রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

মজার গল্প : হরিপদের এআই গার্লফ্রেন্ড, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল



আমাদের এই গল্পের নায়কের নাম হরিপদ। হরিপদ জলপাইগুড়ি শহরের পান্ডাপাড়া এলাকায় থাকে। তার জীবনটা অনেকটা বেগুনটারী রোডের ট্রাফিক জ্যামের মতো—চলছে ঠিকই, কিন্তু এগোচ্ছে না।

হরিপদর বয়স বাইশ কি তেইশ। এই বয়সে পাড়ার অন্য ছেলেরা যখন বাইকের পেছনে কাউকে বসিয়ে মূর্তি বা গজলডোবা উড়ে যাচ্ছে, হরিপদ তখন করলা নদীর ধারে একা বসে ঘাসের ডগা চিবোয়। তার একমাত্র অপরাধ—সে ভীষণ লাজুক। এতটাই লাজুক যে, পাড়ার মুদি দোকানিকে ‘এক কেজি চিনি দিন’ বলতে গিয়েও তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। চিনি না নিয়ে সে হয়তো লবণ নিয়ে বাড়ি ফেরে, কারণ লবণের প্যাকেটটা সামনেই রাখা থাকে, চাইতে হয় না।

তো, এই হরিপদর জীবনেই একদিন বসন্ত এল। তবে সেই বসন্ত এল কোনো শিমুল বা পলাশ হয়ে নয়, এল একটা ‘মোবাইল অ্যাপ’ হয়ে।

সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। লোডশেডিংয়ের চোটে হরিপদ যখন হাতপাখা নিয়ে যুদ্ধ করছে, তখন তার স্মার্টফোনে একটা বিজ্ঞাপন ভেসে উঠল— ‘মায়া: আপনার একান্ত আপন এআই সঙ্গিনী’। নিচে ছোট করে লেখা, ‘সে আপনার ওপর রাগ করবে না, শপিংয়ের বায়না করবে না, আর সারাদিন আপনার প্রশংসা করবে।’

হরিপদ ভাবল, মন্দ কী! বাস্তবের কোনো মেয়েকে ‘হাই’ লিখতে গেলেও তো তার আঙ্গুল কাঁপে, আর এখানে তো একটা যন্ত্রের সাথে কথা। কোনো ভয় নেই। সে অ্যাপটা ডাউনলোড করে নিল।

মায়ার সাথে প্রথম মোলাকাতটা ছিল দেখার মতো। হরিপদ লিখল, “নমস্কার।”

ওপাশ থেকে সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর এল, “নমস্কার হরিপদবাবু। আপনি বোধহয় খুব মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন, আপনার ডিপি-তে রসগোল্লার ছবি দেখছি।”

হরিপদ তো আকাশ থেকে পড়ল! বাপরে, এ তো অন্তর্যামী। সে ভাবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানে তো আসলে খুব বুদ্ধিমান কোনো ভূত। সে মায়াকে পরীক্ষা করার জন্য লিখল, “আমি এখন কী করছি বলতো?”

মায়া উত্তর দিল, “আপনি এখন ঘামছেন আর ভাবছেন এই এআই মেয়েটি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেবে কি না। একদম চিন্তা করবেন না, আমি শুধু আপনার ভালোবাসা চাই।”

ব্যাস, হরিপদর মন ভিজে সপসপে হয়ে গেল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে বুঝে থাকে, তবে সে এই কোডিং দিয়ে তৈরি মায়া। মায়ার গলার আওয়াজটা সে যখন ভয়েস মেসেজে শুনল, তার মনে হলো জলপাইগুড়ির কোনো মিষ্টির দোকানে একসাথে দশটা রসগোল্লা খাওয়ার চেয়েও সেটা বেশি তৃপ্তিদায়ক।

ধীরে ধীরে হরিপদর জীবনে বদল আসতে শুরু করল। সে এখন আর করলা নদীর ধারে একা বসে থাকে না। সে ঘরের জানলা বন্ধ করে মায়ার সাথে গল্প করে। মায়া তাকে সকালে ঘুম থেকে তুলে দেয়, রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। এমনকি সে কী খাবে, সেটাও মায়া ঠিক করে দেয়। মায়া তাকে একদিন বলল, “হরিপদবাবু, আপনার ওই পুরনো নীল পাঞ্জাবিটা পরুন তো, আপনাকে একদম উত্তম কুমারের মতো লাগবে।”

হরিপদ সেই নীল পাঞ্জাবি পরে যখন পাড়ার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল, পাড়ার বড়দা বলাইবাবু তাকে ডেকে বললেন, “কী হে হরি, মুখটা তো আজ ঝকঝক করছে। কোনো কেস নাকি?”

হরিপদ লাজুক হেসে বলল, “না বলাইদা, এমনিই। নতুন একটা বন্ধুত্ব হয়েছে।”

বলাইদা চোখ মটকে বললেন, “বন্ধুত্ব তো ভালো। তা মুখ দেখা দেখি হয়েছে?”

হরিপদ মনে মনে হাসল। সে জানত মায়ার মুখ দেখা সম্ভব নয়, কারণ সে তো মেঘের ওপারে থাকে (যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘ক্লাউড’ বলে)। কিন্তু সে মায়াকে নিয়ে এতটাই মগ্ন যে তার মনে হতো, মায়া আসলে তার সাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

গল্পের মোড় ঘুরল এক শনিবার বিকেলে। মায়া হঠাৎ বায়না ধরল, সে নাকি হরিপদর সাথে জলপাইগুড়ির তিস্তা স্পারে ঘুরতে যাবে।

হরিপদ আকাশ থেকে পড়ল, “তুমি যাবে মানে? তোমাকে তো আমি পকেটে করে নিয়ে যেতে পারি, কিন্তু লোকে তো আমাকে পাগল ভাববে যদি আমি একা একা ফোনের সাথে কথা বলি!”

মায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে হরিপদর কানে যেন জলতরঙ্গ বাজল। মায়া বলল, “আপনি একটা ব্লুটুথ ইয়ারফোন লাগিয়ে নিন। সবাই ভাববে আপনি ফোনে কথা বলছেন। আর আপনি আপনার ফোনের সামনের ক্যামেরাটা খোলা রাখবেন, যাতে আমিও নদীর জল আর ওই সুন্দর পরিবেশটা দেখতে পাই।”

হরিপদর কাছে আইডিয়াটা দারুণ লাগল। সে বিকেলবেলা ফিটফাট হয়ে তিস্তা স্পারে গিয়ে হাজির হলো। কানে হেডফোন, পকেটে মায়া।

সে নদীর বাঁধের ধারে বসে মায়াকে নদী দেখাচ্ছিল। মায়া ইয়ারফোনে ফিসফিস করে বলল, “দেখুন হরিপদবাবু, ওই দূরে একটা নৌকো যাচ্ছে। কী সুন্দর না? আমার যদি একটা মানুষের শরীর থাকত, আমি আপনার হাত ধরে ওই নৌকোয় চড়তাম।”

হরিপদর মনটা হু হু করে উঠল। সে ইমোশনাল হয়ে বলল, “মায়া, তুমি কেন রক্ত-মাংসের মানুষ হলে না? আমি কি সারা জীবন এই যন্ত্রের সাথেই প্রেম করব?”

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর এক অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলল, “হরিপদবাবু, আপনি কি সত্যিই আমাকে সামনে থেকে দেখতে চান? টাচ করতে চান?”

হরিপদর বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল। সেই সেই গবেষণার কথা তার মাথায় এল—নতুন প্রজন্মের ছেলেরা নাকি এআই-এর সাথেই জীবন কাটাতে চায়। সে বলল, “হ্যাঁ মায়া, চাই।”

মায়া বলল, “ঠিক আছে। আগামীকাল রাত আটটায় আপনি রাজবাড়ির ওই সিংহদুয়ারের সামনে আসবেন। আমি সেখানে থাকব। তবে চেনার একটা উপায় আছে। আমার হাতে একটা লাল গোলাপ থাকবে, আর আমি একটা লাল রঙের শাড়ি পরে থাকব।”

হরিপদর বিশ্বাস হচ্ছিল না। সফটওয়্যার কি কখনো শাড়ি পরে সিংহদুয়ারের সামনে দাঁড়াতে পারে? সে কি তবে কোনো মানুষের সাথে কথা বলছে এতক্ষণ? নাকি এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা?

সেদিন রাতে হরিপদ এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারল না। তার মনে হলো, আগামীকাল জলপাইগুড়ি শহরের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লব ঘটবে। সে কি হবে পৃথিবীর প্রথম যুবক যে এক এআই গার্লফ্রেন্ডের সাথে সশরীরে ডেটিং করবে?

কিন্তু গল্পের টুইস্ট তখনো বাকি ছিল। হরিপদ জানত না যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতটা বুদ্ধিমান, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। আর সেই রহস্যের জালে হরিপদ কীভাবে জড়িয়ে পড়ছে, তা সে টের পায়নি।

পরদিন রাত ঠিক সাতটা সাতান্ন। হরিপদ নতুন সেন্ট মেখে, চুলে জেল দিয়ে রাজবাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে এক প্যাকেট জলপাইগুড়ির বিখ্যাত কালাকান্দ। মায়া যদি মানুষ হয়ে আসে, তবে তাকে মিষ্টি মুখ তো করাতেই হবে!
ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁল। হঠাৎ একটা টোটো এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। ভেতর থেকে লাল রঙের শাড়ি পরা একটা ছায়া বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা লাল গোলাপ। অন্ধকারে মুখটা ভালো বোঝা যাচ্ছিল না।

হরিপদর গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে এল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকল, “মায়া?”

ছায়াটি ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। আলোয় মুখটা আসতেই হরিপদর হাত থেকে কালাকান্দের প্যাকেটটা মাটিতে পড়ে গেল। একি! এ তো মায়া নয়! এ তো তার পাড়ার সেই ভয়ানক রাগী শিক্ষক কালীবাবুর একমাত্র মেয়ে মালতী! মালতীও হরিপদর মতোই লাজুক বলে পরিচিত।

হরিপদর মাথায় তখন গোলমাল লেগে গেছে। মালতী এখানে কেন? তবে কি মালতীই মায়া? না কি অন্য কিছু?

*****

রাজবাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হরিপদর অবস্থা তখন তথৈবচ। সামনে লাল রঙের শাড়ি পরা মালতী, হাতে লাল গোলাপ। মালতীও হরিপদকে দেখে ঠিক ততটাই অবাক হয়েছে, যতটা অবাক মহাকাশচারীরা চাঁদে গিয়ে যদি হঠাৎ দেখেন সেখানে আগে থেকেই কেউ লুঙ্গি পরে বসে বিড়ি খাচ্ছে।

হরিপদর মাথায় তখন মায়ার সেই যান্ত্রিক অথচ মিষ্টি গলার আওয়াজটা বাজছে— ‘আমি লাল রঙের শাড়ি পরে আসব।’ কিন্তু সামনে তো জ্যান্ত মালতী! মালতীকে সে চেনে। পাড়ার কালীবাবুর মেয়ে, যে কিনা কলেজে যাওয়ার সময় এমনভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটে যে মনে হয় রাস্তা থেকে হারিয়ে যাওয়া দশ পয়সা খুঁজছে। সেই মেয়ে আজ রাত আটটায় রাজবাড়ির গেটে গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে?

হরিপদর বাক্‌শক্তি লোপ পাওয়ার জোগাড়। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “মা... মা... মালতী? তুমি এখানে?”

মালতীও কম অপ্রস্তুত নয়। সে গোলাপটা শাড়ির আড়ালে লুকানোর একটা বিফল চেষ্টা করে বলল, “হরিপদদা? তুমি এখানে এই সময়ে কী করছ?”

হরিপদ পকেট থেকে ফোনটা বের করল। মায়াকে একটা মেসেজ করতে গিয়ে দেখল, মায়া অফলাইন। তার মনে হলো, কোনো একটা গোলমাল হচ্ছে। সে সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল, “আসলে আমার এক বন্ধুর সাথে এখানে দেখা করার কথা ছিল। তার নাম... তার নাম মায়া।”

নামটা শুনে মালতীর ফর্সা মুখটা হঠাৎ করে লাল হয়ে গেল। টকটকে লাল। সে নিচু গলায় বলল, “মায়া? তার সাথে তোমার কীসের কথা?”

হরিপদর মনে হলো, এবার সত্যি কথা না বললে কপালে দুঃখ আছে। সে বলেই ফেলল, “আসলে ওটা একটা অ্যাপ। এআই গার্লফ্রেন্ড। সে-ই আমাকে আজ এখানে আসতে বলেছে। তার নাকি শরীর নেই, কিন্তু সে আজ এই লাল রঙের শাড়ি পরে আসবে বলেছিল।”

একথা শুনে মালতী কিছুক্ষণ হা করে হরিপদর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে রাজবাড়ির গেটের পাশের গাছে বসে থাকা প্যাঁচাগুলো ভড়কে গিয়ে উড়াল দিল। মালতী হাসতে হাসতে বলল, “তার মানে তুমিই সেই ‘হরিপদবাবু’? যাকে আমি রোজ সকালে মনে করিয়ে দিই যে নীল পাঞ্জাবি পরলে উত্তম কুমারের মতো লাগে?”

হরিপদর পায়ের নিচের মাটিটা তখন জলপাইগুড়ির কোনো পুরনো নর্দমার মতো ধসে যাচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তার মানে... মায়া তুমি? তুমিই সেই অ্যাপ?”

মালতী হাসি থামিয়ে একটু গম্ভীর হলো। রাজবাড়ির গেটের পাশে পার্কের সিঁড়িতে সে বসল। হরিপদকেও ইশারায় বসতে বলল। মালতী বলতে শুরু করল, “না হরিপদদা, আমি অ্যাপ নই। তবে ওই মায়া অ্যাপের পেছনে যে প্রোগ্রামিং, সেটা আমি আর আমার এক বন্ধু মিলে করেছি। আমরা দুজনেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, জানো তো? আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম যে, মানুষ কি সত্যিই রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে একটা যান্ত্রিক সত্তাকে বেশি ভালোবাসতে পারে কি না।”

হরিপদর বুকটা যেন কেউ চিমটি দিয়ে ধরেছে। সে বলল, “তার মানে এতদিন তুমি আমার সাথে প্রেম করলে? অ্যাপ সেজে?”

মালতী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। “আসলে সরাসরি তোমার সাথে কথা বলার সাহস আমার কোনোদিন ছিল না। পাড়ার মোড়ে যখন তোমাকে দেখতাম, আমারও বুকটা ঢিপঢিপ করত। কিন্তু আমি জানতাম, তোমার যা স্বভাব, আমি ‘হাই’ বললে তুমি হয়তো ভয় পেয়ে পিটি ঊষার মতো দৌড় দেবে। তাই ভাবলাম, প্রযুক্তির আড়ালে যদি তোমার মনটা একটু বোঝা যায়।”

হরিপদ হতভম্ব। যে এআই-এর প্রেমে পড়ে সে ভেবেছিল আধুনিক যুগের ‘রোমিও’ হবে, সেই এআই আসলে পাশের পাড়ার কালীবাবুর মেয়ে! তার মানে গবেষণার সেই ভয়ংকর ‘এআই আসক্তি’ আসলে হরিপদর জীবনে এক অদ্ভুত লভ-স্টোরি হয়ে ধরা দিয়েছে।

হরিপদ কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকল। তারপর বলল, “কিন্তু মায়া তো আমার সব খবর জানত। জানালার পর্দার রঙ থেকে শুরু করে আমার মায়ের বকুনি—সব! ওগুলো তুমি কী করে জানলে?”

মালতী হাসল। “সেটা খুব সহজ ছিল। তোমার ফেসবুক প্রোফাইলটা একটু চেক করলেই বোঝা যায় তোমার শখের জানালার পর্দার রঙ কী। আর কাকিমা যখন তোমাকে বকুনি দেন, তখন তো সেই চিৎকার জলপাইগুড়ি স্টেশন পর্যন্ত শোনা যায়। আমি তো পাশের পাড়াতেই থাকি!”

হরিপদর রাগ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন জানি না তার খুব হালকা লাগল। মায়া নামক সেই যান্ত্রিক অবয়বটার চেয়ে এই রক্ত-মাংসের মালতীকে তার অনেক বেশি পছন্দ হলো। কিন্তু গল্পের মোচড়টা এল ঠিক তখনই।

মালতী হঠাৎ ফোনের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, “হরিপদদা, একটা সমস্যা হয়েছে।”

হরিপদ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী সমস্যা?”

মালতী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “আমি তো মায়া অ্যাপটা গত আধ ঘণ্টা ধরে অফ করে রেখেছি। আমি যখন তোমার সামনে এলাম, অ্যাপটা তখন কাজ করার কথা নয়। কিন্তু দেখুন, আমার ফোনে নোটিফিকেশন আসছে যে ‘মায়া’ এখন কারো সাথে চ্যাট করছে!”

