সুচিপত্র :
১/ আলো ফুরিয়ে যায় - সুমিতা চৌধুরী (কলকাতা)
২/ সন্ন্যাসী শিপুখুড়ো - উত্তম চক্রবর্ত্তী (কলকাতা)
৩/ উৎসর্গ - তপন তরফদার (খড়্গপুর)
৪/ পরিযায়ী - অভিজিৎ সেন (কোচবিহার)
------//*//------
আলো ফুরিয়ে যায়
সুমিতা চৌধুরী (কলকাতা)
" তিয়াসা....আ, তিয়াসা..আ..আ"...বাবানের ডাক টা যেন কোন মহা সিন্ধুর ওপার থেকে ভেসে আসে। ডাক টা অনুসরণ করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে তিয়াসা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রকান্ড এক ঢেউ তাকে মোচার খোলার মত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আজ প্রকৃতি ধ্বংস লীলায় মেতেছে। চতুর্দিকে যেন রণ দুন্দুভি বেজে উঠেছে। ঝলসে ওঠা বিদ্যুতে উন্মত্ত রোষের আগুন। " তিয়াসা...আ, কোথায় তুই? আমি যে ডুবে যাচ্ছি!...."
" আসছি...ই ই ই"
" মা, মা, ওমা....আ"
নরম, উষ্ণ হাতের স্পর্শে অনেক কষ্টে চোখ খোলে তিয়াসা। ঘন, কোঁকড়া চুলে ঘেরা কচি মিষ্টি মুখ খানা তার মুখের উপর ঝুঁকে আছে।
" অনেক বেলা হল যে, মা.."
ধড়মড় করে উঠে বসে তিয়াসা। স্বপ্নের ঘোর এখনও দু চোখে লেগে রয়েছে। বাবানের সেই আকুল ডাক মাথার মধ্যে যেন হাতুড়ি পিটছে! সত্যি ই তো, সূর্য দেব বেশ কটমট করে তাকাচ্ছে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। সব কিছু এখন ঝড়ের বেগে সারতে হবে। সময় নেই, হাতে এখন একদম সময় নেই.....
এখন মধ্য দুপুর। এই সময় টা তার একান্ত নিজস্ব। এমনি তেই তিস্তা আর গৌতম বেরিয়ে গেলে সারা বাড়িতে যেন তালা পড়ে যায়। আজ সমস্ত কাজ সে যন্ত্রের মতো সেরেছে, অন্যমনস্কতার জন্য কাজে ভুল, ভ্রান্তি ও হয়েছে। এ নিয়ে দু কথা শোনাতে ছাড়ে নি গৌতম। এমনি তে তার বর খুব প্র্যাকটিকাল, ডিসিপ্লিনড মানুষ। দৈনন্দিন কাজে গাফিলতি একদম বরদাস্ত করে না। কিন্তু আজ যে খেলা ভাঙার খেলা....
