বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

বর্ষশেষের কবিতা

শিরোনাম : বর্ষশেষে
কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

ইংরেজি বছরের শেষ বিকেল,
ঘড়ির কাঁটায় ধুলো জমেছে-
সময় যেন আজ একটু ধীরে হাঁটে,
আমার না বলা কথাগুলোর পাশে পাশে।

ক্যালেন্ডারের শেষ পাতায়
অসংখ্য ভুলের দাগ,
কিছু স্বপ্ন অপঠিত চিঠির মতো
ড্রয়ারে মুখ লুকিয়ে আছে আজও।

এই বছরে আমি কতবার ভেঙেছি,
কতবার হেসে উঠেছি অকারণে-
জয়-পরাজয়ের হিসেব রাখিনি,
শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছি চুপচাপ।

বন্ধুদের কণ্ঠস্বর পাতলা হয়েছে,
কিছু মানুষ হারিয়ে গেছে নীরবে-
ঠিক যেমন সন্ধেবেলায়
রোদ হারিয়ে যায় আকাশের ভাঁজে।

তবু বর্ষশেষ মানে শেষ নয়,
এটা একরকম দাঁড়িয়ে পড়া-
পেছনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নেওয়া,
আর সামনে নতুন করে হাঁটার সাহস।

আমি এই বছরের কাছে
কোনো অভিযোগ রাখি না,
যা দিয়েছে - তা স্মৃতি,
যা নেয়নি - তা এখনো আশা।

রাত নামছে,
শেষ দিনের আকাশে আলো ফুরোচ্ছে -
আমি নিজের সঙ্গেই বলি,
চল, আবার একবার জীবন শুরু করি।

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

লেখক পরিচিতি : শব্দের ভেতর মানুষের খোঁজে — পিনাকী রঞ্জন পাল

লেখক পরিচিতি
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চলমান স্রোতে যাঁরা নীরবে, কিন্তু দৃঢ়তায় নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন, পিনাকী রঞ্জন পাল তাঁদের অন্যতম। গল্প, কবিতা, শিশু সাহিত্য, লোককথা কিংবা রহস্য–রোমাঞ্চ— নানা ঘরানায় সমান স্বচ্ছন্দ এই লেখক মূলত পরিচিত তাঁর সহজ ভাষায় গভীর কথা বলার ক্ষমতার জন্য। শব্দের কারুকার্যের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন অনুভবকে; তাই তাঁর লেখা দ্রুত পৌঁছে যায় পাঠকের মনের কাছে।

জলপাইগুড়ির পূর্ব অরবিন্দ নগরের বাসিন্দা পিনাকী রঞ্জন পাল পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা— এই দুই ধারাকে সমান্তরালভাবে বহন করে চলেছেন দীর্ঘদিন। শহর ও মফস্বলের পাঠক— উভয় শ্রেণির কাছেই তাঁর লেখার গ্রহণযোগ্যতা সমান। এর কারণ, তাঁর গল্পে শহুরে বাস্তবতার পাশাপাশি রয়েছে গ্রামীণ লোকজ জীবনের গন্ধ, আছে মানুষের দৈনন্দিন সুখ–দুঃখের চেনা ছবি।

লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। উত্তরবঙ্গ সংবাদ এবং দৈনিক বসুমতী পত্রিকায় একসময় নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। বর্তমানে তিনি “জলপাইগুড়ি নিউজ” নামের একটি সংবাদমাধ্যম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত— যা ফেসবুক, ইউটিউব এবং ওয়েবসাইট— এই তিনটি মাধ্যমেই সক্রিয়। সাংবাদিকতার এই বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে দিয়েছে দৃঢ়তা, সংযম এবং তথ্যভিত্তিক সচেতনতা, যা সাহিত্যিক লেখাতেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে।

পিনাকী রঞ্জন পালের লেখালেখির জগৎ বহুমাত্রিক। কবিতা থেকে শুরু করে শিশু–কিশোর গল্প, লোককথা ও উপকথার পুনর্গঠন, সামাজিক গল্প, মনস্তাত্ত্বিক রহস্য, ভৌতিক ও থ্রিলার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। বিশেষ করে শিশু সাহিত্যে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর গল্পে নৈতিক বার্তা থাকলেও তা কখনোই উপদেশের ভারে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে না। বরং গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহেই শিক্ষার বীজটি রোপিত হয়।

ভাষা ব্যবহারে তিনি সহজ-সরল, কিন্তু প্রাণবন্ত। অতিরিক্ত জটিলতা বা দুর্বোধ্যতার প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। চরিত্রের আবেগময় বিকাশ, সংলাপের স্বাভাবিকতা এবং পরিস্থিতির বিশ্বাসযোগ্য নির্মাণ— এই তিনটি বিষয় তাঁর লেখার প্রধান শক্তি। ফলে তাঁর গল্পে পাঠক নিজেকে সহজেই খুঁজে পান।

প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে আঁকড়ে ধরা বারণ (কাব্যগ্রন্থ), শেষ রাতের ডাক (অনুগল্প সংকলন), ষোড়শ রঙের গল্প ভুবন (কিশোর গল্প সংকলন) এবং লোককথা উপকথা— দেশ–বিদেশের লোককথার সংকলন। প্রতিটি বই-ই আলাদা স্বাদের, আলাদা পাঠকগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত, তবু সব কটির মধ্যেই বিদ্যমান লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও রয়েছে বিস্তৃত সাহিত্যকর্ম। ইতিহাসভিত্তিক জল্পনায় জলপাইগুড়ি, একাধিক ভৌতিক গল্প সংকলন ও উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, সিনেমা ও ক্রীড়া–ক্রাইম থ্রিলার, এমনকি ঐতিহাসিক রহস্য উপন্যাস ও গোয়েন্দা কাহিনির মতো বৈচিত্র্যময় কাজের প্রস্তুতি তাঁর সৃজনশীলতার ব্যাপ্তিকে স্পষ্ট করে।

পাঠক ও সমালোচকদের চোখে পিনাকী রঞ্জন পাল এমন একজন লেখক, যিনি মানুষের আবেগ, নৈতিক মূল্যবোধ ও সমাজের বাস্তবতাকে গল্পের ভেতর নিঃশব্দে তুলে ধরতে পারেন। তাঁর লেখায় থাকে শৈশবের স্মৃতি, অজানা রহস্যের টান, আবার কখনো সম্পর্কের সূক্ষ্ম মানসিক টানাপোড়েন।

নিজের লেখালেখি সম্পর্কে তিনি বলেন— “গল্প লিখি মানুষের সুখ–দুঃখ, আশা–নিরাশা আর স্বপ্নের আলো ছড়িয়ে দিতে। পাঠকের হাসি, বিস্ময় আর ভাবনাই আমার লেখার সর্বোচ্চ পুরস্কার।”


এই বক্তব্যই আসলে তাঁর সাহিত্যভাবনার মূল সুর।

যোগাযোগ

লেখক পিনাকী রঞ্জন পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে—
📍 ঠিকানা : পূর্ব অরবিন্দ নগর, জলপাইগুড়ি – ৭৩৫১০১
📧 ই-মেইল : pinakiranjanpaulwriter@gmail.com
📞 মোবাইল : ৯০৬৪১৪৩৬২৭

গ্রন্থ আলোচনা : আঁকড়ে ধরা বারণ - এক আন্তরিক আশ্রয়।

গ্রন্থ আলোচনা : আঁকড়ে ধরা বারণ
কবি : পিনাকী রঞ্জন পাল
প্রকাশক : নীরব আলো প্রকাশন

কবিতা অনেক সময় উচ্চস্বরে কথা বলে না। সে ফিসফিস করে, থেমে থেমে শ্বাস নেয়, নীরবতার ফাঁকে নিজের কথা গুঁজে দেয়। পিনাকী রঞ্জন পালের প্রথম কবিতার বই আঁকড়ে ধরা বারণ ঠিক সেই ধরনেরই এক সংবেদনশীল কাব্যসংকলন— যেখানে শব্দ নয়, অনুভবই মুখ্য; উচ্চারণ নয়, উপলব্ধিই শেষ কথা।

এই বইয়ের কবিতাগুলো জীবনকে কোনো একরৈখিক আলোয় দেখায় না। এখানে জীবন একটি ম্লান জ্যোৎস্না— যেখানে সুখ ও দুঃখ, প্রেম ও বিরহ, আশা ও হতাশা একে অপরের মধ্যে মিশে থাকে। কবি খুব সচেতনভাবেই চরম আবেগে যান না, আবার নিস্তরঙ্গ নির্লিপ্ততাতেও ডুবে থাকেন না। বরং তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন ঠিক মাঝখানে— যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়ে ওঠে।

বই কিনুন 

আঁকড়ে ধরা বারণ-এর কবিতাগুলোর মূল সুর হলো অনিত্যতা। সময় এখানে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টোনো নয়; সময় একটি নদী, যেখানে মানুষ ভাসে, কখনো ডুবে যায়, কখনো তীরে উঠতে চায়। “একাকী ঘড়ির টিকটিক”, “অবসন্ন রাতের নিঃশ্বাস”, “বালুকাবেলায় লেখা অদৃশ্য চিঠি”— এইসব চিত্রকল্পে কবি সময়ের নির্দয় অথচ নীরব উপস্থিতিকে ধরেছেন অত্যন্ত মৃদু অথচ তীক্ষ্ণ ভাষায়।

এই সংকলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিগত বেদনা থেকে সমষ্টিগত অনুভবের দিকে যাত্রা। কোথাও কবিতা নিছক ব্যক্তিগত যন্ত্রণার দলিল হয়ে ওঠে না; বরং সেই যন্ত্রণা ধীরে ধীরে পাঠকের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। হারানো ভালোবাসা, অপূর্ণ সম্পর্ক, অনুক্ত আকাঙ্ক্ষা— সবই এখানে আছে, কিন্তু সেগুলো আত্মকেন্দ্রিক নয়। বরং সেগুলো আমাদের চেনা জীবনেরই প্রতিধ্বনি।
নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্মম সত্য কিংবা প্রকৃতির নিস্তব্ধ সৌন্দর্য— এই বইয়ে আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে আসে না। বরং এগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কবির চোখে প্রকৃতি কখনো আশ্রয়, কখনো সাক্ষী, কখনো আবার নিঃশব্দ প্রতিবাদ। ফলে কবিতাগুলোতে দৃশ্যমান প্রকৃতির পাশাপাশি একটি অভ্যন্তরীণ ভূগোলও তৈরি হয়।

ভাষার দিক থেকে পিনাকী রঞ্জন পাল সংযত ও স্পষ্ট। অতিরিক্ত অলংকার বা দুর্বোধ্য শব্দচর্চার প্রতি তার কোনো মোহ নেই। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তার ভাষাকে দিয়েছে স্বচ্ছতা, আর কবিসত্তা দিয়েছে গভীরতা। ছোট ছোট পঙ্‌ক্তিতে, কখনো প্রায় গদ্যের কাছাকাছি এসে তিনি এমন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা পাঠককে থামিয়ে দেয়— “আমরা কি সত্যিই বেঁচে থাকি, নাকি শুধু সময়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলি?”

এই প্রশ্নই আসলে বইটির মেরুদণ্ড। আঁকড়ে ধরা বারণ কোনো ঘোষণা-পত্র নয়, কোনো উচ্চকিত প্রতিবাদও নয়। এটি এক ধরনের আত্মসমীক্ষা— যেখানে আঁকড়ে ধরার অভ্যাসকে প্রশ্ন করা হয়। ভালোবাসা, স্মৃতি, যন্ত্রণা— সবকিছুকেই কি আঁকড়ে ধরতে হবে? নাকি ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও আছে মুক্তি?

প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে এই বই কবির সততা ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়। এখানে পরিণত কবির ভারী আত্মবিশ্বাস নেই, আছে এক ধরনের নগ্ন সত্যবাদিতা, যা পাঠককে কাছাকাছি টেনে আনে। বইয়ের পাতায় পাতায় পাঠক নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতে পারেন— কখনো উদাসী, কখনো ক্ষতবিক্ষত, কখনো নিঃশব্দ ভালোবাসায় ভরা।

স্বল্পমূল্যের এই কাব্যগ্রন্থটি প্রমাণ করে, কবিতা আজও মানুষের একাকীত্বের ভাষা হতে পারে। যারা চিৎকার নয়, নীরবতার কবিতা পড়তে ভালোবাসেন— আঁকড়ে ধরা বারণ তাদের জন্য এক আন্তরিক আশ্রয়। নদী যেমন নিঃশব্দে সাগরে মেশে, তেমনি এই কবিতাগুলোও ধীরে ধীরে পাঠকের মনে মিশে যায়— থেকে যায় অনেকক্ষণ।


গ্রন্থ আলোচনা : শেষ রাতের ডাক - এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়

গ্রন্থ আলোচনা : শেষ রাতের ডাক
লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল
প্রকাশক : ইলশেগুঁড়ি প্রকাশন

রাত সবসময় নিঃশব্দ নয়— কিছু রাত কথা বলে। কিছু রাত ডাকে। সেই ডাক কখনো স্মৃতির, কখনো অপরাধবোধের, কখনো বা এমন এক অজানা শূন্যতার, যার নাম দেওয়া যায় না। পিনাকী রঞ্জন পালের অনুগল্প সংকলন শেষ রাতের ডাক ঠিক সেই অদ্ভুত সময়েরই সাহিত্যিক দলিল, যেখানে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের মুখোমুখি হয়।

এই বইয়ের দশটি অনুগল্প যেন দশটি আলাদা জানালা— প্রত্যেকটির বাইরে আলাদা দৃশ্য, আলাদা অন্ধকার। কিন্তু সব জানালার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে একই ধরনের হিমেল হাওয়া— নিঃসঙ্গতা, ভয়, অনিশ্চয়তা আর অব্যক্ত প্রশ্ন। লেখক খুব সচেতনভাবেই গল্পগুলোকে অতিরিক্ত ঘটনার ভারে চাপিয়ে দেননি। বরং সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যেই তিনি তৈরি করেছেন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ, যা গল্প শেষ হওয়ার পরও পাঠকের সঙ্গে থেকে যায়।

পিনাকী রঞ্জন পালের গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার নীরবতা। এখানে চিৎকার নেই, নেই রক্তাক্ত নাটকীয়তা। ভয় আসে ধীরে, প্রায় অদৃশ্য পায়ে হেঁটে। কোনো গল্পে হয়তো একটি রাত, কোনো গল্পে একটি ডাক, কোনো গল্পে একটি স্মৃতি— এই সামান্য উপাদান থেকেই তৈরি হয় গভীর অস্বস্তি। লেখক বোঝাতে চান, ভয় সবসময় বাইরে থাকে না; অনেক সময় তা আমাদের ভেতরেই জমে ওঠে।

এই সংকলনের গল্পগুলোর মধ্যে অলৌকিকতার ছোঁয়া থাকলেও সেগুলো কখনোই মুখ্য হয়ে ওঠে না। বরং অলৌকিক এখানে এক ধরনের অনুষঙ্গ, যা বাস্তব জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ে। অতীতের কোনো ভুল, অমীমাংসিত সম্পর্ক, অপরাধবোধ বা হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষ— এসবই গল্পগুলোর আসল ভূত। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, এখানে অন্ধকার মানে শুধু আলোহীনতা নয়; অন্ধকার মানে অনুচ্চারিত সত্য।

ভাষার দিক থেকে বইটি সংযত ও পরিমিত। কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকার নেই, আবার শুষ্কতাও নেই। লেখকের সাংবাদিক সত্তা ভাষাকে দিয়েছে স্পষ্টতা, আর সাহিত্যিক মন দিয়েছে আবেশ। ছোট ছোট বাক্যে, সংলাপের ফাঁকে, বর্ণনার ছায়ায় তিনি তৈরি করেন এক ধরনের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য, যা অনুগল্পের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।

এই বইয়ের গল্পগুলো এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়— কিন্তু তার রেশ সহজে কাটে না। শেষ গল্প শেষ হওয়ার পর পাঠকের মনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়, সেগুলোই এই সংকলনের আসল সাফল্য। আমরা কি সত্যিই আমাদের চারপাশকে চিনি? রাত নামলে কি আমাদের পরিচিত মানুষগুলো একই থাকে? নাকি অন্ধকার তাদের মুখোশ খুলে দেয়?

শেষ রাতের ডাক কোনো প্রচলিত ভৌতিক গল্পের বই নয়। এটি বেশি করে একটি মানসিক অনুসন্ধান— যেখানে ভয়, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যারা চমক নয়, বরং ধীরে ধীরে জমে ওঠা অস্বস্তি পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বই নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।

স্বল্পমূল্যের এই ছোট সংকলনটি প্রমাণ করে, সাহিত্যিক গভীরতার জন্য পৃষ্ঠাসংখ্যা বা আড়ম্বর জরুরি নয়। প্রয়োজন সংবেদনশীল চোখ ও সতর্ক কলম— যা পিনাকী রঞ্জন পালের লেখায় স্পষ্টভাবে উপস্থিত। শেষ রাতের ডাক সেই পাঠকদের জন্য, যারা জানেন— কিছু ডাক কানে শোনা যায় না, তবু সারা জীবন মনে বাজতে থাকে।


গ্রন্থ আলোচনা : লোককথা উপকথা - সাংস্কৃতিক ভ্রমণের অনুভব।


গ্রন্থ আলোচনা : লোককথা উপকথা
সংকলক : পিনাকী রঞ্জন পাল
প্রকাশক : শহরতলী প্রকাশনী

গল্প মানুষের প্রথম ভাষা। সভ্যতার সূচনালগ্নে আগুনের পাশে বসে যে কথকতার জন্ম, তা আজও বদলায়নি— শুধু তার রূপ বদলেছে। সেই চিরন্তন গল্পধারার এক আন্তরিক, মননশীল সংকলন হলো পিনাকী রঞ্জন পাল সম্পাদিত লোককথা উপকথা। ছোটদের জন্য নির্মিত হলেও এই বইয়ের আবেদন কেবল বয়সের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছেও এটি এক ধরনের স্মৃতির ফেরার পথ, শৈশবের গল্পশোনার দিনগুলোর কাছে ফিরে যাওয়া।


এই সংকলনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বৈচিত্র্য। গ্রীস থেকে আফ্রিকা, তিব্বত থেকে জাপান, চীন থেকে রাজস্থান— নানা দেশ, নানা সংস্কৃতি, নানা জীবনদর্শনের গল্প এখানে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও গল্পগুলোর অন্তর্গত সুর একটাই— মানবিকতা, বুদ্ধি, লোভ-সংযম, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব এবং জীবনের সহজ অথচ গভীর শিক্ষা। এই জায়গাতেই লোককথার সার্বজনীনতা ধরা পড়ে, আর সংকলকের নির্বাচন-দৃষ্টি প্রশংসার দাবিদার হয়।


গল্পগুলোর ভাষা সহজ, সাবলীল এবং শিশুমনের উপযোগী। কোথাও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা নেই, আবার অতিরিক্ত সরলীকরণের ফলে গল্পের গভীরতাও নষ্ট হয়নি। যেমন ‘লোভী কালু কাক’ বা ‘টিকটিকির শয়তানি’ গল্পে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে লোভ ও ধূর্ততার পরিণতি, আবার ‘তিনটি প্রশ্ন’ কিংবা ‘সামীর দীক্ষা’র মতো গল্পে পাওয়া যায় আত্মজিজ্ঞাসা ও নৈতিক বোধের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ছোটদের কাছে এগুলো গল্প, কিন্তু অজান্তেই তা হয়ে ওঠে জীবনপাঠ।

সংকলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সাংস্কৃতিক ভ্রমণের অনুভব। প্রতিটি গল্প যেন একটি জানালা— যার ভেতর দিয়ে শিশুরা উঁকি দেয় ভিন্ন দেশের জীবন, বিশ্বাস ও সমাজব্যবস্থার দিকে। ‘সর্পগন্ধা নদীর সেতু’ বা ‘দ্য উইলো ট্রি’ র গোপন কথা’ পড়তে পড়তে কেবল কাহিনি নয়, একটি ভিন্ন ভূগোল ও সংস্কৃতির গন্ধও পাঠক অনুভব করেন। বর্তমান সময়ের একরৈখিক ডিজিটাল বিনোদনের যুগে এই ধরনের সাহিত্যিক ভ্রমণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।


পিনাকী রঞ্জন পালের সম্পাদকসত্তা এখানে স্পষ্ট। তিনি গল্পগুলোকে কেবল সংগ্রহ করেননি, বরং শিশু-কিশোর পাঠকের মানসিকতা মাথায় রেখে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বিন্যাস তৈরি করেছেন। সূচিপত্র দেখলেই বোঝা যায়, কাহিনির ওঠানামা, বিষয়বৈচিত্র্য ও পাঠের ছন্দ— সবকিছুর প্রতিই যত্নশীল দৃষ্টি রাখা হয়েছে। ফলে বইটি শুরু করলে মাঝপথে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে না।

এই গ্রন্থের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো এর নৈতিক শিক্ষার ধরন। এখানে কোথাও উপদেশ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। গল্প নিজেই তার কথা বলে। ঠগরাজ ভুজ্জা, গপলু বা পাও— এই চরিত্রগুলো শিশুমনে সহজেই জায়গা করে নেয়, এবং তাদের কাজকর্মের মাধ্যমেই শিক্ষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পৌঁছে যায়। এটাই ভালো শিশু সাহিত্যের লক্ষণ।

সব মিলিয়ে লোককথা উপকথা কেবল একটি গল্পসংকলন নয়; এটি ছোটদের কল্পনা, বোধ ও মূল্যবোধ গঠনের এক সহৃদয় প্রয়াস। অভিভাবক, শিক্ষক ও গ্রন্থাগারের জন্য এই বই একটি নির্ভরযোগ্য সংযোজন। আর যারা বিশ্বাস করেন— গল্পই মানুষের প্রথম পাঠশালা— তাদের জন্য এই বই নিঃসন্দেহে এক আনন্দের আশ্রয়।

চলো তবে, সত্যিই গল্পলোকে ঘুরে আসা যাক।

রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

সাহিত্যের আলো শীত সংখ্যা ১৪৩২ (বড় গল্প)


সুচিপত্র : 

১/ আলো ফুরিয়ে যায় - সুমিতা চৌধুরী (কলকাতা)
২/ সন্ন্যাসী শিপুখুড়ো - উত্তম চক্রবর্ত্তী (কলকাতা)
৩/ উৎসর্গ - তপন  তরফদার (খড়্গপুর)
৪/ পরিযায়ী - অভিজিৎ সেন (কোচবিহার)

------//*//------


আলো ফুরিয়ে যায় 
সুমিতা চৌধুরী (কলকাতা)

" তিয়াসা....আ, তিয়াসা..আ..আ"...বাবানের ডাক টা যেন কোন মহা সিন্ধুর ওপার থেকে ভেসে আসে। ডাক টা অনুসরণ করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে তিয়াসা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রকান্ড এক ঢেউ তাকে মোচার খোলার মত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আজ প্রকৃতি ধ্বংস লীলায় মেতেছে। চতুর্দিকে যেন রণ দুন্দুভি বেজে উঠেছে। ঝলসে ওঠা বিদ্যুতে উন্মত্ত রোষের আগুন। " তিয়াসা...আ, কোথায় তুই? আমি যে ডুবে যাচ্ছি!...."