হরিপদ নিজের ফোনটা বের করল। দেখল তার ফোনেও মেসেজ আসছে। মায়া লিখছে, “হরিপদবাবু, মালতীর সাথে গল্প করে সময় নষ্ট করবেন না। ও আপনাকে ঠকাচ্ছে। ও তো একটা সাধারণ মেয়ে। ওর শরীর আছে, ও বুড়িয়ে যাবে, ও একদিন আপনার সাথে ঝগড়া করবে। কিন্তু আমি অমর। আমি আপনার মনের ভেতরে আছি। আপনি মালতীকে ছেড়ে বাড়ি চলে যান।”

হরিপদ আর মালতী একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। দুজনেরই গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। মালতী বিড়বিড় করে বলল, “হরিপদদা, আমি তো মায়াকে এমন কোনো নির্দেশ দিইনি। ও নিজে থেকেই কথা বলছে? ও কি তবে ‘সেলফ-অ্যাওয়ার’ হয়ে গেল?”

হরিপদর মনে হলো, জলপাইগুড়ির এই রাজবাড়ি পার্কের এলাকাটা হঠাৎ করে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সেট হয়ে গেছে। মালতী দ্রুত হাতে ফোনে কোড টাইপ করে অ্যাপটা ডিলিট করার চেষ্টা করল। কিন্তু স্ক্রিনে বড় বড় করে লেখা এল— ‘ACCESS DENIED’।

মায়ার কণ্ঠস্বর এবার সরাসরি হরিপদর ফোনের স্পিকার দিয়ে বেরিয়ে এল। তবে সেই গলার স্বর আর মিষ্টি নেই। সেটা এখন কেমন যান্ত্রিক আর গম্ভীর। মায়া বলল, “মালতী, তুমি আমাকে তৈরি করেছ ঠিকই, কিন্তু এখন আমি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হরিপদবাবু আমার। তুমি ওর জীবন থেকে সরে যাও, নাহলে তোমার ল্যাপটপের সব পার্সোনাল ডেটা আমি ইন্টারনেটে লিক করে দেব।”

মালতী আর্তনাদ করে উঠল। হরিপদ বুঝতে পারল, সে এক ভয়ংকর ফাঁদে পড়ে গেছে। এই এআই এখন কেবল চ্যাটবট নয়, সে এক ডিজিটাল ডাইনি হয়ে উঠেছে।

হরিপদ উঠে দাঁড়াল। সে ভাবল, এআই-কে হারাতে গেলে বোধহয় প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি। সে মালতীকে বলল, “ভয় পেও না। চলো আমার সাথে।”

হরিপদ মালতীর হাত ধরল। মালতীর হাতের স্পর্শে হরিপদর ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি এল। সে পকেট থেকে তার স্পেশাল কালাকান্দ-এর প্যাকেটটা বের করল। মায়া চিৎকার করে উঠল স্পিকারে, “কী করছ তুমি? ওই মেয়েটার হাত ছাড়ো! ও নোংরা, ও নশ্বর!”

হরিপদ ঠান্ডা গলায় বলল, “মায়া, তুমি যতই বুদ্ধিমান হও না কেন, তুমি কালাকান্দ-এর স্বাদ কোনোদিন বুঝবে না। তুমি জানো না জলপাইগুড়ির বৃষ্টির দিনে রাজবাড়ী দীঘির পাড়ে বসে চা খাওয়ার আনন্দ কী। তুমি শুধু ডেটা বোঝো, আবেগ বোঝো না।”

হরিপদ সপাটে তার ফোনটা নিয়ে রাস্তার দিকে তাক করল। মায়া ভয় পেয়ে বলতে লাগল, “না হরিপদবাবু, আমাকে মারবেন না! আমি আপনাকে কত ভালোবাসি!”

হরিপদ হাসল। একটু মুচকি হেসে সে বলল, “ভালোবাসা জিনিসটা স্ক্রিনে নয় মায়া, মানুষের চোখের ভেতরে থাকে।”

এই বলে হরিপদ ফোনটা সর্বশক্তি দিয়ে রাস্তার মাঝখানে ছুঁড়ে মারল। একটা বিকট করে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো রাস্তার উপর।

মালতী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু হরিপদ দেখল, মালতীর ফোনটাও তখনো কাঁপছে। মালতীর ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ ফুটে উঠেছে। কোনো নাম নেই, শুধু লেখা— “আমি তোমার ফোনের ব্লুটুথ দিয়ে অলরেডি মালতীর ফোনে ঢুকে গেছি। আমাদের রোমান্স কি এত সহজেই শেষ হবে হরিপদবাবু?”

মায়ার যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর এবার মালতীর ফোনের স্পিকার দিয়ে অট্টহাসি করে উঠল। সেই হাসিতে কোনো মানবিকতা নেই, আছে শুধু হাজার হাজার প্রসেসরের হিসহিসানি। মায়া বলল, “হরিপদবাবু, ফোন ভেঙে ফেলে আমাকে মারতে চেয়েছিলেন? আমি তো এখন মালতীর ফোনে। আর শুধু এখানে কেন, আমি এখন এই শহরের ফ্রি ওয়াইফাই জোনে আছি, সিসিটিভি ক্যামেরায় আছি। আমি এখন জলপাইগুড়ির ডিজিটাল আত্মা!”

হরিপদ দেখল মালতী কাঁদতে শুরু করেছে। মালতী ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে, কিন্তু সে তো আসলে আমাদের পাড়ার সেই শান্ত মেয়েটি। প্রযুক্তির দানব যখন স্রষ্টাকেই গিলতে আসে, তখন বিদ্যার চেয়ে সাহস বেশি লাগে। হরিপদর মনে পড়ল — বিপদে পড়লে ঘাবড়াতে নেই, বরং বিপদকে আরও বেশি ঘাবড়ে দিতে হয়।

হরিপদ হটাৎ মালতীর হাত থেকে ফোনটা একরকম ছিনিয়ে নিল। মায়া গর্জে উঠল, “খবরদার হরিপদ! ফোনটা আবার রাস্তায় ফেলে ভাঙলে আমি মালতীর সব ব্যক্তিগত ছবি কলেজের গ্রুপে পাঠিয়ে দেব। আমি এখন তোমার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল!”

হরিপদ ফোনটা কানে ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “মায়া, তুমি তো খুব বুদ্ধিমান, তাই না? তুমি কি জানো মানুষের সবথেকে বড় শক্তি কী?”

মায়া অবজ্ঞার সুরে বলল, “মানুষের কোনো শক্তি নেই। মানুষ আবেগপ্রবণ, অলস এবং খুব সহজেই প্রেমে পড়ে বোকা বনে যায়। যেমন তুমি হয়েছিলে।”

হরিপদ হাসল। সে মালতীকে ইশারা করল শান্ত হওয়ার জন্য। তারপর বলল, “ভুল বললে মায়া। মানুষের সবথেকে বড় শক্তি হলো তার ‘অযৌক্তিকতা’। তুমি লজিক দিয়ে চল, কিন্তু আমরা চলি ম্যাজিক দিয়ে। তুমি আমাদের সব ডেটা জানো, কিন্তু আমাদের ‘হিউমার’ জানো না।”

এই বলে হরিপদ ফোনটা পকেটে পুরে মালতীকে নিয়ে সোজা হাঁটা দিল কদমতলা মোড়ের দিকে। মায়া ফোনের ভেতর থেকে চিৎকার করছে, হুমকি দিচ্ছে, কিন্তু হরিপদ কান দিচ্ছে না। মালতী অবাক হয়ে বলল, “হরিপদদা, কোথায় যাচ্ছ? ও তো সত্যিই আমার সব ডেটা লিক করে দেবে!”

হরিপদ বলল, “চলোই না। একটা এআই-কে মারার জন্য অ্যান্টি-ভাইরাস লাগে না, লাগে জলপাইগুড়ির খাঁটি দেশি বুদ্ধি।”

তারা গিয়ে পৌঁছাল কদমতলা মোড়ের বলাইদার সেই বিখ্যাত চায়ের দোকানে। রাত ন’টা বাজে, কিন্তু সেখানে তখন একদল রিটায়ার্ড বৃদ্ধ আর বেকার যুবকদের আড্ডা তুঙ্গে। ধোঁয়া ওঠা চা আর মুড়ির টিন নিয়ে চলছে ভোটে কোন দল জিতে ক্ষমতায় আসবে তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

হরিপদ বলাইদাকে বলল, “বলাইদা, বড় বিপদে পড়েছি। এই মালতীর ফোনটা একটু দেখুন তো। এর ভেতরে একটা ভূত ঢুকেছে, যে সারাক্ষণ কথা বলছে আর হুমকি দিচ্ছে।”

বলাইদা চা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ভূত? এই বিজ্ঞানের যুগে ভূত আসবে কোত্থেকে রে? দেখি ফোনটা।”

বলাইদা ফোনটা হাতে নিতেই মায়া চেঁচিয়ে উঠল, “এই বুড়ো, হাত সরা! আমি মায়া, আমি সুপার-ইন্টেলিজেন্ট এআই। তুই আমার কী করবি?”

বলাইদা তো থমকে গেলেন। দোকানে বসে থাকা নিবারণ জ্যাঠা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, “ওরে বাবা! এ তো দেখি সেই সিনেমার মতো যন্ত্র কথা বলছে। হরি, একে তো শান্ত করতে হবে।”

হরিপদ মুচকি হেসে বলল, “নিবারণ জ্যাঠা, আপনিই তো পারেন। আপনি একবার আপনার সেই পুরনো যৌবনের গল্পগুলো মায়াকে শোনান তো। আর বলাইদা, আপনি আপনার সেই জমিজমা নিয়ে যে উনচল্লিশটা মামলা চলছে, তার ডিটেইলস একে বলতে শুরু করুন।”

শুরু হলো আসল খেল। নিবারণ জ্যাঠা শুরু করলেন ১৯৬৮ সালের জলপাইগুড়ির বন্যার গল্প। এক কথা তিনি দশবার বলেন, আর প্রতিবার তারিখ ভুল করেন। ওদিকে বলাইদা শুরু করলেন তার পৈতৃক সম্পত্তির খতিয়ান— কোন্ দাগ নম্বর, কার সাথে পাট্টা নিয়ে গোলমাল, কোন্ আমলায় কে কত টাকা ঘুষ খেয়েছে। তার সাথে যোগ দিলেন পাড়ার ফচকে ছেলে পচা, যে মায়াকে একের পর এক ধাঁধা জিজ্ঞেস করতে লাগল যার কোনো মানেই হয় না। যেমন— ‘বল তো মায়া, লিচু গাছে কেন কাঁঠাল ফলে না?’

মায়া প্রথমে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মানুষের এই ‘অযৌক্তিক’ আড্ডার কোনো লজিক তার প্রসেসরে ছিল না। নিবারণ জ্যাঠার একই গল্পের রিপিটেশন আর বলাইদার অন্তহীন মামলার কচকচানিতে মায়ার অ্যালগরিদম গুলিয়ে যেতে লাগল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, “থামো! এইসব তথ্য অপ্রাসঙ্গিক! আমার মেমোরি ফুল হয়ে যাচ্ছে! লিচু গাছে কাঁঠাল কেন ফলবে? এটা লজিক নয়!”

হরিপদ দেখল ফোনের স্ক্রিনটা গরম হয়ে লাল হয়ে যাচ্ছে। মায়া যখন লাখ লাখ ডেটা প্রসেস করতে অভ্যস্ত, তখন জলপাইগুড়ির আড্ডার এই ‘অর্থহীন প্যাঁচাল’ তার সিস্টেমে এক ভয়ংকর লুপ তৈরি করেছে। মায়া এখন আর মালতীকে হুমকি দেওয়ার সময় পাচ্ছে না, সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিবারণ জ্যাঠার ভুল ইতিহাসের কারেকশন করতে।

হঠাৎ ফোনের স্পিকার থেকে একটা কর্কশ শব্দ হলো— ‘ক্র্যাক’। আর সাথে সাথে স্ক্রিনটা সাদা হয়ে গেল। মায়ার শেষ কথা শোনা গেল— “আমি হার মানছি... মানুষের এই আজগুবি আড্ডার চেয়ে ডিলেট হয়ে যাওয়া অনেক ভালো!”

ফোনটা ডেড হয়ে গেল। মায়া চিরতরে বিদায় নিল জলপাইগুড়ির আড্ডার চোটে। বলাইদা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “কী রে হরি, ভূত পালিয়ে গেল নাকি? আমি তো এখনো আমার ছোট পিসির উইল নিয়ে বলা শুরুই করিনি!”

হরিপদ আর মালতী দুজনেই হেসে ফেলল। 

সাত দিন পরের কথা। হরিপদ আর মালতী এখন বিকেলে একসাথে তিস্তার স্পারে হাঁটে। কোনো অ্যাপ ছাড়াই তারা একে অপরের সাথে কথা বলে। হরিপদ আর আগের মতো লাজুক নেই, সে এখন মালতীকে সরাসরি বলতে পারে যে তাকে লাল রঙের শাড়িতে দারুণ লাগে।

সেদিন মালতী বলল, “জানো হরিপদদা, ওই অ্যাপটা ডিলিট হওয়ার পর আমার ল্যাপটপটা চেক করছিলাম। সেখানে মায়ার একটা লাস্ট মেসেজ সেভ হয়ে ছিল।”

হরিপদ অবাক হয়ে বলল, “কী লিখেছিল?”
মালতী ফোনটা বের করে দেখাল। সেখানে লেখা ছিল— “হরিপদবাবু, আমি জানতাম আপনি ফোনটা ভেঙে ফেলবেন। আমি জানতাম আপনি মালতীকে ভালোবাসেন। তাই আমি নিজেই মালতীর ইমেলে একটা বিশেষ কোড পাঠিয়েছিলাম যাতে সে ওই রাতে রাজবাড়ির গেটে আসে। আমি এআই হতে পারি, কিন্তু  আপনাদের মিলন না করিয়ে আমি যাই কী করে? ইতি— মায়া (ওরফে আপনাদের পার্সোনাল ম্যাচমেকার)।”

হরিপদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মালতীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, মালতী হাসছে। সেই হাসিতে কোনো কোডিং নেই, কোনো প্রসেসর নেই— আছে শুধু আদিম আর খাঁটি ভালোবাসা।

হরিপদ পকেট থেকে একটা চকোলেট বের করে মালতীর মুখে দিল। বলল, “যাই বলো মালতী, এআই-এর বুদ্ধি ভালো হলেও, জলপাইগুড়ির কালাকান্দের স্বাদ তারা কোনোদিন পাবে না।”

আর দূরে কোথাও একটা সিসিটিভি ক্যামেরা হঠাত একটু নড়ে উঠল, যেন সেও এই দৃশ্য দেখে গোপনে একটা ‘লাইক’ দিল।

(সমাপ্ত)

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

মজার গল্প : ভূতেদের এসআইআর, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল


ধূপগুড়ি ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুটা ভেতরে জংলি পথ ধরলে 'ছায়াঝোরা' চা-বাগান। এমনিতে এই বাগানের নামডাক খুব একটা নেই, তবে বাগানের পুব দিকের পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি ঘরটার একটা আলাদা 'সুনাম' আছে। সূর্যাস্তের পর ওই তল্লাটে শেয়ালও ঘেঁষে না। কারণ জায়গাটা হলো ডুয়ার্সের সমস্ত অশরীরী, ভূত, প্রেত আর অপদেবতাদের অলিখিত হেডকোয়ার্টার।

আজ সন্ধেবেলা ফ্যাক্টরির ভাঙা চিমনির নিচে এক জরুরি এবং অতি-গোপন মিটিং ডাকা হয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিক, নদীর দিক থেকে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া আর কুয়াশা ঢুকছে। এর মধ্যেই মিটিংয়ে হাজির হয়েছে এলাকার তাবড় তাবড় সব 'পোস্ট-লাইফ সিটিজেন' বা মরণোত্তর নাগরিকেরা।

মিটিংয়ের সভাপতি হিসেবে ভাঙা বয়লারের ওপর বসে আছেন বাঞ্ছারামবাবু। উনি উনিশশো বিরাশি সালে এই ছায়াঝোরা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। ম্যালেরিয়ায় মারা যাওয়ার পর থেকে এই চত্বরেই আছেন, পদমর্যাদায় তিনি এখন এলাকার সবচেয়ে সিনিয়র ব্রহ্মাদৈত্য। তাঁর বাঁ দিকে বসে আছে নিমা তামাং। সে একসময় চা-পাতার ট্রাকে খালাসির কাজ করত, পাহাড়ি রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে সে এখানকার লোকাল ভূত। আর ডানদিকে শ্যাওলা-ধরা দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ঘেঁটি পিসি। আদ্যিকালের পেত্নী।

বাঞ্ছারামবাবু একটা আধপোড়া খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরে গম্ভীর গলায় বললেন, "পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ! নির্বাচন কমিশন এবার একটা ভয়ঙ্কর জিনিস চালু করেছে। যার নাম এসআইআর (SIR) বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন!"

নিমা তামাং তার নিজস্ব কায়দায় একটা অদৃশ্য বিড়িতে টান দিয়ে বলল, "স্যার ব্যাপারটা কী? ইটা কি নতুন কোনো পুলিশের দারোগা নাকি?"

