সুচিপত্র :
১/ COP 30 জলবায়ু ন্যায়বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বহুমুখী ভূমিকা - শ্যামল প্রসাদ চৌধুরী
২/ অর্ধেক আকাশ - শংকর ব্রহ্ম (কলকাতা)
৩/ সর্বপ্রথম কৃত্রিম প্রজননে শাবক ও আলিপুর চিড়িয়াখানা - শৌনক ঠাকুর (মুর্শিদাবাদ)
৪/ শীতের দিনের হারানো স্মৃতি - সামসুজ জামান (কলকাতা)
------//*//------
COP 30 জলবায়ু ন্যায়বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বহুমুখী ভূমিকা
শ্যামল প্রসাদ চৌধুরী (পরিবেশবিদ,সম্পাদক শ্রীভূমি ফ্রেন্ডস অফ আর্থ)
প্রায় প্রতিটি দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) ব্রাজিলের বেলেম শহরে COP30 শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। COP30 জলবায়ু ন্যায়বিচার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জলবায়ু বিষয়ক গবেষণায় অস্থির পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।কপ-৩০-এর আগে প্রকাশিত ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনগুলোতে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উষ্ণ তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়া সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি করবে, মানব স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার উপর প্রভাব ফেলবে এবং কৃষি, বনজ, মৎস্য ও পর্যটনের মতো খাতগুলিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, চরম আবহাওয়া প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, আর বহু বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে।
আইপিসিসির জুন মাসের আপডেট অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা এখন প্রতি দশকে 0.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছে, যা ১৯৯০-র দশকের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে, যা বিংশ শতাব্দীর হারের দ্বিগুণ।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৫ সাল হবে ইতিহাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর।
১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার বিপজ্জনক অতিক্রম এড়ানোর জন্য বিশ্ব সময় ফুরিয়ে আসছে। বিলম্বিত পদক্ষেপের ফলে ইতিমধ্যেই উচ্চতর ক্রমবর্ধমান নির্গমনের দিকে এগিয়ে গেছে, এবং নতুন প্রমাণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে জলবায়ু ব্যবস্থা পূর্বের ধারণার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। দ্রুত, গভীর নির্গমন হ্রাস - ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০% এর বেশি - না হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি হয়ে পড়বে, যার ফলে মানুষ এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর মারাত্মক পরিণতি ঘটবে," জলবায়ু বিশ্লেষণের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল হেয়ার বলেন।
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, এখন বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী তীব্র গরমের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘১.৫ ডিগ্রির সীমা(Paris threshold )ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে তা হবে নৈতিক ও চরম ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী উদাসীনতা।’
বিশ্ব জুড়ে ক্লাইমেট চেঞ্জ এর ভয়াবহ কিছু তথ্য যেমন - মার্চ ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দাবানলে ৩.৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বনভূমি পুড়ে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। ইউরোপে ২০২৪ সালের ভয়াবহ গ্রীষ্মে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৭০০ জন। ২০২৫ সালেও ২৪ হাজার ৪০০ জন মারা গেছে।
দ্য ল্যানসেট-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, তাপের কারণে ২০২৪ সালে কর্মক্ষমতা কমায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
জীববৈচিত্র্য এখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। সমুদ্রে উষ্ণ জলের কারণে প্রবাল প্রাচীরের স্থায়ী ধ্বংস শুরু হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করছেন, ১. ৫ ডিগ্রি উষ্ণতা অতিক্রম করলে আমাজন অরণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত ঘটছে। গলতে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বরফ উত্তর আটলান্টিক স্রোত (এএমওসি) বন্ধ করে দিতে পারে, ফলে ইউরোপের শীত আরও তীব্র হবে।অন্যদিকে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যাওয়ায় সাগরের অন্ধকার জলরাশি আরও বেশি সূর্যালোক শোষণ করছে, যা তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এবং সমুদ্রের কার্বন শোষণ ক্ষমতা (কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন) কমিয়ে দিচ্ছে।
এসব বাস্তবতায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘১.৫ ডিগ্রির সীমা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে তা হবে নৈতিক ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী উদাসীনতা।’বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের সর্বশেষ পরিস্থিতি
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) এমিশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ জানায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে ২০৩৫ সালের মধ্যে (২০১৯ সালের তুলনায়) নিঃসরণ ৩৫ শতাংশ কমাতে হবে। আর ১. ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে চাইলে নিঃসরণ কমাতে হবে ৫৫ শতাংশ। বর্তমান গতিপ্রকৃতি অনুসারে, যদি বড় পরিবর্তন না আসে, তবে ২১০০ সালের মধ্যে উষ্ণতা ২.৫ থেকে ২.৯ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। এতে পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে মহাবিপর্যয়।
গ্লোবাল এনার্জি রিভিউ ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জ্বালানি খাত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ বেড়েছে, যদিও বৃদ্ধি হার কিছুটা ধীর হয়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে বাড়বে এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও বেড়ে যাবে।
জাতিসংঘের (ইউএনএফসিসিসি) এক আপডেটে বলা হয়েছে, দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১২ শতাংশ কমতে পারে। কিন্তু ওইসিডির ক্লাইমেট অ্যাকশন মনিটর ২০২৫ সতর্ক করেছে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে—ফলে নিঃসরণ এখনো রেকর্ড উচ্চতায় রয়ে গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিঃসরণকারী দেশ চীন কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে। কার্বন ব্রিফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টানা ১৮ মাস ধরে চীনের কার্বন নিঃসরণ স্থিতিশীল রয়েছে বা বেড়ে গেছে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ গোটা বিশ্বে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির দেখা দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা ভারতের পরেই দ্বিতীয়।পরিবর্তিত জলবায়ুর অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই ভোগ করছে বিভিন্ন রাষ্ট্র গুলি। ২০১৮ সালে প্রকাশিত চতুর্থ জাতীয় জলবায়ু মূল্যায়নে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, যদি আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন রোধ না করি এবং অভিযোজন শুরু না করি, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব সামাজিক ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে
বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষতির সঙ্গে মার্কিন ব্যবসায়কেও প্রভাবিত করবে।
বৈরী প্রকৃতি, আবহাওয়ার এলোমেলো আচরণ, হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা তীব্র খরা—এসব কৃষিনির্ভর মানুষদের এখন বড় বেশি ভাবাচ্ছে। ব্যাহত হবে উৎপাদন। অবিরাম জলবায়ু পরিবর্তন বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক সুযোগের উপর নাটকীয় প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বের মানুষ তাকিয়েছিলো কপ সম্মেলন এর উপর।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য বিশ্ব নেতাদের, বিজ্ঞানীদের এবং অন্যান্য প্রতিনিধিদের একত্রিত করবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই সম্মেলনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ এটি আমাজন রেইনফরেস্টের কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উপর জরুরি পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হব বলে আশা প্রকাশ করেছিলে বিশ্ববাসী ।কিন্তু দেখা গেলো বন উজাড় বন্ধের জন্য কোনও রোডম্যাপ নেইl
ধনী আর শিল্পনির্ভরদেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নে মূল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর দায় তারা নিচ্ছে না। তারা স্বচ্ছ জ্বালানির কথা বলে থাকে। কিন্তু এতে বিপুল অর্থায়ন দরকার, সেটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।সৌদি আরব এবং রাশিয়া সহ প্রধান পেট্রোস্টেটগুলির চাপের মুখে, COP30 । ভারত সাহসের সাথে তার সমস্ত অবস্থান নিয়েছে । ভারত তার উন্নয়ন যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে - যেখানে জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একত্রিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর জলবায়ু ও পরিবেশ নীতিগুলির প্রভাব বহুমুখী, যার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন মডেল(development )যা ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক , মানব কল্যাণকর, জলবায়ু এবং ১০০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব।
জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সমাজকে ক্রমবর্ধমান হারে প্রভাবিত করছে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতির মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক হিমবাহ রক্ষা,গ্রীন ইকোনমি ,সার্কুলার ইকোনমি,সবুজায়ন, একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক হ্রাস ,সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শক্তি, ইকোফ্রেন্ডলি লাইফস্টাইল এবং পরিষ্কার রান্নার জ্বালানি উৎপাদন। জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য ভারত তার নীতিগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ৩০শে জুন ২০০৮ তারিখে, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAPCC) প্রকাশিত হয়। এই পরিকল্পনায় ভারতের উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য একাধিক পদক্ষেপের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAPCC) বিভিন্ন পদক্ষেপকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আটটি লক্ষ্যের উপর আলোকপাত করে।এটি ভারতের উন্নয়নের পথে পরিবেশগত স্থায়িত্বকে অভিযোজিত এবং বৃদ্ধি করার জন্য ৮টি উপ-মিশনের একটি জাতীয় কৌশল। এগুলি হল জাতীয় সৌর মিশন (NSM), বর্ধিত শক্তি দক্ষতার জন্য জাতীয় মিশন (NMEEE), টেকসই বাসস্থান সংক্রান্ত জাতীয় মিশন (NMSH), জাতীয় জল মিশন (NWM), হিমালয় বাস্তুতন্ত্র টেকসই করার জন্য জাতীয় মিশন (NMSHE), জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৌশলগত জ্ঞানের জন্য জাতীয় মিশন (NMSKCC), একটি সবুজ ভারতের জন্য জাতীয় মিশন (GIM), এবং টেকসই কৃষির জন্য জাতীয় মিশন (NMSA)।ভারতের বনভূমি রক্ষা, পুনরুদ্ধার বৃদ্ধি করা , টেকসই কৃষি, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই মিশনের উদ্দেশ্য। জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অধীনে আটটি মিশনের মধ্যে একটি হল সবুজ ভারতের জন্য জাতীয় মিশন (GIM) ও গ্রীন এনার্জি মিশন ফর ইন্ডিয়ান" যা দুটি প্রধান জাতীয় উদ্যোগকে বোঝানো হয়, ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন এবং ন্যাশনাল মিশন ফর এ গ্রিন ইন্ডিয়া (GIM)।জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গ্রীন ইন্ডিয়া মিশন' একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জাতীয় সবুজ হাইড্রোজেন মিশন ৪ জানুয়ারী ২০২২ তারিখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল।ভারত সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২৫ GW গিগাওয়াট হবে। ২০৭০ সালের জন্য নেট-জিরো লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো এবং সবুজ অর্থায়নের চারপাশে ক্রমবর্ধমান গতির সাথে, এখন আমাদের দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ।
৩ আগস্ট ২০২২ তারিখে, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা প্যারিস চুক্তির অধীনে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) দ্বারা বিবেচনার জন্য আপডেট করা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) পাস করে, যার মাধ্যমে ২০৭০ সালের মধ্যে ভারতের নিট শূন্য নির্গমনের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এটি ছিল পঞ্চামৃত (পাঁচটি অমৃত উপাদান) - জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ভারতের কর্ম পরিকল্পনার একটি অনুবাদ, যা গ্লাসগোতে COP 26-তে ঘোষিত হয়েছিল।ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট শূন্যে পৌঁছানোর লক্ষ্য রাখে এবং তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তার নির্গমন থেকে দ্বিগুণ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায় ।
ভারতকে কপ৩০-এ জলবায়ু অর্থায়নের ও সিটিটি(ক্লিন কার্বন টেকনোলজি ট্রান্সফার), সিডিএম (ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম) এর সুবিচারের জন্য সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।
ভারতকে জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য স্থিতিস্থাপকতা এবং ক্ষমতা জোরদার করা, দেশীয় নীতি, কৌশল এবং পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যবস্থাগুলি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলার মাধ্যমে SDG 13 অর্জনের জন্য ভারত কাজ করছে। কপ ৩০-এর সফলতা নির্ভর করছে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত হওয়ার উপর। যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগ, অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করা এবং কার্বন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করার মতো পদক্ষেপ।উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও এখন কার্বন ট্যাক্স চালুর পরিকল্পনা করছে।ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্রাজিল কপ৩০-এ যৌথভাবে একটি কার্বন বাজার জোট গঠন করেছে, যাতে নিঃসরণের ওপর মূল্য নির্ধারণ কার্যকর হয়।
SDG ১৩ ক্লাইমেট একশনএর লক্ষ্য হল জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে: জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য স্থিতিস্থাপকতা এবং ক্ষমতা জোরদার করা, দেশীয় নীতি, কৌশল এবং পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যবস্থাগুলি অন্তর্ভুক্ত করা।জলবায়ু পরিবর্তন, এর প্রভাব হ্রাস এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতা সম্পর্কে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।টাইম ইস fleeting। *প্যারিস চুক্তির দশ বছর পর, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উষ্ণায়নের* পূর্বাভাসে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি ।আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল,শুধু টিকে থাকা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবন গড়ে তোলা।আর এই অভিযোজনে সবার অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি একধরনের সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন। কিভাবে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে আমরা সবাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ভূমিকা রাখতে পারি। আসুন সবাই মিলে শপথ করি- পরিবেশ রক্ষা করব, সচেতন থাকব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলব।
(লেখক ব্রাজিল এর কপ 30 সম্মেলনে ডিজিটাল/ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ করেন)
------//*//------
অর্ধেক আকাশ
শংকর ব্রহ্ম (কলকাতা)
আদিকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত লক্ষ্য করলে দেখা যায় নারীরা ইতিহাস থেকে শুরু করে সকল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেছে।
অবমাননা ও অত্যাচারে অভ্যস্ত নারী প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হলেও, একথা অনস্বীকার্য যে নারী শক্তি ছাড়া পৃথিবীতে উন্নতি সম্ভব হত না, ভবিষ্যতেও হবে না।
ঘরে -বাইরে সব জায়গায় একা-হাতেই নারী সুষ্ঠুভাবে সামলাতে পারে কারও সাহায্য ছাড়াই। আধুনিক সমাজে নারী আজ আর পিছিয়ে নেই।
কথায় আছে, ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। শিক্ষা, কর্তৃত্বে ,গুণে, মানে সব ক্ষেত্রেই পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে তারা। নারীরা আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারাও কোনও অংশে কম নয়। তাই সর্বযুগে সর্বকালে মানুষের মনে নারীশক্তি মর্যাদা পেয়েছে।
ইতিমধ্যে নারীরা নিজেদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে পারদর্শী । তাই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ও আজ নারীশক্তির জয়জয়কার । প্রকৃত অর্থে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের সাথে সাথে তারাও সমান অধিকার ও সম্মানের দাবিদার।
একজন নারীর বুদ্ধিমত্তা, সাহস, ব্যক্তিত্ব এবং প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব কোনও অংশেই পুরুষের থেকে কম নয়। তা বর্তমান যুগের আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারীরা প্রমাণ করেছেন।
অমিত সম্ভাবনার অধিকারী নারী হল প্রকৃত শক্তির আধার, নারীশক্তি বিহীন পৃথিবী সামনের দিকে এগোতে পারে না।
নারী বিহীন পুরুষের একক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের উন্নতির কথা কল্পনা করা বৃথা।
নারী হল প্রকৃত শক্তি, সে সব উপমার ঊর্ধ্বে। রূপের ছটায় মোহিত করার ক্ষমতা যেমন রাখে তেমনই গুণের সম্ভারে নারী সকলকে মুগ্ধ করতে পারে। কর্মসূত্রে তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তার সমাধান চেষ্টা করে যেমন, তেমন আবার সন্তানের অসুস্থতায় সারা রাত ধরে জেগে পাখার বাতাসও করতে পারে। দেশের নেতৃত্ব সুদক্ষহাতে সামলাতেও পারে নারী। একই অঙ্গে এত রূপ কেবলমাত্র নারীদের মধ্যেই দেখা যায়। আধুনিক যুগে নারীশক্তি সর্বত্রব্যাপি।
নারীশক্তি বা নারীর ক্ষমতা ব্যাপক অর্থে একজন নারীর স্বকীয়তা, নিজস্বতা এবং সর্বোপরি স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিকাশকে চিহ্নিত করে। নারী হল সমাজের অর্ধেক অংশ। একজন স্ত্রী, বোন, কন্যাসহ মর্যাদাপূর্ণ সব সম্পর্কের বন্ধনে নারীজাতি সমাজের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্ব-নির্ভরশীলতাকে বাস্তব আকার প্রদান করার মাধ্যমেই সারা বিশ্বের সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর শক্তির ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
তাই নজরুল ইসলাম লিখেছেন -
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
যত কথা হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা.."
“ জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্।
কোন্ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।
“তুমি প্রজাপতি হংসমালা
তুমি আত্মা তুমি স্বত্বা তুমি প্রভু প্রেমিকা
তুমি দেবদুত তুমি রাধা তুমি সতী শ্বেতশুভ্রা
তুমি কাংগাল তুমি পুত তুমি পবিত্র আজলা
তুমি প্রেত তুমি নগ্ন তুমি রাক্ষসী তুমি যৌবনজালা
তুমি রুপ তুমি সৃজন তুমি ঝলক তুমি আশ্রিতা
তুমি বিমুর্ত তুমি কল্পনায় কল্পিতা,
তুমি রানী তুমি সম্রাজ্ঞী তুমি মাতা তুমি জননী জ়ায়া
তুমি সারথী তুমি পুজারী তুমি ভোগ তুমি ত্যাগ তুমি মায়া ।
তুমি রাখী তুমি মিলন তুমি প্রেমরতিকা
তুমি বোধ তুমি অবোধ তুমি মাস্তুল তুমি বর্তিকা,নারী তুমি শক্তি তুমি প্রজ্ঞা তুমি উৎকর্ষতা
তুমি ফল্গু তুমি চাষভূমি তুমি উর্বর তুমি রুক্ষ অনুর্বর মরুতা,
তুমি পণ্য তুমি বর্ণ তুমি যবনিকা
তুমি আদিম তুমি সনাতন তুমি মাতৃকা ।
তুমি ঘৃনার তুমি নিঃগৃহের তুমি আস্ফালন তুমি আকাশ নীল
তুমি শীতল তুমি ফানুস তুমি উচ্ছ্বাসের ঢেউ ফেনিল
তুমি ভুমিষ্ট তুমি জরায়ু তুমি প্রসব তুমি জোয়ার তুমি বান
তুমি তীব্রতা তুমি পতিত তুমি ভাগার তুমি নীরব শ্মশান ।”
নারীদের নিয়ে কবি শুভ দাশগুপ্তর লিখেছেন -
“সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা।
আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়।
আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়।
আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে।
কালো আকাশ মাথায় নিয়ে
আমি ছাতা হয়ে থাকি।
ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার।”
“হয়ত একদিন- হয়ত অন্য কোন এক দিন
আমার সমস্ত মিথ্যে পোশাক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
আমিই হয়ে উঠবো সেই অসামান্যা !
খোলা চুল মেঘের মত ঢাকবে আমার খোলা পিঠ।
দু চোখে জ্বলবে ভীষণ আগুন।
কপাল-ঠিকরে বেরুবে ভয়ঙ্কর তেজরশ্মি।
হাতে ঝলসে উঠবে সেই খড়গ।
দুপায়ের নুপুরে বেজে উঠবে রণদুন্দভি।
নৃশংস অট্টহাসিতে ভরে উঠবে আকাশ।
দেবতারাও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে বলতে থাকবেন
মহামেঘপ্রভাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং
কালিকাং দক্ষিণাং মুণ্ডমালা বিভুষিতাং।”
“তোমাকে বলেছে –আস্তে,
বলেছে –ধীরে.
বলেছে –কথা না,
বলেছে –চুপ।
বলেছে– বসে থাকো,
বলেছে– মাথা নোয়াও,
বলেছে — কাঁদো।
তুমি কি করবে জানো?