" আসছি...ই ই ই"

" মা, মা, ওমা....আ" 

নরম, উষ্ণ হাতের স্পর্শে অনেক কষ্টে চোখ খোলে তিয়াসা। ঘন, কোঁকড়া চুলে ঘেরা কচি মিষ্টি মুখ খানা তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। 

" অনেক বেলা হল যে, মা.."

 ধড়মড় করে উঠে বসে তিয়াসা। স্বপ্নের ঘোর এখনও দু চোখে লেগে রয়েছে। বাবানের সেই আকুল ডাক মাথার মধ্যে যেন হাতুড়ি পিটছে! সত্যি ই তো, সূর্য দেব বেশ কটমট করে তাকাচ্ছে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। সব কিছু এখন ঝড়ের বেগে সারতে হবে। সময় নেই, হাতে এখন একদম সময় নেই.....

এখন মধ্য দুপুর। এই সময় টা তার একান্ত নিজস্ব। এমনি তেই তিস্তা আর গৌতম বেরিয়ে গেলে সারা বাড়িতে যেন তালা পড়ে যায়। আজ সমস্ত কাজ সে যন্ত্রের মতো সেরেছে, অন্যমনস্কতার জন্য কাজে ভুল, ভ্রান্তি ও হয়েছে। এ নিয়ে দু কথা শোনাতে ছাড়ে নি গৌতম। এমনি তে তার বর খুব প্র্যাকটিকাল, ডিসিপ্লিনড মানুষ। দৈনন্দিন কাজে গাফিলতি একদম বরদাস্ত করে না। কিন্তু আজ যে খেলা ভাঙার খেলা....

অনেক দূর থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসে ।কি করুণ আর্তি সেই সুরে! আনমনা হয়ে পড়ে তিয়াসা।ঠিক হ্যামলিন দাদুর মতো, যে তার শৈশবের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। এই হ্যামলিন নাম টা বাবানের দেওয়া, রোজ বিকেলে দাদু বাঁশি বাজাতে শুরু করলে সব ছেলে মেয়ে তাকে ঘিরে ভিড় করত। বাজানো শেষে তিয়াসার হাত থেকে চাল, ডাল, আলু আর জল বাতাসা নিয়ে ধাপিতে বসে কত গল্প করতো দাদু! সুন্দর বনের কোন প্রত্যন্ত গ্রামে দাদুর বাড়ি, সে একেবারে ছবির মতো সুন্দর, পাশ দিয়ে বয়ে চলত মাতলা নদী। কিন্তু এক ভয়াবহ বন্যায় তাদের ঘর বাড়ি সব ভেসে যায়। সেই থেকে দাদু দের পুরো পরিবার ছন্ন ছাড়া। শুনে খুব খারাপ লাগত তিয়াসার। আহা রে! তার পয়সা হলে সে ওইরকম নদীর পাড়ে একটা সুন্দর বাসা বানিয়ে দেবে দাদু কে। 


তীব্র হর্নের আওয়াজে ঘোর ভাঙে তিয়াসার ।তিস্তার বাস আসার সময় হলো নাকি? কিন্তু এখন তো মোটে দুপুর তিনটে! ঘরে ঢুকে তাক থেকে গীতবিতান পেড়ে নেয়। মন খারাপ থাকলে সে এই বই খুলে বসে ।একটার পর একটা পাতা উল্টে যায়।বই এর ঠিক বাষট্টি নম্বর পাতায় বাবানের ছবি টা রাখা। কালো কোঁকড়ানো চুল আর দুই উজ্জ্বল চোখের বাবান! কপালের কাছে এক টা ছোট্ট কাটা দাগ। একবার বাড়ির উঠোনে পড়ে গিয়ে প্রচুর রক্ত পাত হয়েছিল, হাসপাতালে নিয়ে সেলাই দিতে হয়েছিল! সাদায় সবুজে মেশানো বাবান দের বাড়ি টাও অবিকল স্মৃতি তে ধরা আছে। সেই বাড়ির বাগান সব চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত তিয়াসা কে।কত দিন সেই বাগানে লুকোচুরি খেলেছে তারা!

দূরে কোন বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসে " শূন্য এ বুকে, পাখি মোর আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয় "

কি ভয়াবহ শূন্যতা আর হাহাকার গানের মধ্যে! যার হয়, সেই শুধু উপলব্ধি করে। আবার তিয়াসা ভাবে, সেই শূন্যতার মাঝেও তো জমে থাকে, কত মধুর স্মৃতি , কত অর্থহীন কথোপকথন! সেই শূন্যতা কোনোদিন পূর্ণ হয় না, শুধু রেখে যায় সর্ব গ্রাসী এক একাকীত্ব!


" তোকে খুব সুন্দর একটা নদী কিনে দেবো। নদীতে বাঁধা থাকবে আমাদের ডিঙি নৌকো..আমরা সেই নৌকো তে শুয়ে আকাশ দেখব।" 

" ধ্যাৎ, মোটেই না" প্রতিবাদ করে তিয়াসা। " নদীর পাড়ে খুব সুন্দর বাড়ি থাকবে আমাদের, সেখানে হ্যামলিন দাদু কে নিয়ে আসব। পূর্ণিমার রাতে চাঁদনি আলোয় বসে দাদুর বাঁশি শুনব।" 

সন্ধ্যে বেলা একসাথে টিউশন থেকে ফেরার পথে এমনি হাজারো পরিকল্পনা! কখনো পাল পাড়ার ছোট্টো পুকুর পাড়ে তারা শুধু হাতে হাত ছুঁয়ে বসে থাকতো। তার মধ্যেই কত না বলা কথা বলা হয়ে যেত! বাড়ি ফিরে ও সেই ফাঁকা, যেন কেউ কোথাও নেই! পড়তে বসে ইংরেজী বই এর পাতায় বাবানের মুখ! সেই রকমই দুষ্টুমি ভরা চাউনি আর উপরের ঠোঁট টা টিপে হাসা। বসে বসে পড়া ফেলে সেই মুখ স্কেচ করত তিয়াসা। আচ্ছা, বাবান কে ছেড়ে সে থাকবে কিভাবে?


শীতের দুপুর গুলো বরাবরই না পসন্দ তিয়াসার। কি তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে! টেবিলের ওপর গাদা খানেক গ্রিটিংস কার্ড, রং আর পেন্সিল নিয়ে হিমশিম অবস্থা তিয়াসার। প্রতিবারই নিউ ইয়ারের কার্ড সে নিজে হাতে এঁকে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় দের পাঠায়। এবার বাবান কেও একটা কার্ড পাঠাবে কলকাতার ঠিকানায়। ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে গ্যাছে সে, যাবার আগে ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব দিয়ে গেছে। লিখতে লিখতে বাইরে তাকায় তিয়াসা। পড়ন্ত আলোয় পাখিরা সব ঘরে ফিরছে। আহা! তার যদি এমন ডানা থাকতো! তাহলে এক্ষুনি উড়ে যেত বাবানের কাছে। এখনও আরো পনের দিন বাবানের ফিরে আসার! নিঃশব্দ ঘরে এই সময়েই দেয়ালে লাগানো ফোন টা বেজে ওঠে । ও প্রান্তে বাবানের মাসতুতো বোন রিনি।কলকাতায় থাকে  এখানেও কয়েকবার এসেছে।

" কি রিনি কেমন আছো?" লিখতে লিখতেই জিজ্ঞেস করে তিয়াসা। ও প্রান্তে রিনির গলা শোনা যায় না, শুধু চাপা কান্নার শব্দ। ' কি হয়েছে রিনি?" বুক টা কেঁপে ওঠে ভয়ে। 

" বাবান আর নেই গো" কান্নায় গলা বুঁজে আসে রিনির। " আর নেই? " কোথাও শুনতে ভুল হচ্ছে কি? " দাদা রোজকার মত আজও সুইমিং পুলে গেছিল। অনেক ক্ষণ ফিরছে না, আমরা চিন্তা করছিলাম..সেই সময়ে দুটো ছেলে এসে..দুপুরের পর ডেড বডি খুঁজে পেলো...তুমি তো জানো, দাদা কত ভাল সুইমার ছিল! কত প্রাইজ! আজ দাদার শরীর টা ভালো ছিল না, আমি বারণ করেছিলাম..." শেষ দিকে রিনির কথা গুলো আর শোনা যাচ্ছিল না, হয়তো বা তিয়াসার কানেই কিছু ঢুকছিল না.....


অকাল বর্ষণের পর আজ হঠাৎ বেশ ঠান্ডা পড়েছে। সকাল থেকে চলছে শীত আর রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। গায়ের চাদর টা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বাগানে এসে দাঁড়ায় তিয়াসা। নিজের যত্নে গড়া তার এই বাগান! গন্ধরাজ ফুল খুব প্রিয় ছিল বাবানের। ফুল গুলোর উপর আলতো আঙুল ছুঁয়ে মনে মনে বলে, " ভালো থেকো তোমরা, আমার বাবানের জন্য ভালো থেকো..." 

অপরাহ্নের ম্লান, মায়াবী আলোয় প্রকৃতির রং ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। আচ্ছা, গৌতম আর তিস্তা কে নিয়ে তার যে সংসার, তাতে কোথাও কোনো ফাঁকি থেকে যাচ্ছে না তো? সে তো উদয়াস্ত খাটে, মন দিয়ে সংসার করার চেষ্টা করে। তবু কত খামতি থেকে যায়! ছোট ছোট ভুল, ভ্রান্তি...গৌতম ক্ষমা করে না, তার বকুনির সামনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তিয়াসা। বাবানের ব্যাপার টা জানতো শুধু তার দিদিয়া। বারবার বলতো, মনে একজন কে রেখে আরেক জনের সংসার সাজাতে পারবি তো?


বেলা শেষের পড়ন্ত আলোয় আকাশ টা কে আজ ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা বিশাল ধনেশ পাখি। বড় বড় দুটো ডানা মেলে। একদম একা। আচ্ছা, সেও কি তার সঙ্গী কে খুঁজে ফিরছে??

------//*//------
                         

সন্ন্যাসী শিপুখুড়ো 
উত্তম চক্রবর্ত্তী (কলকাতা)

বছর চার পাঁচ পর শিপু খুড়ো গ্রামে ফিরে এসেছে। কেউ কেউ নাকি দেখেছে শিপু খুড়ো গেরুয়া কাপড় পরে সন্ন্যাসীর বেশে ফিরে এসেছে। তারপরে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির কুঁড়েঘর ভেঙে ঝাঁ চকচকে দোতলা পাকা বাড়ি বানিয়েছে। গাঁয়ের সকলের একটা বড় জিজ্ঞাসা, শিপু হঠাৎ এত টাকা পেল কোথায়?

সদ্য বি.এ পাশ করা মাতব্বর গোছের ভগা চৌধুরী বলল, বেটা এই পাঁচ বছর নিশ্চয় জেল খেটেছে। 

রাম বেনে বলল, তাহলে জেলে সে টাকা কোথায় পাবে?

তুমি জানো না খুড়ো। জেল খাটলে সরকার টাকা দেয়।

সে হয় তো দেয়। তা বলে কুড়ি-পঁচিশ লাখ টাকা তো দেবে না। বাড়ি খানা সরজমিনে গিয়ে দেখে আয়। পঁচিশ লাখেও হবে কি না কে জানে। বাড়ির উপর নীচ মার্বেল আর টাইলস্ দিয়ে মোড়া। ঘরে জলের পাম্প, পাইপ লাইনের জল, কি নেই! আমরা মুখ্যু লোক হলেও এই টুকু জ্ঞান আছে।

এখন গ্রামের ছেলে থেকে বুড়ো,সকলের আলোচনার বিষয়বস্তু হল,শিপু জাতে চোর। চুরি ডাকাতি করলেও তো এত টাকা পাওয়ার কথা না। তবে কি লটারি পেয়েছে!

শিপু খুড়ো যে ডাকাত, তাই তাকে বাড়ির বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করতেও ভয় পায়। তার উপরে সব সময় ধেনো মদ খেয়ে থাকে। মদ খাওয়ার পর একটা তুলসীজর্দা দেওয়া পান খেয়ে মুখটা লাল ভকভকে করে রাখে। আর মেজাজ সব সময় সপ্তমে চড়ে থাকে। বীরপুঙ্গব প্রমাণ করতে কাঁধে থাকে একটা চকচকে টাঙ্গি।

শিপু খুড়ো এখন সকাল হলেই সাগেন,পটমগোড়া,নিমডিহা লোটো,ধাদিকা বামুন পাড়া, পলমী হয়ে সাইকেলে করে ঘুরে অবশেষে ঠিক দশটা নাগাদ কাঁসাইয়ের বুড়ো বটগাছের তলে বসে আর কয়েক পাট ধেনো খেয়ে গুম্ মেরে বসে থাকে। মাঝে মাঝে বকবক করে ।


বহুদিন পর মানবাজার যাওয়ার পথে দূর থেকে কাঁসাইয়ের তীরে গাছ তলে শিপু খুড়োকে দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে ডাকলাম,

শিপু খুড়ো-- ও শিপু খুড়ো।

কোন প্রকারে চোখ খুলে বলল,কোন হ্যায় --

চিনতে পারছো না খুড়ো?

মদের নেশায় চুর হয়ে আছে। তবুও বার কয়েকের চেষ্টায় চোখ খুলে বলল, কেন চিনব নাই বাপ্। ঢের চিনেছি। ই শালার দুনিয়ায় কন শালাকে চিনতে বাকী নাই। সব শালা নিজের নিজের ধান্দায় থাকে। দুনিয়াটা পাল্টে গেছে।

দেখলাম খুড়ো মদের নেশায় ঠিক মত বসতেও পারছে না। তাই ওখান থেকে বেরিয়ে কাঁসাই পেরিয়ে মানবাজারের পথ ধরলাম।


বিকালবেলা পায়রাচালী বাজারে হঠাৎ করে হই হট্টগোল শুনে গিয়ে দেখি,শিপু খুড়ো বীরদর্পে চিৎকার করছে আর বলছে -

শালা শিপতি সর্দার কি করে দোতলা বাড়ি করলো, তোদের জেনে কি লাভ? যখন দু-বেলা খেতে পেতাম না,তখন কেউ জিজ্ঞেস করেছিলি, শিপু খেয়েছিস্ কি না? এখন আমার দালানঘর দেখে চোখ টাঁটাচ্ছে? 

শিপু খুড়ো মাঝে মাঝে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে। আমাকে দেখেই জিব কেটে বলল, ই বাপু রে! ভাইপো কিছু মনে কর না বাপ্। আজ মেজাজটা খারাপ হয়ে পারা মাথায় উঠে গেছে।

তা খুড়ো কাকে গালিগালাজ করছো ? কেনই বা করছো?

কাছে এসে বলল, তুমাকে বলব বাপ্। তবে এখন নয়। ঘন্টাটেক পরে কাঁসাইয়ের ধারে বট গাছটার তলে এস। এখন বাড়ি যাও। আজ শালাদের গন্ডাকতক বাখান দিয়ে গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়তে দাও। ডেলি বলে শিপু টাকা কোথায় পেল, ঘর কি করে করল। শালাদের ভাবটা এমন, যেন উয়াদের বাপের টাকা আমি ঘর করে খরচ করে দিচ্ছি।

তারপর নরম সুরে বলল, ভাইপো তুমি থাকলে ব্যাঁত আটকে যাচ্ছে। যাও যাও। পরে কথা হবেক্।


বেলা পড়ে এসেছে। কাঁসাইয়ের দিক থেকে বাদল বাউরি তার ডাগর গরুর পাল নিয়ে গ্রামে ফিরে আসছে। গ্রামের এমন কেউ নেই যে বাদল বুড়োকে তার বাড়ির গরু ছাগল চরানোর দায়িত্ব দেয়নি। রাস্তায় দেখা হতেই তার পিকাটি পড়া দাঁতের সারি উন্মুক্ত করে বলল, তা বামুন দাদা কবে এসেছেন?

এই তো, তাও তিন চার দিন হবে।

দেখতেই পাইনি। সব সময় ঘরেই থাকো ন কি?

না-না,তা কেন। তুমি হয়তো আমাকে দেখতে পাওনি বাদল দাদু।

হয় তো হবে। আমি তো সারাদিন নদীর ধারে গরু ছাগল চরাই। গাঁয়ে থাকি না। তোমার দেখা পাবোই কি করে। বলেই গরু কাড়া পালের পিছু বাদল দাদু গ্রামের পথে এগিয়ে গেল।

বাদল বুড়োকে পিছনে ফেলে হেঁটে চলেছি কাঁসাইয়ের দিকে। সেখানে বুড়ো বটগাছের তলায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে, শিপতি সর্দার ওরফে আমার শিপু খুড়ো।


বটগাছের তলে গিয়ে দেখি খুড়ো বসে আছে। দেখতে পেয়েই বলল, এসে গেছো ভাইপো? বসো।

তা খুড়ো তখন এত রেগে ছিলে কেন?

রাগ হবেক্ নাই বাপ্। একটা দু'তলা দালান ঘর করেছি। আর উ টা দেখেই সবাই জ্বলে পুড়ে মরছে।

তা তোমার বাড়ি হয়েছে তো অন্যের গা জ্বালা করবে কেন?

তুমি কেমন এম এল এ, বি এল এ পাশ করেছো বাপ্! বুঝতে লারছো?

অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

শুন ভাইপো। তুমি ত জানো। আমার মাটির ঘর, ভঙলা চালে বড় বড় সব ভুলুক। গরীব বঠি ন -- ?

ত কয়েক মাস আগে দু'তলা করলাম। কেউ ভাবছে চুরি করে, আবার কেউ ভাবছে লটারি পেয়ে আমি ঘর করেছি।

তাহলে তুমি ঘর করার টাকা পেলে কোথায়?

উটাই তো তুমাকে বলব বাপ্। তাহলে শোন। বছর পাঁচ আগে ইঁদপুরের কাছে একটা গাঁয়ে ডাকাতি করতে গেছি। আমাদের সর্দার মানে ভূষণ সর্দার বলল, শিপু রে, বড় শক্ত ঘাটি। নিজেকে বাঁচাতে খুন করতেও পিছপা হবি না। তারপর এক অমাবস্যার রাতে মা কালীকে গড় করে ভূষণ সর্দারের দলে বেরিয়ে পড়লাম।

ডাকাতি করা কি আর কত সহজ বাপ্। একটা ঘরে ঢুকতেই একটা বুড়া চোর চোর বলে দমে চিৎকার করছিল। বুড়াকে ধমকে বললাম, খবরদার চোর বলবে না। আমরা চোর না, আমরা ডাকাত। বুড়ার ইস্পর্ধা দেখ। শালা বলে কি না আমর আমরা চোর? সেন্টুতে লেগে গেল। তাই টাঙ্গিটা তুলে কোপাই দিলম্।

তারপর -

বেশ বড়লোকের বাড়ি। দেদার ধনসম্পত্তি। ডাকাতি করে আমরা বেরিয়ে এলাম। রাত তখন গভীর। আমরা এক জায়গায় এসে চুরির টাকা ভাগ করে সকালে বাস ধরে বাড়ি ফিরছি। বাসে সব আলোচনা করছিল। যাত্রীরা বলছিল, ডাকাত গুলো নাকি খুনও করেছে। পুলিশ সকাল থেকে ডাকাত ধরার জন্য বেরিয়ে পড়েছে। আর ধরতে পারলেই খুনের অপরাধে ফাঁসি হতে পারে।

তোমাকে ধরতে পেরেছিল?

না, আমি ঐ বাসেই পায়রাচালীতে না নেমে মানবাজার থেকে বেপাত্তা হয়ে গেলাম।

কোথায় গেলে?

