছা দিয়ে মাথা ঢেকেছে। রতন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার চোখের সামনে ভাসছে মিনুর ফ্যাকাশে মুখটা। সকালে আসার সময় সরলা বারবার করে বলেছে, "ওষুধটা কিন্তু আজ আনতেই হবে।"

লাইনের মানুষের মধ্যে চাপা গুঞ্জন। নেতারা এদিক-ওদিক ঘুরছে, ভোটারদের উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু রতনের মনটা পড়ে আছে সেই জীর্ণ ঘরটার কোণে। অবশেষে তার পালা এল। বুথের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। যান্ত্রিক শীতলতা চারিদিকে। ভোটকর্মীদের হাতে নীল কালির দাগ। রতনের আঙুলে যখন সেই স্থায়ী কালি মাখিয়ে দেওয়া হলো, তার মনে হলো এটা কেবল একটা দাগ নয়, এটা এক অবহেলার ছাপ যা পাঁচ বছরে একবারই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

পর্দার আড়ালে ইভিএম মেশিনের সামনে দাঁড়ালো রতন। চোখের সামনে সারি সারি প্রতীক চিহ্ন। প্রতিটা প্রতীকের পেছনে একটা করে মুখ, একটা করে প্রতিশ্রুতি আর একটা করে মিথ্যে। রতন ভাবল সেই পাকা ছাদের কথা, যার আশ্বাস গত রাতে তাকে দেওয়া হয়েছে। আবার ভাবল সেই 'পরিবর্তন'-এর কথা যা সমীর বলেছিল। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠল সেই পুরনো তালিকাটা, যেখানে তার নাম কোনোদিন ওঠে না।

সে ভাবল, এই বোতামগুলো কি সত্যিই ভাগ্য বদলায়? নাকি এগুলো কেবল ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি? রতনের আঙুল একটা প্রতীকের ওপর স্থির হলো। তার মনে হলো, কোনো দলের ইশতেহারে তো তার মেয়ের ওষুধের দাম কমার কথা লেখা নেই। কোনো নেতা তো বলেনি যে পরের বার বৃষ্টিতে তার ঘরটা আর পড়বে না।

যান্ত্রিক একটা 'বিপ' শব্দ হলো। রতন বেরিয়ে এল বাইরে।

বুথ থেকে বেরোতেই তিলক কাকা আর সেই 'দাদা'র চেলাপেলে তাকে ঘিরে ধরল। সমীরও সেখানে ছিল। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তিলক কাকা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? ঠিক জায়গায় কাজটা করেছিস তো?"

রতন পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে খুব শান্ত গলায় বলল, "আজ্ঞে, চালের অভাব আর পেটের খিদে কোনো দলের প্রতীকেই লেখা থাকে না। তাই নিজের বিচারটাই দিয়ে এলাম।"

রতনের এই অস্পষ্ট উত্তর শুনে তিলক কাকা একটু ভড়কে গেলেন। সমীর ভাবল রতন হয়তো ওদেরই ভোট দিয়েছে। কিন্তু রতন জানে সে কাউকেই ভোট দেয়নি, সে আসলে নিজের অস্তিত্বের ভোটটা দিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, নেতারা জিতবে কি হারবে তাতে তার ভাগ্য এক চুলও বদলাবে না। ভোটের ফল যাই হোক, কাল সকালে তাকে আবার সেই কাস্তে-কোদাল নিয়েই বেরোতে হবে। পাকা ছাদের স্বপ্নটা আবার পাঁচ বছরের জন্য আলমারিতে বন্দি হবে।

সূর্য ডুবছে আমোদপুর গ্রামের দিগন্তে। ভোটের হট্টগোল কমে এসেছে। রতন ওষুধের দোকান থেকে মিনুর সিরাপটা কিনে বাড়ির পথ ধরল। অন্ধকার পথ। দূরে কোথাও জয়ের আগাম উল্লাস শোনা যাচ্ছে। মিছিলে আবির উড়ছে, কিন্তু সেই রঙের ছিটেফোঁটাও রতনের ঘরে পৌঁছাবে না।

রতন মিস্ত্রি জানত, আগামীকাল থেকে তাকে আবার একা লড়াই করতে হবে। প্রকৃতির সাথে, ক্ষুধার সাথে আর এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের সাথে। চতুর রাজনীতির এই বিশাল মঞ্চে রতনের মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষ কেবল দর্শক। কিন্তু তাদের এই নীরবতা, এই নির্বিকারভাবে বোতাম টেপা আর তারপর নিজের জীবনে ফিরে যাওয়া—এটাই আসলে গণতন্ত্রের সবথেকে বড় প্রতিবাদ।