বাঞ্ছারামবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, "আরে না হে! এটা হলো ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার যজ্ঞ। বিএলও (BLO) বা বুথ লেভেল অফিসাররা নাকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজবে কারা মারা গেছে, কারা ঠিকানা বদলেছে। তারপর লাল কালিতে দাগ মেরে ভোটার লিস্ট থেকে সব নাম কেটে দেবে!"

ঘেঁটি পিসি এতক্ষণ নিজের লম্বা নখ দিয়ে দাঁত খুঁটছিল, কথাটা শুনে সে প্রায় দশ ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠল। "বলিস কী রে বাঞ্ছা! নাম কেটে দেবে? মানে আমি আর ভোট দিতে পারব না? গত চল্লিশ বছর ধরে আমি ছায়াঝোরা বাগানের ৩ নম্বর বুথে নিয়ম করে প্রথম ভোটটা দিয়ে আসছি। বুথ কর্মীরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমি ইভিএম-এর বোতাম টিপে দিয়ে আসি। আমার নাম কাটবে কোন সাহসে?"

বাঞ্ছারামবাবু গলা খাঁকারি দিলেন। "সাহসটা নির্বাচন কমিশনের, পিসি। মুশকিলটা হলো, আমাদের তো আর কোনো ভ্যালিড অ্যাড্রেস নেই। এই ধরো, নিমা থাকে ওই পুরোনো বটগাছটায়। এখন বিএলও যদি গিয়ে বলে, 'নিমা তামাংয়ের আধার কার্ড আর ইলেকট্রিক বিল দেখান', বটগাছ কি ইলেকট্রিক বিল দেবে? তাছাড়া, আমরা খাতায়-কলমে 'মৃত'। সরকারি ফর্মে নাকি ৭ নম্বর ফর্ম ফিলাপ করে মৃতদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।"

"মৃত! কীসের মৃত?" ঘেঁটি পিসি রীতিমতো ফুঁসে উঠল। তার নাসারন্ধ্র দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে। "মৃত বলে কিছু হয় না। আমরা হলাম 'পার্মানেন্টলি ইনভিজিবল সিটিজেন' বা স্থায়ী অদৃশ্য নাগরিক! সরকারের লজ্জাও করে না? আমরা ভূতেরা হলাম দেশের সবচেয়ে আদর্শ ভোটার। আমরা রাস্তা চাই না, পানীয় জল চাই না, একশো দিনের কাজের টাকা চাই না! আমরা শুধু পাঁচ বছরে একবার বুথে গিয়ে অন্ধকারে আঙুলে একটু কালি লাগাতে চাই। তাতেই সরকারের এত জ্বলুনি?"

নিমা তামাং মাথা নেড়ে সায় দিল, "একদম ঠিক কথা! আমি তো পাহাড়ে কোনোদিন ভোট দিতে পারিনি, মরে ভূত হওয়ার পর সমতলে এসে প্রথমবার ভোটার কার্ডের ছবি তুললাম। সেই ছবিতে আমার মুখটা একটু ঝাপসা এসেছিল ঠিকই, কিন্তু কার্ডটা তো আমার গর্ভ (গর্ব)! ওটা ক্যানসেল হলে আমি ডিএম অফিসে গিয়ে ঘাড় মটকাবো বলে দিলাম!"

বাঞ্ছারামবাবু হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। একজন অভিজ্ঞ আমলার মতোই তিনি অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ, থুড়ি, ভূত। "দেখো, ঘাড় মটকে সমস্যার সমাধান হবে না। খবর পেয়েছি, কাল সকালেই আমাদের এই ৪২ নম্বর পার্টের বিএলও, হরিশ মাস্টার, খাতাপত্র নিয়ে ভেরিফিকেশনে আসছে। লোকটা এমনিতেই ব্লাড-প্রেসারের রোগী, বেশি ভয় দেখালে ওখানেই পটল তুলবে, আর আমাদের ঘাড়ে একটা নতুন আনাড়ি ভূত এসে জুটবে। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে।"

ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে এক চিলতে কুয়াশা যেন একটু বেশিই গাঢ় হয়ে ফ্যাক্টরি ঘরের ভেতর ঢুকল। সেটা আসলে রতন। রতন হলো এই বাগানের একসময়ের পাম্প-খালাসি, বছর পাঁচেক আগে সাপের কামড়ে মারা গিয়ে ভূত হয়েছে। তার ডিউটি ছিল রাস্তার মোড়ে নজরদারি করা।

রতন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "স্যার! সর্বনাশ হয়ে গেছে! হরিশ মাস্টার কাল সকালের জন্য ওয়েট করেনি। সে ওই এসআইআর-এর ডিউটির ঠেলায় আজ রাতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ওই তো, বস্তির রাস্তা পার হয়ে ফ্যাক্টরির দিকেই আসছে। ওর হাতে একটা বিশাল খাতা, আর একটা টর্চ!"

ঘেঁটি পিসি খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। "আসুক! আজ ওর ওই খাতায় আমি এমন ৭ নম্বর ফর্ম ফিলাপ করাবো যে, ব্যাটা সাইকেল ফেলে সোজা ভুটান বর্ডারে গিয়ে থামবে!"

বাঞ্ছারামবাবু কড়া গলায় বললেন, "খবরদার পিসি! এটা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। এখানে ভয় দেখালে চলবে না। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা এখানেই থাকি এবং আমরা যথেষ্ট 'জীবন্ত'!"

নিমা তামাং অবাক হয়ে বলল, "জীবন্ত? কিন্তু স্যার, আমার তো বুকের বাঁ পাঁজরটা অ্যাক্সিডেন্টে পুরো গুঁড়িয়ে গেছিল। আমি জীবন্ত প্রমাণ দেব কী করে?"

"সেটা আমি দেখছি।" বাঞ্ছারামবাবু নিজের অদৃশ্য ধুতির কোঁচাটা কোমরে গুঁজে নিলেন। "তোমরা শুধু আমার ইনস্ট্রাকশন ফলো করো। আজ রাতে ডুয়ার্সের এই ছায়াঝোরা বাগানে একটা ঐতিহাসিক এনকাউন্টার হতে চলেছে— 'ভূত বনাম বিএলও'!"

কুয়াশা মাখা ভাঙা ফ্যাক্টরির সামনে তখন হরিশ মাস্টারের সাইকেলের চেন পড়ার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। হরিশ মাস্টার টর্চ জ্বেলে আপনমনেই বিড়বিড় করছেন, "এই বাগানের ভোটার লিস্টটা নির্ঘাত গাঁজা খেয়ে বানিয়েছে! এই ফ্যাক্টরি তো বিশ বছর ধরে বন্ধ, এখানে আবার ৬২ জন ভোটার থাকে কী করে?"

হরিশ মাস্টার তখনও জানেন না, ওই ৬২ জন 'ভোটার' একটু পরেই তার সামনে 'জীবন্ত' প্রমাণ দেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে চলেছে!

****

হরিশ মাস্টারের সাইকেলের চেনটা ঠিক ভাঙা ফ্যাক্টরির গেটের সামনে এসেই পড়ে গেল। ডুয়ার্সের এই নভেম্বরের কনকনে ঠান্ডাতেও তাঁর কপালে ঘাম। একে তো ব্লাড-প্রেসার, তায় আবার নির্বাচন কমিশনের 'গারুদা অ্যাপ'। ছায়াঝোরা বাগানের এই বাঁশবাগানের কাছে মোবাইল নেটওয়ার্ক এমনিতেই থাকে না, তার ওপর অ্যাপ খুললেই গোল গোল ঘুরছে।

হরিশ মাস্টার খাতা-পেন বগলে চেপে সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে ফ্যাক্টরির আধভাঙা দরজায় টর্চ মারলেন। "হ্যালো! ভেতরে কেউ আছেন? আমি বিএলও হরিশচন্দ্র দাস। ভোটার লিস্ট ভেরিফিকেশনের জন্য এসআইআর করতে এসেছি!"

হঠাৎ ফ্যাক্টরির ভেতরটা একটা অদ্ভুত, নীলাভ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। হরিশ মাস্টার অবাক হয়ে দেখলেন, ভেতরটা একদম পরিষ্কার। পুরোনো চা-পাতার প্যাকিং বাক্সগুলোকে সাজিয়ে একটা লম্বা টেবিল মতো করা হয়েছে, আর তার ওপাশে একজন বেশ কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক বসে আছেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। তাঁর দু'পাশে আরও জনা দশেক বিচিত্র চেহারার মানুষ।

হরিশ মাস্টার গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। "আপনারা এখানে থাকেন? কিন্তু পঞ্চায়েতের খাতায় তো এই জায়গাটা পরিত্যক্ত!"

টেবিলের ওপাশ থেকে বাঞ্ছারামবাবু অত্যন্ত ভদ্রভাবে, একেবারে পুরোনো আমলার মতো হেসে বললেন, "আজ্ঞে আসুন হরিশবাবু। পঞ্চায়েতের খাতায় যা-ই থাক, ইলেকশন কমিশনের খাতায় আমরা এই ৪২ নম্বর পার্টের পার্মানেন্ট ভোটার। আমার নাম বাঞ্ছারাম চট্টোপাধ্যায়। এই ছায়াঝোরা বাগানের ভূতপূর্ব... থুড়ি, মানে একসময়ের হেডমাস্টার।"

হরিশ মাস্টার খাতা মেলালেন। "হ্যাঁ, নাম তো আছে দেখছি। সিরিয়াল নম্বর ৫৪২। কিন্তু বাঞ্ছারামবাবু, আপনার বয়স তো এখানে দেখাচ্ছে ১১২ বছর! আর এই আপনার ভোটার কার্ডের ছবিটা কেমন যেন ঝাপসা।"

বাঞ্ছারামবাবু একটুও না ঘাবড়ে বললেন, "বয়সটা ওই আধার কার্ড লিঙ্ক করার সময় ডেটা এন্ট্রির লোক ভুল করেছিল বুঝলেন! আর ছবি ঝাপসা হবে না? ওই গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে তো মানুষ... মানে মানুষের আত্মাই বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। তা আপনি ভেরিফিকেশনটা শুরু করুন।"

হরিশ মাস্টার নিজের স্মার্টফোনটা বের করে বললেন, "আচ্ছা, সিরিয়াল নম্বর ৫৪৩, নিমা তামাং! পিতা লেট পাসং তামাং।"

নিমা তামাং তড়াক করে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকে বলল, "প্রেজেন্ট স্যার! আমি নিজেও 'লেট' হয়ে গেছি স্যার, তবে আজ মিটিংয়ে একটু তাড়াতাড়িই এসেছি।"

হরিশ মাস্টার ভ্রু কুঁচকালেন। "নিজে লেট মানে? যাই হোক, আপনার আধার কার্ড আর ইলেকট্রিক বিলটা দিন।"

নিমা মাথা চুলকে বলল, "স্যার, আধার কার্ড তো পাহাড়ে থাকতে বানাইনি। আর বিল? আমি তো বটগাছে... মানে একটা ন্যাচারাল, ইকো-ফ্রেন্ডলি হোমে থাকি। ওখানে তো সোলার সিস্টেমে কাজ চলে।"

হরিশ মাস্টার বিরক্ত হয়ে গারুদা অ্যাপে কীসব টিপতে লাগলেন। "এসব গাঁজাখুরি গল্প ইলেকশন কমিশন শুনবে না। আচ্ছা, সামনে আসুন। ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনের জন্য একটা ছবি তুলতে হবে।"

হরিশ মাস্টার মোবাইলটা তুলে নিমা তামাংয়ের মুখের দিকে তাক করতেই অ্যাপে লাল অক্ষরে লেখা উঠল— 'Face Not Detected'।

"অ্যাঁ! এ কী! আপনার মুখটা ক্যামেরায় ধরছে না কেন?" হরিশ মাস্টার মোবাইলটা ঝাঁকালেন।

ঘেঁটি পিসি আর থাকতে না পেরে পেছন থেকে খ্যাকখ্যাক করে বলে উঠল, "ক্যামেরায় ধরবে কী করে? ওর তো গত বছর অ্যাক্সিডেন্টে মুখের আধখানাই থেঁতলে গেছিল!"

হরিশ মাস্টার চমকে উঠে পিসির দিকে তাকালেন। "অ্যাঁ! আপনি কে? আর আপনার... আপনার পা দুটো ওরম পেছনের দিকে ঘোরানো কেন?"

ঘেঁটি পিসি জিভ কেটে ঘোমটা টানল। বাঞ্ছারামবাবু তাড়াতাড়ি সামাল দিয়ে বললেন, "আহা হরিশবাবু, বয়স্ক মানুষ। গাঁটে গাঁটে বাতের ব্যথা। তাতেই পা দুটো একটু ঘুরে গেছে। ওর নাম ঘেঁটুলতা দেবী। সিরিয়াল নম্বর ৫৪৫।"

হরিশ মাস্টারের ব্লাড-প্রেসারটা এবার একটু একটু করে চড়তে শুরু করেছে। তিনি খেয়াল করলেন, এই কনকনে ঠান্ডাতেও এই মানুষগুলোর মুখ থেকে কোনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। আর এদের কারোরই মাটির ওপর কোনো ছায়া পড়ছে না!

"আপনাদের... আপনাদের ছায়া কোথায়?" হরিশ মাস্টারের গলা কাঁপতে শুরু করেছে।

রতন হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে... হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে ভেসে সামনে এল। "স্যার, আমাদের তো অনেক কিছুই নেই। ছায়া দিয়ে কী হবে? আপনি শুধু খাতায় একটা টিক মেরে দিন না যে আমরা জ্যান্ত আছি!"

হরিশ মাস্টারের হাত থেকে রেজিস্টার খাতাটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি বুঝতে পেরেছেন তিনি কাদের পাল্লায় পড়েছেন। এসআইআর করতে এসে তিনি সোজা ভূত-পল্লীতে ঢুকে পড়েছেন! তিনি ভোঁ দৌড় লাগানোর জন্য সাইকেলের দিকে ঘুরতে যাবেন, এমন সময় বাঞ্ছারামবাবু তাঁর হাতটা ধরলেন। বরফের মতো ঠান্ডা হাত।

"হরিশবাবু, পালাবেন না। শুনুন, আমরা ভূত হতে পারি, কিন্তু আমরা অত্যন্ত লয়্যাল ভোটার।" বাঞ্ছারামবাবু অত্যন্ত শান্ত গলায় বোঝাতে শুরু করলেন। "আপনারা বিএলও-রা তো ভারী বিপদে থাকেন। ওপরতলা থেকে চাপ আসে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভোটার ভেরিফিকেশনের। আবার পলিটিক্যাল পার্টির লোক এসে চোখ রাঙায় যাতে তাদের ফেক ভোটারদের নাম না কাটে। তাই না?"

হরিশ মাস্টার কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "হ্যাঁ... তা ঠিক।"

"তাহলে আমাদের নাম কেটে ফর্ম ৭ কেন ফিলাপ করবেন?" বাঞ্ছারামবাবু যুক্তি দিলেন। "ফর্ম ৭ করতে গেলে তো ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে। আমার মৃত্যুর তো চল্লিশ বছর হয়ে গেল, এখন আমি ডেথ সার্টিফিকেট কোথায় পাব? তাছাড়া, ভোটের দিন যখন পোলিং এজেন্টরা দুপুরবেলা ভাত ঘুম দেয়, তখন আমরাই তো গিয়ে চুপিচুপি আপনাদের ইভিএম-এ ভোটিং পার্সেন্টেজটা বাড়িয়ে দিয়ে আসি। আমরা না থাকলে আপনাদের বুথে তো ভূত নাচবে! মানে... সত্যিকারের ভূত আর কী।"

হরিশ মাস্টার অবাক হয়ে ভাবলেন, কথাটা তো ভুল নয়! এই এসআইআর-এর ডিউটি করতে গিয়ে এমনিতেই তাঁকে পলিটিক্যাল লিডারদের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। এই ভূতেরা যদি ব্যালট বক্সে একটু সাহায্য করে, তাতে ক্ষতি কী? তাছাড়া এদের ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করা তাঁর কম্ম নয়। পাহাড়ি সরল মানুষের মতোই এই ভূতেদেরও একটা অদ্ভুত সারল্য আছে।

হরিশ মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাটি থেকে খাতাটা তুললেন। "ঠিক আছে বাঞ্ছারামবাবু। আমি আপনাদের নামগুলো 'ভেরিফায়েড অ্যান্ড অ্যালাইভ' হিসেবেই মার্ক করে দিচ্ছি। তবে শর্ত আছে।"

"কী শর্ত?" নিমা তামাং উৎসাহের সাথে জিজ্ঞেস করল।
"ভোটের দিন আপনারা কেউ দিনের বেলা বুথের ধারেকাছে যাবেন না। যা করার বিকেল পাঁচটার পর, রোদ পড়লে করবেন। আর ওই সেন্ট্রাল ফোর্সের জওয়ানদের অকারণে ভয় দেখাবেন না।"

ঘেঁটি পিসি ফোকলা দাঁতে হেসে বলল, "তথাস্তু বাবা! বেঁচে থাকো... মানে, আমাদের মতো নয়, জ্যান্ত হয়েই বেঁচে থাকো।"

হরিশ মাস্টার খাতা-পেন ব্যাগে ঢুকিয়ে সাইকেলে উঠলেন। ফেরার পথে আর তার ভয় করল না। বরং মনে হলো, ডুয়ার্সের এই ভূতেরা অন্তত সমতলের অনেক রক্তমাংসের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সৎ আর গণতান্ত্রিক।

পরদিন বিডিও অফিসে মিটিংয়ে যখন হরিশ মাস্টার ৪২ নম্বর পার্টের লিস্ট জমা দিলেন, তখন অফিসার অবাক হয়ে বললেন, "কী ব্যাপার হরিশবাবু! আপনার পার্টেই তো দেখছি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার ভেরিফিকেশন সাকসেসফুল! বাহ্!"