মানবাজার থেকে টাটানগর গিয়ে সেখান থেকে দক্ষিণ ভারতে। ওখানে গিয়ে সন্ন্যাসীর ভেক ধরে একটা আশ্রমে উঠলাম।

মন্দিরের মহন্ত মহারাজ আমাকে দীক্ষা দিলেন। আমার নতুন নাম হল স্বামী শিপ্রানন্দ। তারপর মন্দির ধোঁয়া মোছার কাজ দিল। প্রতিদিন সকালে উঠেই মন্দির জল দিয়ে ধুয়ে মুছে তকতকে করে দিতাম। সারাদিন আশ্রমের মহারাজের ফাইফরমাস খাটতাম। সকাল-সন্ধ্যায় নাম জপ করতাম। বেশ ভালোই কাটছিল দিন গুলো।

একদিন আমার গুরুমহারাজ ডেকে বললেন,শিপ্রানন্দ মন্দিরের যে মহারাজ গয়নাগাটি দিয়ে ঠাকুরের রাজবেশ পরাতেন তিনি কন্যাকুমারী আশ্রমে বদলী হয়ে চলে যাচ্ছেন। তুমি কি পারবে তার কাজ গুলো করতে?

রাজী হয়ে গেলাম।

মহারাজ আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে রত্ন ভান্ডার দেখিয়ে আনলেন। কি বলবো ভাইপো বস্তা বস্তা সোনার গয়না। ওজনে যে কত কুইন্টাল হবে কে জানে?

অত গয়না সব ঠাকুরকে পরানো হয়?

দূর বোকা। বস্তা বস্তা গয়না পরাতেই তো সারাদিন পেরিয়ে যাবে। তার পরেও কয়েক বস্তা বাকী থেকে যাবে।

অত গয়না রাখে কোথায়?

তাই তো বলছি ভাইপো। মন্দিরের নীচে বিশাল আন্ডার গ্রাউন্ড চেম্বারে গয়না রাখা থাকে। নানা গয়না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরানো হয় বলে মহারাজ আমার হাতেও এক থোকা চাবি দিয়েছিলেন। কাজ বেশ ভালোই করছিলাম। জানতাম গ্রামে ফিরে গেলেই খুন ও ডাকাতির দায়ে পুলিশের জালে ধরা পড়ব। তার চেয়ে সন্ন্যাসীর বেশে আত্মগোপন করে চার পাঁচটা বছর কাটিয়ে দিতে হবে। কেস চাপা পড়ে গেলে তখন দেখা যাবে।

বললাম, তারপর ফিরে এলেও তো পুলিশ ধরতে পারে?

শিপু খুড়ো হেসে বলল, ভাইপো সময় হচ্ছে এক বিশাল ময়লম। সময়ের তরঙ্গ আসতেই যা সময় নেয়। একবার পাড়ে ধাক্কা লাগলে তা মুছে যায়। কারণ পাড় তখন পরের তরঙ্গের জন্য অপেক্ষা করে।

বেশ,তারপর কি হলো বলো।

তারপর তো মালুম করছো ভাইপো, আমি জাত ডাকাত। তিন চার বছর নিরাসক্ত ভাবে কাজ করে বিশ্বাস অর্জন করলাম। তারা যখন আমার উপর ভরসা করতে শুরু করল তখন প্রতিদিন গয়নার ভাঁড়ার থেকে দু-চার ভরি গয়না সরিয়ে রাখতে শুরু করলাম। গয়না সরিয়ে একটা গোপন জায়গায় জমা করে রাখতে রাখতে প্রায় এক ব্যাগ ভর্তি করে একদিন মহারাজকে বললাম, মহারাজ একটু তীর্থ ভ্রমণ করতে চাই।যদি অনুমতি দেন।

অনুমতি পেলে?

পেলাম মানে? মহারাজ আমাকে ভ্রমণের খরচ বাবদ দু'হাজার টাকাও দিলেন। একদিন ভোরবেলা মহারাজকে রত্ন ভান্ডারের চাবি দিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে এসে গয়নার ব্যাগ নিয়ে করমন্ডল এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। দু- দিন পরে সোজা বাড়ি।

তুমি ফিরে না গেলে যদি তাঁরা তোমার খোঁজ করে। বা যদি দেখে গয়না চুরি গেছে?

তুমি কেমন এম এল এ, বি এল এ পাশ ভাইপো? শিপু অশিক্ষিত হতে পারে। কিন্তু জাত ডাকাত। আমি ওখানে আমার ঠিকানা লক্ষ্ণৌ দিয়েছিলাম। আর গয়নার কথা বলছো? ওখানকার মহারাজরাও জানে না কত গয়না আছে। তার থেকে যে চুরি গেছে কিছু বুঝতেই পারবে না।

কথাগুলো বলেই শিপু খুড়ো ফিচিক ফিচিক হাসতে লাগল।

তা কত ভরি গয়না চুরি করেছিলে?

ধরে নাও, প্রায় দু'শ ভরি। তারমধ্যে কিছু বিক্রি করে বাড়ি বানিয়েছি। কিছু ছেলেকে দিয়েছি। সে একটা ইঁটভাটা করবে। বাকি গয়না এখনও একটা গোপন স্থানে রেখেছি।

যদি কেউ কোনদিন জানতে পারে?

কেউ জানে না ভাইপো। ঘটনাটা একমাত্র তোমাকেই বললাম। জানি তুমি পাঁচ কান করবে না। বলেই আমার দুটো হাত ধরে বলল, ভাইপো কথাগুলো বুকের মাঝে চাপ হয়ে বসেছিল। তোমাকে বলে হাল্কা হলাম। তুমি কাউকে যেন বলো না বাপ্।

কথাগুলো বলেই গগন ফাটিয়ে শিপু খুড়ো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

সন্ধ্যা বেলায় তার হাসি বাতাসকে চুরমার করে পলমী, বামুন পাড়া, লোটো, ধাদকা, নিমডিহা পেরিয়ে সাগেন পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগলো।

হাসি থামিয়ে বলল, ভাইপো, আমি এখন শিপতি ডাকাত নই। আমি এখন মহারাজ শিপ্রানন্দ।

বলেই আমার কাঁধ ঝাঁকিয়ে আর একপ্রস্থ হাসতে লাগলো।

------//*//------


 উৎসর্গ
তপন  তরফদার (খড়্গপুর)
 
উৎসর্গ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক দান-ধ্যানের মহান আদর্শ। আমারা বই খুললেই দেখি অত্যন্ত যত্ন করে শ্রদ্ধা মূলক সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করে প্রথম পৃষ্ঠাতেই ছাপা হয় পরিচিত প্রিয়জনের নামে বইটি “উৎসর্গ” করা হয়েছে। অনেক বইতে আবার আঁকাবাঁকা অক্ষরমালায় খোদাই করে লেখা হয় যাতে সবার নজরে আসে। এখন উৎসর্গ আবার সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উৎসর্গীকৃত করা হচ্ছে নিজের দলের বা অপ্রয়োজনীয় হলেও উৎসর্গ করে যাচ্ছে।  এই নিয়ে  সমাজ মাধ্যমে তোলপাড় হয়। কিন্তু এমন ঘটনা ও ঘটে যা নিঃশব্দে ঘটে যায়, হয়ে যায়, থেকে যায়, যা জানা যায়  অনেক পরে। কাহিনি ও জানতে পারা যায়  অনেক  অনেক পরে নীরবে, নীরব আলোর মাধ্যমে। সেই কাহিনীর কথা এখন অবগত করা প্রয়োজন।

ধীরেনদা মরেই মুক্তি পেলো। মৃত্যু দুঃখদায়ক। এক্ষেত্রে আমরা দুঃখ পেলেও ধীরেনদার কাছে এই মৃত্যু পুরস্কার। ধীরেনদা পেলো এক প্রাণখোলা মুক্তির আকাশ। অসহনীয় কষ্টের মধ্যেই ধুকপুক করে শ্বাস প্রশ্বাস চলছিল। মৃত্যু সবার কাছে দুঃখদায়ক হয়না। মুখে দুঃখের ছাপ বজায় রেখে মনের অন্দরে আনন্দের খবর হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বৌদি মালা দেবীর কাছেও খুবই আনন্দের খবর। আমারা যারা ধীরেনদার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশেছি তারা জানে, মালা বৌদি কখনোই ধীরেনদাকে মেনে নিতে পারেনি। কারন ধীরেনদা কোন করিতকর্মা আদমী ছিলনা। জীবনটা নিজে উপভোগ করেনি, উপভোগ করার উপকরণ যোগাড় করে দেয়নি। শুধুমাত্র দিনরাত এক করে দিস্তা দিস্তা কাগজে  লিখে গেছে। মালা বৌদি বারন করেছে, ধীরেনদা শোনেনি। এমনকি  ষড়যন্ত্র করে কাগজপত্র লুকিয়ে রেখেছে, তাও দমাতে পারেনি।

                            (২)

আমাদের জগৎবল্লভপুরের অন্যতম বর্ধিষ্ণু পরিবারের ছেলে ধীরেনদা। চক্রবর্তী পরিবারের যেমন  চাষের জমি আছে তেমনি সত্যনারায়ণের চন্ডীপাঠ থেকে পারলৌকিক শ্রাদ্ধ্যবাড়ি থেকে র অনুষ্ঠানে স্বর্গের পথে প্রতিস্থাপন করা, মোবাইল থেকে টিভি, সাইকেল থেকে মটরসাইকেলর বিভিন্ন  ধরনের রমরমা  ব্যবসা ও করে। ধীরেনদারা পাঁচ ভাই। ধীরেনদাই ছোট। যাদের সংসার সম্পর্কে গভীর  ধারণা আছে  তারা জানে সংসারে ওই শেষের জন তেমন আদর যত্ন পায়না। বড়জন, সংসারের প্রথম উত্তরাধিকারী ছেলেরা যেমন আদর যত্নে মানুষ হয়, তার ছিটেফোঁটা ও পায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়া, পরিবার চেয়ে ছিল একটা রুপে লক্ষী গুণে সরস্বতী সংসারে আসুক। ছেলে আছে  মেয়ে হোক। মেয়েরা পরের বাড়িতে গেলেও মা,বাবার জন্য  হৃদয়ের  ভালোবাসায় কখনও  খামতি রাখেনা।

সময় থেমে থাকে না। সময় কারো কথা শোনেনা। সময় নিজের গতিতে চলে। এবং বড়কথা  ধীরে ধীরে ধীরেন ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হলো।

এই কলেজে ভর্তি  হয়েই ধীরেন অন্য মানুষে রুপান্তরিত হয়ে যায়। “কালো তা  সে যতই  কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।“  পৃথিবীতে অনেক গবেষণা চলছে তাদের মধ্যে অন্যতম গবেষণা প্রেমে পড়া বা প্রেমিক প্রেমিকা কেন হয় তার  উৎসর সন্ধানে। এখনো প্রকূত কারন খুঁজে  পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে অন্যতম, মানুষ  কখন কার সঙ্গে, কি কারণে প্রেমে পড়ে কেউ জানেনা। এক কবি তার মনে আঁকা প্রেমিকার সঙ্গে দেখা এক স্টীমারে। দুর থেকে দেখা। প্রেমপত্র বিনিময় আকাশ কুসুম। কোনো কথাবার্তা বলার ও সুযোগ হয়নি নীল নয়না স্বর্ণকেশীর সঙ্গে। তাও তার প্রেমে হাবুডুবু হয়ে দু-দুটো মহাকাব্য লেখেন ইতালির কবি দান্তে আলিগিয়েরি, “দ্যা ডিভাইন কমেডি “ এবং “ দ্যা নিউ লাইফ”। অন্য একটি পৃথিবী খ্যাত কাহিনী। রাডইয়ার্ড কিপলিং বম্বেতে জন্মানো এক ইংরেজ সন্তান ২৪ বৎসরের তরুণ। সাংবাদিকতার সঙ্গে গল্প-কবিতা ও লিখতেন। মায়ানমারের মৌলামিন শহরের সুউচ্চ কায়াকথিন প্যাগোডার সিঁড়িতে এক বর্মি তরুণীর রুপে মুগ্ধতায় আবিষ্ট। তার সঙ্গে কথা বলার ও সুযোগ হয়নি। তাও প্রেমের বন্ধনে জড়িয়ে পরেন। ভুলতে পারেননি। এক বৎসর পরে কিপলিং “মান্দালয়” কবিতায় নামহীন তরুণীকে অমর করে গেছেন। তাকে উৎসর্গ করে লিখেছেন, “বাই দি ওল্ড মৌলামিন প্যাগোডা.... দেয়ার ইজ অ্যা বার্মিজ্ গার্ল।“ শতবর্ষ পরেও আজও তা প্রাসঙ্গিক। সিনেমা হয়েছে এমনকি কবিতাটা উপলক্ষ্য করে গান তৈরি হয়েছে। কোভিড ইত্যাদি ভাইরাস সনাক্ত করা গেলেও প্রেমের ভাইরাস এখনো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।

আমাদের ধীরেনদা প্রেমে পড়লো এক কৃষ্ণ কলির। এক মাথা ঘন-কোঁকড়ানো চুল। সামনের দিকে একটু চিরুনি চালিয়ে কেশ সজ্জা শেষ করে। আগোছলা “কুন্তলচূর্ন” কানের চারপাশে  হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। কাজল টানা চোখ যেখানে কাজলের প্রয়োজন হয়না। সুগঠিত দাঁতে  সুখ স্পর্শের হাসি। মদিরায় ভেজানো ঠোঁট। চোখের দৃষ্টিতে দূর ভেদী প্রখরতা। রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ লাস্যময়ীর নাম ও রুপা বেসরা। কালো মানিকের কথা যারা শুনেছে তারা স্বীকার করতে বাধ্য কালো মানিক আছে এখনো, থাকবেও। ওদের সমাজে গায়ের রঙ কালো বলে কেউ দুঃখ করেনা।

ধীরেনদা ওই কলেজে পড়তে পড়তে  কালো মানিকের সঙ্গে কি ভাবে প্রেমের আঠায় সেঁটে গেল কেউ জানেনা। ধীরেনদাকে বেসরাদের কুটিরে দেখা গেছে। ওদের সঙ্গে হাঁড়িয়ার নেশায় না দেখা গেলেও ওদের মাটির ঘরের গোবর দিয়ে নিকানো আঙিনা, ভেষজ রঙ দিয়ে আলপনা আঁকা দাওয়ায় বসে দুজনে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপা আলোলোচনা চালিয়ে যায়। এই পল্লীর কয়েকজন  লেখাপড়া শিখে চাকরি করছে। নিজেদের সংস্কৃতি বহাল রেখেও অপরকে আপন করতে পিছপা হয়না। সাঁওতালদের বেসরারা নাচে গানে খুবই পটু হয়। রূপার চেহারা যেমন ছিপছিপে, গানের গলাতেও মধু আছে। সব থেকে আশ্চর্যজনক  ঘটনা ও মুখে মুখে গান রচনা করে গাইতে পারে। মনকে  মাতিয়ে রাখে। “দুলৈড় তাম দ পালেন-ঝঁড়গাও ঞুরু ক:আ?   / আলে ছাটকা দারে লাফাং ডৈর খন।/ আঁজলে আতাং কাতেঞ-লকা দারাম কেয়া / আটেৎ অসার কিয়ীঞ নোআ জিউয়ী মন।“  ভাবানুবাদ।  “তোমার ভালোবাসা যদি হঠাত খসে পড়তো আমাদের বাড়ির  উঠানের-আঙিনায় / আমি সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে/ দু’হাত বাড়িয়ে, হৃদয়ের অঞ্জলি পেতে লুফে নিতাম।“

                 (৩)

ধীরেনদার মনে এক কবির ভ্রুণ বাস করতো। এই কালো মানিকের সংস্পর্শে এসে তার পূর্ণ বিকশিত হয়। বাংলা ভাষার সাহিত্যের খুব গভীরে না হলেও কিছু জ্ঞান ছিল। কিন্তু সাঁওতাল ভাষার সাহিত্য ও যে ফেলনা নয়, তা এই রূপার সংস্পর্শে এসে জানতে পারে। কবির লেখায় যতই কালোমানিক সুন্দরী বলে কাব্য করলেও, নিজের জীবনের সঙ্গী  নির্বাচন কখনো করেনা। তখন ওই ধবল সুন্দরীদের পছন্দ করে তাদেরই দ্বারস্থ হয়।

ধীরেনদা যখন  নিজেই যেচে এগিয়ে এসেছে, রূপা খোলা মনেই মেশে এবং অন্তরঙ্গ হয়ে আলোচনা ও করে। ধীরেনদা ওদের সৃষ্টিতে আদিম সরলতা, অকৃত্রিম প্রাঞ্জলতা, মৌখিকভাবে প্রচারিত হওয়ার ক্ষমতা ও অন্যান্য লোকসাহিত্যের সমস্ত গুণগত উচ্চমানে গুণমুগ্ধ্য হয়ে যায়। এই সম্পর্কে  বিশদে জানতে রূপার সঙ্গী হয়ে যায়। রূপাও প্রাণ খুলে অন্তঃস্থল থেকে আলোচনা করে।

রূপা শিক্ষিকার মতো ধীরেনদাকে বলে, সাঁওতাল জাতির পুরাতন তথ্য সংগ্রহ করে “হড়কোরেন মারে ‘হাপড়ামকোরেয়া  কথা” বইটি ১৮৮৭ সালে রেভা স্টেফ্সরড কলে,বইটি প্রকাশ করেন। এরপর আরেকটি কালজয়ী বই রামদাস টুডুর “খেরোয়াল বংশা  ধরম পুঁথি” প্রকাশ করেন প্রথম সাঁওতালি লেখক, রামদাস টুডু। বইটিতে সাঁওতালি পুরাণকথা ও সামাজিক রীতিনীতির বই হলেও, বইটির সাহিত্য মূল্য প্রচুর। রামচাঁদ মুর্মূর লেখা ও সুরে বাঁধা গান, “আদিবাসী বীর হো” সাঁওতালদের কাছে আজও জাতীয় সংগীতের মতো। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০-র মধ্যে সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা রচনা করেছিলেন। ধীরেনদা বলে,  আমরাতো কিছুই জানিনা। রূপা বলে জানাবার চেষ্টা ও করা হয়নি। দেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে আমাদের অবদান আলোচিত হয়না। বৃটিশদের দেওয়া আদিবাসী তকমা ছেড়ে দিয়ে আমরা অধিবাসী হতে পারলাম না। ধীরেনদা বলে আমি তোমার সঙ্গে আছি আরও জানতে চাই। আমি তোমাদের নিয়েই দলিত সাহিত্যের অন্য ধারার গল্প লিখবো। যা উৎসর্গ করবো তোমাকেই।

রূপার মুখে হাসি। এ হাসির প্রকৃত অর্থ কি তা কেউই বলতে  পারবেনা, যেমন মনোলিসার হাসি। রুপা দাওয়ার কোনায রাখা মাটির কলশি থেকে  দু গ্লাস জল, ঘর থেকে দুটো বড়ো লালবাতাসা এনে ধীরেনদাকে একটা এগিয়ে দিয়ে বলে “খেয়ে লে।“

রূপা বলতে লাগলো – সাধু রামচাঁদ মনে করতেন সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্য ছাড়া পৃথিবীতে সাঁওতালদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। সাঁওতালি সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সাধু রামচাঁদের অপরিসীম অবদান আছে। এগিয়ে আসেন পাউল জুঝৌর সরেন, পন্ডিত রঘুনাথ মুর্ম, মঙ্গল সরেন। সাওঁতাল সংস্কৃতির উপর কয়েকটি বই লেখেন কবি নায়ক মঙ্গলচন্দ্র। জাতিকে আন্দোলিত করতে পন্ডিত রঘুনাথ মুর্ম অলচিকি বর্ণমালা তৈরি করেন। অলিচিকি আন্দোলন আদিবাসী সমাজে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। রঘুনাথ মুর্মর কবিতা আধ্যাত্মিক চেতনায় সম্পৃক্ত উন্নত র কবিতা। গোরাচাঁদ টুডুর কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রকৃতি ও মানব জীবনের অপার রহস্য তার কবিতায় বিশেষ ভাবে উল্লিখিত আছে। নারায়ণ সরেন অন্যতম শক্তিশালী কবি। তার ‘তড়ে সুউম’ কবিতায় মিস্টিক চেতনা ও ধ্যানমগ্নতার সুর মনকে ভীষণ নাড়া দিয়ে  যায়। গল্প উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। তাঁর ‘তড়ে সুতীম’ লেখাটি  সাঁওতালি ভাষার আধ্যাত্মিক চেতনার অন্যতম হাতিয়ার ও বলা যেতে পারে।

ধীরেন যত শুনছে ততই অবাক হচ্ছে। রুপা গালে হাত দিয়ে চোখ গোল গোল করে বলে আরও অনেক কবি-লেখকের সাহিত্য প্রচারের আলোয় আসলে অবাক হয়ে যাবে। ইদানিং আমরা গদ্য-কবিতার কথা বলি। কবি ঠাকুরদাস মুর্মর সমস্ত কবিতা গদ্যের আকারে লেখা। চিন্তা শীল প্রবন্ধ ও লেখাতে সিদ্ধহস্থ ছিলেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৯ আদিবাসী সমাজের নানা বঞ্চনার বিরুদ্ধে  সেই  সময়েই কলম ধরেছিলেন ঠাকুর প্রসাদ মুর্ম,। ডেমানচন্দ্র হাঁসদা, বাবুলাল মুর্ম সাঁওতাল ভাষার অন্যতম শক্তিশালী কবি। সারদাপ্রসাদ কিসকুর কথা কতজনে জানে, অথচ তিনি মাটির মানুষদের নিয়েই কাব্য লিখেছেন। এক নাগাড়ে বলে চলেছে রুপা। -- অনেকেই জানেনা রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ সাঁওতালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। সমালোচকরা প্রশংসা করে বলেছেন, “রবীন্দ্র কবিতার বিভাব তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়।“ ১৯৪০ থেকে ১৯৪৯ সাঁওতালি সাহিত্যের এক জোয়ার দেখা যায়। স্বাধীনতার স্বপক্ষে কলমে শান দিয়ে আগুন ঝরানো কবিতা লিখে প্রকৃত স্বাধীনচেতা হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল সাঁওতাল কবিরা। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে রুপা বলে - কিন্তু  ইংরেজদের প্রবর্তিত ‘আদিবাসী’ শব্দটি আমাদের গায়ে সেঁটে থাকল। কবিরা প্রতিবাদ করেছিল, করে আসছে। কবি হেমব্রম, কাজলা সরেন, অসিত সরেন প্রমুখের কবিতা সাঁওতালি জনজাতির মতই চিত্রর্ধর্মী, রুচিশীল, স্নিগ্ধ অনুভূতি প্রবণ, অনাবৃত অরণ্য চেতনার নির্মল সবুজের সন্ধান পাওয়া যায়।  বিশ্বায়নের লোভের পৃথিবীতে সাঁওতাল কবি-লেখকদের সাহিত্য সাঁওতাল সহ সমগ্র জাতিকে জাগ্রত করে তোলার সৃজনশীল সাহিত্যের সৃষ্টি করেছেনন। সাধারণ মানুষকে উৎসর্গ করেছেন। 