অনেক দূর থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসে ।কি করুণ আর্তি সেই সুরে! আনমনা হয়ে পড়ে তিয়াসা।ঠিক হ্যামলিন দাদুর মতো, যে তার শৈশবের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। এই হ্যামলিন নাম টা বাবানের দেওয়া, রোজ বিকেলে দাদু বাঁশি বাজাতে শুরু করলে সব ছেলে মেয়ে তাকে ঘিরে ভিড় করত। বাজানো শেষে তিয়াসার হাত থেকে চাল, ডাল, আলু আর জল বাতাসা নিয়ে ধাপিতে বসে কত গল্প করতো দাদু! সুন্দর বনের কোন প্রত্যন্ত গ্রামে দাদুর বাড়ি, সে একেবারে ছবির মতো সুন্দর, পাশ দিয়ে বয়ে চলত মাতলা নদী। কিন্তু এক ভয়াবহ বন্যায় তাদের ঘর বাড়ি সব ভেসে যায়। সেই থেকে দাদু দের পুরো পরিবার ছন্ন ছাড়া। শুনে খুব খারাপ লাগত তিয়াসার। আহা রে! তার পয়সা হলে সে ওইরকম নদীর পাড়ে একটা সুন্দর বাসা বানিয়ে দেবে দাদু কে।
তীব্র হর্নের আওয়াজে ঘোর ভাঙে তিয়াসার ।তিস্তার বাস আসার সময় হলো নাকি? কিন্তু এখন তো মোটে দুপুর তিনটে! ঘরে ঢুকে তাক থেকে গীতবিতান পেড়ে নেয়। মন খারাপ থাকলে সে এই বই খুলে বসে ।একটার পর একটা পাতা উল্টে যায়।বই এর ঠিক বাষট্টি নম্বর পাতায় বাবানের ছবি টা রাখা। কালো কোঁকড়ানো চুল আর দুই উজ্জ্বল চোখের বাবান! কপালের কাছে এক টা ছোট্ট কাটা দাগ। একবার বাড়ির উঠোনে পড়ে গিয়ে প্রচুর রক্ত পাত হয়েছিল, হাসপাতালে নিয়ে সেলাই দিতে হয়েছিল! সাদায় সবুজে মেশানো বাবান দের বাড়ি টাও অবিকল স্মৃতি তে ধরা আছে। সেই বাড়ির বাগান সব চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত তিয়াসা কে।কত দিন সেই বাগানে লুকোচুরি খেলেছে তারা!
দূরে কোন বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসে " শূন্য এ বুকে, পাখি মোর আয়, ফিরে আয়, ফিরে আয় "
কি ভয়াবহ শূন্যতা আর হাহাকার গানের মধ্যে! যার হয়, সেই শুধু উপলব্ধি করে। আবার তিয়াসা ভাবে, সেই শূন্যতার মাঝেও তো জমে থাকে, কত মধুর স্মৃতি , কত অর্থহীন কথোপকথন! সেই শূন্যতা কোনোদিন পূর্ণ হয় না, শুধু রেখে যায় সর্ব গ্রাসী এক একাকীত্ব!
" তোকে খুব সুন্দর একটা নদী কিনে দেবো। নদীতে বাঁধা থাকবে আমাদের ডিঙি নৌকো..আমরা সেই নৌকো তে শুয়ে আকাশ দেখব।"
" ধ্যাৎ, মোটেই না" প্রতিবাদ করে তিয়াসা। " নদীর পাড়ে খুব সুন্দর বাড়ি থাকবে আমাদের, সেখানে হ্যামলিন দাদু কে নিয়ে আসব। পূর্ণিমার রাতে চাঁদনি আলোয় বসে দাদুর বাঁশি শুনব।"
সন্ধ্যে বেলা একসাথে টিউশন থেকে ফেরার পথে এমনি হাজারো পরিকল্পনা! কখনো পাল পাড়ার ছোট্টো পুকুর পাড়ে তারা শুধু হাতে হাত ছুঁয়ে বসে থাকতো। তার মধ্যেই কত না বলা কথা বলা হয়ে যেত! বাড়ি ফিরে ও সেই ফাঁকা, যেন কেউ কোথাও নেই! পড়তে বসে ইংরেজী বই এর পাতায় বাবানের মুখ! সেই রকমই দুষ্টুমি ভরা চাউনি আর উপরের ঠোঁট টা টিপে হাসা। বসে বসে পড়া ফেলে সেই মুখ স্কেচ করত তিয়াসা। আচ্ছা, বাবান কে ছেড়ে সে থাকবে কিভাবে?