তুমি এখন উঠে দাঁড়াবে
পিঠটা টান টান করে, মাথাটা উঁচু করে দাঁড়াবে,
তুমি কথা বলবে, অনর্গল বলবে, যা ইচ্ছে তাই বলবে,
জোরে বলবে,
চিৎকার করে বলবে,
এমন চিৎকার করবে যেন ওরা দুহাতে ওদের কান চেপে রাখে।
ওরা তোমাকে বলবে, ছি ছি! বেহায়া বেশরম
শুনে তুমি হাসবে।
ওরা তোমাকে বলবে, তোর চরিত্রের ঠিক নেই,
শুনে তুমি জোরে হাসবে
বলবে তুই নষ্ট ভ্রষ্ট
তুমি আরও জোরে হাসবে
হাসি শুনে ওরা চেঁচিয়ে বলবে, তুই একটা বেশ্যা
তুমি কোমরে দুহাত রেখে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলবে, হ্যাঁ আমি বেশ্যা।
ওদের পিলে চমকে উঠবে। ওরা বিস্ফারিত চোখে তোমাকে দেখবে। ওরা পলকহীন তোমাকে
দেখবে। তুমি আরও কিছু বলো কি না শোনার জন্য কান পেতে থাকবে।
ওদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের বুক দুরু দুরু কাঁপবে,
ওদের মধ্যে যারা নারী তারা সবাই তোমার মত বেশ্যা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।”
আরেক কবি লিখেছেন -
"তুমি নিজেই জানো না
কতটা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে তোমার অন্তরালে,
জগৎকে করে আলোকিত
নিজের মহিমায় সকলকে করেছ তুমি ধন্য ,
নিজেকে করোনি কখনো প্রকাশ ,
থেকে গেছো চিরকাল আড়ালে,
তোমার গুরুত্ব কখনো হবে না কম।
নারী, তুমি অপরাজেয় কালে কালে।
সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা।
আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়।
আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়।
আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে।
কালো আকাশ মাথায় নিয়ে
আমি ছাতা হয়ে থাকি।
ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার।"
নারী সম্পর্কে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিদের ধারণা -
১. “ স্ত্রীদিগের উপর যেমন কঠিন ব্যবস্থা , পুরুষের উপর আলোচনার কিছু নেই। কথায় কিছু হয় না, ভ্রষ্ট পুরুষের কোন সামাজিক দণ্ড নেই। একজন স্ত্রী সতীত্ব সম্বন্ধে কোন পরিচয় করিলে সে আর মুখ দেখাতে পারে না। "
– বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২. "প্রাণকে নারী পূর্ণতা দেয়, এই নারীর মৃত্যুকেও মহািয়ান করতে পারে।"
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. “ কোন কালে একা হয়েছে ক' জয়ী পুরুষের তরবারি , প্রেরণা দিয়াছে , শক্তি দিয়াছে বিজয় -লক্ষ্মী নারী । "
– কাজী নজরুল ইসলাম
৪. “ মেয়েদের চরিত্রের মাধুর্য পাওয়া যায় কুমারীত্বে।
– প্রবোধকুমার সান্যাল
৫. " নারীর হৃদয় এমন একটা জায়গা, যেখানে আমি একজন নারীকে হারিয়ে ফেলেছি৷ "
– রেদোয়ান মাসুদ
৬. “প্রতিটি মেয়ে তার স্বামীর কাছে রাণী হতে পারে না। কিন্তু প্রতিটা মেয়েই তার বাবার কাছে রাজকন্যা থাকে।
– হুমায়ূন আহমেদ
৭. "নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সামান্য সচেতন হলে মেয়েরা নিশ্চয়ই বুঝত যে জগতে যত নির্যাতন আছে মেয়েদের বিরুদ্ধে , সবচেয়ে বড় নির্যাতন হল – মেয়েদের সুন্দরী হওয়ার জন্য লেলিয়ে দেওয়া।“
– তসলিমা নাসরিন
৮. " তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও ,আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেবো। "
– নেপোলিয়ানা বোপার্ট
৯. “ নারীর কাছ থেকে পুরুষের মত কাজ করার আশা তাকে অবশ্যই সমান শিক্ষা দিতে হবে। "
– পলিটো
১০. “নারীর সাহায্যে, তার চিন্তাশীলতা ও ধারণা নব সমাজের নির্মাণ সুদৃঢ় হতে পারে।
– লেলিন
১১. ” নারী হচ্ছে টি – ব্যাগের মত। গরম জলে দেয়ার আগে তুমি বুঝতে পারবে না সে কতটা শাক্তিশালী। ”
– এলিয়ানর রুজভেল্ট
১২. ” মাতৃত্ব শুধু শক্তি যোগায় না, এটা মনে শান্তিও দেয়। তুমি নারী বলে এটা কখনই বলে না। "
– ম্যারি কম
১৩. “ আমাদের সমাজে মহিলারাই মহিলার মা। তাই তাদের উন্নতির দিকে নজর দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। "
– মরিয়ম মাকেবা
১৪. "নারী প্রেমের জন্য, জানার জন্য নয়।"
– অস্কার ওয়াইল্ড
১৫. "যে একটি নারীকে বিবেচনা করতে পারে, সে নারীর কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে গৌরবে"।
– জে, বি,ইয়েস্ট
নারীদের নিয়ে কিছু স্মরণীয় উক্তি -
" কোন সংস্কৃতি কতটা সভ্য তা জানতে তারা তাদের নারীদের সাথে কেমন আচরণ করে সেদিকে লক্ষ্য করো।"
“ আমাদের সমাজে নারীরাই ভবিষ্যতের মা। তাই তাদের উন্নতির দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। “
”সব বড় মানুষেরাই তাঁদের সাফল্যর জন্য কোন অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উৎসাহের ঋণের কথা বলেছেন। “
” মেয়েদের মন পৃথিবীর সবচেয়ে স্পর্শকর জায়গা। এই মন অনেক কঠিন বিষয় সহজে মেনে নেয়, আবার অনেক সহজ বিষয় সহজে মেনে নিতে পারে না। “
” অসংখ্য কষ্ট ,যন্ত্রনা পেয়েও মেয়েরা মায়ারটানে একটা ভালোবাসা, একটা সম্পর্ক , একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে চায়। এই জন্য মেয়েরা মায়াবতী আর মায়াবতীর কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই। ”
” মাতৃত্ব শুধু শক্তিই যোগায় না, এটা মনে শান্তিও এনে দেয়। তুমি নারী বলে দুর্বল এটা কখনই কাউকে বলবে না। “
“ ঈশ্বর নারীর প্রতিভাকে স্থাপন করেছে তার হৃদয়ে, কারণ এই প্রতিভার সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে সর্বদাই প্রেমেরই সৃষ্টিকর্ম। ”
“ যে পুরুষ একটি নারীকে বুঝতে পারে, সে পৃথিবীর যে কোন জিনিস বুঝতে পারার গৌরব করতে পারে।”
” নারীর হৃদয় হলো এমন একটা জায়গা, যেখানে গেলে সকল পুরুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। ”
“ যে সমাজে শিক্ষিত, স্বনির্ভর, সচেতন মেয়ের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজে বিচ্ছেদের সংখ্যাটা বেশি, বিয়ের সংখ্যাটা কম। ”
“ নারীর সাহায্যে, তার চিন্তাশীলতা ও সচেতনতায় নব সমাজের নির্মাণ সুদৃঢ় হতে পারে। ”
“ যে মহিলা ভিড় অনুসরণ করে সে সাধারণত ভিড়ের চেয়ে আর বেশি যায় না। যে মহিলা একা হাঁটেন তিনি সম্ভবত নিজেকে এমন জায়গাগুলিতে সন্ধান করতে পারেন যা আগে কখনও হয়নি। ”