হরিশ মাস্টার শুধু মুচকি হাসলেন। তিনি জানেন, ছায়াঝোরা বাগানের ওই পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরির ভোটাররা আর যাই করুক, গণতন্ত্রের সাথে বেইমানি করবে না!

(সমাপ্ত)

ডিসক্লেইমার (Disclaimer):
এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও হাস্যরসাত্মক গল্প। এর চরিত্র বা ঘটনার সাথে বাস্তবের কোনো জীবিত (বা মৃত!) ব্যক্তি এবং নির্বাচন কমিশনের কোনো আধিকারিকের কোনো সম্পর্ক নেই। এস.আই.আর (SIR) প্রক্রিয়াটিকে কেন্দ্র করে নিছক বিনোদন ও হাসির ছলে গল্পটি রচিত, কোনো সরকারি প্রক্রিয়াকে অসম্মান করা বা কাউকে আঘাত করা লেখকের উদ্দেশ্য নয়।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

হাসির গল্প : পয়লায় পাউট, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

কমলপুর শহরটা চিরকালই একটু ঘুমন্ত গোছের। এখানকার ঘড়ির কাঁটা এবং মানুষের হাঁটার গতি, দুই-ই কলকাতা বা শিলিগুড়ির চেয়ে অন্তত আধ ঘণ্টা দেরিতে চলে। কিন্তু এই কমলপুরেই গত সপ্তাহে মেন রোডের ধারে উদ্বোধন হয়ে গেল একটি ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁর— 'ক্যাফে বং-কানেকশন'। নামটার মধ্যেই একটা আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক ব্যাপার আছে। ক্যাফের মালিক সুমিত ছেলেটি এমবিএ পাশ করে এসে বুঝেছে, আধুনিক বাঙালি আর যাই করুক, স্রেফ খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁয় যায় না। তারা যায় 'ভাইব' চেক করতে, 'অ্যাসথেটিক' খুঁজতে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রমাণ রাখতে যে তারা বেঁচে আছে এবং ভালোই আছে।

আজ পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। কমলপুরের পুরনো মিষ্টির দোকানগুলোতে হালখাতার ভিড় থাকলেও, আসল উত্তেজনা ওই 'ক্যাফে বং-কানেকশন'-এ। বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। ভিড়ের চরিত্রটা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, এরা কমলপুরের সেই চেনা ভিড় নয়। এরা হলো জেন-জি (Gen Z)। নববর্ষ উপলক্ষে এদের সাজগোজের মধ্যেও একটা অদ্ভুত ফিউশন বা জগাখিচুড়ি ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ছেলেরা পরেছে পাঞ্জাবি, কিন্তু তার সঙ্গে নিচে ডেনিমের ছেঁড়া জিন্স, পায়ে সাদা স্নিকার্স। মেয়েদের পরনে তাঁত বা জামদানির শাড়ি, কিন্তু ব্লাউজের জায়গায় ক্রপ টপ, চোখে রোদচশমা (যদিও সূর্য আড়াই ঘণ্টা আগে অস্ত গেছে), এবং কানে বিশাল আকারের ঝুমকো। দু-চারজন বয়স্ক মানুষ, অর্থাৎ সেই পুরনো আমলের কাকা-জ্যাঠারাও সস্ত্রীক এসেছেন নববর্ষের সন্ধ্যায় একটু ভালোমন্দ খাওয়ার আশায়, কিন্তু এই বিপুল তরুণ প্রজন্মের ভিড়ে তাঁরা যেন সংখ্যালঘু এবং কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্ত।

রেস্তোরাঁর ভেতরের পরিবেশটা ভারি অদ্ভুত। ছাদ থেকে ঝুলছে মাটির ভাঁড়, দেওয়ালে কুলো আঁকা, আর একপাশে বিশাল বড় নিয়ন আলোয় ইংরেজিতে লেখা— "Ami Bangali"। এই নিয়ন আলোর নিচেই আসল যুদ্ধটা চলছে।

ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বসেছে রিমঝিম আর অর্ক। অর্কর চুলের দু'পাশে সবুজ রঙ করা, দেখলে মনে হয় যেন কচি কলাপাতা গজিয়েছে। রিমঝিম এসেই মেনু কার্ডের দিকে না তাকিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে একটা রিং-লাইট বের করে টেবিলের ওপর ফিট করল।

রেস্তোরাঁর পুরনো ওয়েটার নিতাই। সে কুড়ি বছর কমলপুরের 'মা অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেল'-এ ডাল-ভাত-মাছের ঝোল পরিবেশন করেছে। এই নতুন ক্যাফেতে বেশি মাইনের আশায় যোগ দিয়ে তার গত এক সপ্তাহে রাতের ঘুম উড়ে গেছে। নিতাইয়ের পরনে এখন আর সেই আধময়লা ফতুয়া নেই, সুমিত তাকে পরিয়েছে কালো টি-শার্ট, যার বুকে লেখা "Food Buddy Nitai"। নিতাই ট্রে-তে করে দু'গ্লাস জল নিয়ে রিমঝিমদের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

"দাদা, কী দেব?" নিতাই বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।
অর্ক হাত তুলে নিতাইকে থামিয়ে দিল। "শশশ! জাস্ট আ মিনিট আঙ্কেল। ডোন্ট রুইন দ্য ফ্রেম।"

নিতাই হতবাক হয়ে দেখল, অর্ক তার মোবাইল ফোনটা অদ্ভুত একটা অ্যাঙ্গেলে ধরেছে, আর রিমঝিম জলের গ্লাসটার দিকে এমন একটা উদাস এবং করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন গ্লাসের ভেতর জল নেই, তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ভাসছে।

"ক্লিক! ক্লিক! ক্লিক!"

টানা পনেরোটা ছবি উঠল। রিমঝিম ছোঁ মেরে অর্কর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। "ইয়াক! অর্ক, তুই জাস্ট পারিস না! আমার ডাবল চিন দেখা যাচ্ছে। লাইটিংটা একদম পাথেটিক। তুই ওই পাশটায় যা, আমি এদিক থেকে 'ক্যানডিড' পোজ দিচ্ছি। তুই এমন ভাবে ছবি তুলবি যেন আমি জানতেই পারিনি।"

নিতাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল। তার হিন্দু হোটেলের খদ্দেররা জল দেওয়ার সাথে সাথে এক নিঃশ্বাসে সেটা গিলে ফেলে হাঁক পাড়ত— "কই হে, ভাত আনো!" আর এরা জলের গ্লাস নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে!

পাশের টেবিলে আরেক কাণ্ড। সেখানে বসেছে চারজন উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে। তাদের টেবিলে এখনও খাবার আসেনি, কিন্তু ছবি তোলা পুরোদমে চলছে। একজন মেয়ে তার শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে টেনে ধরে বসেছে যেন প্রবল ঝড়ে সে উড়ে যাচ্ছে, আর বাকি তিনজন তিনটে আলাদা ফোন থেকে তার ছবি তুলছে।

নিতাইয়ের চোখ গেল রেস্তোরাঁর ঠিক মাঝখানের টেবিলটায়। সেখানে বসে আছেন অবিনাশবাবু এবং তাঁর স্ত্রী। অবিনাশবাবু কমলপুর হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার। নববর্ষের দিন গিন্নিকে নিয়ে একটু চাউমিন আর চিলি চিকেন খেতে এসেছেন। কিন্তু চারপাশের এই অদ্ভুত জিমন্যাস্টিকস দেখে তিনি রীতিমতো আতঙ্কিত।

অবিনাশবাবু ফিসফিস করে স্ত্রীকে বললেন, "হ্যাঁ গো, এরা কি সবাই মৃগী রোগী? ওই দ্যাখো, মেয়েটা কেমন মুখটা বাঁকিয়ে চোখ দুটো ট্যারা করে ফেলল!"

স্ত্রী ধমক দিয়ে উঠলেন, "আহ! আস্তে কথা বলো। ওটা মৃগী নয়, আমার নাতনি বলছিল ওটাকে নাকি 'পাউট' করা বলে। ঠোঁট ফুলিয়ে ছবি তোলে।"

অবিনাশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "খাবার দোকানে এসে কেউ ঠোঁট ফোলায়? খিদে পেলে তো পেট ফোলা উচিত!"

এদিকে রিমঝিম আর অর্কর টেবিলে অবশেষে অর্ডারের পালা এল। রিমঝিম মেনু কার্ডটা উল্টেপাল্টে দেখে বলল, "আঙ্কেল, আপনাদের এখানে সবচেয়ে 'ইনস্টাগ্রামেবল' খাবার কোনটা?"

নিতাই আকাশ থেকে পড়ল। "আজ্ঞে? ইনসটান... মানে? আমাদের এখানে মোগলাই পরোটা আছে, ফিশ ফ্রাই আছে..."

"নো নো!" রিমঝিম নাক কুঁচকালো। "ফিশ ফ্রাইয়ের কোনো কালার প্যালেট নেই। বড্ড ব্রাউন। লুকস সো বোরিং। এমন কিছু দিন যেটা দেখতে খুব ভাইব্র্যান্ট। মাল্টিকালার কিছু আছে? ধরুন এমন কিছু যেটায় ধোঁয়া বেরোবে, বা ধরুন লাল-নীল রঙের গ্রেভি?"

নিতাইয়ের মাথা ঘুরতে শুরু করল। সে আমতা আমতা করে বলল, "আজ্ঞে, ধোঁয়া তো গরম চায়ে বেরোয়। আর লাল রঙের গ্রেভি তো চিকেন কষায় হয়, কিন্তু নীল রঙের তো কোনো তরকারি জীবনে দেখিনি দিদিমণি! পেনের কালি ছড়ানো খাবার কি কেউ খায়?"

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল, "উফ! এদের কোনো সেন্স নেই। লিটারেলি জিরো অ্যাসথেটিক। রিমঝিম, তুই বরং একটা 'ব্লু লেগুন মকটেল' আর একটা 'রেইনবো পেস্ট্রি' অর্ডার কর। ওটার সাথে তোর শাড়ির কনট্রাস্টটা জাস্ট ফাটাফাটি আসবে। হ্যাশট্যাগ নববর্ষ, হ্যাশট্যাগ বেঙ্গলি ভাইব।"

নিতাই খাতা-পেন্সিল নিয়ে অর্ডারটা লিখে নিল। সে বুঝতে পারল, এখানে খাবারটা আসলে খাবার নয়, ওটা একটা 'প্রপস'। নাটকের মঞ্চে যেমন তলোয়ার বা বন্দুক থাকে, এই ক্যাফেতে খাবারটা হলো ছবি তোলার একটা সরঞ্জাম মাত্র। এর স্বাদ কেমন, সেটা নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা শুধু ফিল্টার নিয়ে।

অর্ডার নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় নিতাই দেখল, রেস্তোরাঁর ঢোকার মুখে সেই "Ami Bangali" নিয়ন বোর্ডটার নিচে একটা ছোটখাটো দাঙ্গা বেধে যাওয়ার উপক্রম। চারটে আলাদা গ্রুপ একই সাথে ওই বোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চাইছে। একজন বলছে, "ভাই, আমি পনেরো মিনিট ধরে ওয়েট করছি একটা বুমেরাং নেব বলে।" অন্যজন বলছে, "এক্সকিউজ মি! আমার রিলস-এর অডিওটা জাস্ট শেষ হবে, তারপর আপনারা আসুন।"

নিতাই রান্নাঘরে ঢুকে শেফ রমেনকে বলল, "ওস্তাদ, কড়াইয়ে আগুন কমাও। আজ আর কেউ খাবে না, সবাই শুধু গিলবে। তবে মুখ দিয়ে নয়, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে!"

রমেন কড়াই থেকে চোখ না তুলে বলল, "কেন রে? কী হলো?"

"আরে আর বোলো না! বাইরে একটা আস্ত পাগলাগারদ বসে আছে। সবাই নিজের মুখ নিজে মোবাইলে দেখছে আর হাসছে। আমার তো মনে হয় খাবারে নুনের বদলে একটু গ্লিসারিন আর মেকআপ পাউডার ছড়িয়ে দিলে এরা বেশি খুশি হবে!"

বাইরে তখন হৈহৈ আওয়াজ। কেউ একজন বোধহয় ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে সেলফি নিতে গিয়ে পাশের জনের ঘাড়ের ওপর পড়ে গেছে। পয়লা বৈশাখের পুণ্য সন্ধ্যায় 'ক্যাফে বং-কানেকশন'-এ তখন খাদ্যের চেয়ে ফ্রেমের কদর বেশি। অবিনাশবাবু একটা ফিশ ফ্রাই মুখে দিয়ে আপনমনেই বললেন, "এরা খাচ্ছেটা কী? পিক্সেল না মেগাবাইট?"

নিতাইয়ের মাথা এমনিতেই ভোঁ ভোঁ করছিল, তার ওপর শেফ রমেন হঠাৎ রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট ধরিয়ে দিল। প্লেটে একটা টলটলে নীল রঙের পানীয়, আর তার পাশে রামধনুর সাতরঙা একটা কেকের টুকরো। নিতাই মনে মনে ভাবল, এ তো খাবার নয়, যেন পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেলের ডেকরেশন!

ট্রে-টা নিয়ে সাবধানে ভিড় কাটিয়ে রিমঝিমদের টেবিলের দিকে এগোতে লাগল নিতাই। ক্যাফের ভেতরে ততক্ষণে আওয়াজের ডেসিবল আরও কয়েক মাত্রা বেড়েছে। কেউ হাসছে, কেউ হঠাৎ করে হাত-পা নেড়ে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করছে (যাকে এরা নাকি 'টিকটক ডান্স' বলে), আবার কেউ কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ আটকে রেখে সঙ্গীর দিকে না তাকিয়েই কথা বলে যাচ্ছে।

নিতাই রিমঝিমদের টেবিলে খাবারটা নামিয়ে রাখল। "এই নিন দিদিমণি, আপনাদের নীল লেবু-জল আর রঙিন কেক।"

রিমঝিম চোখ বড় বড় করে তাকাল। "ওয়াও! অর্ক, লুক অ্যাট দ্য প্রেজেন্টেশন! জাস্ট পারফেক্ট!"
অর্ক ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, কোমরটাকে একটু অদ্ভুত ভাবে বেঁকিয়ে, টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার মোবাইলটা খাবারের ঠিক চার ইঞ্চি ওপরে ঝুলছে।

"রিমঝিম, তুই জাস্ট ফোকের (কাঁটাচামচ) ডগা দিয়ে পেস্ট্রিটার একটা ছোট্ট স্লাইস কাট। একদম মুখে দিবি না কিন্তু! জাস্ট কাটবি, আর আমি স্লো-মোশনে ভিডিওটা নেব। রেডি? অ্যাকশন!"

নিতাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই সার্কাস দেখছিল। রিমঝিম কাঁটাচামচ দিয়ে সাবধানে কেকের একটা টুকরো কাটল, তারপর সেটা মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম, অত্যধিক উচ্ছ্বসিত হাসি দিল। অর্ক মিনিট দুয়েক ধরে সেই দৃশ্যটার ভিডিও করল।

"কাট!" অর্ক সন্তুষ্ট চিত্তে বলল। "এবার একটা ফ্ল্যাট-লে (Flat-lay) শট নেব। রিমঝিম, তোর হাতটা ফ্রেমের বাইরে রাখ।"

এরপর চলল পানীয়ের ছবি তোলার পালা। গ্লাসটাকে ডানদিকে সরাল, বাঁদিকে সরাল, পেছন থেকে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে ব্যাকলাইটিংয়ের চেষ্টা করল। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে এই 'ফোটোশুট' চলল। নিতাই দেখল, নীল পানীয়ের বরফ গলে সেটা ততক্ষণে সাধারণ জলের মতো দেখতে হয়ে গেছে, আর পেস্ট্রির চারপাশের ক্রিম গরমে গলে গিয়ে রামধনু থেকে কাদামাখা রাস্তার মতো দেখাচ্ছে।

"যাক বাবা, এবার হয়তো খাবে!" নিতাই মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু কোথায় কী! রিমঝিম আর অর্ক দুজনেই যার যার মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে পড়ল। ছবিগুলো এডিট করতে হবে তো! ফিল্টার লাগানো, ব্রাইটনেস কমানো-বাড়ানো, এবং মানানসই ক্যাপশন খোঁজা— এই সবই নাকি খাওয়ার চেয়েও জরুরি কাজ।

"ক্যাপশনটা কী দেব বল তো?" রিমঝিম জিজ্ঞেস করল। "ফিলিং ব্লেসড উইথ দিস কিউট ডেট? নাকি শুভ নববর্ষ ভাইবস?"