শীতের দুপুর গুলো বরাবরই না পসন্দ তিয়াসার। কি তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে! টেবিলের ওপর গাদা খানেক গ্রিটিংস কার্ড, রং আর পেন্সিল নিয়ে হিমশিম অবস্থা তিয়াসার। প্রতিবারই নিউ ইয়ারের কার্ড সে নিজে হাতে এঁকে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় দের পাঠায়। এবার বাবান কেও একটা কার্ড পাঠাবে কলকাতার ঠিকানায়। ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে গ্যাছে সে, যাবার আগে ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব দিয়ে গেছে। লিখতে লিখতে বাইরে তাকায় তিয়াসা। পড়ন্ত আলোয় পাখিরা সব ঘরে ফিরছে। আহা! তার যদি এমন ডানা থাকতো! তাহলে এক্ষুনি উড়ে যেত বাবানের কাছে। এখনও আরো পনের দিন বাবানের ফিরে আসার! নিঃশব্দ ঘরে এই সময়েই দেয়ালে লাগানো ফোন টা বেজে ওঠে । ও প্রান্তে বাবানের মাসতুতো বোন রিনি।কলকাতায় থাকে এখানেও কয়েকবার এসেছে।
" কি রিনি কেমন আছো?" লিখতে লিখতেই জিজ্ঞেস করে তিয়াসা। ও প্রান্তে রিনির গলা শোনা যায় না, শুধু চাপা কান্নার শব্দ। ' কি হয়েছে রিনি?" বুক টা কেঁপে ওঠে ভয়ে।
" বাবান আর নেই গো" কান্নায় গলা বুঁজে আসে রিনির। " আর নেই? " কোথাও শুনতে ভুল হচ্ছে কি? " দাদা রোজকার মত আজও সুইমিং পুলে গেছিল। অনেক ক্ষণ ফিরছে না, আমরা চিন্তা করছিলাম..সেই সময়ে দুটো ছেলে এসে..দুপুরের পর ডেড বডি খুঁজে পেলো...তুমি তো জানো, দাদা কত ভাল সুইমার ছিল! কত প্রাইজ! আজ দাদার শরীর টা ভালো ছিল না, আমি বারণ করেছিলাম..." শেষ দিকে রিনির কথা গুলো আর শোনা যাচ্ছিল না, হয়তো বা তিয়াসার কানেই কিছু ঢুকছিল না.....
অকাল বর্ষণের পর আজ হঠাৎ বেশ ঠান্ডা পড়েছে। সকাল থেকে চলছে শীত আর রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। গায়ের চাদর টা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বাগানে এসে দাঁড়ায় তিয়াসা। নিজের যত্নে গড়া তার এই বাগান! গন্ধরাজ ফুল খুব প্রিয় ছিল বাবানের। ফুল গুলোর উপর আলতো আঙুল ছুঁয়ে মনে মনে বলে, " ভালো থেকো তোমরা, আমার বাবানের জন্য ভালো থেকো..."
অপরাহ্নের ম্লান, মায়াবী আলোয় প্রকৃতির রং ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। আচ্ছা, গৌতম আর তিস্তা কে নিয়ে তার যে সংসার, তাতে কোথাও কোনো ফাঁকি থেকে যাচ্ছে না তো? সে তো উদয়াস্ত খাটে, মন দিয়ে সংসার করার চেষ্টা করে। তবু কত খামতি থেকে যায়! ছোট ছোট ভুল, ভ্রান্তি...গৌতম ক্ষমা করে না, তার বকুনির সামনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তিয়াসা। বাবানের ব্যাপার টা জানতো শুধু তার দিদিয়া। বারবার বলতো, মনে একজন কে রেখে আরেক জনের সংসার সাজাতে পারবি তো?
বেলা শেষের পড়ন্ত আলোয় আকাশ টা কে আজ ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা বিশাল ধনেশ পাখি। বড় বড় দুটো ডানা মেলে। একদম একা। আচ্ছা, সেও কি তার সঙ্গী কে খুঁজে ফিরছে??
------//*//------
সন্ন্যাসী শিপুখুড়ো
উত্তম চক্রবর্ত্তী (কলকাতা)
বছর চার পাঁচ পর শিপু খুড়ো গ্রামে ফিরে এসেছে। কেউ কেউ নাকি দেখেছে শিপু খুড়ো গেরুয়া কাপড় পরে সন্ন্যাসীর বেশে ফিরে এসেছে। তারপরে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির কুঁড়েঘর ভেঙে ঝাঁ চকচকে দোতলা পাকা বাড়ি বানিয়েছে। গাঁয়ের সকলের একটা বড় জিজ্ঞাসা, শিপু হঠাৎ এত টাকা পেল কোথায়?