“ সমতা অর্জনের জন্য নারীদের সংগ্রামের গল্পটি কোনও একক নারীবাদী বা কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, যারা মানবাধিকার সম্পর্কে যত্নশীল তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার অন্তর্ভুক্ত। ”
“ আপনি একজন মানুষকে শিক্ষিত করেন; আপনি একজন মানুষকে শিক্ষিত করুন আপনি একজন মহিলাকে শিক্ষিত করেন; আপনি একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করুন। ”
“ একজন মানুষের মুখ হ’ল তার আত্মজীবনী। একজন মহিলার মুখ হ’ল তার কথাসাহিত্যের কাজ। ”
“ নরসমাজে নারীশক্তিকে বলা যেতে পারে আদ্যাশক্তি। এই সেই শক্তি যা জীবলোকে প্রাণকে বহন করে। প্রাণকে পোষণ করে। ”
নারীশক্তি নিয়ে কিছু প্রচলিত স্টেটাস ~
নারীরা হল জগজ্জননীর প্রতিভূ
নারী আজ স্বয়ংসিদ্ধা। তাঁরা কারও উপরে নির্ভরশীল নয়, বরং তাঁদের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র পরিবার। আবার কখনও তাঁদের উপরেই নির্ভর করছে কোনও দেশের ভাগ্য।
প্রত্যেকটি মানুষের সাফল্যের, পেছনেই রয়েছে একজন নারীর,আত্মত্যাগের কাহিনী যারা সবসময় থেকে যান পর্দার পেছনেই। নারী না থাকলে হতো না রাখীবন্ধন, ভাই ফোঁটা পেত না তার মর্যাদা।
নারী না থাকলে- পৃথিবীটা হত না এত সুন্দর। নারী না থাকলে- আমাদের জন্মই যে হত না।
যুগ যুগ ধরে অত্যাচার সহ্য করে নারীরা এবারে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নারী শক্তির জয়জয়কার এখন সর্বত্র।
এই বিশ্বজগৎ সুষ্ঠুভাবে একমাত্র মেয়েরাই চালাতে পারে।
যে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মতো শান্ত সে চণ্ডীর মতো আগুন হয়েও জ্বলে উঠতে পারে।
একটা অসুরকে বধ করতে যখন হিমসিম গিয়ে খাচ্ছিলেন তখন এক নারী এসেই তাঁদের পরিত্রাণ ঘটালেন ।
বর্তমান দুনিয়ায় এমন কোনও কাজ নেই যা মেয়েরা পারে না।
সমুদ্রের জল যেমন একটা গ্লাসে রাখা যায় না ঠিক তেমনি নারী দিবস একদিনে পালন করা যায় না।
নারীরা যখন শক্তিরূপা হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীতে অনেক বড় পরিবর্তন আসে। নারীবাদী হওয়া মানে নারীদের শক্তিশালী করা নয়, কারণ মেয়েরা এমনিতেই শক্তিশালী।
বাধা এলে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে সদাই প্রস্তুত মেয়েরা, কারণ তাদের মধ্যে আছে অনন্ত শক্তির আধার।
আজকের দিনে নারীরা পুরুষদের থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। সব ক্ষেত্রেই তারা পুরুষদের টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই আপামর নারীজাতির নিজেকে কখনো দুর্বল না ভেবে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে কারণ তারাই হল শক্তির উৎস।
নারীরা হলেন কন্যাসন্তান হিসাবে মিষ্টি, বোন হিসাবে যত্নবান, প্রেমিকা হিসাবে সুন্দরী, স্ত্রী হিসাবে প্রিয়তমা,মা হিসাবে পরম মমতাময়ী, তারা শক্তির আধার, তারা যে নারী! একজন নারী হলো সংসারের ধারক এবং বাহক।
জীবন যদি রামধনু হয়, তবে নারী হল তার রঙের বাহার, জীবনে যদি নেমে আসে আঁধার, নারী তবে তার আশার আলো।
নারীরা চায় মুক্ত আকাশ, সে চায় উড়তে। ডানার দাবি তারা করে না কখনও, কারণ ইচ্ছেশক্তি তাদের রক্তে। হে নারী , তোমার ডানায় আগুন, দীর্ঘ হোক তোমার উড়ান।
পৃথিবীর প্রাণ তুমি, নারী। তোমার থেকে সৃষ্ট সমগ্র দুনিয়া। আজ তাই তোমারে প্রণিপাত করি।
নারীর কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই, কেউ যদি নারী শক্তির দৃঢ়তা বুঝতে না পারে, তাহলে তাদের নিজেদেরই বদলের দরকার আছে, নারীদের নয়।
নারীর অনেক রূপ। কখনও প্রেয়সী আবার কখনও চামুণ্ডা কালীও হয়ে উঠতে পারে সে। নারীরা সময় বিশেষে হয়ে ওঠেন দশভুজা।
নারী জাতিই একমাত্র যারা প্রাণের সৃষ্টি করতে পারে। এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে? নারীর উপমা নারী নিজেই । সে নিজেও জাননা, তার মধ্যে কতটা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। সবাইকে নিজের আলোয় আলোকিত করে রেখেছে ‘নারী’।
নারী হল আগুন দিয়ে তৈরি অগ্নিকন্যা যে রক্ষা করে সবাইকে এবং একই সাথে ভালোবাসায় ঘিরে রাখে। একজন নারী হলেন সব ক্ষমতার উৎস, ভালবাসার এক অনন্ত নদী।
রূপ,গুণ, কর্মদক্ষতা, সহনশীলতা সবেতেই নারী অদ্বিতীয়া। তোমার তুলনা তুমি নিজেই ..হে নারী।
নারী হলেন একটি পরিবারের স্তম্ভ, যা সবাইকে বেঁধে রাখে। তার অনুপ্রেরণা ছাড়া কোনও কিছু সম্ভব নয়।
সব বড় মানুষেরাই তাদের সাফল্যের জন্য কোন অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উৎসাহের ঋণের কথা বলেছেন।
নারী হলেন তরুণের কর্ত্রী, মধ্যবয়সী পুরুষের সঙ্গিনী এবং বৃদ্ধের সেবিকা।
যেখানেই কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে সেখানেই মহিলারা উপস্থিত ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। … তাই নারীদের ব্যতিক্রম হিসাবে ভাবা উচিত নয়।
একজন নারী যে তার দাবি জানাতে পারে সে ই হল প্রকৃতপক্ষে একজন শক্তিশালী রমণী। একজন নারীবাদী মহিলা সে ই যিনি নারী ও পুরুষের সমতা এবং মানবতাকে সমান স্বীকৃতি দেন।
একজন মহিলার এমন বিশেষ কিছু গুণ আছে যা একজন পুরুষতান্ত্রিক জগতে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম। সেটি হল নারীর নির্দিষ্ট অনুগ্রহ, শক্তি, বুদ্ধি, এবং নির্ভীকতা। পৃথিবীতে এমন কিছু কাজ নেই যা নারীরা সম্পাদন করতে পারে না।
মহিলাদের নেতৃত্ব এ বিশ্বে সর্বত্র – দেশের নেত্রী কিংবা সিইও পদ থেকে শুরু করে সেই গৃহিনী যে তার সন্তানদের লালন-পালন করে এবং তার পরিবারের নেতৃত্ব দেয়। আমাদের দেশটি শক্তিশালী মহিলাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল যা ইতিহাস কখনও অস্বীকার করতে পারবে না।
মানবাধিকার হ’ল নারীর অধিকার এবং নারীর অধিকার হ’ল মানবাধিকার, এই সত্যটি আজকের এবং সর্বকালের জন্য।
নারীর অনুমান পুরুষের নিশ্চয়তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। পুরুষ সম্মুখ যুদ্ধে বিশ্বাস করে, কিন্তু স্ত্রী জাতির রণনীতি সম্পূর্ণ পরোক্ষ।
জগতের প্রাণ তুমি হে নারী,/ তোমার থেকে সৃষ্ট আমি, /তোমার চরণ চুমি।
যে হাসিমুখে সব সয় সেই যে নারী। / শক্তি যার অপার, অসীম,/কখনও হাল দেয় না ছাড়ি, তোমায় কুর্নিশ সে মহান নারী।
নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,/ যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