        
রুপার অশ্রুজল মুক্তর মতো চিকচিক করছে। ধরা গলায় বলে, আমাদের কাছে  অতীব দুঃখদায়ক। ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে অনেক নথিপত্র, বীরগাথা। বর্তমানে  ইতিহাসের অন্বেষণে সাঁওতালি সমাজের, সাহিত্যের অনেক হারানো ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় উঠে আসছে। রুপা নিজেকে সামলে নিয়ে  বলে, - ধীরেনদা আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, জগ মাঝিদের কাছ থেকে অনেক নথিপত্র যোগাড় করেছি। তোমাকে দেখাবো। তোমার ভালো  লাগবে। লেখালেখি করলে অনেকেই বাহবা দেবে। জান আমাদের সমাজে পুত্রদের অধিকার সমান, কিন্তু মেয়েদের কোন অধিকার নেই। তবে পিতা ইচ্ছা করলে মেয়েকে কিছু দিয়ে যেতে পারেন। তবে সম্পত্তি বিলি করার  সময় বাবা প্রত্যেক মেয়েকে একটি করে সুস্থ সবল গাভী দেয়।। পুত্রহীন ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানা তার সহোদর ভাইয়েরা পেয়ে থাকে। আমারতো ভাই নেই আমাদের সবকিছু  কাকার ছেলেরা পাবে।

                     ( ৪)

ধীরেন যত রুপার সঙ্গে মিশছে ততই অবাক হচ্ছে। কাগজে সবাই পড়ে আদিবাসীরা অসভ্য।এখনো আদিম চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকে। ধীরেন কিন্তু  ইতিমধ্যেই বুঝে  গেছে প্রকৃতিকে এরা উপেক্ষা করেনা। সম্মান করে ভালোবাসে এবং প্রকৃতিকে, অরণ্যকে পুজো না করে নিজেদের একান্ত প্রয়োজনেও এরা ব্যবহার করে না। এই প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা আদিম মানুষরা ছিল আরন্যক এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। অরণ্য কমেছে, আদিম মানুষরা অন্য ধারার জীবনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। অর্ন্তজাল ঢুকে পড়ছে অন্দরমহলে। যুগের সঙ্গে খাপখাওয়াতে গিয়ে কিছু পরিবর্তন এসে গেছে। ইতিহাস বলে সে সর্বধর্ম ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের উদ্ভাবনীর সঙ্গে  পরিস্থিতির সমাজে পরিবর্তন হয়ে অনেক কিছুই মেনে নেয়। কিন্তু আদিম সমাজ আদিম ভাবনার অনুষঙ্গ থেকে যায় মননে। সেই ভাবনাকে সম্মান জানাতে স্বীকৃতি দিতে পূর্বপুরুষদের রীতিকে শ্রদ্ধা করে, পালন করে বিভিন্ন  রীতির মাধ্যমে। রুপা ধীরেনদাকে বলে আমাদের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নিয়ে যাবে। আমাদের মাঘবঙা অনুষ্ঠানে নিয়ে  যাব। মাঘবঙা কবে কবে হবে তা ঠিক করে “পারানিক” এবং মাঝি। মাঝি ডাকুয়াকে ডেকে বলে দেয় সবাই কে খবর দিতে। আদিম সমাজেও প্রত্যেকের যে প্রয়োজন আছে প্রত্যেকে গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ, সেই ভাবেই নিয়ম-নীতি, রীতি  তৈরি করা।  ডাকুয়াকে বলা হয় “গোডেৎ”।যার কাজ প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে আমন্ত্রণ জানান। গোডেৎ প্রত্যেক বাড়ি থেকে চাল আর একটা ছোট মুরগি নেবে। নির্দিষ্ট দিনের ঠিক করার জায়গায় ও সময়ে পারানিক, মাঝি, গোডেৎ, জগমাঝি  এবং নাইকি এই পাঁচজন গ্রামের অন্য পুরুষদের নিয়ে  পুজোর  জায়গায় যাবে। ধীরেনের কাছে “নাইকি” শব্দটি পরিচিত শব্দ। ধীরেন বলে ওঠে এখানে নাইকির কিসের প্রয়োজন বুঝতে পারছিনা। নাইকি মানে জুতো কোম্পানির বিঞ্জাপনের বিষয়টি ভাবছে। ওকে বুঝিয়ে দেয়, নাইকি মানে পুরোহিত।

রুপা ধীরেন কে নিয়ে  আসে ওদের সমাজের পুজো  দেখাবার জন্য। সবাই  দেখছে পুজোর জন্য নতুন কুলোয় তেল সিঁদুর মেথি চালগুড়ি আতপ চাল।  বলি দেয়ার জন্য মুরগি  নিয়ে চলেছে। অবিবাহিত ছেলেরা নতুন মাটির ঘট ভর্তি  জল নিয়ে চলেছে।

জঙ্গলের ঢোকার মুখেই ওদের পুজোরর জায়গা। জায়গাটা  গোবর দিয়ে নিকানো হলো। সুতো দিয়ে ঘিরে তিনটে খোপ তৈরি করল। প্রত্যেক খোপে নকশা ওরাই কাটলো। ধীরেন লক্ষ্য করে নকশাগুলো কিন্তু এক নয় বিভিন্ন ধরনের। নকশার ভিতর আতপ চাল, মেথি ছড়িয়ে দিয়ে সিঁদুরের টিপ দিয়ে পুজো শুরু হল। প্রথমে “মারাং বুরু” পরের “জহর আয়ে”। মারাং বুরুর কাছে, করাতিফুল, ঝুঁটি ওলা  সাদা মুরগির বাচ্চা বলি দেয়া হলো। সাদা মুরগি বলি দেওয়ার কারন ওরা মনে করে এই মুরগি বলি দিলে ছেলে মেয়েদের বিয়েতে কোন বাধা বিঘ্ন, অশান্তি হবেনা। গোডেৎ এর নাম গোবিন্দ সরেন। আমাদের  মন্ত্রকে আমরা বলি বাঁখোড়।হাসি লেগে আছে। আমাকে বেশ খাতির ও করছে। মনে হয় রুপা  কিছু ওকে বলে দিয়েছে। আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলে এই “বাঁখোটের” মানে বোঝেন। ধীরেন ম্লান হেসে বলে, কোন মন্ত্রের মানেই জানিনা। আমরা পুজো করি সংস্কৃত ভাষায়, বিয়ে হয় সংস্কৃত ভাষায়। পুরুত ঠাকুর বলে যায় বর বউ না বুঝেই বলে যায়। গোবিন্দ বলে আমরা কিন্তু আমাদের ভাষাতেই মন্ত্র বলি এবং আমাদের রীতি  অনুযায়ী রীতিমতো ঈশ্বরের আরাধনা করি। এই যে বললো জহর গঁসাই মারাং বুরু / মা একখানে নো আয় মাগ মেগরে।“ কথাটা হলো আমাদের চলার পথে যেন কোন অসুবিধা না হয়, ভগবানের কাছে তাই এই পুজো, ভক্তি, প্রার্থনা।

নাইকি আমাদের বাঙালি হিন্দুদের পুরোহিতের মতো গম্ভীর হয়ে উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছে। গোবিন্দ  বলল এই যে মন্ত্রটা পড়ল, “জোহার আয়ও জাহের এরা/ মা এখানে নঃ অয়ম মান সিম ঙ্চু তেলে।” কথাটার অর্থ আমাদের  রোগজ্বালা যেন না হয়, যেন না ভুগি, তা তুমি দেখো, আমাদের অন্তরের এই আকুল প্রার্থনা। ধীরেন  মনে মনে এদের তারিফ করে। কি সারল্য।তথাকথিত  সভ্য সমাজের  মানুষদের  থেকে এরা অনেক এগিয়ে।

পুজো শেষ পুজোর জন্য ঘুরে ঘুরে যে চাল ডাল জোগাড় করা হয়েছে সেই চাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়। সবাই একসাথে খায় আর প্রার্থনা করে যেন গ্রামের সকলে একসঙ্গে থাকতে পারে। এই পূজা শেষ হলে ঘর ছাওয়া, বেড়া দেওয়া, জঙ্গল থেকে কাঠ কাটার অনুমতি সমাজের মাধ্যমে দেওয়া হয়। এই অনুমতি সরকারের ঘোষণার থেকেও বিশেষ জরুরী। গোবিন্দ  বলে আমাদের মাঝি অনুমতি না দিলে  আমরা জঙ্গলের কোনো পাতাই স্পর্শ করিনা।  আমাদের গ্রামে যাবেন আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে  মিশলে,  বুঝবেন আমাদের সমাজের বন্ধন কত অটুট, কোন খাদ মেশানো নেই। গোবিন্দ ধীরেনদা কে আমন্ত্রণ জানায় ওদের “সাগুন  ঠেলি” অনুষ্ঠান দেখার জন্য।

          (৫)

“সাগুন ঠেলি”। গোবিন্দের সঙ্গে ধীরেনদা  গিয়েছে  ওই “সাগুন ঠেলি” দেখতে।

এই অনুষ্ঠানে অবিবাহিত ছেলেরা মাথায় কাঠ নিয়ে পুরোহিতের ঘরের সামনে এসেছে।। ঘর থেকে  এক অববাহিতা  কিশোরী মেয়ে বেরিয়ে এসে ছেলেদের পায়ে প্রথমে জল ঢেলে পরিষ্কার করলো। তার পর তেল মাখালো। ধীরেনদার খুবই ভালো লাগছে। মেয়েরা  আবার জল ঢেলে তেলটাকে খুব পরিপাটি করে পরিষ্কার করে দিল। তারপরে  মেয়েটা হাঁটু গেড়ে বিশেষ এক ভঙ্গিমায় প্রণাম করলো।। লক্ষণীয় বিষয় প্রত্যেকবার কিন্তু মাটি ছুঁয়ে নিজের মাথায় বোলাচ্ছে।গোবিন্দ বলে, “মানুষকে প্রণাম করলেও আসলে প্রকৃতিকে প্রণাম করছে। প্রকৃতি হল আসল মা সবার রক্ষা কর্তা সবার প্রাণদায়িনী মা। ধীরেনদা নিজের মনেই বলে, “কত অজানা পৃথিবী।“

পুরোহিতের ঘরে মেয়েটা ঢুকে  একটা বড় আকারের মাদুর বারান্দায় বিছিয়ে দিল। মাতব্বররা পার্টিতে বসলো। অন্যান্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো। আলোচনা শুরু হলো।গোবিন্দ ধীরেনদার কানে কানে রিলে করার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল, “জগ মাঝি  গ্রামের অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের সহ গ্রামের সকলের ভালোর জন্য পুজো পাঠ করবে। এই সময়ে পুরোহিতের চালায় কয়েকজন কিছু কাঠ গুঁজে দিল। গোবিন্দ  বলে বুঝলেন কিছু। ধীরেনদা মাথা নড়িয়ে বলে না। ভূপেন বলে আপনারাই শুধু প্রতিকীর ব্যবহার করেন,  আদিম বনবাসী রাও প্রতিকী ব্যবহার করে করতে জানে।। আমার মনে হল আদিম জনজাতি গোষ্ঠীই প্রথম “প্রতিকী”র সাহায্য নেয়। এই কাঠ গোঁজার অর্থ হল পুরোহিতের ঘর ছাওয়া বা  রক্ষানবেক্ষনর দায় সবাই  মিলে নিলাম। উনি যেমন গ্রামের ভালোর জন্য পুজো পাঠ করবেন, আমরাও উনার ঘর গোড়ে দেবো।

গোবিন্দ  বললো, আমাদের সবারই কাজ, দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। যে যার কাজ করে যায়। প্রয়োজনে কঠোর শাস্তি দিতেও আমাদের সমাজ পিছপা হয় না। আমাদের জগমাঝি গ্রামের অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন।

                               (৬)

ধীরেন ও রুপার মেলা মেশা নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলে। ধীরেনের বাড়িতে এই অভিসারের খবর পৌঁছনোর লোকজন না থাকায় ওরা অন্ধকারেই থাকে।         আদিবাসী পাড়া জানলেও ধীরেনদের বাড়িতে খবর পৌঁছায়নি।   পৃথিবীতে সবকিছু মসৃন গতিতে চললে পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকবেনা।  ধীরেন আর রুপার প্রেম গাথা সাঁওতাল সমাজ সহজ সরল হলেও সেখানে  প্রেমের যেমন মন আছে প্রতিহিংসা ও আছে।                        

 উপেন মূর্মর বাবা জগমোহন গ্রামের জগমাঝি, ওদের সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি। উপেনের নজর এখন রুপার উপর। একটু  লেখাপড়া শিখে রেলের গ্যাংম্যান হয়েছে। উপেন ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়, “হাম কিসিসে কম নেহি।“ভয় এখন উপেনকে নিয়ে।“ ধীরেন বলে, আমি আছি, তোমার ভয়ের কিছু নেই। রুপা একটা  এঁটো হাসি হেসে বলে, প্রত্যেক ধর্মেই শারীরিক বা আর্থিক বলশালীদের বিশেষ সুযোগ -সুবিধার ব্যবস্থা করা আছে। আমাদের অনেক ধরনের  বিবাহ প্রথা আছে একটা বিয়ের রীতি রীতিমতো আমাদের পক্ষে ক্ষতিকারক। তোমাদের মতো আমাদের বিয়েতে দেনা পাওনা চলেনা  সমাজে যেকোনো রকম পণপ্রথা পূর্ব কাল থেকেই নিষিদ্ধ। আমাদের সমাজে ছয় প্রকার বিবাহ রীতির প্রচলন থাকলেও বতর্মানে তিন ধরনের বিবাহের প্রচলন বেশি দেখা যায়। আসলি, রাজারাজি, হুর কাটারা বা ইতুঃবিবাহ। ধীরেনের মুখে মুচকি হেসে বলে, হিন্দুদের ও অনেক ধরনের বিয়ের রীতি আছে। কোনো কথা না বলে শান্ত ছেলের মতো শুনে যায়। রূপা গলায় সুর তুলে ছন্দ বজায় রেখে গড়গড় করে বলে আমাদের এক রীতির নাম আসলি বিবাহ। আসলি বিবাহ সম্ভ্রান্ত পরিবার ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যেই প্রচলিত এ ধরনের বিবাহ কন্যার পিতা-মাতা পরিবারের সন্মতিতেই সম্পন্ন হয়।আর এক রকমের নাম রাজরাজি। প্রেম করে বিবাহ। গ্রামের হাটে কেনাবেচা করতে এসে সাঁওতাল যুবক যুবতীরা তাদের পছন্দসই প্রিয়জনের খোঁজ করে। মেয়েরা যখন হাটে যায় তখন তাদের সাথে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকে। যাকে আমরা  যোগমাঝি বলি। যোগমাঝি ছেলে-মেয়েদের পছন্দের অভিভাবকদের সঙ্গে  যোগাযোগ করে বিয়ের ব্যবস্থা পত্র করে। ধীরেন বলে খুব  ভালো ব্যবস্থা। প্রত্যেক সভ্য সমাজের  উচিত তোমাদের দেখে শেখা।                                                             

রুপা গলার শির ফুলিয়ে বলে – মানুষের এই দোষ। ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্ত  না শুনেই মতামত দেয়া। আমি শেষ করিনি। আমাদের  আরও এক ধরনের বিয়ে হয়, যার নাম  হুর কাটরা। হুর কাটরা বিয়ে হচ্ছে  জোর করে বিয়ে করা। মেয়ের অপছন্দ  সত্বেও যদি ছেলেটা মেয়েকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়, সাঁওতাল সমাজে  অনত্র বিয়ে হতে পারে না। গ্রামের সালিশি সভা ডেকে যুবকের অর্থদণ্ড ধার্য্য করা হয়। অর্থ আদায় হলে ওদের বৈধ বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়।  ধীরেন  বলে এবার বুঝতে  পারলাম  তোমার  অসুবিধা কোথায়।

                    (৭)

রাত না দিন বলা মুশকিল। আকাশের তারা আবছা হয়ে আসছে।ইঙ্ক ব্লু থেকে আকাশ  রয়েল ব্লু হচ্ছে। ধীরে ধীরে আকাশ  রুপোর ঝলকানি আলো আকাশের পুবের দিকে। মুরগি ভ্রান্ত হয়ে ডাকতে শুরু করেছে। পাখিরাও ডাকতে শুরু করবে। রুপা ধীরেনের সঙ্গে  ধীরেনদের বাড়িতে   এসেছিল। বাড়িতে সবাই জানে ধীরেন  একজন ভালো ছেলে। পড়াশুনায়  ক্লাসের সবাই কে টেক্কা মারে। রুপা কলেজের পড়ার কিছু  নোট নিতে ধীরেনের বাড়িতে গিয়েছিল। রাস্তার ধারের কোন ঘরটায় ধীরেন শোয় রুপা তা জানে। একটা কঞ্চি যোগাড় করে জানলা দিয়েই ধীরেনের গায়ে আলতো করে টোকা দেয়। ধীরেনের ঘুম  ভেঙ্গে যায় রুপা নিচু গলায় ধীরেন কে ডাকে। ধীরেন প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও  ধাতস্থ হয়ে বলে, কি হয়েছে বল। রুপা বলে বিকেলে ওই হনুমানটা আমার মাথায় সিঁদুর ঘষে  দিয়েছে। আমার খুবই বিপদ। আমি পালিয়ে বিলাসপুর চলে যাচ্ছি। আমি ওখানে গিয়ে  খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করে নান হব। এ জীবনে হয়তো তোমার সঙ্গে  আর দেখা হবেনা। আমি আমাদের ইতিহাস, সাহিত্যের সম্পর্কের বই গুলো দিয়ে  গেলাম। তুমি অনেক  কিছু  শিখতে পারবে। লিখতে পারবে। এই ব্যাগটায় সব আছে। যদি ভালো মনে করো আমাকে ঊৎসর্গ করে কিছু লিখ। কথা শেষ করেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল রুপা।

                   (৮)

রাতারাতি ধীরেনদার মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। পরমতম আত্মীয় স্বজন মত দিল সব কিছু ঠিক হয়ে  যাবে বিয়ে দিলে। ধীরেনদার আপত্তি থাকা সত্বেও বিয়েটা গিলে নিতে হলো ধীরেনকে।

বিয়ের কনে মালা, মালাবদল করে কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝতে পারে মানসিক ও শারীরিক দুদিকেই ঠকেছে। মনে মনে ঠিক  করেছিল ওই বেকার বয়ফ্রেন্ড অচিন্ত্যর সঙ্গেই পালিয়ে  যাবে। মা তপতী মেয়ের হাবভাবে বুঝতে পেরে যায় মেয়ের  মতলব। মা মেয়েকে খুশি করতে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় হাবাগোবা বর হলে অনেক সুবিধা। নিজের খুশিমত কাজ করতে পারবি। এদের যে সম্পত্তি আছে হেসে খেলে সুখে খরচা করতে পারবি। মালার মা তপতী চিরদিন সেজেগুজে নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গল্প করে, নিজের সখ আহ্লাদ মিটিয়েই সময় কাটায়।

মালাও মায়ের পথ অনুসরণ করে। ধীরেনদাকে সবার সামনেও ওর ঘাড় কুঁজো করে লেখালেখিকে ব্যঙ্গ করতো। এমন অপদার্থ স্বামী যেন কারও ভাগ্যে না জোটে। ধীরেনদা ঘর থেকে আর বেরোয়না। নিজকে আবদ্ধ করে ঘরেই থাকতো।  শুধু  লেখা নিয়ে থাকতো। মানুষের সব থেকে  বড় অসুখ মনের অসুখ, যা শরীর কে তছনছ করে দেয়। ধীরেনদা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। হাঁফ ছেড়ে  বাঁচলো মালা বৌদি। শ্রাদ্ধর পরদিনই  ধীরেনদার লেখা আর বইগুলো সেরদরে কাপাসওয়ালার কাছে  বিক্রি করে দেয়। ঘরটা এখন ভদ্রস্থ দেখাচ্ছে।

              (৯)

মালা বৌদির মামা তপেশ বোন তপতীর থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। কলকাতার নাম করা এক কলেজের  অধ্যাপক। বিশেষ ব্যস্ততার জন্য শ্রাদ্ধের সময়ে আসতে পারেননি। দু একদিন ভাইঝির বাড়িতে থেকে  ভাইঝিকে সান্ত্বনা দিয়ে  বাড়ি ফিরবেন। হাত-মুখ ধুয়ে আয়েশ করে সান্ধ্য কালীন টিফিন খেয়ে বিছানায় বসলেন গল্প করবে বলে। কার সঙ্গে গল্প করবে সবাই ব্যস্ত। তাছাড়াও  ওনার সঙ্গে ভারী ভারী বিষয় নিয়ে কথা বলার জ্ঞানের অভাব।