সদ্য বি.এ পাশ করা মাতব্বর গোছের ভগা চৌধুরী বলল, বেটা এই পাঁচ বছর নিশ্চয় জেল খেটেছে।
রাম বেনে বলল, তাহলে জেলে সে টাকা কোথায় পাবে?
তুমি জানো না খুড়ো। জেল খাটলে সরকার টাকা দেয়।
সে হয় তো দেয়। তা বলে কুড়ি-পঁচিশ লাখ টাকা তো দেবে না। বাড়ি খানা সরজমিনে গিয়ে দেখে আয়। পঁচিশ লাখেও হবে কি না কে জানে। বাড়ির উপর নীচ মার্বেল আর টাইলস্ দিয়ে মোড়া। ঘরে জলের পাম্প, পাইপ লাইনের জল, কি নেই! আমরা মুখ্যু লোক হলেও এই টুকু জ্ঞান আছে।
এখন গ্রামের ছেলে থেকে বুড়ো,সকলের আলোচনার বিষয়বস্তু হল,শিপু জাতে চোর। চুরি ডাকাতি করলেও তো এত টাকা পাওয়ার কথা না। তবে কি লটারি পেয়েছে!
শিপু খুড়ো যে ডাকাত, তাই তাকে বাড়ির বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করতেও ভয় পায়। তার উপরে সব সময় ধেনো মদ খেয়ে থাকে। মদ খাওয়ার পর একটা তুলসীজর্দা দেওয়া পান খেয়ে মুখটা লাল ভকভকে করে রাখে। আর মেজাজ সব সময় সপ্তমে চড়ে থাকে। বীরপুঙ্গব প্রমাণ করতে কাঁধে থাকে একটা চকচকে টাঙ্গি।
শিপু খুড়ো এখন সকাল হলেই সাগেন,পটমগোড়া,নিমডিহা লোটো,ধাদিকা বামুন পাড়া, পলমী হয়ে সাইকেলে করে ঘুরে অবশেষে ঠিক দশটা নাগাদ কাঁসাইয়ের বুড়ো বটগাছের তলে বসে আর কয়েক পাট ধেনো খেয়ে গুম্ মেরে বসে থাকে। মাঝে মাঝে বকবক করে ।
বহুদিন পর মানবাজার যাওয়ার পথে দূর থেকে কাঁসাইয়ের তীরে গাছ তলে শিপু খুড়োকে দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে ডাকলাম,
শিপু খুড়ো-- ও শিপু খুড়ো।
কোন প্রকারে চোখ খুলে বলল,কোন হ্যায় --
চিনতে পারছো না খুড়ো?
মদের নেশায় চুর হয়ে আছে। তবুও বার কয়েকের চেষ্টায় চোখ খুলে বলল, কেন চিনব নাই বাপ্। ঢের চিনেছি। ই শালার দুনিয়ায় কন শালাকে চিনতে বাকী নাই। সব শালা নিজের নিজের ধান্দায় থাকে। দুনিয়াটা পাল্টে গেছে।
দেখলাম খুড়ো মদের নেশায় ঠিক মত বসতেও পারছে না। তাই ওখান থেকে বেরিয়ে কাঁসাই পেরিয়ে মানবাজারের পথ ধরলাম।
বিকালবেলা পায়রাচালী বাজারে হঠাৎ করে হই হট্টগোল শুনে গিয়ে দেখি,শিপু খুড়ো বীরদর্পে চিৎকার করছে আর বলছে -
শালা শিপতি সর্দার কি করে দোতলা বাড়ি করলো, তোদের জেনে কি লাভ? যখন দু-বেলা খেতে পেতাম না,তখন কেউ জিজ্ঞেস করেছিলি, শিপু খেয়েছিস্ কি না? এখন আমার দালানঘর দেখে চোখ টাঁটাচ্ছে?
শিপু খুড়ো মাঝে মাঝে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে। আমাকে দেখেই জিব কেটে বলল, ই বাপু রে! ভাইপো কিছু মনে কর না বাপ্। আজ মেজাজটা খারাপ হয়ে পারা মাথায় উঠে গেছে।
তা খুড়ো কাকে গালিগালাজ করছো ? কেনই বা করছো?