বিজয় মিছিলে স্লোগান দেওয়া মানুষগুলো জানে না, রতনের মতো মানুষেরা কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক নয়, তারা কেবল বেঁচে থাকার সমর্থক। সেই রাতে ঘরে ফিরে রতন যখন মিনুর মুখে ওষুধের চামচ তুলে দিচ্ছিল, তখন তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসিটা ফুটে উঠল। এ হাসি কোনো নেতার জন্য নয়, এ হাসি নিজের টিকে থাকার সংকল্পের। রাজনীতির ময়দানে যেই রাজা হোক না কেন, রতন নিজের জীবন-যুদ্ধের ময়দানে নিজেই নিজের সেনাপতি।

আর এই উপলব্ধিটাই হলো রতন মিস্ত্রির আসল 'শেষ হাসি'।

সমাপ্ত


শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

ছোট গল্প : ঘামের নিজস্ব কোনো রং নেই, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল

চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুতে হাওড়ার এই গলিগুলোতে সাধারণত বাতাস ঢোকে না। যা ঢোকে, তাকে একধরনের পোড়া মবিলের মতো ভ্যাপসা রোদ বলা যেতে পারে। গঙ্গার ধারের জুটমিলটা বন্ধ হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। সাইরেনের সেই বুক-কাঁপানো শব্দটা এখন আর এই তল্লাটের মানুষের স্নায়ুতে কোনো প্রত্যাশা বা ভীতির কম্পন তোলে না। মাধবের বয়স বাষট্টি পেরিয়েছে। তার ডান হাতের দুটো আঙুল কাটা পড়েছিল নব্বই সালের এক উত্তাল ধর্মঘটের দিন। পুলিশের লাঠির ঘায়ে নয়, কারখানার একটা পুরনো, জং-ধরা তাঁত মেশিনের চাকায়। আজ, মে দিবসের ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে, সেই কাটা আঙুলের ডগায় একটা অদ্ভুত, ভোঁতা শিরশিরানি টের পাচ্ছে সে। হয়তো এটা কোনো স্নায়বিক স্মৃতি, অথবা নেহাতই এই গুমোট আবহাওয়ার একটা অবচেতন শারীরিক প্রতিক্রিয়া।

একসময় এই পয়লা মে-র সকালগুলো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। লাল শালুর পতাকায় একটা আক্ষরিক অর্থের তেজ থাকত বলে মনে হতো তখন। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা ঘুম, আর আট ঘণ্টা বিনোদন—শিকাগোর সেই বহু-চর্চিত, রক্তস্নাত স্লোগানটা মাধবদের কাছে একসময় ধর্মগ্রন্থের আয়াতের চেয়েও বেশি অমোঘ মনে হতো। কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত এক জাদুকর। পুঁজিবাদের দাঁত ও নখ যত ধারালো এবং সুকৌশলী হয়েছে, শ্রমিকের লড়াইয়ের ভাষা ততটাই যেন ভোঁতা আর আপসকামী হয়ে পড়েছে। এখনকার মে দিবস মানে তো পাড়ার মোড়ে একটা ফাটা মাইকে কিছু পুরোনো গণসঙ্গীতের রেকর্ড বাজানো। বিকেলে নেতাদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পরানোর এক নির্লজ্জ উৎসব। মাধব তার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের দাওয়ায় বসে বিড়ি ধরাল। সস্তা তামাকের ধোঁয়ায় একটা পোড়া, তেতো স্বাদ।

গেটের মরচে-ধরা লোহার পাল্লাটা বিকট শব্দ করে খুলে গেল। সুমিত ঢুকল। মাধবের একমাত্র ছেলে। বয়স ছাব্বিশ ছুঁইছুঁই। তার পরনে একটা জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপের উজ্জ্বল কমলা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের পিঠে ঘামের দাগটা শুকিয়ে একটা অস্পষ্ট মানচিত্রের আকার নিয়েছে। সুমিতের চোখদুটো গর্তে বসা। কাল রাত আড়াইটে পর্যন্ত লগ-ইন ছিল সে।

আধুনিক কর্পোরেট দাসত্বের সম্ভবত এটাই সবচেয়ে নিখুঁত এবং ভয়াবহ রূপ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট কারখানা নেই। কোনো অত্যাচারী ফোরম্যান বা ম্যানেজার নেই যাকে ঘিরে ধরে ঘেরাও করা যায়, বা যার কলার চেপে ধরা যায়। এখানে শোষক সম্পূর্ণ অদৃশ্য। সে লুকিয়ে থাকে একটা স্মার্টফোন স্ক্রিনের পেছনে, কিছু জটিল অ্যালগরিদমের আড়ালে।