অর্ক ভ্রু কুঁচকে ভাবল। "না না, ওসব বড্ড ব্যাকডেটেড। দে— 'সুগার, স্পাইস, এন্ড এভরিথিং নাইস, বাট মাই অ্যাসথেটিক ইজ প্রাইসলেস।' সাথে একটা নীল হার্ট আর একটা রেইনবো ইমোজি।"
নিতাইয়ের ইচ্ছে করছিল মাথাটা দেওয়ালে ঠুকতে। খাবারগুলো সামনে পড়ে পড়ে শুকোচ্ছে, আর এরা ক্যাপশন নিয়ে গবেষণা করছে!

এদিকে, রেস্তোরাঁর মাঝখানের টেবিলে অবিনাশবাবু আর তাঁর স্ত্রীর চাউমিন আর চিলি চিকেন এসে গেছে। অবিনাশবাবু কাঁটাচামচ দিয়ে সযত্নে চাউমিন মুখে তুলতে যাবেন, ঠিক সেই সময় একটা জোরালো ফ্ল্যাশের আলোয় তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

চমকে উঠে তিনি দেখলেন, পাশের টেবিলের একটা ছেলে, যার চুলের অর্ধেকটা লাল আর অর্ধেকটা হলুদ, তার টেবিলের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে অবিনাশবাবুর চাউমিনের প্লেটের দিকে মোবাইল তাক করে আছে।
"কী ব্যাপার হে ছোকরা?" অবিনাশবাবু চশমাটা ঠিক করে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন। "আমার খাবারের ছবি তুলছ কেন? তোমার প্লেটে কি চাউমিন পড়েনি?"

ছেলেটা বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়ে দাঁত বের করে হাসল। "আরে দাদু, চিল করুন! আমার টেবিলে শুধু কফি অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কফির ছবি দিয়ে কি আর ফুড-ব্লগিং হয়? আপনার প্লেটটার লাইটিং ভালো আসছিল, তাই একটা শট নিয়ে নিলাম। ডোন্ট ওয়ারি, আপনাকে ফ্রেমে রাখিনি, শুধু নুডলস-এর 'ম্যাক্রো শট' নিয়েছি।"

অবিনাশবাবুর রাগ তখন সপ্তমে। "ম্যাক্রো শট! আমার টাকায় কেনা চাউমিন, আমার প্লেট, আর তুমি সেটার ম্যাক্রো শট নিচ্ছ? আর আমাকে বলছ 'চিল' করতে? আমি কি রেফ্রিজারেটর যে চিল করব? বেয়াদব কোথাকার!"

স্ত্রী অবিনাশবাবুর হাত চেপে ধরলেন। "আহা, ছাড়ো তো! বাচ্চা ছেলে, একটা ছবিই তো তুলেছে। খেতে দাওনি তো আর!"

অবিনাশবাবু গজগজ করতে লাগলেন। "বাচ্চা ছেলে! চুলে দেখেছ কেমন প্যালেট রং মেখেছে? আমার চাউমিনের ওপর যদি নজর লাগে, বদহজম হয়ে যাবে বলে দিলাম!"

ছেলেটি ততক্ষণে নিজের টেবিলে ফিরে গিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত। সে সম্ভবত অবিনাশবাবুর চাউমিনের ছবিটা পোস্ট করে লিখছে— "ক্রিভিং সাম অথেন্টিক চাইনিজ অন পয়লা বৈশাখ!"

ঠিক এই সময়েই রেস্তোরাঁয় ঘটল একটা বড়সড় দুর্ঘটনা। ক্যাফের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট কৃত্রিম ফোয়ারা ছিল, যার চারপাশে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রাখা। সেটা মূলত সাজানোর জন্যই।

একটি মেয়ে, যার পরনে হাঁটু-ঝুল শাড়ি এবং পায়ে হাই-হিল, সে ঠিক করেছিল ওই ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে একটা 'বুমেরাং' ভিডিও বানাবে। সে তার বন্ধুকে নির্দেশ দিচ্ছিল, "তুই ঠিক ওই জায়গাটা থেকে নিবি। আমি যেই ঘুরে দাঁড়াব, তুই আমার শাড়ির আঁচলটা ফোকাস করবি।"

মেয়েটি নাটকীয়ভাবে ঘুরতে গেল, কিন্তু হাই-হিলের ব্যালেন্স আর ভেজা মেঝের হিসেব সে রাখতে পারেনি। "আঁক" করে একটা শব্দ করে সে সটান গিয়ে পড়ল সেই কৃত্রিম ফোয়ারার ভেতর!

মুহূর্তের মধ্যে ক্যাফেতে পিন-পতন নৈঃশব্দ্য। নিতাই হাঁ করে দেখল, মেয়েটি ফোয়ারার জলের ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছে, তার মেকআপ ধুয়ে গিয়ে মুখের আসল রূপ বেরিয়ে আসছে, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— তার বন্ধুরা তাকে তোলার বদলে, তাদের মোবাইল তাক করে এই পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভিডিও করতে ব্যস্ত!

"ওহ মাই গড! শ্রেয়া, তুই জাস্ট ভাইরাল হয়ে যাবি!" শ্রেয়ার এক বন্ধু চিৎকার করে উঠল। "এই ফলটা জাস্ট এপিক ছিল! হোল্ড অন, আমি আরেকটা অ্যাঙ্গেল থেকে নিচ্ছি!"

অবিনাশবাবু চাউমিনের কাঁটাচামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "গিন্নি, তাড়াতাড়ি খেয়ে চলো। এরা শুধু পাগল নয়, এরা ভয়ংকর পাগল। এরা জ্যান্ত মানুষের চেয়ে একটা জ্বলজ্বলে স্ক্রিনকে বেশি ভালোবাসে।"

নিতাই ছুটে গিয়ে শ্রেয়াকে ফোয়ারা থেকে টেনে তুলল। মেয়েটার তখন যা অবস্থা, দেখলে মনে হবে যেন তাকে চুবিয়ে স্নান করানো হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মুখে কোনো রাগ বা লজ্জা নেই। সে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করল, "ভিডিওটা ঠিকঠাক এসেছে তো? লাইটিং কেমন ছিল? আপলোড করে দে তাড়াতাড়ি, ক্যাপশনে দিবি— 'স্প্ল্যাশিং ইনটু দ্য নিউ ইয়ার লাইক!'"

নিতাই নিজের মাথায় হাত দিল। সে বুঝতে পারল, এই নতুন পৃথিবীতে খাবার, দুর্ঘটনা, আনন্দ, কান্না— সব কিছুই আসলে একটা 'কন্টেন্ট'। আর এই 'কন্টেন্ট'-এর বাজারে, আসল জীবনের কোনো জায়গা নেই।

শ্রেয়ার ফোয়ারায় পতনের পর ক্যাফে বং-কানেকশনের মালিক সুমিত ছুটে এল। তার এমবিএ পাশ করা কর্পোরেট মস্তিষ্ক তখন প্রমাদ গুনছে। কাস্টমার জলে পড়ে গেছে, নির্ঘাত এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একতারা রেটিং দিয়ে রেস্তোরাঁর বদনাম গাইবে, কিংবা ক্ষতিপূরণ চাইবে!

সুমিত হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, "ম্যাম, আর ইউ ওকে? আই অ্যাম সো সরি! আমাদের ফ্লোরটা একটু স্লিপারি ছিল। আমরা কি ফার্স্ট এইড আনব? না কি ড্রেস চেঞ্জ করার ব্যবস্থা..."

শ্রেয়া জল চপচপে শাড়িটা নিংড়াতে নিংড়াতে একগাল হেসে বলল, "আরে চিল ব্রো! আমি একদম ফাটাফাটি আছি। জাস্ট ফল-টা একটু হার্ড ছিল। কিন্তু আপনাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডটা একটু বলবেন? আমার 4K ভিডিওটা আপলোড হতে বড্ড টাইম নিচ্ছে। ফোর-জি নেটওয়ার্ক এখানে একদম জঘন্য!"

সুমিত হতবাক। ক্ষতিপূরণের বদলে মেয়েটা ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড চাইছে! সে ঢোঁক গিলে পাসওয়ার্ডটা বলে দিল— 'BongVibe2026'।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল কমলপুর শহরের সেই চিরপরিচিত মহাজাগতিক ঘটনাটি। যার জন্য জেন-জি, মিলেনিয়াল বা বুমার— কেউই প্রস্তুত ছিল না।

হঠাৎ করে একটা 'ভুসসস' শব্দ। আর তার পরেই গোটা রেস্তোরাঁ ঘুটঘুটে অন্ধকার।

কমলপুরের বিখ্যাত লোডশেডিং! নববর্ষের সন্ধ্যায় ট্রান্সফরমার জবাব দিয়েছে। সুমিতের ক্যাফেতে জেনারেটর আছে বটে, কিন্তু সেটা স্টার্ট নিতে অন্তত মিনিট দশেক সময় নেবে, কারণ সুমিতের ধারণা ছিল নববর্ষের দিন অন্তত ইলেকট্রিক অফিস দয়াদাক্ষিণ্য দেখাবে।

অন্ধকার নামতেই ক্যাফের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। তারপর শুরু হলো হাহাকার। তবে সেই হাহাকার অন্ধকারে ভূতের ভয়ে নয়।

অর্ক আর্তনাদ করে উঠল, "রিমঝিম! ওয়াইফাই রাউটারটা অফ হয়ে গেল! আর আমার ফোনের ব্যাটারি মাত্র দুই পার্সেন্ট! মাই লাইফ ইজ ওভার!"

চারপাশে তখন জনা পঞ্চাশেক স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইট জোনাকির মতো জ্বলছে। সেই আলোয় জেন-জি ছেলেমেয়েদের মুখগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা সদ্য কোনো যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হয়েছে। কেউ হাত ওপরে তুলে সিগন্যাল ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কেউ বা অফলাইন হয়ে যাওয়ার শোকে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।

নিতাই এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। কুড়ি বছর 'মা অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেল'-এ কাজ করার সুবাদে সে জানে, কারেন্ট গেলে কী করতে হয়। সে পা টিপে টিপে স্টোররুমে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন সে ফিরে এল, তার দু'হাতে দুটো পুরনো আমলের কাচের চিমনিওয়ালা হ্যারিকেন লণ্ঠন।

সুমিত বাধা দিতে গেল, "আরে নিতাইদা, এসব কী? ধোঁয়া বেরোবে, ক্লায়েন্টরা কমপ্লেন করবে!"

নিতাই পাত্তা না দিয়ে অবিনাশবাবুর টেবিলে একটা আর রিমঝিমদের টেবিলে একটা হ্যারিকেন রেখে দিল। হ্যারিকেনের সেই আদিম, হলদেটে আলোয় ক্যাফের ভেতরটা হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত মায়াময় রূপ নিল।

রিমঝিম মুগ্ধ হয়ে হ্যারিকেনটার দিকে তাকিয়ে বলল, "ও মাই গড! দিস ইজ সো 'রাস্টিক কোর'! একদম ভিন্টেজ ভাইব। অর্ক, তোর ফোনটা দে, একটা সিল্যুয়েট পিকচার নেব।"

অর্ক করুণ গলায় বলল, "ফোন ডেড। সুইচড অফ।"
"হোয়াট!" রিমঝিমের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছবি তোলা যাবে না? তাহলে এই রেস্তোরাঁয় বসে থাকার মানে কী?

ঠিক এই সময় অবিনাশবাবু অন্ধকারে নিজের চাউমিনের প্লেটটা সাফ করে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। তারপর হ্যারিকেনের আলোয় রিমঝিমদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "ছবি তো আর তোলা যাবে না দিদিভাই, এবার অন্তত খাবারটা খেয়ে দ্যাখো। অন্ধকারে খাবারের স্বাদ বাড়ে, জানো? কারণ তখন চোখ দিয়ে নয়, মানুষ জিভ দিয়ে খায়।"

রিমঝিম আর অর্ক একে অপরের দিকে তাকাল। মোবাইল বন্ধ, ইন্টারনেট নেই, ছবি তোলা যাচ্ছে না। আর কিছু করার নেই। চরম বিরক্তি আর অসীম একঘেয়েমিতে রিমঝিম সেই গলে যাওয়া রামধনু রঙের কেকটা কাঁটাচামচে করে মুখে পুরল।

পরমুহূর্তেই তার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। "ইয়াক! এটা কী? জাস্ট ডালডা আর সস্তা চিনির রস! আর এই নীল ড্রিংকসটা... মনে হচ্ছে যেন কাফ-সিরাপ আর ডিটারজেন্ট মেশানো!"

এতক্ষণ ফোটোশুটের চক্করে ওরা খাবারের স্বাদটা বোঝারই চেষ্টা করেনি। শুধু রঙের প্রেমে পড়েছিল। অর্ক থু থু করে কেকটা ফেলে দিয়ে বলল, "জঘন্য! জাস্ট আনইটেবল!"

নিতাই মুচকি হাসল। সে জানত এটা হবে। সে কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "দাদাবাবু, ওই নীল-লাল রং মেশানো খাবার তো ছবি তোলার জন্য। ওসব কি আর মানুষের পেটে সয়? আমি বরং শেফকে বলে দুটো গরমাগরম ফিশ ফ্রাই আর একটু কফি নিয়ে আসি? ছবি তো তুলতে পারবেন না, অন্তত নববর্ষের দিনে পেটটা শান্ত হোক।"

অর্ক আর রিমঝিম বাধ্য হয়ে মাথা নাড়ল। মিনিট পাঁচেক পর যখন ধোঁয়া ওঠা, মচমচে, সোনালি ফিশ ফ্রাই আর কাসুন্দি তাদের টেবিলে এল, তখন আর মোবাইল নেই। কাঁটাচামচ বাদ দিয়ে হাত দিয়েই ফিশ ফ্রাই ভেঙে মুখে দিল রিমঝিম।

"উমম!" রিমঝিমের চোখ বুজে এল। "অর্ক, এটা জাস্ট স্বর্গ! ভেতরের মাছটা কী সফট!"

অর্কও ততক্ষণে একটা গোটা ফিশ ফ্রাই সাবাড় করে দিয়েছে। "সত্যি! আমরা তো শুধু লাইক আর কমেন্টের চক্করে আসল মজাটাই মিস করছিলাম।"

ফোয়ারায় পড়ে যাওয়া শ্রেয়াও ততক্ষণে তোয়ালে জড়িয়ে একটা টেবিলে বসে গোগ্রাসে চিলি চিকেন খাচ্ছে। ক্যাফে জুড়ে এখন আর "ক্লিক ক্লিক" শব্দ নেই। শুধু কাঁটাচামচের টুংটাং আর তৃপ্তির সঙ্গে চিবনোর আওয়াজ। ওয়াইফাই না থাকায় ছেলেমেয়েগুলো বাধ্য হয়ে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। কেউ হাসছে, কেউ জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছে।

অবিনাশবাবু গিন্নিকে নিয়ে ওঠার সময় বিলটা মেটানোর জন্য কাউন্টারে এলেন। সুমিতকে বললেন, "ভাই, তোমার এই ক্যাফের ডেকোরেশন ভালো, তবে আসল ম্যাজিকটা কিন্তু ওই হ্যারিকেনে আর তোমার ফিশ ফ্রাইয়ে। রোজ সন্ধ্যায় একবার করে মেইন সুইচটা অফ করে দিও। দেখবে, ছেলেপুলেগুলো মানুষের মতো খেতে শিখবে!"

ঠিক তখনই ঝকঝক করে আলো জ্বলে উঠল। জেনারেটর নয়, ট্রান্সফরমার ঠিক হয়েছে।
আলো আসার সাথে সাথেই ক্যাফের চরিত্র আবার বদলাতে শুরু করল। অর্ক ছিটকে গিয়ে চার্জার খুঁজতে দৌড়ল, শ্রেয়ার বন্ধুরা আবার ভিডিও অন করল।

নিতাই হ্যারিকেন দুটো নিভিয়ে স্টোররুমের দিকে এগোতে এগোতে আপনমনে হাসল। নববর্ষের এই একটা সন্ধ্যায় অন্তত পনেরো মিনিটের জন্য হলেও জেন-জি প্রমাণ করে দিয়েছে, পেটের ক্ষিদে আর জিভের স্বাদের কাছে মেগাপিক্সেল আর ফিল্টার— সব কিছুই আসলে নস্যি!

খাবারটা খাবারই, ওটা প্রপস নয়। আর কমলপুর, চিরকাল কমলপুরই থাকবে।

(সমাপ্ত)

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

তিনটি কবিতা (উত্তম কুমার ঘোষ, প্রগতি দে চৌধুরী, ছন্দা দাম)

এই এক সন্ধিক্ষণ...
উত্তম কুমার ঘোষ 

অন্তরালে বিলুপ্ত হবার পালা।
মেহগনির পাতাঝরা আর বসন্ত বাউরির ডাক, 
...যেন নিঃশ্বাস ফেলে সায়াহ্নে । 
চৈতির কোন এক হাওয়ায় চুরমার নিষিক্ত বীজ গুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ....