কাছে এসে বলল, তুমাকে বলব বাপ্। তবে এখন নয়। ঘন্টাটেক পরে কাঁসাইয়ের ধারে বট গাছটার তলে এস। এখন বাড়ি যাও। আজ শালাদের গন্ডাকতক বাখান দিয়ে গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়তে দাও। ডেলি বলে শিপু টাকা কোথায় পেল, ঘর কি করে করল। শালাদের ভাবটা এমন, যেন উয়াদের বাপের টাকা আমি ঘর করে খরচ করে দিচ্ছি।
তারপর নরম সুরে বলল, ভাইপো তুমি থাকলে ব্যাঁত আটকে যাচ্ছে। যাও যাও। পরে কথা হবেক্।
বেলা পড়ে এসেছে। কাঁসাইয়ের দিক থেকে বাদল বাউরি তার ডাগর গরুর পাল নিয়ে গ্রামে ফিরে আসছে। গ্রামের এমন কেউ নেই যে বাদল বুড়োকে তার বাড়ির গরু ছাগল চরানোর দায়িত্ব দেয়নি। রাস্তায় দেখা হতেই তার পিকাটি পড়া দাঁতের সারি উন্মুক্ত করে বলল, তা বামুন দাদা কবে এসেছেন?
এই তো, তাও তিন চার দিন হবে।
দেখতেই পাইনি। সব সময় ঘরেই থাকো ন কি?
না-না,তা কেন। তুমি হয়তো আমাকে দেখতে পাওনি বাদল দাদু।
হয় তো হবে। আমি তো সারাদিন নদীর ধারে গরু ছাগল চরাই। গাঁয়ে থাকি না। তোমার দেখা পাবোই কি করে। বলেই গরু কাড়া পালের পিছু বাদল দাদু গ্রামের পথে এগিয়ে গেল।
বাদল বুড়োকে পিছনে ফেলে হেঁটে চলেছি কাঁসাইয়ের দিকে। সেখানে বুড়ো বটগাছের তলায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে, শিপতি সর্দার ওরফে আমার শিপু খুড়ো।
বটগাছের তলে গিয়ে দেখি খুড়ো বসে আছে। দেখতে পেয়েই বলল, এসে গেছো ভাইপো? বসো।
তা খুড়ো তখন এত রেগে ছিলে কেন?
রাগ হবেক্ নাই বাপ্। একটা দু'তলা দালান ঘর করেছি। আর উ টা দেখেই সবাই জ্বলে পুড়ে মরছে।
তা তোমার বাড়ি হয়েছে তো অন্যের গা জ্বালা করবে কেন?
তুমি কেমন এম এল এ, বি এল এ পাশ করেছো বাপ্! বুঝতে লারছো?
অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
শুন ভাইপো। তুমি ত জানো। আমার মাটির ঘর, ভঙলা চালে বড় বড় সব ভুলুক। গরীব বঠি ন -- ?
ত কয়েক মাস আগে দু'তলা করলাম। কেউ ভাবছে চুরি করে, আবার কেউ ভাবছে লটারি পেয়ে আমি ঘর করেছি।
তাহলে তুমি ঘর করার টাকা পেলে কোথায়?
উটাই তো তুমাকে বলব বাপ্। তাহলে শোন। বছর পাঁচ আগে ইঁদপুরের কাছে একটা গাঁয়ে ডাকাতি করতে গেছি। আমাদের সর্দার মানে ভূষণ সর্দার বলল, শিপু রে, বড় শক্ত ঘাটি। নিজেকে বাঁচাতে খুন করতেও পিছপা হবি না। তারপর এক অমাবস্যার রাতে মা কালীকে গড় করে ভূষণ সর্দারের দলে বেরিয়ে পড়লাম।
ডাকাতি করা কি আর কত সহজ বাপ্। একটা ঘরে ঢুকতেই একটা বুড়া চোর চোর বলে দমে চিৎকার করছিল। বুড়াকে ধমকে বললাম, খবরদার চোর বলবে না। আমরা চোর না, আমরা ডাকাত। বুড়ার ইস্পর্ধা দেখ। শালা বলে কি না আমর আমরা চোর? সেন্টুতে লেগে গেল। তাই টাঙ্গিটা তুলে কোপাই দিলম্।
তারপর -
বেশ বড়লোকের বাড়ি। দেদার ধনসম্পত্তি। ডাকাতি করে আমরা বেরিয়ে এলাম। রাত তখন গভীর। আমরা এক জায়গায় এসে চুরির টাকা ভাগ করে সকালে বাস ধরে বাড়ি ফিরছি। বাসে সব আলোচনা করছিল। যাত্রীরা বলছিল, ডাকাত গুলো নাকি খুনও করেছে। পুলিশ সকাল থেকে ডাকাত ধরার জন্য বেরিয়ে পড়েছে। আর ধরতে পারলেই খুনের অপরাধে ফাঁসি হতে পারে।
তোমাকে ধরতে পেরেছিল?