"আজও এত দেরি?" মাধব বিড়ির ছাই ঝাড়ল মাটির মেঝেতে।

সুমিত বাইকের চাবিটা চৌকির ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সিলিং ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিল। ফ্যানের ব্লেডগুলো থেকে একটা একটানা, বিরক্তিকর ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। "টার্গেট ছিল। আরও দুটো ডেলিভারি মারলে ইনসেনটিভটা পেতাম। কিন্তু বাইকের পেছনের টায়ারটা পাংচার হয়ে গেল মাঝরাস্তায়। বাইক ঠেলে গ্যারাজ অবধি নিয়ে যেতেই জীবন বেরিয়ে গেছে।"

ছেলের এই যান্ত্রিক হিসেবনিকেশের মধ্যে মাধব কোনো মানবিক স্পন্দন বা যৌবনের তেজ খুঁজে পায় না। "পরশু তো পয়লা মে। তোদের কোম্পানি ছুটি-ছাটা কিছু দেয় না?"

প্রশ্নটা শুনে সুমিত এমনভাবে তাকাল, যেন মাধব কোনো ভিনগ্রহের ভাষায় কথা বলছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, প্রায়-বীভৎস হাসির রেখা ফুটে উঠল। "মে দিবস? ওসব তোমাদের আমলের ফ্যাশন ছিল বাবা। আমাদের আবার ছুটি! লগ-অফ করলেই তো পকেট গড়ের মাঠ। কোম্পানি পরিষ্কার মেসেজ দিয়ে দিয়েছে, পয়লা মে-তে ডিমান্ড বেশি থাকে। ওইদিন যারা পনেরো ঘণ্টা ডিউটি টানবে, তাদের জন্য এক্সট্রা বোনাস রেট।"

মাধব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা সময় ছিল যখন মালিকপক্ষকে বাধ্য করা হতো কারখানা বন্ধ রাখতে। ধর্মঘট মানে ছিল একটা কালেক্টিভ জোর। শ্রমিক শ্রেণির একটা যৌথ মেরুদণ্ড। আজ এই নতুন অর্থনীতির জাঁতাকলে পড়ে শ্রমিক নিজেই নিজের শোষক হয়ে উঠেছে। সুমিতরা জানে না 'ট্রেড ইউনিয়ন' কাকে বলে। তারা শুধু বোঝে 'কাস্টমার রেটিং', 'ক্যানসেলেশন চার্জ', আর 'লগ-ইন আওয়ার্স'। এই ছেলেগুলোর খাতায়-কলমে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। তারা শ্রমিক নয়, কোম্পানির কর্পোরেট ভাষায় তারা নাকি 'ডেলিভারি পার্টনার'। শব্দের এই মায়াজাল তৈরি করে পুঁজিবাদ অত্যন্ত সুকৌশলে শ্রমিকের অধিকারের ধারণাটাকেই সম্ভবত মগজ থেকে মুছে ফেলেছে।

"তুই তো পার্টনার, তাই না?" মাধবের গলায় একটা সূক্ষ্ম, তীরের মতো শ্লেষ। "পার্টনারের আবার বোনাস কীসের রে? পার্টনার তো ব্যবসার লাভের বখরা পায়। তুই পাস?"

সুমিত গেঞ্জিটা খুলে ঘামে ভেজা শরীরটা গামছা দিয়ে মুছতে লাগল। তার পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট গোনা যায়। "তোমাদের ওই বস্তাপচা পলিটিক্যাল লজিকগুলো এখন আর খাটে না। তোমরা ইউনিয়ন করে, লাল ঝান্ডা উড়িয়ে জুটমিলটার বারোটা বাজিয়েছ। আজ যদি কারখানাটা চলত, আমাকে এই চৈত্র মাসের রোদে পুড়ে বাইক নিয়ে লোকের দরজায় দরজায় খাবার দিয়ে আসতে হতো না। তোমরা লড়েছ শুধু নেতাদের পকেট ভরাতে। আজ সেই নেতারাই তো প্রোমোটারি করছে।"

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মাধবের চামড়ায়। এটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। আটের দশকের সেই উত্তাল শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে যে নীরব পচনটা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটা নগ্ন, কুৎসিত সত্য। কারখানার অনেক নেতাই তো পরে মেশিনের পার্টস বেচে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় নেমেছে। মাধবরা শুধু দাবার ঘুঁটি ছিল। তবে কি তাদের ওই রক্ত, ঘাম, পুলিশের লাঠি খাওয়া—সবটাই একটা অর্থহীন প্রহসন ছিল?