তপেশমামা আলমারিতে সাজানো কয়েকটি বই নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখে বইয়ের পিছনে পড়ে রয়েছে  হাতে লেখা কাগজে ভর্তি  একটা ফাইল ওপরে লেখা দশখন্ডের “আদিম আদিবাসীদের আলো-আঁধারি” উৎসর্গ করলাম, “ আমার হৃদয়ের রুপা বেসরা কে।   মামা কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মালাকে ডাকতে থাকে। মালা মামার হাতে ধীরেনের হাতে লেখা কাগজের ফাইল দেখে ঘাবড়ে যায়। সব জঞ্জাল কে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা এলো কোথা থেকে। মামা বলে, ধীরেন যে এইসব লেখে আমাকে জানাসনি কেন। আদিবাসী দলিত সাহিত্যের এক অসাধারণ দলিল তৈরী করেছে। আমি  বলছি জাতীয় পুরস্কার পাবেই। আর সব লেখা কাগজপত্র গুলো কোথায় আছে।  দশটা খন্ডে লিখেছে। অন্য  গুলো কোথায় আছে, দে আমাকে। চার-পাঁচ লাখ টাকা  অনায়াসে পাওয়া  যাবে।

মালা বৌদির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় বলতে পারেনা কি ভুল করেছে এই জীবনে। মামা মালাকে ধমকে বলে তোকে বইটা উৎসর্গ করেনি বলে অমূল্য লেখা গুলো নস্ট করে দিলি।

------//*//------


পরিযায়ী
অভিজিৎ সেন (কোচবিহার)
                                                 
সঙ্গে আছে দুটো টিশার্ট, দুটো জিন্সের প্যান্ট, একটি গামোছা, একটি পাম বালিস,একটি বিছানায় পাতা চাদর, পাঁচ হাজার টাকা, মোবাইল(তবে টাচ্ মোবাইল নয়,মাত্র হাজার টাকা দামের)এবং মায়ের হাতের তৈরী রুটি-তরকারি নিয়ে বছর পনেরোর রূপ রবিদাস চলেছে ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লিতে। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু আর এগোনো সম্ভব হলো না, তবে মেধার জন্য নয়, অর্থের জন্য। পরিবারে মোট আট জন সদস্য। মা,বাবা ছাড়া তিন ভাই ও তিন বোন । বাবা দিনমজুর। একটি ভাই দুই বছরের আর একজন তিন বছরের বড়ো রূপের থেকে ।  প্রাথমিক স্কুলের পর পড়া ছেড়ে দিয়েছে ওরা । বাবার সঙ্গে কাজে যেতো । বাবা এতই অসুস্থ কাজে যেতে পারে না। দাদাদেরও নিয়মিত কোন কাজ নেই। তিন বোনই রূপের থেকে বয়েসে ছোট। করোনা মহামারীর পর থেকে তাদের আর্থিক দুরবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থাভাব দূর করতে লেখাপড়ায় ইতি টেনে রূপ চলেছে নিজের গ্ৰাম, নিজের জন্মস্থান ছেড়ে একেবারে ভিন্ন পরিবেশে । রূপকে কাজের উদ্দেশ্যে যেতে হচ্ছে হিন্দি ভাষা অধ্যুষিত,আত্মীয় বন্ধু বর্জিত দিল্লির মতো মহানগরে । সেখানে একটি প্লাস্টিকের সামগ্ৰি প্রস্তুত কারক কোম্পানিতে চাকরী নিয়েছে মাসিক বারো হাজার টাকার বেতনে,থাকার ব্যবস্থা কোম্পানির। খাওয়া খরচ নিজেকে বহন করতে হবে। গ্ৰাম সম্পর্কের কাকু অবনী মন্ডল তাকে সঙ্গে নিয়ে চলেছে। অবনী বিগত পাঁচ বছর ধরে এখানেই কাজ করে আসছে। প্রতি বছর কোনো না কোন ছেলে অভাবের কারণে তার সঙ্গে কাজের জন্য যায় ।শর্ত শুধু এক বছর তার সঙ্গে কাজ করতে হবে সেখানে । তাদের কাছে লিখিত নিয়ে নেয় অবনী। তাদের প্রমাণ পত্র জমা রাখ এক বছর নিজের কাছে। অবনীর লাভ আছে তাতে সে। মালিকের কাছে কমিশন পেয়ে থাকে । মালিক সস্তা শ্রমিক পেয়ে যায় এবং বছর ধরে পরিশ্রম করিয়ে নেয়, মুনাফা তুলে নেয় কয়েক গুণ। প্রাণচঞ্চল রূপ বাধ্য হয়ে এই শর্ত মেনেই কাজ করতে চলেছে দিল্লিতে ।
                
রূপের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের এক অজ্ঞাত গ্ৰাম কোচবিহার জেলার মোহনপুরে। তার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ধরলা নদী।নদীর দুই তীরে তার বাল্য ও কৈশোরের ছড়িয়ে আছে অজস্র স্মৃতি। দুপুর জুড়ে বন্ধুদের সঙ্গে নদীর বুকে সাঁতার কেটে সময় কাটানো, ঘাটে বাঁধা সোলেমান চাচার ছোট খেয়াটি নিয়ে মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যাওয়া। চাচা জানতো এটা কে করেছে? সে পাড়ে বসে অপেক্ষা করতো । মিনিট দশেক পরে রূপ খেয়া নিয়ে এলে এক গাল হেসে চাচা বলতেন,''কেমন মজা পাইলা আব্বাজান ?" রূপ বলতো ''সেই মজা চাচা । তোমার কাজে একটু দেরি করে দিলাম"। চাচা আবার হেসে বলে,''আমার বেটা রহিম আর তুমি কি আলাদা? আমার কাজের কোন ক্ষতি হয় নাই বাপ'' ! এই বলে মাছ ধরতে নদীর বুকে ভেসে চলে যেত। নদীর তীরে বাড়ি, সেই কারণে বর্ষার সময় তাদের গ্ৰাম,জলে ডুবে যেত প্রতি বছর । এটা এখানের খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বছর বছর দুর্গা পূজার মতোই যেন ব্যাপারটি ! জল নেমে গেলে বন্ধুরা মিলে মাছ ধরায় নেমে পড়তো । রূপের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি ।
             
বর্ষা চলে যাওয়ার পর শরতকাল নরম সাদা কাশের দোলায় নদীর তীর আলো করে রাখতো । গভীর নীল আকাশ স্বচ্ছ আয়নায় মতো নদীর স্থির জলে অব্যক্ত প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করতো,রূপ সেই দৃশ্যের গভীর থেকে গভীরে হারিয়ে যেত ।এক সিগ্ধ মায়াঞ্জনে আচ্ছন্ন হয়ে যেত তার মন । এক সুরেলা আবেগের শিহরণ নদীর বুক থেকে উঠে এসে তার শিরা ধমনীর প্রবাহের সঙ্গে মিশে যেত। শরৎ‌ ভোরের শিউলি ফুলের কোমল আবেশ, শিশির ভেজা ঘাসের রেশম-তুলতুলে আহ্বান,সবুজ কচি কচি চারা ধানের মৃদুল আলোড়ন,শাপলা শালুক ফুলের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য,পদ্মবনের মোহিনী মুগ্ধতা সবকিছু মিলেমিশে তার কানে,অনুরণনের মতো যেন কী একটা বেজে চলতো ! দিনরাত শারদীয় ঢাকের চির পরিচিত তাল ও বোল যেন শুনতে পেতো । তার মনে হতো আকাশে বাতাসে কে যেন নূপুর পায়েবেঁধে অতি ধীর লয়ে হেঁটে চলেছে । নিত্যদিনের ব্যথা বেদনা হতাশা ব্যর্থতা দূরে সরিয়ে রেখে গভীর ভালোবাসার টানে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে সপরিবারে দুর্গা মায়ের শারদ উৎসবে । শুরু হয়ে যেত বাঙালির আনন্দের উৎসব, দুর্গোৎসব--- ‌রূপ এ আনন্দটুকুর জন্য অপেক্ষা করে থাকে বছর ধরে।
          
তাদের গ্ৰামেই খুব বড়ো করে পূজা হয় । সকলকেই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হতো। রূপ ও তার সমবয়সী বন্ধুরা চাঁদা সংগ্ৰহ, মূর্তি আনার কাজ করতো। পঞ্চমীর আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত তাদের আয়োজন। মূর্তি পাশের গ্ৰামের মদন পালের ওখান থেকে আসছে শুরু থেকেই। তার পরিবার সুনামের সঙ্গে একাজ করে চলেছে বংশপরম্পরা ধরে । সাবেকি ধাঁচের প্রতিমা, একটি কাঠামোতেই সপরিবারে মা দুর্গ । গ্ৰামের মানুষের অভাব থাকলেও এ কটি দিন আনন্দের ঘোরেই কাটিয়ে দেন তারা মাতৃ আরাধনায় । সপ্তমী,অষ্টমী,নবমী ভালই কেটে যায় দশমীর দিনে মায়ের নিরঞ্জনের সাথে সাথে বিষণ্ণতা নেমে আসে গ্ৰামবাসীর মনে। রূপের মনেও । সেদিন সারা রাত ধরে অতি উচ্চ স্বরে ডি.জে বাজিয়ে বন্ধুরা পিকনিকে মত্ত হয়ে উঠলেও শূন্য মন্ডপের সামনে এলে রূপের মনের ভেতরটা শূন্য হয়ে যেতো।ঔদাসীন্যের ঘূর্ণিঝড় তাকে যেন ঘিরে ধরতো । তাদের পাশের গ্ৰাম শিকারপুরে বেশ বড়ো আকারে কালীপূজা হয়। নানা রঙ্গের বৈদ্যুতিক আলোর রোশনাই দিনের মতো করে তোলে রাতের পথ । শহরের মতো বিগ বাজেটের পুজো না হলেও আমোদ আনন্দের তিল মাত্র অভাব থাকে না। 
                
ট্রেনের কামরায় বসে অতীত কথাগুলো স্মৃতির পাতা বেয়ে যতই উঠে আসছিল ততই এক অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে ঘূণকীটের মতো করে দংশন করে চলেছিল। এ যেন উদ্বাস্তুদের স্বজন স্বদেশ হারানোর চাপা আর্তনাদ এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ধারাবাহিক কালকূট যাপন । কী এক ব্যথা তার বুকের উপর চেপে বসেছে ! অসহনীয় দারিদ্র্য ও অভাবের কাছে সম্পূর্ণ পরাভূত, এই প্রাণচঞ্চল কিশোরটি । শৈশবের, কৈশোরের অচ্ছেদ্য আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার বিসর্জন দিয়ে বাস্তবের কঠিন কঠোর মাটিতে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে আজ।  নদীর বাঁকের মতো জীবন, জীবন বাঁক নিলে জীবনের চিত্রপট বদলে যায়। জীবন,কবিতার ব্যঞ্জনাময় লালিত্য ছেড়ে গদ্যের ঋজু তীক্ষ্ম পাথুরে পথে হেঁটে যেতে শুরু করে। বাল্য কৈশোরের ভাবনাহীন কল্পোলোক ছেড়ে রূপকথার, কার্টুনের আর খেলাধুলার জীবন ও জগৎ ছেড়ে রূপ লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের একজন আজ । দেশে,পরিযায়ী শ্রমিকের একটি সংখ্যা শুধু মাত্র বৃদ্ধি পেল !
             
নিউ কোচবিহার রেল স্টেশন থেকে 
যাত্রা শুরু করেছে। ট্রেন একটু একটু করে গতি বাড়িয়ে চলেছে। তার চেনা পৃথিবীকে,সহজ আনন্দের জগতকে, আত্মীয়,বন্ধু,পরিবারের সকলকে পিছনে ফেলে  এগিয়ে চলেছে এক নতুন অচেনা মানুষের পৃথিবীতে। কিছুতেই মনকে শান্ত করতে পারছিলো না। আবার পিছিয়ে আসাও
সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্যদের রক্তশূন্য মুখ,অভুক্ত রাত,  অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ,বাবার অসুস্থতা, মায়ের নির্বাক চোখের আতঙ্ক, ছোট ছোট বোনেদের সারল্য মাখা মায়াবী চোখের অবুঝ আবদার তাকে কোথা থেকে যেন আসুরিক রকমের শক্তি যুগিয়ে চলেছে-- দূরে কাজে যেতে । বিভিন্ন স্টেশনে গাড়ি এসে দাঁড়াচ্ছে। কতো বিচিত্র মানুষ, কতো বিচিত্র পোশাক, ভাষা ও খাবার। জীবনে এতোকিছু সে একসাথে কোথাও দেখেনি। একবার কোচবিহারের মদনমোহন ঠাকুরের রাসের মেলায় এসেছিল। সেখানে দেখেছিল অনেক রকম মানুষকে । কিন্তু আজকের মতো এত বৈচিত্র্য আর কখনো দেখেনি । আজ জীবিকার প্রয়োজনে, অভাবের নির্মম চাবুকে রেসের মাঠের ঘোড়ার মতন ছুটে চলতে হচ্ছে যেন তাকে ।
       
মাতৃভূমি বাংলা পার হয়ে গেছে। হিন্দি ভাষা অধ্যুষিত এলাকায় গাড়ি ছুটে চলেছে। হিন্দি ভাষা বোঝে, কাজ চালানোর মতো বলতেও পারে । ট্রেনের কামরায় বসে জানালার ফাঁক দিয়ে দুরন্ত বেগে পেছনে ছুটে যাওয়া গাছ, মানুষ, নদী, বাজার, হাট, খেলার মাঠ, শ্মশান যা যা চোখে পড়েছে যতোটা পারছে মনের খাতায় ছবির মতো এঁকে নিচ্ছে। হঠাৎ অবনী কাকু বললো," কি রে কিছু খাবি ? অনেকক্ষণ কিছু তোর খাওয়া হয় নি।" মুড়িমাখা,চা দুজনে‌ খেলো। অবনীর ধূমপানের অভ্যাস। কিন্তু ট্রেনে খায় না, জরিমানার ভয়ে। তামাক পাতার গুঁড়া হাতের তালুতে মিহি করে দলে তার কালো ঠোঁট ফাঁক করে দাঁতের গোড়ায় ঠেলে দিলো । ভাবুক স্বভাবের রূপ বিস্ময়ভরা চোখে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের অজানা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। রাতে মায়ের দেওয়া খাবার খেলো । গভীর রাতের শীতল স্নিগ্ধতা এতোটা রমনীয় ও কমনীয় হয় রূপের আগে এতটা অনুভব হয়নি, আজ যতটা হচ্ছে। হয়তো বাড়ি থেকে দূরে আছে বলে । বাড়ির আশেপাশের রাত্রিকালীন  নীরবতাও মনে পড়ছে খুব গভীরভাবে । রাতের আঁধার ও নীরবতার বুক চিরে দুরন্ত গতিতে গাড়িটি প্রচন্ড শব্দ করে এগিয়ে চলেছে । পেছনে ছুটে চলে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত। বিচ্ছেদ যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ,আজ বেশ বুঝতে পারছে রূপ । জীবনের কোন সম্পর্কই স্থায়ী নয়,অটুট নয় যেন এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সে বুঝতে পেরেছে ।
          
যখনই কোন স্টেশনে এসে দাঁড়াচ্ছে তখন কেউ জলের বোতল নিয়ে, কেউ কাগজের মতো পাতলা রুটি ও ঝাল ঝাল আলুর তরকারি নিয়ে, কেউ বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে, দই, মিস্টি নিয়ে ছুটে আসছে । গাড়ির কামরায় ঘুরে বিক্রি করছে । দুই বা তিন মিনিটের বিরতির ফাঁকে যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ প্ল্যাটফর্মে নেমে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে নিচ্ছে । ট্রেনের কামরায় হকাররা সূচ 
থেকে শুরু করে চাদর,গামছা,পিলো, বাচ্চাদের খেলনা বেশি দামে বিক্রি করছে। কেউ কিনছে, কেউ দেখে ফিরিয়ে দিচ্ছে । স্টেশনে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ভিক্ষে করছে । অর্থ ও খাদ্য চেয়ে যাত্রিদের পা জড়িয়ে ধরছে । কেউ আবার রেলের কামরার নোংরা মেঝে ঝাড় দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। একদল কিন্নর তাদের কামরায় এলো । দুই হাতে তালি দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করল । রূপ এদের কথা শুনেছিল আগে দেখেনি আজ দেখলো কাছ থেকে । যারা দিচ্ছে মাথায় হাত দিয়ে আশিস্ দিচ্ছে না দিলে কেউ অশ্লীলভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে বা গালাগাল দিচ্ছে। রূপ যতো এগিয়ে চলেছে জীবনের রহস্য বর্ণময় হয়ে ধরা পড়ছে তার জিজ্ঞাসু কিশোর চোখে । অন্ধ ভিক্ষুক বাঁশি বাজিয়ে গান করছিল। রূপ তার হাতে দশ টাকা দিলো । গান শুনে রূপের উদাস মনও গুন্ গুনিয়ে উঠলো-- "কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম পাখির নেই স্থায়ী ঠিকানা/পাখি কাঁদে, আর কাঁদে পাখির আপনজনা ।" তিন দিন পরে তারা দিল্লি এসে পৌঁছায়। তাদের জায়গা কারখানার ভেতরে বস্তি এলাকার মতো ছোট ছোট ঘরে ।এক ঘরে দুজন করে থাকার ব্যবস্থা। দুটি চৌকি পাতার পরে মাঝে দুই হাত জায়গা অবশিষ্ট থাকে, সে সংকীর্ণ পথে দুজনকেই যাতায়াত করতে হয়। মোট ষাটজন শ্রমিক সেখানে থাকে । স্নানাগার ও শৌচাগার বেশ কয়েকটি আছে তবে সকলের জন্য । শ্রমিকদের মধ্যে দিল্লির কেউই নেই, বেশির ভাগই বাংলা, বিহার এবং ওড়িশা থেকে এসেছে। প্রত্যেকের সমস্যা এক একটি ট্র্যাজেডি।পরেরদিন সকাল আটটায় সাইরেন বাজে । সাইরিন বাজার দশ মিনিটের মধ্যে কাজে যেতে হবে । আগের দিন অবনী কাকু কারখানার নিয়ম বুঝিয়ে দিয়েছিল। রূপ সকাল পাঁচটায় প্রতিদিন ওঠে,প্রাতকৃত্য করে, সামান্য কসরতের পর ছোলা গুড় খায় । আজ তাই করে কাজের উদ্যোশে বেরোলো। বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ। মাঝে বেলা ১টা থেকে ১টা৩০ পর্যন্ত বিরতি। ভেতরে ক্যান্টিন আছে। দিনে ও‌ রাতে খোলা থাকে। রূপের রান্নার সমস্যা থাকলো না । এখানেই খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা হয়ে গেল। খাওয়া খরচ অস্বাভাবিক নয়, এটাই রক্ষ্যা । দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। রূপ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। রূপের মতই পরিস্কার ও সরল মনের উজ্জ্বল মহাপাত্র নামের ষোল বছরের ছেলেটি। সে এই ঘরে থাকে । তার বাড়ি উড়িষ্যায়। রূপকে তারও ভালোই লেগেছে। তেমনি রূপেরও ।
             
রূপ, এখানে আলো ঝলমলে রাতের প্রশস্ত সরক দেখেছে, দ্রুতগামী যানবাহন দেখেছে, অগণিত বিদেশি পর্যটক দেখেছে, নানা ধরনের মনোলুব্ধকর খাদ্যের নিত্য আয়োজন দেখেছে,ভোগ বিলাসের স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষদের দেখেছে---সব ধরনের আয়োজন ছড়িয়ে আছে শুধু প্রয়োজন অপর্যাপ্ত অঢেল অর্থের। বিলাসিতায় গা
ভাসানোর অবকাশ ও মানসিকতা তার নেই। সহজ সরল জীবনযাপন করতেই বরাবর পছন্দ করে রূপ। সে এখানে কেন এসেছে একটি মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি, নাগরিক বিলাসিতায় প্রলুব্ধ হয়ে ভেসে যায়নি । মন দিয়ে সে কাজ করে। ফাঁকি দেয় না কাজে । অবনী কাকু এবং কারখানার মালিক দুজনেই তার প্রতি সন্তুষ্ট। 
                