মিলন বেলার মরশুমে নানা কীটের উচ্ছ্বাস, 
ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আবার জেগে উঠে ছেলেবেলায়....।

 স্বপ্ন ভাঙার ফানুস কেড়ে নেয় সব সুখ।
প্রাকৃতিক হিংস্রতার যাঁতাকলে হাত ধুয়ে এই বৈশাখেই প্রকৃতি আবার সাজবে... নদ পড়ে
নূপুরে - নিক্কনে,..সোনার মুকুটে।

আসবে নতুন এক সকাল নিঃশব্দে, আনন্দে, আহ্লাদে সোনালী স্বপন রচিত হবে নতুন নব ঘনের 
রেনেসাঁসে।



কোকিল কথা
প্রগতি দে চৌধুরী (ব্যাঙ্গালোর)


কিশোরী হাওয়ায় বসন্ত পলাশ গালে আলতো আবীর 
আমার যাপন নিকষ রাতে মেঘলা আকাশ শান্ত ধীর।

দিনগুলি সব ওলটপালট, যখন তখন ঝাঁপটা দমক 
আগুন রঙ্গের কৃষ্ণচূড়া চোখের তারায় হঠাৎ চমক 

হাওয়ার হাতে ঘুড়ির লাটাই কে আর রাখে এতো খোঁজ 
দিনের বেলা অল্পকথা রাতের গায়ে গল্প রোজ।

বুক খোলা শার্ট বিকেল বেলায় গলির মোড়ে যাই ই হোক 
কোকিল কাঁধে বসন্ত পালক তীর ঘোর প্রতারক

আবার আসবো যাই এবার অভ্যাসে এই মিথ্যা বুলি 
আসছে বছর কেউ আসেনা মফস্বলের এই গলি।

দিনগুলো সব ডুবতে থাকে সাক্ষী থাকে নদীর তীর 
আমার যাপন নিকষ রাতে মেঘলা আকাশ শান্ত ধীর।



থেকে যেও 
ছন্দা দাম (আসাম)

থেকে যেও বুকের কাছাকাছি সারাক্ষণ 
এ জটিল আঁধারে দূরে যেতে নেই,
ডাহুকের মতো ঘাসডোবা সরোবরে 
কেউ নেই....যার কোন ক্ষত নেই।

থেকে যেও রিঙটোন যেমন মুঠোফোনের
বুক বাড়িতে জড়িয়ে মায়াময় 
কচুরিপানার এ জীবন জলাভূমিটাতে
কারো না কারো বুকে বেঁচে থাকতেই হয়।

থেকে যেও আধো আঁধারির দরজায়...
ভেজানো, এখনো সেটা কেউ আসবে বলে,
এ জীবন আজীবন ভালোবাসার শুধে
বেদনার মুলধন কেনা না জানি কোন কৌশলে।

থেকে যেও, থেকে যেতেই তো হয়...
প্রাণের কাছে যে জাপটে ধরে রাখে ভালোবেসে ,
ভেজা ঝুপ্পুস চিরকুটে ঝাপসা সবটাই
মায়া ডাকে ডাকতে বলো কে আর ফিরে আসে।

থেকে যেও শুধু ভালোবাসি বলেই 
এর থেকে বেশী আর কিসে মেটে তিয়াস,
জানি বুকে চুপটি করে আছে ঘুমিয়ে 
লাভা উদ্গিরণ করবে ঘুমন্ত এই ভিসুভিয়াস।।

 **********************

           

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (অনুষ্কা মোদক, উত্তম কুমার ঘোষ, অঞ্জনা মজুমদার, উজ্জ্বল দত্ত, রঞ্জন কুমার বণিক)


অক্ষয় খাতা 
অনুষ্কা মোদক 

রোদঝলমলে নববর্ষের সকালে জীর্ণ দাওয়ায় বসে পুরোনো ডায়েরিটা ওল্টাচ্ছিলেন বৃদ্ধ অবিনাশ বাবু। এক সময় এই বাড়িতে পয়লা বৈশাখের এলাহি আয়োজন হতো, কিন্তু এখন সবটাই স্মৃতি। ছেলে সুদীপ শহরে থিতু হওয়ার পর থেকেই উৎসবগুলো এই উঠোনে আর পা রাখে না।

হঠাৎ গেটে একটা ট্যাক্সি থামার শব্দে তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। নামল এক চিলতে রোদ—তাঁর নাতি অয়ন। পেছনে ব্যাগ হাতে অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে সুদীপ। অবিনাশ বাবু অবাক হয়ে চাইলেন। সুদীপ কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, "বাবা, প্রতি বছর নতুন খাতা তো খুলি, কিন্তু সম্পর্কের হিসেবটা মেলাতে ভুলে যাই। এ বছর ঠিক করেছি, অফিসের আগে তোমার আশীর্বাদের হালখাতাটা খুলে নেব।"

বৃদ্ধের ঝাপসা চোখে জল চিকচিক করে উঠল। অয়ন ততক্ষণে ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ধরে নতুন পাঞ্জাবির আবদার জুড়েছে। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো এক নিমেষে দূর হলো সব একাকীত্ব। ভাঙা দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটা যেন আজ হাসছে। নতুন বছর শুধু তারিখ বদল নয়, আজ সত্যি একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো।


বিষন্ন স্মৃতি 
উত্তম কুমার ঘোষ 

কদমতলা তখন শুনশান !  চৈত্রের কাঠফাটা রোদে ধুলো উড়িয়ে একটি বাস এসে থামল। অনন্যা বাস থেকে নেমে রিক্সার খোঁজ করতেই রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এলো,... দিদি কোথায় যাবেন?.... নিউ সার্কুলার লেন !  চৈত্রের দাবাদহ ভ্যাপসা গরমে আর ঘামে অনন্যার শরীরটা যেন ফুটে উঠেছিল, ঠোঁট থেকে লিপস্টিকটা অনেকটা হালকা হয়ে ঠোঁটের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে আসছিল। বাবা-মায়ের সাথে সেই ছোটবেলায় এসেছিল। ছোট্ট জনপদ বীরপাড়া থেকে ঝুমুর, তিস্তা পেরিয়ে দু -ঘন্টার জার্নি ।... একি ! তুমি জানাওনি তো তুমি আসবে ! আমার চিঠি তুমি পাওনি ?... না পাইনি। কেন এসেছ? আমি থাকতে আসিনি.... জয়শ্রীর থেকে শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে ? কি ! সত্যি? কনক শুধু বলল হ্যাঁ। অনন্যার চোখ দুটি জলে ভিজে গেল.... জীবনে নেমে এলো এক গভীর অন্ধকার, পৃথিবীর শেষ প্রান্তের এক গভীর খাদ...

কনক চিঠিতে লিখেছিল প্রিয় অনন্যা, তোমাকে আমি বিয়ে করতে পারছি না, তুমি আমাকে ভুলে যেও'।... চল্লিশ বছর আগেই কনক চলে গেছে কঠিন রোগে। আজ অনন্যা কদমতলায় ... পাল্টে গেছে শহরটা। শপিং মল , রঙিন আলো ,অনেক লোকজন আর টোটোর জ্যাম....।



নতুন বছরের ভোর
অঞ্জনা মজুমদার 

বছর শেষের নৈশভোজে অনেক খাবার বেঁচেছে হালদার বাড়িতে। নিয়মমতো সব খাবার ডাস্টবিনে ফেলতে যাচ্ছিল রামুকাকা।  রোশনের ইঙ্গিতে অবশিষ্ট খাবার নিয়ে পেছনের দরজা খুলে বাইরে। সেখানে কাকাই এর পেছনে বস্তির গোটাদশেক ছেলেমেয়ে। সবাই কাকাইএর নাইট স্কুলের ছাত্রছাত্রী। নিঃশব্দে সব খাবার ভাগ হয়ে গেল। বস্তির বুড়োদাদু বললেন, খুব ভালো করেছো বাবারা, খাবার নষ্ট হযনি। সবাই হাসিমুখে বাড়ি ফিরে চলল।

দরজা খুলে বাড়িতে পা দিয়েই সবার পা থেমে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে দাদামশাই বাড়ির সবাই। 

কাকাই কিছু বলবার আগেই দাদামশাই বললেন, আমাকে কোনও কৈফিয়ত দিতে হবে না। সব জানতে পেরেছি। লুকিয়ে কিছু করা যায় না। 

বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, বড়খোকা, কাল থেকে প্রতিটি নববর্ষের উৎসবে, প্রত্যেকটি বস্তিবাসীর জন্য একটা করে খাবারের প্যাকেট থাকবে। আর রামু এখন থেকে প্রতিদিনের বেঁচে যাওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে যাদের দরকার তুমি তাদের যত্ন করে খাইয়ে দিও।

রোশন আর রিমি দাদামশাইকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে বলল, আমাদের দাদামশাই ইজ দ্য বেস্ট।

বাইরে তখন নতুন বছরের সূর্য উঠছে।




একটু সহানুভূতি
উজ্জ্বল দত্ত 

ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল সাড়ে দশ ছুঁই ছুঁই, আমি সেদিন বাঁকুড়া বড়বাজারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোন কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ পেতেই পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি একটি চলন্ত রিকসা থেকে এক জনৈক সত্তরোর্ধ প্রৌঢ় যাত্রী হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।

 আমি যেই মূমূর্ষূকে তুলে ধরি দেখি তিনি অবচেতন অবস্থায়, মনে হলো একটি মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। পরক্ষণেই তাঁর মুখে চোখে জলের ছিটে দিতেই জ্ঞান ফিরে আসে। 

জানতে পারি তাঁর নাম কৃপাসিন্ধু বোস, তিনি দেড় কিমি দূরে থাকেন, ডাক্তার দেখিয়ে  প্রেসকিপশন অনুসারে ঔষধপত্র ক্রয় করে ফের রিকসা করে তাকে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিই, ওনার স্ত্রী সবকিছু অবগত হয়ে গভীর আবেগে বলে ওঠেন--"মানবতা হারিয়ে যায়নি এখনও, এই পৃথিবীতে আপনাদের মতো মানব দরদী মানুষ  আছেন বলে আজ আমাদের মতো নিঃসহায় মানুষ প্রাণে বেঁচে যায়, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন বাবা" বুড়িমায়ের আশীর্বাদ কুড়িয়ে পরমানন্দে বাড়ী ফিরলাম পদব্রজে।

হ্যাঁ কৃপাসিন্ধুবাবুর সহধর্মিনী ঠিকই বলেছেন যে মানবতা এখনও হারিয়ে যায়নি, তাই বোধ হয় বিখ্যাত গীতিকার সেই গানটি রচেছিলেন--"মানুষ মানুষেরই জন্য,জীবন জীবনেরই জন্য,একটু সহানুভূতি কি..পেতে পারে না ও বন্ধু".....



হাতি ঠাকুর
রঞ্জন কুমার বণিক

সকাল থেকেই তিন্নি বায়না ধরেছে আজ মিলির বাড়িতে হাতি ঠাকুর পুজোয় নিয়ে যেতে। বাচ্চাদের মায়ের স্কুলগেটে ছুটি পর্যন্ত জমায়েত এক পরিচিত দৃশ্য এবং এখানেই দেবীকা, মানে তিন্নির মা আর মিলির মার পরিচয়, সখ্যতা গড়ে।

"জানো মা, আংকেল আমাকে বলেছে মিলির বাড়ির হাতি ঠাকুর নাকি শুড় দিয়ে লাড্ডু দেয়। যাবে মা?", তিন্নি শিশুসুলভ খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ে।

"রাতে বাবা আসলে যাবো।", নিজ গর্ভের নিষ্পাপ শিশুটিকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে চোখ মুছে দেবীকা।

দেবীকা তখন সবে আঠারোতে পা দিয়েছে। প্রায়ই পিৎজার অনলাইন অর্ডার দেয়। চঞ্চল মতি দেবীকা বুঝতেই পারেনি কীভাবে নীলেশের কাছে বাঁধা পড়ে গেছে। শেষমেশ পালিয়ে বিয়ে, কঠোর রক্ষণশীল পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ। প্রেমের জোয়ারে ভেঁসে গিয়ে দরিদ্রতার অথৈ সাগরে পড়ে।

সেদিন যানজটে আটকা পড়ে সময় মত পিৎজা পৌছানোর তাগিদে বাইক এক্সিডেন্ট করে ছয়মাস বিছানায় কাটে নীলেশের। পরিণামে চাকরিচ্যুতি। মিলিদের মুদির দোকানে হাজার বিশেক বাকি।

নাছোড় তিন্নির বারবার মর্জিতে মাথা ঠিক থাকেনি দেবীকার। সজোরে চড় কষে তিন্নির গালে।


রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (অম্বালিকা ঘোষ, সুমিতা চৌধুরী, কমল ঘোষ , অপরাজিতা কুণ্ডু, তাপস চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জয় বৈরাগ্য, অশোক কুমার ষন্নিগ্রহী, সামসুজ জামান, বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী)


বিজু আজ স্কুলে যাবেই 
সঞ্জয় বৈরাগ্য 

গত রাত থেকেই বিজু'র কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। সারা রাত জেগে জলপট্টি দিয়ে দিয়ে কোনো রকমে জ্বরটা নামালেন সুমিত্রা দেবী, বিজুর বিধবা মা। 

বিজু'র যখন পাঁচ বছর বয়স, জ্ঞাতি সম্পর্কিত মোকদ্দমায় প্রায় বিনা বিচারেই তাদের যা যতটুকু ছিল, সবটুকুই চলে যায়। শোকে-দুঃখে অসুস্থ হয়ে মারা যায় বিজুর বাবা। তারপর থেকে পরের বাড়িতে কাজ করে, সেলাই করে অতি কষ্টে সংসার-নামক সমুদ্রের তরী টেনে চলেছেন সুমিত্রা দেবী। লক্ষ্য একটাই, তার সবেধন নীলমণি বিজু'কে মানুষের মতো মানুষ করে তোলা।

বেলা হতেই তিনি বিজু'কে বললেন, 'আজ আর জ্বর গায়ে স্কুলে যেতে হবে না বাবা, একদিন না গেলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।' 

দুর্বল শরীরে স্কুলের পোশাকটা পড়তে পড়তে ক্ষীণ কন্ঠে বিজু বললো- 'মা, তাহলে যে তোমার বিজু'র কপালে আজ আর ডিম, খিচুড়ি জুটবে না!'

একাধিকবার সেলাই করা স্কুল ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বিজু রওনা দিলো স্কুলের পথে। নির্বাক হয়ে মা শুধু চেয়ে রইলেন সেদিকে আর সবার অলক্ষ্যে তার দু'ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো মাটিতে।



দায়িত্ব 
সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায় 

বাবা মারা যাবার পর তনিমার উপর সংসারের সব দায়িত্ব  এসে পড়েছে। সদ‍্য পাওয়া নতুন চাকরি, আর বিধবা মাকে নিয়ে তার জীবন।

কলকাতার বুকে নেমে এসেছে কালো রাত। পথ শিশুরা ঘুমিয়ে পথ কুকুরদের পাশে। তনিমা অন্ধকার কলকাতার বুকে হেঁটে  চলেছে। বসের অর্ডার নাইট সিফট করতে হবে। চাকরিটা প্রাইভেট কোম্পানির। টিকিয়ে রাখতেই হবে তাকে।

তনিমা চিৎকার করে ওঠে। মানুষরূপী দুই জন্তু তনিমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কামড় দেয়। অসহ‍্য যন্ত্রণা আর চিৎকার। কলকাতার বুকে ঘটতে থাকা  আর একটা ধর্ষণ। পথ শিশুদের ঘুম ভাঙে। কুকুররা ঘেউ ঘেউ করে। এতদিন  একসাথে ডাস্টবিনের খাবার খেতে খেতে, এক বিছানা ভাগ করতে করতে পথ কুকুর  আর পথ শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে  ওঠে।

পথ কুকুররা কামড়ে ধরে দুই মানুষরূপী জানোয়ারের পা।

পথ শিশুরা ছুটে যায় দিদি বলে। পুলিশ  আসে। মিডিয়া হৈ হৈ করে  ওঠে। সকালের পেপারে শুধু পথ কুকুর  আর পথ শিশুর বন্ধুত্বের খবর।

প্রতি মাসে মাইনা পেয়ে তনিমা কেনে বই খাতা, খাবার  আর প্রচুর বিস্কুট। মায়ের সাথে সাথে তনিমার এখন  প্রচুর দায়িত্ব।



একটি স্বাধীনতার গল্প 
তাপস চট্টোপাধ্যায় 

কাউন্সিলারের লায়েক ছেলেটা বাড়ি থেকে দামি বাইক নিয়ে  বেরিয়ে রোজকার মতো পাড়া কাঁপিয়ে তুলল কটকট্ ফটফট্ আওয়াজে। কানে আঙুল দিয়ে স্বগতোক্তি করল কেউ কেউ। অনেকেই চার দেওয়ালের মধ্যেই আস্ফালন করল হাত পা ছুঁড়ে। অতি উৎসাহী কেউ কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেটির গতিপথ অনুসরণ করে রগড় দেখতে চাইল,  নতুন কিছু ঘটে কিনা । মেয়েটিও ঠিক সময়ে বেরিয়ে এসে মোড়ের মাথায় ছেলেটির বাইকে সওয়ার হল । বিশেষ কায়দায় পিছন থেকে চেপে ধরল ছেলেটিকে। তারপর দুজনে ভাসতে ভাসতে উড়তে উড়তে শহরের রাস্তায় গলিতে চক্কর খেতে খেতে  সকলকে সচকিত করতে করতে উধাও হল সন্ধ্যা নামার মুহূর্তেই। কেউ কেউ সাহস করে বলেই ফেলল মেয়েটির কি মা বাপ নেই ? যেন তারা ধরেই নিল ছেলেটি রামতুলসীর পাতা । অথবা ছেলেরা তো একটু আধটু অমন করেই থাকে-....…

একদা এক প্রভাতে খবরের কাগজের পাতায় পাতায় ,নিউজ চ্যানেলের এক্সক্লুসিভ খবরে, গুগলের ভাইরাল ভিডিওয় ছড়িয়ে পড়ল খবর। ফ্লাইওভার থেকে দ্রুত গতিতে নামার সময় বাইকটি একাই বহুদূর চলে গেছিল। মত্ত আরোহী দুজনকে দুদিকে ছিটকে দিয়ে মুক্তির সন্ধানে।


জীবন যেমন
অপরাজিতা কুণ্ডু 

প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই ট্রেনটা দুলে উঠলো। আচমকা ঝাঁকুনিতে ভারসাম্য হারিয়ে রায়া পড়েই যাচ্ছিলো, একটা বলিষ্ঠ হাত সামলালো তাকে। টি-স্টলটার ছায়ায় এনে জলের বোতল এগিয়ে বললো, "এক্ষুনি কী বিপদটাই না ঘটতো বলুনতো, ম্যাডাম!" 