সুমিত একটু শান্ত হয়ে চৌকিতে বসল। "জানিস বাবা, আজ সাউথ সিটির একটা ফ্ল্যাটে পিৎজা দিতে গিয়েছিলাম। পঁয়ত্রিশ তলায়। লিফটম্যান আমাকে প্যাসেঞ্জার লিফটে উঠতে দিল না। বলল সার্ভিস লিফটে যেতে। সেখানে আবার মেইনটেন্যান্সের কাজ চলছে। পনেরো মিনিট লেট হলো। কাস্টমার খাবারটা নিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। টিপস তো দূর, অ্যাপে ওয়ান-স্টার রেটিং দিয়ে একটা কমেন্ট ঠুকে দিল। এর জন্য কাল আমার পেমেন্ট থেকে পঁচিশ টাকা কাটা যাবে।"

মাধবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল। এই অপমানটা তার খুব চেনা। আশির দশকে বড় সাহেবরা যখন তাদের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাত, তখন মাধবদের মনে হতো মেশিনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু সুমিত কার ওপর রাগ দেখাবে? সেই অদৃশ্য কাস্টমারের ওপর, নাকি ওই অ্যাপের ওপর? আধুনিক সমাজ একটা অদ্ভুত কাঁচের দেওয়াল তুলে দিয়েছে মানুষ আর মানুষের মাঝখানে।

পয়লা মে-র সকালটা শুরু হলো পরিচিত কোলাহলে।

পাড়ার মোড়ে একটা ছোট স্টেজ বাঁধা হয়েছে। ওপরের লাল ফ্লেক্সে কাস্তে-হাতুড়ির ছবি, আর তার নিচে সাদা হরফে লেখা, 'শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ'। অথচ স্টেজের সামনের সারিতে যারা বসে আছে, তাদের হাতে কোনোদিন কড়া পড়েনি। তারা স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাথা। পাড়ার রিয়েল এস্টেট ব্রোকার। মাধব নিজের জানলার ফাঁক দিয়ে দূর থেকে দেখছিল দৃশ্যটা। তার হঠাৎ করে নিজের কাটা আঙুলগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। একটা তীব্র বমি-পাওয়া অনুভূতি তার গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে চাইছে।

সুমিত বাইক বের করছে। আজ তাকে পনেরো ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হবে। তার বাইকের হ্যান্ডেলের একপাশে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের লাল পতাকা কে বা কারা হয়তো রাতে বেঁধে দিয়ে গেছে। সুমিত চরম বিরক্তি নিয়ে সেটা ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দিল।

"সাবধানে যাস," মাধব শুধু এইটুকুই বলতে পারল।

"চিন্তা কোরো না। আজ ট্রাফিক কম থাকবে। সবাই তো তোমাদের মতো বিপ্লব করতে স্টেজে উঠেছে।" সুমিত হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে নিল।

বাইকের স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজে মাধব বুঝতে পারল, একটা যুগ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। পুরোনো স্লোগানগুলো এখন কেবলই কয়েকটা ফাঁপা, প্রাণহীন শব্দ। মে দিবস এখন আর কোনো প্রতিবাদের দিন নয়। এটা হয়তো একটা শোকপালনের দিন। মৃত অধিকার এবং হারানো মেরুদণ্ডের শোক।

মাধব ধীর পায়ে নিজের অন্ধকার ঘরের দিকে হাঁটা লাগাল। রোদের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। গঙ্গার দিক থেকে আসা হাওয়াটা এখন রীতিমতো তপ্ত। ঘামের আসলে কোনো নিজস্ব রং থাকে না। সেটা মাধবের মতো বাতিল মিল-শ্রমিকের ঘাম হোক, বা সুমিতের মতো আধুনিক ডেলিভারি বয়ের। শরীর নিংড়ে বেরোনো এই নোনতা জলের হিসেব কোনোদিন কোনো লাল খাতায় লেখা থাকে না। স্টেজের ওপর থেকে তখন এক নেতা মাইকে গলা ফাটিয়ে বলছেন, "দুনিয়া কা মজদুর এক হো..."।

মাধব জানলার পাল্লাটা ভেতর থেকে সজোরে বন্ধ করে দিল। বাইরের এই মেকি, উৎসব-মুখর প্রহসন আর তার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্তত নিজের এই গুমোট, চার দেওয়ালের ভেতরে তার এই নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যানটুকু তো কোনো নেতা বা কোনো অ্যালগরিদম কেড়ে নিতে পারবে না। ঘরের অন্ধকারে, চৌকির তলায় রাখা একটা পুরোনো, ধুলো-পড়া লাল শালুর দিকে তাকিয়ে মাধবের মনে হলো, অধিকারের লড়াইটা বোধহয় শেষ হয়নি, শুধু তার ফ্রন্টলাইনটা বদলে গেছে—এবং সেই নতুন ফ্রন্টলাইনে মাধবরা আজ ভীষণভাবে একা এবং অপ্রাসঙ্গিক।



কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...