------//*//------
সর্বপ্রথম কৃত্রিম প্রজননে শাবক ও আলিপুর চিড়িয়াখানা
শৌনক ঠাকুর
যদি জানতে চাওয়া হয় বন্দীদশায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কোথায় প্রথম গন্ডার শাবক প্রসব করানো হয়েছিল? স্বভাবতই আমাদের স্মৃতি বিদেশি কোন জায়গার নাম অনুসন্ধান করা করবে। কিন্তু আমরা প্রায় অনেকেই জানি না যে আজ থেকে প্রায় ১৩৬ বছর আগে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল আলিপুর চিড়িয়াখানায়। হ্যাঁ, আমাদের চির পরিচিত সেই আলিপুর চিড়িয়াখানা। কলকাতা। এই কান্ডটি যিনি ঘটিয়েছিলেন কোন ইংরেজ নন , একজন বাঙালি — রামব্রহ্ম সান্যাল।
রামব্রহ্ম সান্যালই আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রথম ভারতীয় অধিকর্তা বা সুপারিনটেনডেন্ট। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার জন্ম হয়েছিল মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলার কাছে মহুলা গ্রামে। সালটি ১৮৫৮ (১৩ অক্টোবর)। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে তিন বছরের বড়। রামব্রহ্মের পিতা ছিলেন বৈদ্যনাথ সান্যাল। অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। রামব্রহ্ম বহরমপুরের কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারিতে ভর্তিও হন। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। মোটামুটি তিনবছর পর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। তার দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে থাকে। তখন বাধ্য হয়েই ডাক্তারি পড়া মাঝ পথে ছাড়তে হয়। তবে স্থিতধী , পরিশ্রমী ,বুদ্ধিমান , বিচক্ষণ রামব্রহ্ম সহজেই নজর কেড়েছিলেন অধ্যাপক জজ কিং এর।
এই জজ কিং তাকে প্রথমে আলিপুর চিড়িয়াখানায় একটা কাজ দেন। কুলি-মিস্ত্রীদের তদারক করা। তখন অবশ্য চিড়িয়াখানাটি নির্মাণ হচ্ছিল। চিড়িয়াখানা তৈরি হবার পর তিনি হলেন হেডবাবু। সাল ১৮৭৭। কর্মদক্ষতা ও পরিশ্রমের গুণে তিনি সুপারিনটেনডেন্ট পদ অলংকৃত করেন। বাল্যকাল থেকেই পশু-পাখিদের প্রতি তার ছিল একটা আলাদা আগ্রহ। ছুটিতে বাড়ি ফিরে তিনি বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। বিভিন্ন প্রকার গাছগাছালি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। খোঁজ নিতেন গ্রামের গৃহপালিত পশুদের।
পশুদের প্রতি তার এই ভালোবাসা যেন সহজাত। চিড়িয়াখানায় জীবজন্তুদের স্বাস্থ্য , খাওয়া-দাওয়া , বাসস্থান ইত্যাদি বিষয় তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখতেন। দু’বেলা ঘুরে ঘুরে পশুদের দেখতেন। ঋতু অনুযায়ী থাকার সুব্যবস্থা করেছিলেন।
পশুদের বিজ্ঞানসম্মত নাম, তাদের দৈহিক পরিবর্তন, তিনি নোট করে রাখতেন। অসুস্থ হলে তিনি পশু চিকিৎসক ডাকতেন। ছোটখাটো অপারেশনে ওখানে হত। কোন পশু মারা গেলে তার পোস্টমটম করা হত। সেই রিপোর্ট তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠাতেন। পশুদের বিষয়ে তার নোট বা পর্যবেক্ষণ কতটা গভীর ছিল একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই —
“The Dolphin has an elongated body, and a long compressed beak provided with large conical teeth, which are rather sharp-pointed in young, but become worn down as the animal grows old. Its dimensions vary from seven or eight to even twelve feet; the colour is uni-formly black or greyish black. This aquatic animal is perfectly blind, because its eyes are not only rudimentary but completely buried beneath the thick, opaque hide of the head. There is, however, nothing strange in this deprivation of sight, which would be useless to a beast which lives in thick muddy water. Any one who has sailed often in the Ganges, the Brahmaputra, or the Indus cannot have failed to notice that these animals do not show themselves always and everywhere in these rivers. They are migratory in habits and desert such parts as become clear and shallow during the summer for others which are deep and dirty. Their food con sists of fish and prawns, and also, it is said, crabs; but this requires confirmation. Dolphins are sometimes captured by fishermen, either accidentally or on purpose, as their oil is said to possess great efficacy in curing rheumatism and allied disorders.”
তার রেজিস্টার থেকে জানা যায় , একবার খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল দুটি বাঘ। মিস্ত্রিরা হয়তো কাজ করার পর খাঁচার দরজা বন্ধ করতে ভুলে যান। অবশ্য বহু চেষ্টাতেও বাগে আনা যায় নি বাঘ দুটিকে। তখন বাধ্য হয়েই গুলি করা হয়েছিল। এই ঘটনা তাকে খুব ব্যথিত করেছিল। শুধু তিনি কেন আমরা যারা এই রচনাটি পড়ছি তাদেরকেও মন নিশ্চিতভাবেই ব্যথিত হবে।
পাখিদের বাসা তৈরি , শিকার ধরার কৌশল ইত্যাদি বিষয় নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন। মাছরাঙ্গা পাখির শিকার ধরার কৌশল তিনি যথেষ্ট দক্ষতাই বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখছেন — মাছরাঙার খাবার হয় ছোট মাছ। মাছরাঙার মধ্যে এই গুণগুলি অসাধারণ মাত্রায় বিদ্যমান। শিকার জলের ওপর ভেসে উঠলেই, মাছরাঙা একেবারে তীরের মতো ছুটে যায়, চোখের পলকে শিকার ধরে ফেলে, এবং আবার দ্রুত তার নির্ধারিত জায়গায় ফিরে আসে।
বাংলাদেশের স্ত্রী গন্ডার ও সুমাত্রার পুরুষ গন্ডারের মিলনে একটি গন্ডার শাবক জন্ম নিল। বন্দী দশায় গন্ডারের জন্ম ভারতের ইতিহাসে প্রথম। যেখানে আজকের মত চিকিৎসা বিদ্যা বা শল্যচিকিৎসা এতটা উন্নত ছিল না। নিজে দক্ষতায় বুদ্ধিমত্তায় এবং সাহসের সঙ্গে কৃত্রিম প্রজননের ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। এছাড়াও সাপের বিষ নিয়ে ওখানে গবেষণা চলত।