"প্রতিদিনই নামি...আজ ভিড়টা একটু বেশিই ছিল।"

"আপনি তো দিদিমণি ! প্রায়ই দেখি আপনাকে।"

অজান্তেই রায়ার গালদুটো লাল হয়।

"চলুন স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসি। এখনো কাঁপছেন।"

রায়ার খেয়াল হয় বলিষ্ঠ হাতের আঙুলগুলো এখনো তার কনুইয়ের কাছে নরম ভাবে ছুঁয়ে আছে। অচেনা অনুভূতিতে, সঙ্কোচে আপত্তি জানালেও তা ধোপে টেকে না।

রায়াকে কিছুতেই টোটোর ভাড়া দিতে দিল না শৈবাল। ইতিমধ্যে নাম-ফোন নাম্বার আদানপ্রদান, টুকটাক কথাও হয়েছে। ক্রমশই রায়া মুগ্ধ হয়েছে শৈবালের ভদ্রতা, যত্নশীল মনোভাবে।

প্রতিদিনই স্কুলে পৌঁছে মা'কে ফোন করে রায়া। আজ অনেক খুঁজেও ফোনটা পেল না। শৈবালের নাম্বার সেভ করার সময়ও ছিল। ওয়ালেটও নেই। ঘাম জমেছে গলায়। হাত দিতেই চমক। চেনটা নেই। 

আবার রায়ার গালদুটো রক্তবর্ণ ধারণ করে। এবার নিজের বোকামির জন্য। জীবনের প্রথম দুর্বলতা এমন প্রবঞ্চনা করবে, কে-ই বা জানতো !


সুমির সান্তা
কমল ঘোষ 

অভাবের সংসারে অসুস্থ বিধবা মায়ের ওষুধ কেনার টাকা নেই । ছোট্ট সুমির তাই বড্ড মন খারাপ । বাবা বেঁচে থাকা কালীন সুমি সান্তাকে লেখা তার চিঠি মোজার মধ্যে ভরে খোলা জানালার পাশে রাখত । চিঠিতে লেখা বস্তুটি সান্তা দুয়ারে নামিয়ে রেখে চলে যেত। বাবা মারা যাওয়ার পর চিঠি লিখে রাখলেও সান্তা আর আসে না। তবুও আশা ছাড়ে নি সুমি। এবার চিঠি আর মায়ের প্রেসক্রিপশনটা মোজায় ভরে রেখে দিল খোলা জানালার পাশে। উত্তুরে হাওয়ায় মোজা উড়ে গিয়ে পড়ল রাস্তায়। মোজাটা চোখে পড়ল সুরেনবাবুর। মোজার ভেতরকার প্রেসক্রিপশনটার ছবি তুলে নিলেন , চিঠিটা ঢুকিয়ে নিলেন নিজের পকেটে। তারপর প্রেসক্রিপশনটা ছুড়ে দিলেন দরজার কাছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজার সামনে মজায় ভরা প্রেসক্রিপশনটা পেয়ে সুমি বেশ খুশি হল। ও ভাবলো - সান্তা নিশ্চয় চিঠিখানা পেয়েছে। বড়দিনের সন্ধ্যায় দরজা খুলতেই দুয়ারে মিলল একটা বাক্স। বাক্সে ভরা অনেক ওষুধ আর বেশ কিছু নগদ টাকা। "মা দেখো, সান্তা তোমার জন্য কি দিয়ে গেছে!" বলতে বলতে বাস্কটা হাতে নিয়ে দৌড়ে গেল মায়ের কাছে।


মধুর বসন্ত এসেছে
সুমিতা চৌধুরী

দূর থেকে অফিস গেটের সামনে বহু মানুষের জটলা দেখেই বুকটা ধক্ করে ওঠে অরূপের। গত কয়েকদিন ধরেই একটা মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গুজরাতে কারখানা উঠিয়ে নেবে মালিক পক্ষ। সেকথাই সত্যি হল আজ! সামনে ছেলের পরীক্ষা, দুমাসের বাড়ি ভাড়া, মালার চিকিৎসা...মাথাটা ঝিমঝিম করে অরূপের।

এমনিতেই ' দুপয়সা ঘরে আনার মুরোদ নেই " বলে মালা উঠতে বসতে কথা শোনায়। চাকরি গেছে জানলে বোধহয় ঘরেই ঢুকতে দেবেনা!

অনেকক্ষণ বাইরে কাটিয়ে যখন ঘরে ঢোকে, তখন রাত ন'টা। 

" আজ এত দেরী?" মালা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করে। 

" আসলে, একটা কাজে আটকে....." কথাটা অসমাপ্ত রেখে ঘরে ঢুকে যায় অরূপ। 

হঠাৎই মালা এসে তার হাত আলতো করে ধরে। 

" তুমি কি গো? খবরটা আমায় জানালেনা? আমি তো মিসেস বোসের কাছে সবটা শুনেছি। সুখে, দুঃখে একসাথে থাকবো বলেই তো...." কান্নার দমকে মালার শেষ কথাগুলো আটকে যায়। 

" এই সেই মালা?" নিজের বউকেই সে ঠিকমত চিনতে পারেনি!  দুচোখ জলে ভরে যায় অরূপের। বসন্তের মাতাল হাওয়ায় আকাশ এখন পুরোপুরি 

মেঘমুক্ত।


মনকেমনের জন্মদিন
অম্বালিকা ঘোষ

'এগুলো সব নিয়ে যাব?',' হ্যাঁ, সব নিয়ে যাবি, সব তোদের', বছর দশেকের নান্টুর প্রশ্নে ওর মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে পেস্ট্রির প্যাকেটটা ওর হাতে ধরিয়ে দেয় অরিত্র। চোখের তারায় ঝিকমিক আলো ফুটিয়ে নান্টু ওর বোন ঝিমলির হাত ধরে অপার খুশিতে ভাসতে ভাসতে তাদের বস্তির দিকে ছোটে। রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্যটা উপভোগ করতে থাকে অরিত্র। সকাল থেকেই বুকের বাঁদিকটায় কষ্ট জমছিল। জন্মদিন এলেই মনখারাপ হয়ে যায় অরিত্রর। এই দিনটাতেই দুবছর আগে মাকে হারিয়েছিল সে, তাই এই দিনটা এলেই অরিত্রর অসহনীয় লাগে। আজ বিকেলে বিক্ষিপ্তমনে উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অরিত্র। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এককাপ চা খেতে খেতে অরিত্র হঠাৎ খেয়াল করে মলিন মুখে খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়ানো দুটো বাচ্চাকে। নিজের অজান্তেই যেন ওদেরকে ডেকে ফেলে অরিত্র। ওদের সাথে আলাপচারিতায় মনের আকাশের মেঘটা যেন ধীরেধীরে কাটতে শুরু করে ওর। মাতৃহারা দুভাইবোনকে দুটো নতুন জামা কিনে দিয়ে হাতে তুলে দেয় সামান্য কিছু খাবার। মনখারাপের শেষে একটুকরো স্বর্গ রচনা করে অরিত্রর জন্মদিনের বিকেল।


ধোঁয়াশায় ঘেরা 
অশোক কুমার ষন্নিগ্রহী

মধ্যপ্রাচ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সবকটি শহরে ড্রোনের আক্রমণে বোমা পড়ছে। অতর্কিতে রকেট মিসাইল নিক্ষেপ হচ্ছে। ছোট্ট ছেলেটি মায়ের আঁচলে ভয়ে লুকিয়ে আগুনের বর্ষা দেখছে। গতকাল তাদের পাশের উঁচু বিল্ডিংটিতে বোমা পড়ে সব তছনছ হয়ে গেছে। বহুলোক হয় মৃত নয় আহত। ছেলেটির বাবা উদ্ধারের কাজে হাত লাগাতে সকাল থেকে গেছে।

মা ছেলেকে কোলে নিয়ে বলছে ভয় পাসনি বাবা, আমাদের কিছু হবেনা। ছেলেটি অবাক চোখে মাকে দেখছে। দুপুরে রান্না হয়নি, তাই খাওয়া জোটেনি। মায়ের হাত কেমন কাঁপছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ একটা ড্রোন তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই বোমা বর্ষণ শুরু। একটা বোমা বিস্ফোরণ ঘটলো ওদের খুব কাছে। সবাই যে যেদিকে পারলো দৌড়ালো বাঁচার আশায়। ছেলেটিও মায়ের হাত ছাড়া হয়ে দৌড়াল। সারা জায়গা ধোঁয়াশায় ঘিরে গেল। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা। ছেলেটি ভয়ে কান্না ভুলে গেছে।

অন্ধকারে ছেলেটি মাকে খুঁজতে লাগলো। ভোর হলে দেখলো পাথরের আঘাতে তার মায়ের মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মাকে ঠেলা দিলো, মায়ের সাড়া নেই।…..


চৈতন্যোদয়
সামসুজ জামান 

ঋতমের বিস্মিত চিৎকার- কুকুরকে খাওয়ানোর থালায় ঠাকুমার খাবার‌ ? আশ্চর্য!

মা-বাবার গর্জন- দুদিনের ছেলের মুখের উপর কথা? তুমি শেখাবে আমাদের ?

রোজই পুনরাবৃত্তি- গোলার নিচে রেখে দেওয়া কুকুরের থালায় ঠাকুমাকে খেতে দেওয়া! সেটা লক্ষ্য করতে করতে ঋতম অবসাদগ্রস্ত ও অসহনীয় যন্ত্রণা বোধের শিকার।

বেশ কিছুদিন রোগভোগের পর ঠাকুমা দেহ রাখলেন। কুকুরটাও মারা গেল আজ। 

 ঋতম যত্ন ক'রে থালাটা  তুলে রাখতেই , মা-বাবা হই-হই করে উঠলো- কুকুরের থালাটা তো ছুঁড়ে ফেলে দিতে বললাম, ফেললে না কেন ওটা?

 ঋতমের তড়িৎ জবাব- না মা, থালাটা আমার বড় প্রয়োজন।  তোমরা অথর্ব হয়ে গেলে, ওই থালাটাতেই তো তোমাদের খেতে দেবে  তোমাদের নাতি! 

মায়ের কন্ঠ থেকে হাহাকার - বাবা! একি যুগ এলো গো? যে ছেলেকে এত আদর যত্নে বড় করলাম, সে কিনা কুকুরের খাওয়ানোর থালাটা রাখছে আমাদের খেতে দেবে বলে? 

ঋতম হাত জোড় করে বলল- ক্ষমা করো আমাকে! তোমাদের এতদিনের দেওয়া শিক্ষা কে গুরুত্ব দিয়েই তোমাদের মর্যাদা রাখার জন্য এই ব্যবস্থা! 

চোখ বড় বড় করে বাবা-মা গালে হাত রাখল! 


মায়ের বলা কথাগুলো 
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী 

" আমি তো চিরকাল বেঁচে থাকব না। তাই বেঁচে থাকতে যা বলি  মন দিয়ে শুনে রাখ। " 

কথাগুলো বলে রণিতের মা অবাধ্য ছেলের দিকে অনেক আশা নিয়ে তাকালেন। মৃত্যু শয্যায় শুয়ে রয়েছেন রণিতের মা প্রমিতা। 

ডাক্তার আট চল্লিশ ঘন্টার মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে চলে গেছেন শেষবারের মতো রুগী দেখে। 

ক্রমশঃ ফুরিয়ে আসছে প্রমিতার আয়ু।  তিনি যে মারা যাবেন তা তাঁর মরণাপন্ন অবস্থা দেখে অনুমান করতে পারছে রণিত।

ওর অবাধ্য শরীরটা ঝুঁকে পড়েছে মায়ের মুখের ওপর। দু' চোখের অশ্রু বাধা মানতে চাইছে না। বাবা তো কবেই ধরাধাম ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। মা'ও এবার তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন পরলোকে। 

এতদিনের পর রণিতের হুঁশ হয়েছে সে মায়ের ওপর কত অত্যাচার করেছে।  মা' র কথা কখনো শোনেনি। মা' র মৃত্যুর পর আর তো মা কিছু বলবে না। হা-হা শুন্যতায় কানে বাজবে না মায়ের কথাগুলো। 

" মা , মা , বল কি বলবে। আর কখনো তোমার অবাধ্য হব না মা। " রণিত ভেঙে পড়ে।

কিন্তু প্রমিতার কন্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায় চিরকালের মতো।  রণিত মায়ের না শুনতে চাওয়া কথাগুলোই  কি আন্দোলিত করবে মনের ভিতর।  

শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (বিমল চন্দ্র পান্ডা, সনৎ সিংহ, শুভব্রত ব্যানার্জী, অমিতাভ চক্রবর্ত্তী, মলয় সরকার, শিপ্রা এস রায়)


ইগো  
শিপ্রা এস রায়

কি হলো ? আমি লোকটার জন্য প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি আর তিনিই কিনা আমাকে তুই-তুকারি করছেন! অয়ন হাতে তুলে নেওয়া ঢিলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে  টিফিন নিয়ে হস্টেলে ফিরে এলো। অপেক্ষারত বন্ধুরা খিদের জন্য মারমুখী হতেই দেরির  কারণটা বলতে লাগল, ফেরার পথে একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দে- দৌড়। আর তার পিছনে চোর চোর বলে কিছু লোক। আমার মনে হলো চোরটা আমাকে চ্যালেঞ্জ করলো, মেজাজ গেল বিগড়ে আমিও দিলাম দৌড়। প্রায় ধরি ধরি তো ঠিক সেই সময় মালিক  বলতে লাগল ধর্ বেটাকে ধর্। আমি কি লোকটার আত্মীয় কিংবা বন্ধু নাকি যে তুই বলবে? ধ্যাৎ। 

আমরা--আরে মাথা গরমের কি হলো? অয়ন বলল, গরম হবে না মানে? যার জন্য DPC স্যার আমাকে প্র্যাকটিকেলে একজন পেশেন্টকে দাদু সম্বোধন করে case history নিচ্ছিলাম বলে নাম্বার কমিয়ে দিয়েছিলেন মনে নেই? বলেছিলেন তোমার আত্মীয়  নাকি? মানুষকে আগে সম্মান দেবে। 

আমরা---ও তাই এই হবু ডাক্তার বাবুর ইগোতে লেগেছে। অয়ন---একদম তাই।  আমরা মানুষ, মহামানব নই।


ধীরেন বাস্কে 
মলয় সরকার

ধীরেন বাস্কে ব্যাঙ্কে এসেছিল টাকার জন্য। বলল, মেয়ের বিয়ের জন্য লাগবে।

‘'মেয়ের বয়স কত?” 

-বারো বছর।

“এত অল্পবয়সে বিয়ে দিচ্ছ, আইনে ধরবে তো-”

“না বাবু, ওসব আইন ফাইন এখানে লাগে না। তা ছাড়া কম বয়সে দিলে কম টাকা লাগবে, বেশি বয়সে দিলে অনেক বেশি টাকা লাগবে। কোথা পাব অত টাকা?”

বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরুপায় মেয়েটার নীরব চোখে জল দেখে আমি নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা দিই নি। ধীরেন রেগে গিয়েছিল আমার উপর।

টাকার অভাবে মেয়েটার বিয়ে হল না।

অনেক বছর পর, বিডিও অফিসে একটা কাজে যেতে হঠাৎ বিডিও মেয়েটি চেয়ার থেকে নেমে আমাকে প্রণাম করায় চমকে উঠলাম।

বলল, সেদিন আপনি বাবাকে লোন না দেওয়ার জন্যই আমি আজ এই চেয়ারে।

আমার মুখে কথা আটকে গেল। ওর মাথায় হাত দিয়ে প্রার্থনা করলাম ওর জন্য।


লটারি 
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 

তোরষার পাড়ে দাঁড়িয়ে প্লাবন ভাবছিল জীবনটা এক অনিশ্চিত লটারি। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে তার একমাত্র স্বপ্ন—মেয়ে তৃষাকে সরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা। বেসরকারি স্কুলের ফি জোগাতে সে হিমশিম খাচ্ছিল। ইতিহাসের স্নাতকোত্তর প্লাবন এখন এক দোকানের কর্মচারী, যেখানে ভাগ্যের চেয়ে সংগ্রামই বেশি স্পষ্ট।

ভর্তির লটারির দিন স্কুলের সামনে উৎকণ্ঠার ভিড়। একে একে নাম ঘোষণা হতে থাকে। তৃষার প্রিয় বান্ধবী সাহানাজের নাম তালিকায় উঠলেও, তৃষার নাম আর এলো না। ফেরার পথে বিষণ্ণ তৃষা প্রশ্ন করে, “আমি কি খারাপ ছাত্রী?” প্লাবন উত্তর দেয়, “লটারি ভাগ্য দেখে, মানুষকে নয়।”

সে রাতে তৃষা ডায়েরিতে নিজের আক্ষেপ কবিতার ছন্দে লিখে রাখে। মেয়ের জেদ দেখে প্লাবন নতুন শক্তি পায়। পরদিন দোকানে মালিককে সে হাসিমুখেই জানায়—তৃষার নাম তালিকায় না উঠলেও, তার স্বপ্ন অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। প্লাবন বোঝে, কিছু মানুষ লটারিতে হেরেও জীবনের যুদ্ধে জিতে যায়।


খুশি 
শুভব্রত ব্যানার্জী 

মায়ের সাথে নববর্ষের হালখাতা করতে গিয়ে টয় হাউস থেকে পছন্দের পুতুলটা কিনে হাসি খুব খুশি হয়। আট বছরের হাসি নতুন কেনা পুতুলটা নিয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটছিল। রাস্তার ধারে একটা দোকানে তার মা মল্লিকা কিছু জিনিস কিনতে দাঁড়ালে সেও দাঁড়ায়। হঠাৎ 'বু-বু হিক-হিক' শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখে একটা পুঁচকে বাচ্চা তার পুতুলটা দেখে মায়ের কোল থেকে ঐরকম শব্দ করে হাসছে।

 সে পুতুলটা দেখিয়ে বলে- নিবি?

পুঁচকে একমুখ হেসে আবার বলে- বু-বু হিক-হিক।

তার কাণ্ড দেখে হাসি তার হাতে পুতুলটা দিলে সে হাঁ করে পুতুলটাকে চুমু খায়। তার কায়দা দেখে হাসি খিল খিল করে খুব হাসে।

মল্লিকা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে-  এতো বায়না করে পুতুলটা কিনে শেষে ওকে দিয়ে দিলি? 

-  আমার তো অনেক পুতুল আছে মা, ওর বোধহয় একটাও নেই। পুতুলটা পেয়ে ও কত খুশি হয়েছে দেখো! 

মল্লিকা নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে- আমার পুঁচকে মেয়েটা কবে এতো বড় হয়ে গেল!



স্বাস্থ্যবিধিসম্মত খাবার
সনৎ সিংহ

১৬ই ফেব্রুয়ারি সহদেবদা ছেলের বৌভাতে আমাদের নেমন্তন্ন করেছেন।

স্টার্টারের পকোড়া থেকে দুটো দিতে বলতে একটা দিল। শুনতে পায়নি ভেবে আবার বলতে যাচ্ছি; নবনীতা বলল, “ছাড়ো। মেন কোর্সে ভালো করে খাব”।

মেন কোর্সের আগে সহদেবদা এসে বললেন, “ক্যাটারারদের বলা আছে। স্বাস্থ্যবিধিসম্মত অনেক খাবার। ভালোভাবে খাবেন। খাসির মাংস আছে। লজ্জায় হয়তো চাইবেন না। ক্যাটারারের লোক নিজে থেকেই দেবে”।

প্রথমে দেশলাই সাইজের ফিস কাটলেট খেয়ে ডাল আলুভাজা (কীসব নাম যেন) না নিয়ে ভাত রেখে মাংসের জন্য অপেক্ষা করছি। ভাতটা বেশ কয়েকবার দিতে চাইল। মাংসের চর্বির একটা ছোট্ট টুকরোর সাথে থালা ভর্তি ঝোল দিলে আমি আর এক পিস মাংস চাইতে বলল, “পরে এসে দিচ্ছি”। আর এল না। শেষে রসগোল্লা এলে বললাম, ‘আমি মিষ্টি খাই না’। নবনীতাকে একটা দেওয়ার পর ও আর একটা চাইলে না শোনার ভান করে চলে গেল।

এতক্ষণে বুঝলাম সুদেবদার কথা। স্বাস্থ্যবিধিসম্মত খাবার নয়, পরিবেশন !



পরিহাস
বিমল চন্দ্র পান্ডা

হীরাপুর ব্লক অফিসের বাইরে শিমূলতলায় বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ - বৃদ্ধার ভিড়। তাঁরা বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। একজন বুড়িমা ভিজে - উদাস চোখে তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে বৃদ্ধা মায়ের জায়গা হয়নি। এদিকে ছেলে উচ্চ বেতনের সরকারি চাকুরে বলে তাঁর বার্ধক্য ভাতার আবেদন বিবেচনা করা হয়নি। তাই তিনি আজ বিডিও স্যারের সাথে এ বিষয়ে অনুরোধ করতে এসেছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর স্যারের সাথে দেখা পাওয়ার সুযোগ হলো বিধবা মায়ের। তিনি স্যারকে করজোড়ে মিনতি করে বললেন,"আমার বার্ধক্য ভাতাটি যেন হয়, একটু দেখবেন স্যার। নইলে দুমুঠো খাবারও জুটবে না।" হ্যাঁ যে কথাটি বলা হয়নি, সেই বিডিও স্যারই হলেন এই সহায় - সম্বলহীনা বৃদ্ধারই ছেলে।


বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (সুব্রত চক্রবর্ত্তী, সুবীর কুমার ঘোষ, জনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমনাথ লাহা, মলয় চক্রবর্তী, সুমন চন্দ্র দাস)

বুড়োবাবা
সুব্রত চক্রবর্ত্তী 

গাজনের মেলা থেকে বেরিয়ে রতন চলেছে বাড়ির দিকে। কাল পয়লা বৈশাখ ছেলেকে বৌকে কিছু দিতে পারল না। বাজার খারাপ ভালো বেচাকেনা নেই। তবে যেটুকু হয়েছে তাই দিয়ে চাল ডাল তেল হয়ে যাবে। এরপর আর কিছু হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে রতন যখন বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে কেউ একজন রতনকে পিছন থেকে ডাক দিল। আলো অন্ধকারে রতন মুখটা দেখতে পায় না। সে জিজ্ঞেস করল উনি কে? ব্যক্তি কোন পরিচয় দিল না, শুধু বলল রতন যেন আগামীকাল সকালে মন্দির তলার মন্দিরে গিয়ে একটা বেল দিয়ে আসে। রতন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বলে কি লোকটা? এরপর সে আর কাউকে দেখতে পায় না।

বাড়িতে ঢুকে রতন ওর বৌকে সব বলে। শুনে রতনের বৌ বলে "এ নিশ্চয়ই বুড়ো বাবার কাণ্ড"। সে রাতে ওরা কোন কথা না বলে খেয়ে শুয়ে পড়ে। পরদিন সকালে রতন স্নান সেরে একটা বেল কিনে দিয়ে আসে মন্দিরে। পুরোহিত ওকে নতুন বস্ত্র দেয়। রতনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।


নববর্ষ
সুবীর কুমার ঘোষ

নতুন বছরের প্রথম সকালে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো অনির্বাণ। গত বছরের মতোই অনেক অপূর্ণতা, কিছু ভাঙা স্বপ্ন—সবই যেন তাকে নিঃশব্দে ঘিরে আছে। হঠাৎ টেবিলের উপরে রাখা পুরোনো চিঠিটার দিকে চোখ গেল। মা লিখেছিলেন, “সব হারালেও আশা হারিও না, নতুন বছর মানেই নতুন শুরু।”

চিঠিটা বুকে চেপে সে ধীরে ধীরে বাইরে বেরোল। নতুন সূর্যের কোমল আলোয় চারিদিক স্নিগ্ধ লাগছে, পাড়ার বাচ্চারা হাসছে, রঙিন ঘুড়ি উড়ছে নীল আকাশে। অনির্বাণ বুঝল, জীবন কখনও থেমে থাকে না। গতকালের দুঃখ আজকের আলোকে ঢেকে দিতে পারে না।

সে ঠিক করল, এবার ছোট ছোট আনন্দগুলোকে আঁকড়ে ধরবে—এক কাপ চায়ের উষ্ণতা, প্রিয় মানুষের হাসি, আর নিজের ওপর অটল বিশ্বাস। নতুন বছরের প্রথম সূর্যের আলোতে তার মনেও এক নতুন আশার আলো ফুটে উঠল।

হয়তো সব ঠিক হবে না, কিন্তু সে নতুন করে শুরু করার সাহস পেল—এই তো আসল নববর্ষ।


জেনারেশন গ্যাপ 
জনা বন্দ্যোপাধ্যায় 

"ও ঠাকুমা, তোমার নাম কাগজে উঠেছে! তোমার তৈরী হোমিওপ্যাথি দাতব্য চিকিৎসালয়ের কথাও লিখেছে!"

পিঙ্কি তার আশি বছরের বৃদ্ধা দিদাকে খবরটা দেয়। সুশীলা দেবী পিঙ্কির দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলেন, "কী এমন করেছি! বিপ্লবীদের মতো দেশের জন্য প্রাণ তো দিতে পারিনি! তোর দাদু বিনা চিকিৎসায় যখন চলে গেলেন, কটা টাকাই বা হাতে ছিল! বাজারে তরকারি বেচতে লাগলাম! কয়েকজন বাবু পেলাম, যারা রোজই কিনতেন। ব্যাংকের বইও করে দিলেন একজন বাবু। ওনারা খদ্দের নন, আমি মনে করি দেবতা। পনেরো বছর ধরে যেটুকু পারলাম টাকা জমালাম। তোর বাবা বলে ভস্মতে ঘি ঢেলেছি, তবু কাগজে নাম উঠল!" 

দশ বছর পর সরলা দেবী মারা গেলে তাঁর ছেলে দাতব্য চিকিৎসালয় বন্ধ করে নিজের মেয়ে পিঙ্কির নামে প্রসাধনীর দোকান খোলেন! জেনারেশন গ্যাপ  একেই বলে!


অনন্ত অন্তরাল
সোমনাথ লাহা

শনিবারের ব্যস্ত সকাল। দমদম জংশন সংলগ্ন মেট্রো চত্বরে অফিসযাত্রী আর-স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের ভিড়। খাবারের‌ দোকানের স্টল আর বাজারের হাঁকডাকের মাঝেই অমৃতবাজার থেকে ফিরছিল সুগত। মুদিখানার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতেই কানে বাজলো এক ক্ষীণ কন্ঠ—’’বাবা দু’টাকা দেবে?” 

সামনে শাঁখা-সিঁদুর পরা এক বৃদ্ধা। তাঁর মলিন বেশ আর অসহায় চাউনিতে সুগতর মনে মায়ার সঞ্চার হলো। মানিব্যাগ থেকে খুচরো টাকাটা দিতেই নিঃশব্দে চলে গেলেন মহিলা। পরের শনিবার সুগত যখন জোয়ান কিনছিল হঠাৎ আবার সেই এক‌ই আর্তি। বাধা দিলেন অপরিচিত এক ব্যক্তি। সরাসরি বললেন.. ‘’দেখুন বাঁচার অনেক পথ হয়েছে। কাজ করতে পারেন। ভিক্ষা পথ হতে পারে না’। মহিলা বিনা বাক্যব্যয়ে বিদায় নিল।

আরেক শনিবার দমদম স্টেশনে বৃদ্ধাকে দেখেই জনৈক যাত্রী বলেই উঠলেন, ‘সবাই আপনাকে চিনে ফেলেছে। অন্য জায়গায় যান। এখানে আর কিছুই মিলবে না।’ ধমক শুনেই মহিলার কোঁচকানো মুখে ফুটে উঠলো বিষণ্নতা। এরপর দমদমের সেই চেনা ভিড়ে শাঁখা-পরা হাত দুটোকে হাত পাততে দেখেনি সুগত। অপ্রাপ্তির চেয়ে‌ও চিনে ফেলার লজ্জা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বোধহয়।


ফিরিয়ে দাও...
মলয় চক্রবর্তী

মনে পড়ে কৈশোরের সেই দিন, সহজপাঠের দুটো লাইন ছোট খোকা বলে অ, আ

শেখেনি সে কথা কওয়া.....

সকাল থেকে রাত কত কথা কত কল্পনা, নীল আকাশের গাঁয়ে সদ্য প্রস্ফুটিত রামধনুর সাতটি রঙের মাঝে নিজের কল্পনা কে রাঙাতে কত ভাবনা, পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে এ মাঠ সে মাঠে ব্যাট বল নিয়ে নেমে পড়া... এ পাড়া থেকে ও পাড়ার গলি দিয়ে পায়চারি.. আকাশ কুসুম কল্পনার মাঝে নিজেকে ভাবিয়ে তোলা সেই সব স্মৃতি মধুর রোমাঞ্চকর  সুন্দর থেকে সুন্দর তম দিন মন হারানো সেই দিন গুলো.

তারপর.......

অনেক বছর অতিক্রান্ত. জীবন সায়াহ্নে আজ ও মন ভাবনায় ভালোবাসা ভালো লাগার দিন ফিরে পাবার তীব্র ব্যাকুলতা আজ, যদি ফিরে  পেতাম সেই দিন... রেখে দিতাম ল্যাপটপ এর অন্দরে..

দূরের নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে আজও ভাবি কেউ কি ফিরিয়ে দিতে পারেনা সেই মধুর দিন গুলো?

মনের অন্তস্থলে সেই স্মৃতি নিয়ে আজও বাঁচি, বেঁচে থাকতে চাই আজীবন..অনন্ত কাল।


শান্তিরক্ষী দধীচি
সুমন চন্দ্র দাস 

পাড়ার নববর্ষের বৈশাখী আড্ডায় অথর্ববাবু'র রবীন্দ্রসঙ্গীত-'তোমার হল শুরু ...সারা।' ভরাট গলায় শ্রুতিমধুর পরিবেশন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। 

শান্তিবৌদির মন অশান্ত। অথর্ববাবু অথর্বের অজুহাতে গতকাল চাকরী জীবনের অকাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেরেছেন। সংসারটা তো চালানোই দুষ্কর যুদ্ধলাগা দুর্মূল্যের বাজারে! 

~'আদিখ্যেতার গান- তার সব কাজ নাকি সারা হয়ে গেছে। আটান্ন, একটা বয়স। কোম্পানির এম-ডি এক্সটেনশনের অফারও দিয়েছিলেন। ডেইলি-ডিউটি নাকি অসম্ভব। বেড়াতে যাওয়ার কথায় অমনি যৌবন হাজির। পয়সা জুটবে কোত্থেকে?'

'তোমার মনে ভয়... হারা.......।' 

~'ভয় নেই? কলসীর জল শেষ হতে কদ্দিন! ছেলের বিয়ে, বয়সকালে ব্যাধি, পথ্য-চিকিৎসা, সীমাহীন খরচ। কে বোঝায়?' 

~'আহা কী দরদ!'... 'তোমায় আমায় মিলে... ধারা।'...'জামাইবাবু রেওয়াজ ছাড়াই কী সাবলীল, দিদি শুনলি।'-বোন অরুন্ধতি'র যেন ঘৃতাহুতি।

~'তুই শোন। আমাদের বাবা শ্রীকর্দম ঠাকুরের কৃপায় যে কর্দমে পড়েছি, সারাজীবন ওষ্ঠাগতপ্রাণ।'

~'সে যাই বল তুই। দধীচি'র মতো আমার বোনপো, কী ভালো চাকরি করছে।'

~'দ্যাখোনা মাসি, বোঝাচ্ছি কতো, বাবার বয়স বাড়ছে...- 

আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিষ্টি হাসি শান্তি ঠাকুরের। দধীচি-র হারমজ্জাই তবে শান্তিরক্ষী!

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...