যখন বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিল তখন শ্রাবণ 
মাস । আজ তার কাজের এক মাস পূর্ণ হলো। এটা ভাদ্র। শরতের সূচনা কাল । বাংলার আকাশে বাতাসে ঢাকের কাঠির বোল বাজতে শুরু করেছে। দিল্লির প্রকৃতি একেবারে ভিন্ন চরিত্রের । শুষ্কতা, ধোঁয়া ।  গগনচুম্বী ইমারত, দূষণযুক্ত শ্বাসরোধী বাতাস, কলুষিত যমুনার প্রবাহ, ঘিঞ্জি এলাকার মানুষের অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, আবেগ শূন্য ও আত্মকেন্দ্রিক,ভোগসর্বস্ব ও যান্ত্রিক জীবনে শরতের সামান্য ছোঁয়াটুক পর্যন্ত নেই। রবিবার ছুটি। দীপাবলিতে দুদিন ছুটি থাকে। দুর্গা পূজার কোন ছুটি নেই। এক রবিবারে উজ্জলকে নিয়ে যমুনার তীরে বেড়াতে এসেছিল। ছোট থেকেই তো সে মুক্ত পাখির মতন ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতো । যমুনার তীরে বসে তার বাড়ির পাশের নদীর কথা, নদীর দু ধারের সৌন্দর্যের কথা মনে পড়ছিল । শরতের সময় বাড়ি থেকে একটু দূরে মানসাই নদীর তীরে ত্রিকোণীয়ার ছোট্ট পার্কটিতে সাইকেল করে চলে আসতো । এ সময় নদী যেন স্বচ্ছ আয়না । ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকো ভেসে চলেছে। নীল আকাশের বুকেও ভেসে চলেছে পাল্লা দিয়ে সাদা বর্ণের‌ মেঘ --নৌকার মতন।একেই স্বর্গের শোভা মনে হতো তার। মেঘখণ্ডগুলো যেন পৃথিবী থেকে বার্তা নিয়ে চলেছে কৈলাসের উদ্যেশ্যে । মা দুর্গা যেন পরিবার সমেত পৃথিবীর সন্তানদের সঙ্গে কয়েক দিন আনন্দে আবেগে কাটিয়ে যান । শারদীয়ার দুর্গোৎসব বাংলার সমগ্ৰ প্রকৃতি জুড়ে যে ধরনের মাদকতা ছড়িয়ে দেয়, এক অলৌকিক আবেগ সকলের মনের স্তর ধরে নামতে থাকে চৈতন্যের  নানা স্তরে । অজস্র ইচ্ছারা জমাট বাঁধে মধুর চাকের মতন তখন থেকেই । বাংলার আকাশ বাতাসে, প্রতিটি ঘাসে, ভোরের শিশির বিন্দুতে, মাটির বুকে ছড়িয়ে থাকা শিউলি ফুলে পদ্মফুলের  জলবিন্দুতে, শুভ্র অথবা খয়েরি রঙের অজস্র শাপলা-শালুকে, সবুজ কচি চারাধানের সুশীল শিহরনে, ভোরের হিমেল হাওয়ার দোলায় মায়ের আগমনের পদধ্বনি যেন প্রতিটি মুহূর্তে শুনতে পেয়ে থাকে বাঙ্গালী তার সমগ্ৰ সত্তা জুড়ে। রূপ, উজ্জ্বলকে বলছে," আর পনেরো দিন পরেই আমাদের ওখানে দুর্গাপূজা। পূজায় কতো যে আনন্দ হয় তোমাকে কী বলবো। এবার ভেবেছিলাম বন্ধুরা মিলে চপ,মোমোর দোকান দিবো, হলো না। পূজার কয়টি দিনই আমাদের আনন্দের দিন। বাকি দিনগুলো যন্ত্রণার কাঁটাই আমাদের পাথেয় । " এই বলে রূপ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো। দুর্গাপূজা চলে এলো। দুর্গাপূজায় ছুটি পাওয়া যায় না । গেলে বিনা বেতনে যেতে হবে। কাল পঞ্চমী । সে নেই।গ্ৰামে পূজার আয়োজন চলছে। সে নেই সে যন্ত্রণা শুধু তার নিজের। দিল্লিতে বাঙ্গালীরা মিলে কোথাও পূজা করে থাকলেও বাংলার মতো আনন্দ কোথায়? সবেতেই কৃত্তিমতা, যান্ত্রিকতা।
       
ষষ্ঠীও চলে গেল। আজ সপ্তমী। পঞ্চমীর আগে থেকেই দেবী দর্শনের জন্য বাংলার বুকে জনস্রোত বন্যার মতোই নেমে আসে। এখানে সেই আবেগ, উৎসাহ কোথায়?কাজ করতে করতে এসব ভাবছে । নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে পেল দূর থেকে একদল আকাশী-হলুদ রঙের বিদেশি পাখির ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেলো। পাখিগুলো দেখে সে চিনতে পেরেছে। এদের সে তাদের বাড়ির ওখানে নদীর পাড়ে দেখেছে । শরৎকালেই আসে বাংলায় এই পরিযায়ী  পাখির দল,শরতের শেষে আবার ফিরে যায় । রূপ বাড়ি ফিরে যেতে পারলোনা পুজোর দিনে ! তাই যেন পাখিগুলোর ডানায় মনকে পাঠিয়ে দিল তার গ্ৰামে । 
          
বন্ধুদের মধ্যে একজন নবমীর রাতে রূপকে ফোন 
করেছে । রূপের সঙ্গে কতো কথা হলো। সে বললো, "আমি ভিডিও কল করছি তুই গ্ৰামের পূজার আয়োজন দেখ্ । ও তোর ফোনে তো ভিডিও কল হবে না। অবনী কাকুর ফোনে হবে ।" রূপ ভিডিও কলে গ্ৰামের দুর্গা পূজার আয়োজন দেখলো কয়েক মিনিট, তারপরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল । পরিস্থিতি ও জীবনের কঠিন বাঁক রূপকে বাধ্য করেছে অনলাইনে নিজের গ্রামের দুর্গাপূজা দেখতে । জীবন কখন কাকে কোথায় এনে দাঁড় করাবে কেউ বলতে পারে না ! রূপ টাকা রোজগার করছে, বাড়িতে পাঠিয়েছে। বাড়ির আর্থিক দুরবস্থা ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করেছে। জীবন তার নানা পরীক্ষা নিয়ে চলেছে । তার ব্যবহারে আর কাজে মালিক খুশি। 
কোম্পানিতে তার আয় বেড়েছে, পদোন্নতি হয়েছে। এখন সে অবনী কাকুর শর্ত থাকে মুক্ত । দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চলে গেল। পরিযায়ী পাখির দলটি ঠিক সময়ে তার মাথায় উপর দিয়ে শব্দ করতে করতে উড়ে যায় । তারা তার গ্ৰামের নদীর চরে যাবে,আবার এ পথ ধরেই ফিরে আসবে । রূপ সেটাই দেখে প্রতিবছর । রূপের অনেক দায়িত্ব। অনেক টাকা উপার্জন করতে হবে। যখনই ওই পরিযায়ী পাখিগুলোকে দেখে তখন রূপের শৈশব, কৈশোর,নদীর চর,গ্রামের খেলার মাঠ সব যেন আবর্তিত হতে থাকে তার চৈতন্যের প্রতিটি স্তর ধরে। দিন রাতের মতো সে শুধু ঘুরে চলেছে চাকার মতো । তার বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা
 পরিযায়ী পাখির ডানায় উড়তে থাকে,আর সে দিল্লির ছোট্ট ঘরটির সংকীর্ণ জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে উড়ে যাওয়া পরিযায়ী পাখিগুলির সাথে মনে মনে !  কোথায় যেন উড়ে যেতে থাকে ?

------//*//------

সাহিত্যের আলো শীত সংখ্যা ১৪৩২ (প্রবন্ধ)


সুচিপত্র : 
১/ COP 30 জলবায়ু ন্যায়বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বহুমুখী ভূমিকা - শ্যামল প্রসাদ চৌধুরী
২/ অর্ধেক আকাশ - শংকর ব্রহ্ম (কলকাতা)
৩/ সর্বপ্রথম কৃত্রিম প্রজননে শাবক ও আলিপুর চিড়িয়াখানা - শৌনক ঠাকুর (মুর্শিদাবাদ)
৪/ শীতের  দিনের হারানো স্মৃতি - সামসুজ জামান (কলকাতা)

------//*//------



COP 30 জলবায়ু ন্যায়বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের বহুমুখী ভূমিকা 

শ্যামল প্রসাদ চৌধুরী (পরিবেশবিদ,সম্পাদক শ্রীভূমি ফ্রেন্ডস অফ আর্থ)



প্রায় প্রতিটি দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) ব্রাজিলের বেলেম শহরে COP30 শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছে। COP30  জলবায়ু ন্যায়বিচার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জলবায়ু বিষয়ক গবেষণায় অস্থির পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।কপ-৩০-এর আগে প্রকাশিত ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনগুলোতে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উষ্ণ তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়া সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি করবে, মানব স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার উপর প্রভাব ফেলবে এবং কৃষি, বনজ, মৎস্য ও পর্যটনের মতো খাতগুলিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।

তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, চরম আবহাওয়া প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, আর বহু বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে।

আইপিসিসির জুন মাসের আপডেট অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা এখন প্রতি দশকে 0.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছে, যা ১৯৯০-র দশকের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ দ্রুত। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যেই তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে, যা বিংশ শতাব্দীর হারের দ্বিগুণ।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৫ সাল হবে ইতিহাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর। 

১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার বিপজ্জনক অতিক্রম এড়ানোর জন্য বিশ্ব সময় ফুরিয়ে আসছে। বিলম্বিত পদক্ষেপের ফলে ইতিমধ্যেই উচ্চতর ক্রমবর্ধমান নির্গমনের দিকে এগিয়ে গেছে, এবং নতুন প্রমাণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে জলবায়ু ব্যবস্থা পূর্বের ধারণার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল হতে পারে। দ্রুত, গভীর নির্গমন হ্রাস - ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০% এর বেশি - না হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি হয়ে পড়বে, যার ফলে মানুষ এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর মারাত্মক পরিণতি ঘটবে," জলবায়ু বিশ্লেষণের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিল হেয়ার বলেন।

জাতিসংঘের হিসাব বলছে, এখন বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী তীব্র গরমের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘১.৫ ডিগ্রির সীমা(Paris threshold )ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে তা হবে নৈতিক ও চরম ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী উদাসীনতা।’

বিশ্ব জুড়ে ক্লাইমেট চেঞ্জ এর ভয়াবহ কিছু তথ্য যেমন - মার্চ ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দাবানলে ৩.৭ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বনভূমি পুড়ে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। ইউরোপে ২০২৪ সালের ভয়াবহ গ্রীষ্মে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৭০০ জন। ২০২৫ সালেও ২৪ হাজার ৪০০ জন মারা গেছে।

দ্য ল্যানসেট-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, তাপের কারণে ২০২৪ সালে কর্মক্ষমতা কমায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

জীববৈচিত্র্য এখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। সমুদ্রে উষ্ণ জলের  কারণে প্রবাল প্রাচীরের স্থায়ী ধ্বংস শুরু হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করছেন, ১. ৫ ডিগ্রি উষ্ণতা অতিক্রম করলে আমাজন অরণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত ঘটছে। গলতে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বরফ উত্তর আটলান্টিক স্রোত (এএমওসি) বন্ধ করে দিতে পারে, ফলে ইউরোপের শীত আরও তীব্র হবে।অন্যদিকে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যাওয়ায় সাগরের অন্ধকার জলরাশি আরও বেশি সূর্যালোক শোষণ করছে, যা তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এবং সমুদ্রের কার্বন শোষণ ক্ষমতা (কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন) কমিয়ে দিচ্ছে।  

এসব বাস্তবতায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, ‘১.৫ ডিগ্রির সীমা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে তা হবে নৈতিক ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী উদাসীনতা।’বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের সর্বশেষ পরিস্থিতি

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) এমিশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫ জানায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে ২০৩৫ সালের মধ্যে (২০১৯ সালের তুলনায়) নিঃসরণ ৩৫ শতাংশ কমাতে হবে। আর ১. ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে চাইলে নিঃসরণ কমাতে হবে ৫৫ শতাংশ। বর্তমান গতিপ্রকৃতি অনুসারে, যদি বড় পরিবর্তন না আসে, তবে ২১০০ সালের মধ্যে উষ্ণতা ২.৫ থেকে ২.৯ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। এতে পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে মহাবিপর্যয়।

গ্লোবাল এনার্জি রিভিউ ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জ্বালানি খাত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ বেড়েছে, যদিও বৃদ্ধি হার কিছুটা ধীর হয়েছে।

অন্যদিকে  অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে বাড়বে এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও বেড়ে যাবে।

জাতিসংঘের (ইউএনএফসিসিসি) এক আপডেটে বলা হয়েছে, দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১২ শতাংশ কমতে পারে। কিন্তু ওইসিডির ক্লাইমেট অ্যাকশন মনিটর ২০২৫ সতর্ক করেছে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে—ফলে নিঃসরণ এখনো রেকর্ড উচ্চতায় রয়ে গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিঃসরণকারী দেশ চীন কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে। কার্বন ব্রিফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টানা ১৮ মাস ধরে চীনের কার্বন নিঃসরণ স্থিতিশীল রয়েছে বা বেড়ে গেছে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ গোটা বিশ্বে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির দেখা দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা ভারতের পরেই দ্বিতীয়।পরিবর্তিত জলবায়ুর অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই ভোগ করছে  বিভিন্ন রাষ্ট্র গুলি।  ২০১৮ সালে প্রকাশিত চতুর্থ জাতীয় জলবায়ু মূল্যায়নে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, যদি আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন রোধ না করি এবং অভিযোজন শুরু না করি, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব সামাজিক ও  অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে

বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষতির সঙ্গে  মার্কিন ব্যবসায়কেও প্রভাবিত করবে।

বৈরী প্রকৃতি, আবহাওয়ার এলোমেলো আচরণ, হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা তীব্র খরা—এসব  কৃষিনির্ভর মানুষদের এখন বড় বেশি ভাবাচ্ছে। ব্যাহত হবে উৎপাদন। অবিরাম  জলবায়ু পরিবর্তন বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক সুযোগের উপর নাটকীয় প্রভাব ফেলবে।

বিশ্বের মানুষ তাকিয়েছিলো কপ সম্মেলন এর উপর।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য বিশ্ব নেতাদের, বিজ্ঞানীদের এবং অন্যান্য প্রতিনিধিদের একত্রিত করবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই সম্মেলনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ এটি আমাজন রেইনফরেস্টের কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছিল  এবং জলবায়ু পরিবর্তনের উপর জরুরি পদক্ষেপ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হব বলে আশা প্রকাশ করেছিলে বিশ্ববাসী ।কিন্তু দেখা গেলো বন উজাড় বন্ধের জন্য কোনও রোডম্যাপ নেইl

ধনী আর শিল্পনির্ভরদেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নে মূল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর দায় তারা নিচ্ছে না। তারা স্বচ্ছ জ্বালানির কথা বলে থাকে। কিন্তু এতে বিপুল অর্থায়ন দরকার, সেটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।সৌদি আরব এবং রাশিয়া সহ প্রধান পেট্রোস্টেটগুলির চাপের মুখে, COP30 । ভারত সাহসের সাথে তার সমস্ত অবস্থান নিয়েছে । ভারত তার উন্নয়ন যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে - যেখানে জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একত্রিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর জলবায়ু  ও পরিবেশ নীতিগুলির প্রভাব বহুমুখী, যার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন মডেল(development )যা ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক , মানব কল্যাণকর, জলবায়ু এবং  ১০০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব।

জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের প্রাকৃতিক পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সমাজকে ক্রমবর্ধমান হারে প্রভাবিত করছে।

জলবায়ু ও পরিবেশগত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতির মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক হিমবাহ রক্ষা,গ্রীন ইকোনমি ,সার্কুলার ইকোনমি,সবুজায়ন, একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক হ্রাস ,সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শক্তি, ইকোফ্রেন্ডলি লাইফস্টাইল এবং পরিষ্কার রান্নার জ্বালানি উৎপাদন। জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য ভারত তার নীতিগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ৩০শে জুন ২০০৮ তারিখে, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAPCC) প্রকাশিত হয়। এই পরিকল্পনায় ভারতের উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য একাধিক পদক্ষেপের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAPCC) বিভিন্ন পদক্ষেপকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আটটি লক্ষ্যের উপর আলোকপাত করে।এটি ভারতের উন্নয়নের পথে পরিবেশগত স্থায়িত্বকে অভিযোজিত এবং বৃদ্ধি  করার  জন্য ৮টি উপ-মিশনের একটি জাতীয় কৌশল। এগুলি হল জাতীয় সৌর মিশন (NSM), বর্ধিত শক্তি দক্ষতার জন্য জাতীয় মিশন (NMEEE), টেকসই বাসস্থান সংক্রান্ত জাতীয় মিশন (NMSH), জাতীয় জল মিশন (NWM), হিমালয় বাস্তুতন্ত্র টেকসই করার জন্য জাতীয় মিশন (NMSHE), জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৌশলগত জ্ঞানের জন্য জাতীয় মিশন (NMSKCC), একটি সবুজ ভারতের জন্য জাতীয় মিশন (GIM), এবং টেকসই কৃষির জন্য জাতীয় মিশন (NMSA)।ভারতের বনভূমি রক্ষা, পুনরুদ্ধার বৃদ্ধি করা , টেকসই কৃষি, পরিচ্ছন্ন শক্তি  এবং জলবায়ু পরিবর্তন  এই মিশনের উদ্দেশ্য। জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অধীনে আটটি মিশনের মধ্যে একটি হল সবুজ ভারতের জন্য জাতীয় মিশন (GIM) ও গ্রীন এনার্জি মিশন ফর ইন্ডিয়ান" যা  দুটি প্রধান জাতীয় উদ্যোগকে বোঝানো হয়, ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন এবং ন্যাশনাল মিশন ফর এ গ্রিন ইন্ডিয়া (GIM)।জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গ্রীন ইন্ডিয়া মিশন' একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জাতীয় সবুজ হাইড্রোজেন মিশন ৪ জানুয়ারী ২০২২ তারিখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল।ভারত সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২৫ GW গিগাওয়াট হবে। ২০৭০ সালের জন্য নেট-জিরো লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো এবং সবুজ অর্থায়নের চারপাশে ক্রমবর্ধমান গতির সাথে, এখন আমাদের দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ।

৩ আগস্ট ২০২২ তারিখে, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা প্যারিস চুক্তির অধীনে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) দ্বারা বিবেচনার জন্য আপডেট করা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) পাস করে, যার মাধ্যমে ২০৭০ সালের মধ্যে ভারতের নিট শূন্য নির্গমনের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এটি ছিল পঞ্চামৃত (পাঁচটি অমৃত উপাদান) - জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ভারতের কর্ম পরিকল্পনার একটি অনুবাদ, যা  গ্লাসগোতে COP 26-তে ঘোষিত হয়েছিল।ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে নেট শূন্যে পৌঁছানোর লক্ষ্য রাখে এবং তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তার নির্গমন থেকে দ্বিগুণ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায় । 

ভারতকে  কপ৩০-এ জলবায়ু অর্থায়নের ও সিটিটি(ক্লিন কার্বন টেকনোলজি ট্রান্সফার), সিডিএম (ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম) এর সুবিচারের জন্য সোচ্চার হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা।

ভারতকে জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য স্থিতিস্থাপকতা এবং ক্ষমতা জোরদার করা, দেশীয় নীতি, কৌশল এবং পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যবস্থাগুলি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলার মাধ্যমে SDG 13 অর্জনের জন্য ভারত কাজ করছে। কপ ৩০-এর সফলতা নির্ভর করছে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত হওয়ার উপর। যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগ, অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করা এবং কার্বন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করার মতো পদক্ষেপ।উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও এখন কার্বন ট্যাক্স চালুর পরিকল্পনা করছে।ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ব্রাজিল কপ৩০-এ যৌথভাবে একটি কার্বন বাজার জোট গঠন করেছে, যাতে নিঃসরণের ওপর মূল্য নির্ধারণ কার্যকর হয়। 

SDG ১৩ ক্লাইমেট একশনএর লক্ষ্য হল জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে: জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য স্থিতিস্থাপকতা এবং ক্ষমতা জোরদার করা, দেশীয় নীতি, কৌশল এবং পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যবস্থাগুলি অন্তর্ভুক্ত করা।জলবায়ু পরিবর্তন, এর প্রভাব হ্রাস এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতা সম্পর্কে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।টাইম ইস fleeting। *প্যারিস চুক্তির দশ বছর পর, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উষ্ণায়নের* পূর্বাভাসে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি ।আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল,শুধু টিকে থাকা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবন গড়ে তোলা।আর এই অভিযোজনে সবার অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

এটি একধরনের সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন।   কিভাবে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে আমরা সবাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ভূমিকা রাখতে পারি। আসুন সবাই মিলে শপথ করি- পরিবেশ রক্ষা করব, সচেতন থাকব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলব।


(লেখক ব্রাজিল এর কপ 30 সম্মেলনে ডিজিটাল/ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ করেন)

------//*//------


 অর্ধেক আকাশ
শংকর ব্রহ্ম (কলকাতা)

আদিকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত লক্ষ্য করলে দেখা যায় নারীরা ইতিহাস থেকে শুরু করে সকল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেছে।     

অবমাননা ও অত্যাচারে অভ্যস্ত নারী প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হলেও, একথা অনস্বীকার্য যে নারী শক্তি ছাড়া পৃথিবীতে উন্নতি সম্ভব হত না, ভবিষ্যতেও হবে না। 

ঘরে -বাইরে সব জায়গায় একা-হাতেই নারী সুষ্ঠুভাবে সামলাতে পারে কারও সাহায্য ছাড়াই। আধুনিক সমাজে নারী আজ আর পিছিয়ে নেই। 

কথায় আছে, ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। শিক্ষা, কর্তৃত্বে ,গুণে, মানে সব ক্ষেত্রেই পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে তারা। নারীরা আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারাও কোনও অংশে কম নয়। তাই সর্বযুগে সর্বকালে মানুষের মনে নারীশক্তি মর্যাদা পেয়েছে।               

ইতিমধ্যে নারীরা নিজেদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে পারদর্শী । তাই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ও আজ নারীশক্তির জয়জয়কার । প্রকৃত অর্থে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের সাথে সাথে তারাও সমান অধিকার ও সম্মানের দাবিদার। 

একজন নারীর বুদ্ধিমত্তা, সাহস, ব্যক্তিত্ব এবং প্রত্যুত্‍পন্নমতিত্ব কোনও অংশেই পুরুষের থেকে কম নয়। তা বর্তমান যুগের আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারীরা প্রমাণ করেছেন।

অমিত সম্ভাবনার অধিকারী নারী হল প্রকৃত শক্তির আধার, নারীশক্তি বিহীন পৃথিবী সামনের দিকে এগোতে পারে না। 

নারী বিহীন পুরুষের একক প্রচেষ্টার মাধ্যমে  সমাজের উন্নতির কথা কল্পনা করা বৃথা।       

নারী হল প্রকৃত শক্তি, সে সব উপমার ঊর্ধ্বে। রূপের ছটায় মোহিত করার ক্ষমতা যেমন রাখে তেমনই  গুণের সম্ভারে নারী সকলকে মুগ্ধ করতে পারে। কর্মসূত্রে  তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তার সমাধান চেষ্টা করে যেমন, তেমন আবার সন্তানের অসুস্থতায় সারা রাত ধরে জেগে পাখার বাতাসও করতে পারে। দেশের নেতৃত্ব সুদক্ষহাতে সামলাতেও পারে নারী। একই অঙ্গে এত রূপ কেবলমাত্র নারীদের মধ্যেই দেখা যায়। আধুনিক যুগে নারীশক্তি সর্বত্রব্যাপি।      

নারীশক্তি বা নারীর ক্ষমতা ব্যাপক অর্থে একজন নারীর স্বকীয়তা, নিজস্বতা এবং সর্বোপরি স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিকাশকে চিহ্নিত করে। নারী হল সমাজের অর্ধেক অংশ।  একজন স্ত্রী, বোন, কন্যাসহ মর্যাদাপূর্ণ সব সম্পর্কের বন্ধনে নারীজাতি সমাজের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্ব-নির্ভরশীলতাকে বাস্তব আকার প্রদান করার মাধ্যমেই সারা বিশ্বের সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর শক্তির ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

তাই নজরুল ইসলাম লিখেছেন -

“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
যত কথা হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা.."

“ জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।
“তুমি প্রজাপতি হংসমালা
তুমি আত্মা তুমি স্বত্বা তুমি প্রভু প্রেমিকা
তুমি দেবদুত তুমি রাধা তুমি সতী শ্বেতশুভ্রা
তুমি কাংগাল তুমি পুত তুমি পবিত্র আজলা
তুমি প্রেত তুমি নগ্ন তুমি রাক্ষসী তুমি যৌবনজালা
তুমি রুপ তুমি সৃজন তুমি ঝলক তুমি আশ্রিতা
তুমি বিমুর্ত তুমি কল্পনায় কল্পিতা,
তুমি রানী তুমি সম্রাজ্ঞী তুমি মাতা তুমি জননী জ়ায়া
তুমি সারথী তুমি পুজারী তুমি ভোগ তুমি ত্যাগ তুমি মায়া ।
তুমি রাখী তুমি মিলন তুমি প্রেমরতিকা
তুমি বোধ তুমি অবোধ তুমি মাস্তুল তুমি বর্তিকা,নারী তুমি শক্তি তুমি প্রজ্ঞা তুমি উৎকর্ষতা
তুমি ফল্গু তুমি চাষভূমি তুমি উর্বর তুমি রুক্ষ অনুর্বর মরুতা,
তুমি পণ্য তুমি বর্ণ তুমি যবনিকা
তুমি আদিম তুমি সনাতন তুমি মাতৃকা ।
তুমি ঘৃনার তুমি নিঃগৃহের তুমি আস্ফালন তুমি আকাশ নীল
তুমি শীতল তুমি ফানুস তুমি উচ্ছ্বাসের ঢেউ ফেনিল
তুমি ভুমিষ্ট তুমি জরায়ু তুমি প্রসব তুমি জোয়ার তুমি বান
তুমি তীব্রতা তুমি পতিত তুমি ভাগার তুমি নীরব শ্মশান ।”

নারীদের নিয়ে কবি শুভ দাশগুপ্তর লিখেছেন -
“সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা।
আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়।
আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়।
আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে।
কালো আকাশ মাথায় নিয়ে
আমি ছাতা হয়ে থাকি।
ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার।”

“হয়ত একদিন- হয়ত অন্য কোন এক দিন
আমার সমস্ত মিথ্যে পোশাক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
আমিই হয়ে উঠবো সেই অসামান্যা !
খোলা চুল মেঘের মত ঢাকবে আমার খোলা পিঠ।
দু চোখে জ্বলবে ভীষণ আগুন।
কপাল-ঠিকরে বেরুবে ভয়ঙ্কর তেজরশ্মি।
হাতে ঝলসে উঠবে সেই খড়গ।
দুপায়ের নুপুরে বেজে উঠবে রণদুন্দভি।
নৃশংস অট্টহাসিতে ভরে উঠবে আকাশ।
দেবতারাও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে বলতে থাকবেন
মহামেঘপ্রভাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং
কালিকাং দক্ষিণাং মুণ্ডমালা বিভুষিতাং।”

“তোমাকে বলেছে –আস্তে,
বলেছে –ধীরে.
বলেছে –কথা না,
বলেছে –চুপ।
বলেছে– বসে থাকো,
বলেছে– মাথা নোয়াও,
বলেছে — কাঁদো।
তুমি কি করবে জানো?
তুমি এখন উঠে দাঁড়াবে
পিঠটা টান টান করে, মাথাটা উঁচু করে দাঁড়াবে,
তুমি কথা বলবে, অনর্গল বলবে, যা ইচ্ছে তাই বলবে,
জোরে বলবে,
চিৎকার করে বলবে,
এমন চিৎকার করবে যেন ওরা দুহাতে ওদের কান চেপে রাখে।
ওরা তোমাকে বলবে, ছি ছি! বেহায়া বেশরম
শুনে তুমি হাসবে।
ওরা তোমাকে বলবে, তোর চরিত্রের ঠিক নেই,
শুনে তুমি জোরে হাসবে
বলবে তুই নষ্ট ভ্রষ্ট
তুমি আরও জোরে হাসবে
হাসি শুনে ওরা চেঁচিয়ে বলবে, তুই একটা বেশ্যা
তুমি কোমরে দুহাত রেখে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলবে, হ্যাঁ আমি বেশ্যা।
ওদের পিলে চমকে উঠবে। ওরা বিস্ফারিত চোখে তোমাকে দেখবে। ওরা পলকহীন তোমাকে
দেখবে। তুমি আরও কিছু বলো কি না শোনার জন্য কান পেতে থাকবে।
ওদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের বুক দুরু দুরু কাঁপবে,
ওদের মধ্যে যারা নারী তারা সবাই তোমার মত বেশ্যা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।”

আরেক কবি লিখেছেন -
"তুমি নিজেই জানো না 
কতটা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে তোমার অন্তরালে,
জগৎকে করে আলোকিত 
নিজের মহিমায় সকলকে করেছ তুমি ধন্য ,
নিজেকে করোনি কখনো প্রকাশ ,
থেকে গেছো চিরকাল আড়ালে,
তোমার গুরুত্ব কখনো হবে না কম।  
নারী, তুমি অপরাজেয় কালে কালে।
সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা।
আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়।
আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়।
আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে।
কালো আকাশ মাথায় নিয়ে
আমি ছাতা হয়ে থাকি।
ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার।"

নারী সম্পর্কে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিদের ধারণা - 
১. “ স্ত্রীদিগের উপর যেমন কঠিন ব্যবস্থা , পুরুষের উপর আলোচনার কিছু নেই। কথায় কিছু হয় না, ভ্রষ্ট পুরুষের কোন সামাজিক দণ্ড নেই। একজন স্ত্রী সতীত্ব সম্বন্ধে কোন পরিচয় করিলে সে আর মুখ দেখাতে পারে না। "
–  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

২. "প্রাণকে নারী পূর্ণতা দেয়, এই নারীর মৃত্যুকেও মহািয়ান করতে পারে।" 
–  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৩. “ কোন কালে একা হয়েছে ক' জয়ী পুরুষের তরবারি , প্রেরণা দিয়াছে , শক্তি দিয়াছে বিজয় -লক্ষ্মী নারী । "
–  কাজী নজরুল ইসলাম

৪. “ মেয়েদের চরিত্রের মাধুর্য পাওয়া যায় কুমারীত্বে। 
–  প্রবোধকুমার সান্যাল

৫. " নারীর হৃদয় এমন একটা জায়গা, যেখানে আমি একজন নারীকে হারিয়ে ফেলেছি৷ "
–  রেদোয়ান মাসুদ

৬. “প্রতিটি মেয়ে তার স্বামীর কাছে রাণী হতে পারে না। কিন্তু প্রতিটা মেয়েই তার বাবার কাছে রাজকন্যা থাকে। 
–  হুমায়ূন আহমেদ

৭. "নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সামান্য সচেতন হলে মেয়েরা নিশ্চয়ই বুঝত যে জগতে যত নির্যাতন আছে মেয়েদের বিরুদ্ধে , সবচেয়ে বড় নির্যাতন হল – মেয়েদের সুন্দরী হওয়ার জন্য লেলিয়ে দেওয়া।“
– তসলিমা নাসরিন

৮. " তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও ,আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেবো। "
– নেপোলিয়ানা বোপার্ট

৯. “ নারীর কাছ থেকে পুরুষের মত কাজ করার আশা তাকে অবশ্যই সমান শিক্ষা দিতে হবে। "
–  পলিটো

১০.  “নারীর সাহায্যে, তার চিন্তাশীলতা ও ধারণা নব সমাজের নির্মাণ সুদৃঢ় হতে পারে। 
–  লেলিন

১১. ” নারী হচ্ছে টি – ব্যাগের মত। গরম জলে দেয়ার আগে তুমি বুঝতে পারবে না সে কতটা শাক্তিশালী। ”
–  এলিয়ানর রুজভেল্ট

১২. ” মাতৃত্ব শুধু শক্তি যোগায় না, এটা মনে শান্তিও দেয়। তুমি নারী বলে এটা কখনই বলে না। "
–  ম্যারি কম

১৩. “ আমাদের সমাজে মহিলারাই মহিলার মা। তাই তাদের উন্নতির দিকে নজর দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। "
–  মরিয়ম মাকেবা

১৪.  "নারী প্রেমের জন্য, জানার জন্য নয়।" 
–  অস্কার ওয়াইল্ড

১৫.  "যে একটি নারীকে বিবেচনা করতে পারে, সে নারীর কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে গৌরবে"। 
–  জে, বি,ইয়েস্ট

নারীদের নিয়ে কিছু স্মরণীয় উক্তি -
" কোন সংস্কৃতি কতটা সভ্য তা জানতে তারা তাদের নারীদের সাথে কেমন আচরণ করে সেদিকে লক্ষ্য করো।"

“ আমাদের সমাজে নারীরাই ভবিষ্যতের মা। তাই তাদের উন্নতির দিকে নজর দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। “

”সব বড় মানুষেরাই তাঁদের সাফল্যর জন্য কোন অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উৎসাহের ঋণের কথা বলেছেন। “

” মেয়েদের মন পৃথিবীর সবচেয়ে স্পর্শকর জায়গা। এই মন অনেক কঠিন বিষয় সহজে মেনে নেয়, আবার অনেক সহজ বিষয় সহজে মেনে নিতে পারে না। “

” অসংখ্য কষ্ট ,যন্ত্রনা পেয়েও মেয়েরা মায়ারটানে একটা ভালোবাসা, একটা সম্পর্ক , একটা সংসার টিকিয়ে রাখতে চায়। এই জন্য মেয়েরা মায়াবতী আর মায়াবতীর কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই। ”

” মাতৃত্ব শুধু শক্তিই যোগায় না, এটা মনে শান্তিও এনে দেয়। তুমি নারী বলে দুর্বল এটা কখনই কাউকে বলবে না। “

“ ঈশ্বর নারীর প্রতিভাকে স্থাপন করেছে তার হৃদয়ে, কারণ এই প্রতিভার সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে সর্বদাই প্রেমেরই সৃষ্টিকর্ম। ”

“ যে পুরুষ একটি নারীকে বুঝতে পারে, সে পৃথিবীর যে কোন জিনিস বুঝতে পারার গৌরব করতে পারে।”

” নারীর হৃদয় হলো এমন একটা জায়গা, যেখানে গেলে সকল পুরুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। ”

“ যে সমাজে শিক্ষিত, স্বনির্ভর, সচেতন মেয়ের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজে বিচ্ছেদের সংখ্যাটা বেশি, বিয়ের সংখ্যাটা কম। ” 

“ নারীর সাহায্যে, তার চিন্তাশীলতা ও সচেতনতায় নব সমাজের নির্মাণ সুদৃঢ় হতে পারে। ” 

“ যে মহিলা ভিড় অনুসরণ করে সে সাধারণত ভিড়ের চেয়ে আর বেশি যায় না। যে মহিলা একা হাঁটেন তিনি সম্ভবত নিজেকে এমন জায়গাগুলিতে সন্ধান করতে পারেন যা আগে কখনও হয়নি। ”

“ সমতা অর্জনের জন্য নারীদের সংগ্রামের গল্পটি কোনও একক নারীবাদী বা কোনও একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, যারা মানবাধিকার সম্পর্কে যত্নশীল তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার অন্তর্ভুক্ত। ”

“ আপনি একজন মানুষকে শিক্ষিত করেন; আপনি একজন মানুষকে শিক্ষিত করুন আপনি একজন মহিলাকে শিক্ষিত করেন; আপনি একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করুন। ”

“ একজন মানুষের মুখ হ’ল তার আত্মজীবনী। একজন মহিলার মুখ হ’ল তার কথাসাহিত্যের কাজ। ”

“ নরসমাজে নারীশক্তিকে বলা যেতে পারে আদ্যাশক্তি। এই সেই শক্তি যা জীবলোকে প্রাণকে বহন করে। প্রাণকে পোষণ করে। ”

নারীশক্তি নিয়ে কিছু প্রচলিত স্টেটাস ~ 
নারীরা হল জগজ্জননীর প্রতিভূ

নারী আজ স্বয়ংসিদ্ধা। তাঁরা কারও উপরে নির্ভরশীল নয়, বরং তাঁদের উপরই দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র পরিবার। আবার কখনও তাঁদের উপরেই নির্ভর করছে কোনও দেশের ভাগ্য।

প্রত্যেকটি মানুষের সাফল্যের, পেছনেই রয়েছে একজন নারীর,আত্মত্যাগের কাহিনী যারা সবসময় থেকে যান পর্দার পেছনেই। নারী না থাকলে হতো না রাখীবন্ধন, ভাই ফোঁটা পেত না তার মর্যাদা।

নারী না থাকলে- পৃথিবীটা হত না এত সুন্দর। নারী না থাকলে- আমাদের জন্মই যে হত না। 

যুগ যুগ ধরে অত্যাচার সহ্য করে নারীরা এবারে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নারী শক্তির জয়জয়কার এখন সর্বত্র।

এই বিশ্বজগৎ সুষ্ঠুভাবে একমাত্র মেয়েরাই চালাতে পারে।

যে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর মতো শান্ত সে চণ্ডীর মতো আগুন হয়েও জ্বলে উঠতে পারে।

একটা অসুরকে বধ করতে যখন হিমসিম গিয়ে খাচ্ছিলেন তখন এক নারী এসেই তাঁদের পরিত্রাণ ঘটালেন ।

বর্তমান  দুনিয়ায় এমন কোনও কাজ নেই যা মেয়েরা পারে না।

সমুদ্রের জল যেমন একটা গ্লাসে রাখা যায় না ঠিক তেমনি নারী দিবস একদিনে পালন করা যায় না।

নারীরা যখন শক্তিরূপা হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীতে অনেক বড় পরিবর্তন আসে। নারীবাদী হওয়া মানে নারীদের শক্তিশালী করা নয়, কারণ মেয়েরা এমনিতেই শক্তিশালী।

বাধা এলে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে সদাই প্রস্তুত মেয়েরা, কারণ তাদের মধ্যে  আছে অনন্ত শক্তির আধার।

আজকের দিনে  নারীরা পুরুষদের থেকে  কোনো অংশেই  পিছিয়ে নেই। সব ক্ষেত্রেই তারা পুরুষদের টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই আপামর নারীজাতির  নিজেকে কখনো দুর্বল না ভেবে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে কারণ তারাই হল শক্তির উৎস।  

নারীরা হলেন কন্যাসন্তান হিসাবে মিষ্টি, বোন হিসাবে যত্নবান, প্রেমিকা হিসাবে সুন্দরী, স্ত্রী হিসাবে প্রিয়তমা,মা হিসাবে পরম মমতাময়ী, তারা শক্তির আধার, তারা যে নারী! একজন নারী হলো সংসারের ধারক এবং বাহক।

জীবন যদি রামধনু হয়, তবে নারী হল তার রঙের বাহার, জীবনে যদি নেমে আসে আঁধার, নারী তবে তার আশার আলো।

নারীরা চায় মুক্ত আকাশ, সে চায় উড়তে। ডানার দাবি তারা করে না কখনও, কারণ ইচ্ছেশক্তি তাদের রক্তে। হে নারী , তোমার ডানায় আগুন, দীর্ঘ হোক তোমার উড়ান।

পৃথিবীর প্রাণ তুমি, নারী। তোমার থেকে সৃষ্ট সমগ্র দুনিয়া। আজ তাই তোমারে প্রণিপাত করি।

নারীর কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই, কেউ যদি নারী শক্তির দৃঢ়তা বুঝতে না পারে, তাহলে তাদের নিজেদেরই  বদলের দরকার আছে, নারীদের নয়।

নারীর অনেক রূপ। কখনও প্রেয়সী আবার কখনও চামুণ্ডা কালীও হয়ে উঠতে পারে সে। নারীরা সময় বিশেষে হয়ে ওঠেন দশভুজা।

নারী জাতিই একমাত্র যারা প্রাণের সৃষ্টি করতে পারে। এর চেয়ে  গর্বের আর কী হতে পারে? নারীর উপমা নারী নিজেই । সে নিজেও জাননা, তার মধ্যে কতটা ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। সবাইকে নিজের আলোয় আলোকিত করে রেখেছে ‘নারী’।

নারী হল আগুন দিয়ে তৈরি অগ্নিকন্যা যে রক্ষা করে সবাইকে এবং একই সাথে ভালোবাসায় ঘিরে রাখে। একজন নারী হলেন সব ক্ষমতার উৎস,  ভালবাসার এক অনন্ত নদী।

রূপ,গুণ, কর্মদক্ষতা,  সহনশীলতা সবেতেই নারী অদ্বিতীয়া। তোমার তুলনা তুমি নিজেই ..হে নারী।

নারী হলেন একটি পরিবারের স্তম্ভ, যা সবাইকে বেঁধে রাখে। তার অনুপ্রেরণা ছাড়া কোনও কিছু সম্ভব নয়।

সব বড় মানুষেরাই তাদের সাফল্যের জন্য কোন অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উৎসাহের ঋণের কথা বলেছেন।

নারী হলেন তরুণের কর্ত্রী, মধ্যবয়সী পুরুষের সঙ্গিনী এবং  বৃদ্ধের সেবিকা।

যেখানেই কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে সেখানেই মহিলারা উপস্থিত ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। …  তাই নারীদের ব্যতিক্রম হিসাবে ভাবা উচিত নয়।

একজন নারী যে তার দাবি জানাতে পারে সে ই হল প্রকৃতপক্ষে একজন শক্তিশালী রমণী। একজন নারীবাদী মহিলা সে ই যিনি নারী ও পুরুষের সমতা এবং  মানবতাকে সমান স্বীকৃতি দেন।

একজন মহিলার এমন বিশেষ কিছু গুণ আছে যা একজন পুরুষতান্ত্রিক জগতে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম। সেটি হল নারীর নির্দিষ্ট অনুগ্রহ, শক্তি, বুদ্ধি, এবং নির্ভীকতা। পৃথিবীতে এমন কিছু কাজ নেই যা নারীরা সম্পাদন করতে পারে না।

মহিলাদের নেতৃত্ব এ বিশ্বে সর্বত্র – দেশের নেত্রী কিংবা সিইও পদ থেকে শুরু করে সেই গৃহিনী যে তার সন্তানদের লালন-পালন করে এবং তার পরিবারের নেতৃত্ব দেয়। আমাদের দেশটি শক্তিশালী মহিলাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল যা ইতিহাস কখনও অস্বীকার করতে পারবে না।

মানবাধিকার হ’ল নারীর অধিকার এবং নারীর অধিকার হ’ল মানবাধিকার, এই সত্যটি আজকের এবং সর্বকালের জন্য।

নারীর অনুমান পুরুষের নিশ্চয়তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। পুরুষ সম্মুখ যুদ্ধে বিশ্বাস করে, কিন্তু স্ত্রী জাতির রণনীতি সম্পূর্ণ পরোক্ষ।

জগতের প্রাণ তুমি হে নারী,/ তোমার থেকে সৃষ্ট আমি, /তোমার চরণ চুমি।

যে হাসিমুখে সব সয় সেই যে নারী। / শক্তি যার অপার, অসীম,/কখনও হাল দেয় না ছাড়ি, তোমায় কুর্নিশ সে মহান নারী।

নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,/ যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।