চিড়িয়াখানার ভিতরে লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৮৮০ সালে চিড়িয়াখানার ভেতর ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো হয়। এই চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলেন বহু বিশিষ্টজন। এসেছিলেন তার মধ্যে অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ , ভগিনী নিবেদিতা , স্বামী বিবেকানন্দ ,স্বামী যোগানন্দ প্রমুখ বিশিষ্টজন।
গ্রন্থঋণ
১. “A hand-book of the management of animals in captivity in Lower Bengal” : by Sanyal, Ram Bramha
২. বাংলা চরিতাবিধান
৩. “তাঁর আমলে চিড়িয়াখানায় ওয়াজিদ আলি শাহ থেকে বিবেকানন্দ” : আনন্দবাজার রিপোর্ট : গায়ত্রী সেন ২৬ জানুয়ারি ২০২০
------//*//------
শীতের দিনের হারানো স্মৃতি
সামসুজ জামান (কলকাতা)
রবি ঠাকুরের পংক্তি ছাড়া আমাদের গতি নেই - "শিউলি ফোটা ফুরোল যেই ফুরোলো শীতের বনে /এলে যে -- /আমার শীতের বনে এলে যে সেই শূণ্যক্ষণে।।/ তাই গোপনে সাজিয়ে ডালা দুধের স্বরে বরণমালা/ গাঁথি মনে মনে শূন্যক্ষণে। // শীত এখনো সেই অর্থে তেমন ভাবে আসেনি। আসি আসি করতে করতেই একটু বাদানুবাদ হয়েছে বোধ হয় তার নিম্নচাপের সঙ্গে। তাই আড়ি হয়ে গেছে শীতের সঙ্গে নিম্ন চাপের। এখন অবস্থাটা 'জোর যার ,মুলুক তার'। যার পেশীর জোর সে খাটাবে প্রভাব। অন্তর্জালে এইমাত্র চোখ পড়ল শীত আসার বিলম্ব সংবাদের দিকে। শোনা যাচ্ছে, একটা নিম্নচাপ জনিত কারণ দক্ষিণবঙ্গে শীতের আবহাওয়াকে একটু বিলম্বিত করছে। এই শীত আর নিম্নচাপ বড় গোলমেলে বিষয়। আর নিম্নচাপেরও কাজকর্ম নেই বোধ হয়! এমনিতেই তো বাবা এখন তুমি নানাভাবে আমাদের আবহাওয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করছো। যখন তখন থাবা বাসাচ্ছ যেখানে তোমার মর্জি। তো এই মুহূর্তে কী দরকার বাবা, শীতের আসার পথটা সুগম করার পরিবর্তে তার আসার পথে স্বাগত নৃত্য অথবা উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন না করে উল্টে বাধা সৃষ্টি করার? বলি শীত কি তোমার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল? সুতরাং আমরা হৈ হৈ করে বলতে পারবোনা-" শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে।' তবে কি না ঠিক তার পরের পংক্তিটুকু গাওয়ার জন্য প্রকৃতি একেবারে তৈরি- " পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে"।
হ্যাঁ তবে শীতের ভাবনা ভাবতে ভালোই লাগে। বিষয়টা গরম হলে হয়তো ঘাম ঝরতো কিন্তু এই কার্তিক মাসের এই দিনের প্রখর তাপে শীতের বিষয়ে ভাবতে আমাদের আপত্তি নেই। আর হ্যাঁ দেখেছেন তো রাতের দিকে একটু যেন হিমশিম ভাব অনুভব হচ্ছে না? ভোরের দিকটা ঘুম যখন প্রিয় বন্ধুর মতো আঁকড়ে ধরে তখন একটুক যেন গায়ে চাদর টাদর টেনে নিতে ইচ্ছে করছে না? অথবা সকাল বেলায় উঠে বুঝতে পারছেন ধরে ঠান্ডা লেগে গলাটা কেমন ভার ভার হয়ে গেছে! সেই হিসেবে শীতের ভাবনা ভাবতে বসলে এখন খুব একটা বাড়াবাড়ি কিছু হবে না বলেই মনে হয় অন্তত শীত আসার আগে তো অনেক রকম প্রস্তুতি নিতে হয়, এখন এই ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে কিছুটা যদি শীতের আমেজ অনুভব করা যায় তাহলে মন্দ কী? প্রবল শীত পড়ে গেলে শীতবস্ত্রের চাহিদা যেমন বেড়ে যায়, দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি ঘটে অস্বাভাবিক। সেই হিসেবে পুজো সামলানোর পর হাতে যদি কিছু অর্থমূল্য বেঁচে থাকে তবে তা দিয়ে দুটো একটা শীত বস্ত্র কিনে নিতে পারলে মন্দ কী? আর যদি পারেন সেই শীতবস্ত্র থেকে ফুটপাতের বাসিন্দা একটা দুটো মানুষকে যদি দিতে পারেন কাজ চালানো গাছের কিছু একটা। তবে পেয়ে গেলে আগামী শীতের কথা ভেবে তার চোখে জল এসে যাবে আনন্দে! আর সেই জলের ভিতরে ঝরে পড়া কৃতজ্ঞতা রাশি আপনার অন্তরটাকে ফুলে ফসলে ভরপুর করে দেবে। এটা নিশ্চিত। হোক না বন্ধু এবারের শিটটা সামান্য একটু অন্যরকম ভাবে। খুব মন্দ লাগবে কি?
শীত আসে শীত যায়। কিন্তু তার রূপ বিবর্তিত পরিবর্তিত হতে থাকে। মনে পড়ল অনেক পুরনো কথা। আমরা গ্রামের মানুষ ছোট থেকেই গ্রামের আবহাওয়ায় শীতের সঙ্গে মিলেমিশে দিন কাটিয়েছি। ওই গান মনে পড়ে কথায় কথায়- "আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"। যখন আমাদের ছোটবেলা, তখন শীত আসত অনেক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। সে শীত অনেক রোমাঞ্চ নিয়ে আসতো যেন। তার বৈভব বিলাসিতা ছিল অনেক রাজকীয়। সকালবেলা চা পর্ব মিটে যাবার পরই চট, বিছানা পেতে সূর্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে কী ভালো যে লাগতো। বই পত্র খুলে রোদ পোহাতে পোহাতে পড়াশুনো শুরু করা যেত। আমরা তো গ্রামের ছেলে মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়ানো তো আমাদের স্বভাব। জমিতে তখন আমন ধান কাটা চলছে। স্কুল ছুটি থাকলে অথবা স্কুল ছুটির পর আমরা ছোটরা ধানের শিস কুড়িয়ে বেড়াতাম। একে শীতের দাপট তার উপর রুক্ষ সূক্ষ্ম কাটা ধান গাছের গোড়ার শক্ত মাটির প্রভাবে- ছোট ছোট পা গুলো কেটে ফেটে চৌচির হয়ে যেত। ফাটা পা পরিষ্কার করতে গিয়ে মায়ের মারধর কি আর খাইনি মনে করছেন? কিন্তু সেসব কে মনে রাখে? ধান কুড়ানোর আনন্দটাই তখন অনেক বেশি। তারপর অনেকটা পরিমাণ ধান সঞ্চিত হলে সেই ধান বিক্রি করে ঘুড়ি কেনা, মেলা দেখা কত কী যে অপূর্ণ সাধ মেটাতাম! তখন শীতটাও পড়তো জমিয়ে! ঠান্ডা কনকনে সকালবেলায় মুখ থেকে ধোঁয়া বের করতে করতে খেজুরের রস পানের এবং খেজুর গুড়, পাটালি বানানোর আঘ্রান নেবার সে তৃপ্তি ভোলার নয়। নিজেদের আলুর জমি থেকে পালং শাক, মুলো ,গাজর-বীট,ধনেপাতা তুলে আনতে কী যে ভালো লাগতো। বেসরকারি এক সংস্থায় কর্মরত থাকায় বাবা সাপ্তাহিক ছুটিতে প্রতি রবিবার বিকেলে বাড়ি ফিরতেন। সোমবার দিন উনি বাড়িতে থাকতেন। শীতের দিনে ওই সোমবারে সকালবেলায় আমাদের বাড়ির পাশে বিশাল পুকুর লহলাতে যেতেন খ্যাপলা জাল কাঁধে নিয়ে। সঙ্গে একটা ছোট্ট বালতি হাতে থাকতাম আমি। বাবা জাল ফেলে লহলাতে মাছ ধরতেন। অন্যান্য মাছের সাথে বড় বড় মৌরলা মাছ খুব মন টানতো। জাল ভর্তি সেই মাছ বাবা জাল থেকে ছাড়িয়ে মাটিতে ফেলতেন আর আমি বালতিতে ভরতাম। তারপর বাড়ি ফিরে নিজেদেরই জমি থেকে পেঁয়াজ পাতা ছিঁড়ে কেটে এনে দেবার পর মায়ের হাতের সেই মাছ রান্না যে কী অপূর্ব তৃপ্তি দিত তা বলে বোঝানোর মত নয়। এবং তা আজও যেন জিভে মনে লেগে আছে!
কনকনে শীতের রাতে দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসা ধান পাহারাদার দের হৈ হৈ চিৎকার আর তার সঙ্গে শিয়ালের হুক্কা হুয়া একটা অন্য জগৎ তৈরি করে দিত। ওই সময়ই মাঠ থেকে পেকে যাওয়া আমন ধান তুলে এনে খামারে জড়ো করে রাখা হতো। সেই ধানের আঁটি দিয়ে ই কুঁড়েঘর বানানো হতো অস্থায়ী ভাবে। রাতে পাছে ধান চুরি না হয়ে যায়। চাঁদনী আলোয় আমরা সন্ধ্যে-রাতে সেই কুঁড়েঘরের মধ্যে বসতাম অথবা ২-৪ জন ছেলেপিলে মিলে লুকোচুরি খেলতাম। আরো একটু বয়স যখন বেড়ে গেছে তখন শীতের দিনে পাড়ার কয়েকজন মিলেজুলে মাঝে মাঝে হতো ফিস্ট। আর শীতের প্রধান আকর্ষণ ছিল সার্কাস। সেসব দিনের সে আনন্দই ছিল একেবারে অন্যরকমের- একেবারে নিখাদ পরিতৃপ্তির।
আর মেয়েদের স্বভাব তো চিরদিন মানুষকে খাইয়ে মন ভোলানো। এতেই তাদের তৃপ্তি। মা মাসি পিসি দিদি বোনেরা তোড় জোর করে আতপ চাল ভিজিয়ে ঢেঁকিতে কোটার কি বাহার। দুপুরের ভাত খাওয়ার সাথে সাথেই তারা ঢেঁকি সালে ছুটতেন। সে একেবারে উৎসবের মেজাজ। শীত জুড়ে নানা রকমের পিঠেপুলি পায়েস ইত্যাদি ইত্যাদি বানিয়ে মানুষকে খাওয়ানোর সে আনন্দে তারা সকলেই এক একটা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। তখন বেশিরভাগ মুসলিম পরিবারে হতো ধুকি তৈরি। শুনে চমকে যাবেন না। ভাববেন না সে আবার কি জিনিস। এখন আপনি রাস্তাঘাটে অনেক জায়গায় দেখতে পান চালের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ভাপা পিঠে। সেটা তখন প্রায় মুসলিম পরিবারের একচেটিয়া সম্পদ ছিল। উনুনে বসানো হতো মাটির ভার তাতে ফুটতো জল আর একটা চিনামাটির বাটিতে চাল গুঁড়ি ভরে তার মুখে সাদা কাপড় বেঁধে উপুড় করে দেয়া হতো সেই ভাঁড়ের মুখে।শীতের রাত্রে মা দিদিরা উনুনের ধারে বসে যেত সেই ধুকি বানাতে। আর আমরা একান্নবর্তী পরিবারের ছেলেমেয়ের গোল হয়ে বসে যেতাম উনুনের আছে আগুন পোহাতে। প্রবাদ ছিল যখন ধুকি তৈরি হচ্ছে তখন যদি দুষ্টু মতলবধধারী কারো ছায়া পড়ে কিংবা এই ছড়াটা বলা যায়- "ধুকি ফুকফুকি, ধুকির মাথায় ছায়। ধুকি ভস্ম হয়ে যায়" - তাহলে নাকি ধুকি সত্যি সত্যি নষ্ট হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সে ধুকি যেতো নষ্ট হয়ে যেত কোন না কোন কারনে। তখন সকলে বলাবলি করত- এই ছেলেমেয়েরা ঠিক কেউ আউড়েছে ওই ছড়াটা। সে যাই হোক। তখন তো সকলের সঙ্গে সকলের সদ্ভাব ছিল অনেক বেশি তাই যেদিন কোন বাড়িতে ধুকি বানানো হবে, আশেপাশের বাড়িতে বলে দেয়া হতো- 'রাত্রে আমরা ধুঁকি দেব'। তাহলে সেই বাড়ি রাতের রান্নার চাল কম করে নেবে, কারণ সকলেই দুটো একটা করে ধুকি ভাগ পাবেন। ধুকি হয়ে গেলেই এ বাড়ি ও বাড়ি দিতে যেতাম আমরা । ধুকি খাওয়ার জন্য সঙ্গে থাকতো খেজুর গুড়। কখনো সখনো ধুকি বানানোর পূর্বে ভিতরে খেজুর গুড়ের পাটালি কিংবা চিনি ছড়িয়ে দেওয়াও হতো। এক আধ জন আবার ধুকি, মাংসের ঝোল দিয়ে খাওয়াও পছন্দ করতেন। যেদিন নিজেদের বাড়িতে ধুকি হত না অথচ শুনেছি পাশের কোন বাড়ি থেকে ধুঁকি দিতে আসবে সেদিন পড়াশোনায় মন বসত না। বুবুক্ষ চোখে আমরা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে এদিক-ওদিক চেয়ে দেখতাম কখন আসবে ও বাড়ি থেকে ধুকি। আর এসে যদি গেল তাহলে তো পড়াশোনার থেকে অনেক বেশি দামি- গরম গরম ধুকি। সুতরাং সময়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য আমরা তৈরি থাকতাম। অবশ্যই ধুকি গরম গরম খেতে ভালো লাগতো বলে বাড়ি থেকেও খুব একটা আপত্তি হতো না সে বিষয়ে।
এখনো তো শীত আসে। শীত এলে আমরা গেয়ে উঠি- "এলো যে শীতের বেলা বরষ-পরে।/ এবার ফসল কাটো লও গো ঘরে।।/" ফসল ঘরে আসার আনন্দ হয়তো আমাদের হয় কিন্তু আজকের ছেলেমেয়েরা শীতের আনন্দে তো কোনোভাবেই মাতোয়ারা হয় না। তাদের আনন্দ গেল কোথায়? আজ সার্কাস প্রায় হারিয়ে গেছে। আজকের মেলাও তেমন ভাবে জমে না। হ্যাঁ ছেলেরা শীতের দিনে ক্রিকেট খেলে কিছুটা। তবে খেজুর গুড়ের গন্ধটাও তেমন ভাবে পাওয়া যায় না । খেজুর রস, গাছ থেকে নামার আগেই কৃত্রিমভাবে বানানো পাটালিতে বাজার ছেয়ে যায়। চারিদিকের দূষিত পরিবেশে দিনদুপুরে কুয়াশায় ভ'রে থাকে শীতের আকাশ। তাই শীত এলে মনে হাহাকারের যন্ত্রণা জেগে ওঠে। নস্টালজিক অনুভূতিতে মন সেই গান গাইতে থাকে- 'ফেলে আসা দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে'।
------//*//------