------//*//------


সর্বপ্রথম কৃত্রিম প্রজননে শাবক ও আলিপুর চিড়িয়াখানা
শৌনক ঠাকুর 


যদি জানতে চাওয়া হয় বন্দীদশায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কোথায় প্রথম গন্ডার শাবক প্রসব করানো হয়েছিল? স্বভাবতই আমাদের স্মৃতি বিদেশি কোন জায়গার নাম অনুসন্ধান করা করবে। কিন্তু আমরা প্রায় অনেকেই জানি না যে আজ থেকে প্রায় ১৩৬ বছর আগে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল আলিপুর চিড়িয়াখানায়। হ্যাঁ, আমাদের চির পরিচিত সেই আলিপুর চিড়িয়াখানা। কলকাতা। এই কান্ডটি যিনি ঘটিয়েছিলেন কোন ইংরেজ নন , একজন বাঙালি — রামব্রহ্ম সান্যাল।

রামব্রহ্ম সান্যালই আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রথম ভারতীয় অধিকর্তা বা সুপারিনটেনডেন্ট। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তার জন্ম হয়েছিল মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলার কাছে মহুলা গ্রামে। সালটি ১৮৫৮ (১৩ অক্টোবর)। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে তিন বছরের বড়। রামব্রহ্মের পিতা ছিলেন বৈদ্যনাথ সান্যাল। অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। রামব্রহ্ম বহরমপুরের কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারিতে ভর্তিও হন। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। মোটামুটি তিনবছর পর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। তার দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে থাকে। তখন বাধ্য হয়েই ডাক্তারি পড়া মাঝ পথে ছাড়তে হয়। তবে স্থিতধী , পরিশ্রমী ,বুদ্ধিমান , বিচক্ষণ রামব্রহ্ম সহজেই নজর কেড়েছিলেন অধ্যাপক জজ কিং এর। 

এই জজ কিং তাকে প্রথমে আলিপুর চিড়িয়াখানায় একটা কাজ দেন। কুলি-মিস্ত্রীদের তদারক করা। তখন অবশ্য চিড়িয়াখানাটি নির্মাণ হচ্ছিল। চিড়িয়াখানা তৈরি হবার পর তিনি হলেন হেডবাবু। সাল ১৮৭৭। কর্মদক্ষতা ও পরিশ্রমের গুণে তিনি সুপারিনটেনডেন্ট পদ অলংকৃত করেন। বাল্যকাল থেকেই পশু-পাখিদের প্রতি তার ছিল একটা আলাদা আগ্রহ। ছুটিতে বাড়ি ফিরে তিনি বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। বিভিন্ন প্রকার গাছগাছালি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। খোঁজ নিতেন গ্রামের গৃহপালিত পশুদের।

পশুদের প্রতি তার এই ভালোবাসা যেন সহজাত। চিড়িয়াখানায় জীবজন্তুদের স্বাস্থ্য , খাওয়া-দাওয়া , বাসস্থান ইত্যাদি বিষয় তিনি নিয়মিত খোঁজ রাখতেন। দু’বেলা ঘুরে ঘুরে পশুদের দেখতেন। ঋতু অনুযায়ী থাকার সুব্যবস্থা করেছিলেন। 

পশুদের বিজ্ঞানসম্মত নাম, তাদের দৈহিক পরিবর্তন, তিনি নোট করে রাখতেন। অসুস্থ হলে তিনি পশু চিকিৎসক ডাকতেন। ছোটখাটো অপারেশনে ওখানে হত। কোন পশু মারা গেলে তার পোস্টমটম করা হত। সেই রিপোর্ট তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠাতেন। পশুদের বিষয়ে তার নোট বা পর্যবেক্ষণ কতটা গভীর ছিল একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই — 

“The Dolphin has an elongated body, and a long compressed beak provided with large conical teeth, which are rather sharp-pointed in young, but become worn down as the animal grows old. Its dimensions vary from seven or eight to even twelve feet; the colour is uni-formly black or greyish black. This aquatic animal is perfectly blind, because its eyes are not only rudimentary but completely buried beneath the thick, opaque hide of the head. There is, however, nothing strange in this deprivation of sight, which would be useless to a beast which lives in thick muddy water. Any one who has sailed often in the Ganges, the Brahmaputra, or the Indus cannot have failed to notice that these animals do not show themselves always and everywhere in these rivers. They are migratory in habits and desert such parts as become clear and shallow during the summer for others which are deep and dirty. Their food con sists of fish and prawns, and also, it is said, crabs; but this requires confirmation. Dolphins are sometimes captured by fishermen, either accidentally or on purpose, as their oil is said to possess great efficacy in curing rheumatism and allied disorders.”

তার রেজিস্টার থেকে জানা যায় , একবার খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল দুটি বাঘ। মিস্ত্রিরা হয়তো কাজ করার পর খাঁচার দরজা বন্ধ করতে ভুলে যান। অবশ্য বহু চেষ্টাতেও বাগে আনা যায় নি বাঘ দুটিকে। তখন বাধ্য হয়েই গুলি করা হয়েছিল। এই ঘটনা তাকে খুব ব্যথিত করেছিল। শুধু তিনি কেন আমরা যারা এই রচনাটি পড়ছি তাদেরকেও মন নিশ্চিতভাবেই ব্যথিত হবে। 

পাখিদের বাসা তৈরি , শিকার ধরার কৌশল ইত্যাদি বিষয় নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন। মাছরাঙ্গা পাখির শিকার ধরার কৌশল তিনি যথেষ্ট দক্ষতাই বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখছেন — মাছরাঙার খাবার হয় ছোট মাছ। মাছরাঙার মধ্যে এই গুণগুলি অসাধারণ মাত্রায় বিদ্যমান। শিকার জলের ওপর ভেসে উঠলেই, মাছরাঙা একেবারে তীরের মতো ছুটে যায়, চোখের পলকে শিকার ধরে ফেলে, এবং আবার দ্রুত তার নির্ধারিত জায়গায় ফিরে আসে।

বাংলাদেশের স্ত্রী গন্ডার ও সুমাত্রার পুরুষ গন্ডারের মিলনে একটি গন্ডার শাবক জন্ম নিল। বন্দী দশায় গন্ডারের জন্ম ভারতের ইতিহাসে প্রথম। যেখানে আজকের মত চিকিৎসা বিদ্যা বা শল্যচিকিৎসা এতটা উন্নত ছিল না। নিজে দক্ষতায় বুদ্ধিমত্তায় এবং সাহসের সঙ্গে কৃত্রিম প্রজননের ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। এছাড়াও সাপের বিষ নিয়ে ওখানে গবেষণা চলত। 

চিড়িয়াখানার ভিতরে লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল‌। ১৮৮০ সালে চিড়িয়াখানার ভেতর ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো হয়। এই চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছিলেন বহু বিশিষ্টজন। এসেছিলেন তার মধ্যে অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ , ভগিনী নিবেদিতা , স্বামী বিবেকানন্দ ,স্বামী যোগানন্দ প্রমুখ বিশিষ্টজন।

গ্রন্থ‌ঋণ
১. “A hand-book of the management of animals in captivity in Lower Bengal” : by Sanyal, Ram Bramha
২. বাংলা চরিতাবিধান
৩. “তাঁর আমলে চিড়িয়াখানায় ওয়াজিদ আলি শাহ থেকে বিবেকানন্দ” : আনন্দবাজার রিপোর্ট : গায়ত্রী সেন ২৬ জানুয়ারি ২০২০

------//*//------     



শীতের  দিনের হারানো স্মৃতি
সামসুজ জামান (কলকাতা)


রবি ঠাকুরের পংক্তি ছাড়া আমাদের গতি নেই - "শিউলি ফোটা ফুরোল  যেই ফুরোলো   শীতের বনে /এলে যে -- /আমার  শীতের বনে এলে যে সেই শূণ্যক্ষণে।।/ তাই গোপনে সাজিয়ে ডালা   দুধের স্বরে বরণমালা/ গাঁথি মনে মনে শূন্যক্ষণে। // শীত এখনো সেই অর্থে তেমন ভাবে আসেনি। আসি আসি করতে করতেই একটু বাদানুবাদ হয়েছে বোধ হয় তার নিম্নচাপের সঙ্গে। তাই আড়ি হয়ে গেছে শীতের সঙ্গে নিম্ন চাপের। এখন অবস্থাটা 'জোর যার ,মুলুক তার'। যার পেশীর জোর সে খাটাবে প্রভাব। অন্তর্জালে এইমাত্র চোখ পড়ল শীত আসার বিলম্ব সংবাদের দিকে। শোনা যাচ্ছে, একটা নিম্নচাপ জনিত কারণ দক্ষিণবঙ্গে শীতের আবহাওয়াকে একটু বিলম্বিত করছে। এই শীত আর নিম্নচাপ বড় গোলমেলে বিষয়। আর নিম্নচাপেরও কাজকর্ম নেই বোধ হয়! এমনিতেই তো বাবা এখন তুমি নানাভাবে আমাদের আবহাওয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করছো। যখন তখন থাবা বাসাচ্ছ যেখানে তোমার মর্জি। তো এই মুহূর্তে কী দরকার বাবা, শীতের আসার পথটা সুগম করার পরিবর্তে তার আসার পথে স্বাগত নৃত্য অথবা উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন না করে উল্টে বাধা সৃষ্টি করার? বলি শীত কি তোমার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল? সুতরাং আমরা হৈ হৈ করে বলতে পারবোনা-" শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে।' তবে কি না ঠিক তার পরের পংক্তিটুকু গাওয়ার জন্য প্রকৃতি একেবারে তৈরি- " পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে"। 

হ্যাঁ তবে শীতের ভাবনা ভাবতে ভালোই লাগে। বিষয়টা গরম হলে হয়তো ঘাম ঝরতো কিন্তু এই কার্তিক মাসের এই দিনের প্রখর তাপে শীতের বিষয়ে ভাবতে আমাদের আপত্তি নেই। আর হ্যাঁ দেখেছেন তো রাতের দিকে একটু যেন হিমশিম ভাব অনুভব হচ্ছে না? ভোরের দিকটা ঘুম যখন প্রিয় বন্ধুর মতো আঁকড়ে ধরে তখন একটুক যেন গায়ে চাদর টাদর টেনে নিতে ইচ্ছে করছে না? অথবা সকাল বেলায় উঠে বুঝতে পারছেন ধরে ঠান্ডা লেগে গলাটা কেমন ভার ভার হয়ে গেছে! সেই হিসেবে শীতের ভাবনা ভাবতে বসলে এখন খুব একটা বাড়াবাড়ি কিছু হবে না বলেই মনে হয় অন্তত শীত আসার আগে তো অনেক রকম প্রস্তুতি নিতে হয়, এখন এই ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে কিছুটা যদি শীতের আমেজ অনুভব করা যায় তাহলে মন্দ কী? প্রবল শীত পড়ে গেলে শীতবস্ত্রের চাহিদা যেমন বেড়ে যায়, দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি ঘটে অস্বাভাবিক। সেই হিসেবে পুজো সামলানোর পর হাতে যদি কিছু অর্থমূল্য বেঁচে থাকে তবে তা দিয়ে দুটো একটা শীত বস্ত্র কিনে নিতে পারলে মন্দ কী? আর যদি পারেন সেই শীতবস্ত্র থেকে ফুটপাতের বাসিন্দা একটা দুটো মানুষকে যদি দিতে পারেন কাজ চালানো গাছের কিছু একটা। তবে পেয়ে গেলে আগামী শীতের কথা ভেবে তার চোখে জল এসে যাবে আনন্দে! আর সেই জলের ভিতরে ঝরে পড়া কৃতজ্ঞতা রাশি আপনার অন্তরটাকে ফুলে ফসলে ভরপুর করে দেবে। এটা নিশ্চিত। হোক না বন্ধু এবারের শিটটা সামান্য একটু অন্যরকম ভাবে। খুব মন্দ লাগবে কি?

শীত আসে শীত যায়। কিন্তু তার রূপ বিবর্তিত পরিবর্তিত হতে থাকে। মনে পড়ল অনেক পুরনো কথা। আমরা গ্রামের মানুষ ছোট থেকেই গ্রামের আবহাওয়ায় শীতের সঙ্গে মিলেমিশে দিন কাটিয়েছি। ওই গান মনে পড়ে কথায় কথায়- "আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"। যখন আমাদের ছোটবেলা, তখন শীত আসত অনেক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। সে শীত অনেক রোমাঞ্চ নিয়ে আসতো যেন। তার বৈভব বিলাসিতা ছিল অনেক রাজকীয়। সকালবেলা চা পর্ব মিটে যাবার পরই চট, বিছানা পেতে সূর্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে কী ভালো যে লাগতো। বই পত্র খুলে রোদ পোহাতে পোহাতে পড়াশুনো শুরু করা যেত। আমরা তো গ্রামের ছেলে মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়ানো তো আমাদের স্বভাব। জমিতে তখন আমন ধান কাটা চলছে। স্কুল ছুটি থাকলে অথবা স্কুল ছুটির পর আমরা ছোটরা ধানের শিস কুড়িয়ে বেড়াতাম। একে শীতের দাপট তার উপর রুক্ষ সূক্ষ্ম কাটা ধান গাছের গোড়ার শক্ত মাটির প্রভাবে- ছোট ছোট পা গুলো কেটে ফেটে চৌচির হয়ে যেত। ফাটা পা পরিষ্কার করতে গিয়ে মায়ের মারধর কি আর খাইনি মনে করছেন? কিন্তু সেসব কে মনে রাখে? ধান কুড়ানোর ‌আনন্দটাই তখন অনেক বেশি। তারপর অনেকটা পরিমাণ ধান সঞ্চিত হলে সেই ধান বিক্রি করে ঘুড়ি কেনা, মেলা দেখা কত কী যে অপূর্ণ সাধ মেটাতাম! তখন শীতটাও পড়তো জমিয়ে! ঠান্ডা কনকনে সকালবেলায় মুখ থেকে ধোঁয়া বের করতে করতে খেজুরের রস পানের এবং খেজুর গুড়, পাটালি বানানোর আঘ্রান নেবার সে তৃপ্তি ভোলার নয়। নিজেদের আলুর জমি থেকে পালং শাক, মুলো ,গাজর-বীট,ধনেপাতা তুলে আনতে কী যে ভালো লাগতো। বেসরকারি এক সংস্থায় কর্মরত থাকায় বাবা সাপ্তাহিক ছুটিতে প্রতি রবিবার বিকেলে বাড়ি ফিরতেন। সোমবার দিন উনি বাড়িতে থাকতেন। শীতের দিনে ওই সোমবারে সকালবেলায় আমাদের বাড়ির পাশে বিশাল পুকুর লহলাতে যেতেন খ্যাপলা জাল কাঁধে নিয়ে। সঙ্গে একটা ছোট্ট বালতি হাতে থাকতাম আমি। বাবা জাল ফেলে লহলাতে মাছ ধরতেন। অন্যান্য মাছের সাথে বড় বড় মৌরলা মাছ খুব মন টানতো। জাল ভর্তি সেই মাছ বাবা জাল থেকে ছাড়িয়ে মাটিতে ফেলতেন আর আমি বালতিতে ভরতাম। তারপর বাড়ি ফিরে নিজেদেরই জমি থেকে পেঁয়াজ পাতা ছিঁড়ে কেটে এনে দেবার পর মায়ের হাতের সেই মাছ রান্না যে কী অপূর্ব তৃপ্তি দিত তা বলে বোঝানোর মত নয়। এবং তা আজও যেন জিভে মনে লেগে আছে! 

কনকনে শীতের রাতে দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসা ধান পাহারাদার দের হৈ হৈ চিৎকার আর তার সঙ্গে শিয়ালের হুক্কা হুয়া একটা অন্য জগৎ তৈরি করে দিত। ওই সময়ই মাঠ থেকে পেকে যাওয়া আমন ধান তুলে এনে খামারে জড়ো করে রাখা হতো। সেই ধানের আঁটি দিয়ে ই কুঁড়েঘর বানানো হতো অস্থায়ী ভাবে। রাতে পাছে ধান চুরি না হয়ে যায়। চাঁদনী আলোয় আমরা সন্ধ্যে-রাতে সেই কুঁড়েঘরের মধ্যে বসতাম অথবা ২-৪ জন ছেলেপিলে মিলে লুকোচুরি খেলতাম। আরো একটু বয়স যখন বেড়ে গেছে তখন শীতের দিনে পাড়ার কয়েকজন মিলেজুলে মাঝে মাঝে হতো ফিস্ট। আর শীতের প্রধান আকর্ষণ ছিল সার্কাস। সেসব দিনের সে আনন্দই ছিল একেবারে অন্যরকমের- একেবারে নিখাদ পরিতৃপ্তির।

আর মেয়েদের স্বভাব তো চিরদিন মানুষকে খাইয়ে মন ভোলানো। এতেই তাদের তৃপ্তি। মা মাসি পিসি দিদি বোনেরা তোড় জোর করে আতপ চাল ভিজিয়ে ঢেঁকিতে কোটার কি বাহার। দুপুরের ভাত খাওয়ার সাথে সাথেই তারা ঢেঁকি সালে ছুটতেন। সে একেবারে উৎসবের মেজাজ। শীত জুড়ে নানা রকমের পিঠেপুলি পায়েস ইত্যাদি ইত্যাদি বানিয়ে মানুষকে খাওয়ানোর সে আনন্দে তারা সকলেই এক একটা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। তখন বেশিরভাগ মুসলিম পরিবারে হতো ধুকি তৈরি। শুনে চমকে যাবেন না। ভাববেন না সে আবার কি জিনিস। এখন আপনি রাস্তাঘাটে অনেক জায়গায় দেখতে পান চালের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ভাপা পিঠে। সেটা তখন প্রায় মুসলিম পরিবারের একচেটিয়া সম্পদ ছিল। উনুনে বসানো হতো মাটির ভার তাতে ফুটতো জল আর একটা চিনামাটির বাটিতে চাল গুঁড়ি ভরে তার মুখে সাদা কাপড় বেঁধে উপুড় করে দেয়া হতো সেই ভাঁড়ের মুখে।শীতের রাত্রে মা দিদিরা উনুনের ধারে বসে যেত সেই ধুকি বানাতে। আর আমরা একান্নবর্তী পরিবারের ছেলেমেয়ের গোল হয়ে বসে যেতাম উনুনের আছে আগুন পোহাতে। প্রবাদ ছিল যখন ধুকি তৈরি হচ্ছে তখন যদি দুষ্টু মতলবধধারী কারো ছায়া পড়ে কিংবা এই ছড়াটা বলা যায়- "ধুকি ফুকফুকি, ধুকির মাথায় ছায়। ধুকি ভস্ম হয়ে যায়" - তাহলে নাকি ধুকি সত্যি সত্যি নষ্ট হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সে ধুকি যেতো নষ্ট হয়ে যেত কোন না কোন কারনে। তখন সকলে বলাবলি করত- এই ছেলেমেয়েরা ঠিক কেউ আউড়েছে ওই ছড়াটা। সে যাই হোক। তখন তো সকলের সঙ্গে সকলের সদ্ভাব ছিল অনেক বেশি তাই যেদিন কোন বাড়িতে ধুকি বানানো হবে, আশেপাশের বাড়িতে বলে দেয়া হতো- 'রাত্রে আমরা ধুঁকি দেব'। তাহলে সেই বাড়ি রাতের রান্নার চাল কম করে নেবে, কারণ সকলেই দুটো একটা করে ধুকি ভাগ পাবেন। ধুকি হয়ে গেলেই এ বাড়ি ও বাড়ি দিতে যেতাম আমরা । ধুকি খাওয়ার জন্য সঙ্গে থাকতো খেজুর গুড়। কখনো সখনো ধুকি বানানোর পূর্বে ভিতরে খেজুর গুড়ের পাটালি কিংবা চিনি ছড়িয়ে দেওয়াও হতো। এক আধ জন আবার ধুকি, মাংসের ঝোল দিয়ে খাওয়াও পছন্দ করতেন। যেদিন নিজেদের বাড়িতে ধুকি হত না অথচ শুনেছি পাশের কোন বাড়ি থেকে ধুঁকি দিতে আসবে সেদিন পড়াশোনায় মন বসত না। বুবুক্ষ চোখে আমরা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে এদিক-ওদিক চেয়ে দেখতাম কখন আসবে ও বাড়ি থেকে ধুকি। আর এসে যদি গেল তাহলে তো পড়াশোনার থেকে অনেক বেশি দামি- গরম গরম ধুকি। সুতরাং সময়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য আমরা তৈরি থাকতাম। অবশ্যই ধুকি গরম গরম খেতে ভালো লাগতো বলে বাড়ি থেকেও খুব একটা আপত্তি হতো না সে বিষয়ে।

এখনো তো শীত আসে। শীত এলে আমরা গেয়ে উঠি- "এলো যে শীতের বেলা বরষ-পরে।/ এবার ফসল কাটো লও গো ঘরে।।/" ফসল ঘরে আসার আনন্দ হয়তো আমাদের হয় কিন্তু আজকের ছেলেমেয়েরা শীতের আনন্দে তো কোনোভাবেই মাতোয়ারা হয় না। তাদের আনন্দ গেল কোথায়? আজ সার্কাস প্রায় হারিয়ে গেছে। আজকের মেলাও তেমন ভাবে জমে না। হ্যাঁ ছেলেরা শীতের দিনে ক্রিকেট খেলে কিছুটা। তবে খেজুর গুড়ের গন্ধটাও তেমন ভাবে পাওয়া যায় না । খেজুর রস, গাছ থেকে নামার আগেই কৃত্রিমভাবে বানানো পাটালিতে বাজার ছেয়ে যায়। চারিদিকের দূষিত পরিবেশে দিনদুপুরে  কুয়াশায় ভ'রে থাকে শীতের আকাশ। তাই শীত এলে মনে হাহাকারের যন্ত্রণা জেগে ওঠে। নস্টালজিক অনুভূতিতে মন সেই গান গাইতে থাকে- 'ফেলে আসা দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে'।

         
------//*//------

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...