না, আমি ঐ বাসেই পায়রাচালীতে না নেমে মানবাজার থেকে বেপাত্তা হয়ে গেলাম।
কোথায় গেলে?
মানবাজার থেকে টাটানগর গিয়ে সেখান থেকে দক্ষিণ ভারতে। ওখানে গিয়ে সন্ন্যাসীর ভেক ধরে একটা আশ্রমে উঠলাম।
মন্দিরের মহন্ত মহারাজ আমাকে দীক্ষা দিলেন। আমার নতুন নাম হল স্বামী শিপ্রানন্দ। তারপর মন্দির ধোঁয়া মোছার কাজ দিল। প্রতিদিন সকালে উঠেই মন্দির জল দিয়ে ধুয়ে মুছে তকতকে করে দিতাম। সারাদিন আশ্রমের মহারাজের ফাইফরমাস খাটতাম। সকাল-সন্ধ্যায় নাম জপ করতাম। বেশ ভালোই কাটছিল দিন গুলো।
একদিন আমার গুরুমহারাজ ডেকে বললেন,শিপ্রানন্দ মন্দিরের যে মহারাজ গয়নাগাটি দিয়ে ঠাকুরের রাজবেশ পরাতেন তিনি কন্যাকুমারী আশ্রমে বদলী হয়ে চলে যাচ্ছেন। তুমি কি পারবে তার কাজ গুলো করতে?
রাজী হয়ে গেলাম।
মহারাজ আমাকে সাথে নিয়ে গিয়ে রত্ন ভান্ডার দেখিয়ে আনলেন। কি বলবো ভাইপো বস্তা বস্তা সোনার গয়না। ওজনে যে কত কুইন্টাল হবে কে জানে?
অত গয়না সব ঠাকুরকে পরানো হয়?
দূর বোকা। বস্তা বস্তা গয়না পরাতেই তো সারাদিন পেরিয়ে যাবে। তার পরেও কয়েক বস্তা বাকী থেকে যাবে।
অত গয়না রাখে কোথায়?
তাই তো বলছি ভাইপো। মন্দিরের নীচে বিশাল আন্ডার গ্রাউন্ড চেম্বারে গয়না রাখা থাকে। নানা গয়না ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরানো হয় বলে মহারাজ আমার হাতেও এক থোকা চাবি দিয়েছিলেন। কাজ বেশ ভালোই করছিলাম। জানতাম গ্রামে ফিরে গেলেই খুন ও ডাকাতির দায়ে পুলিশের জালে ধরা পড়ব। তার চেয়ে সন্ন্যাসীর বেশে আত্মগোপন করে চার পাঁচটা বছর কাটিয়ে দিতে হবে। কেস চাপা পড়ে গেলে তখন দেখা যাবে।
বললাম, তারপর ফিরে এলেও তো পুলিশ ধরতে পারে?
শিপু খুড়ো হেসে বলল, ভাইপো সময় হচ্ছে এক বিশাল ময়লম। সময়ের তরঙ্গ আসতেই যা সময় নেয়। একবার পাড়ে ধাক্কা লাগলে তা মুছে যায়। কারণ পাড় তখন পরের তরঙ্গের জন্য অপেক্ষা করে।
বেশ,তারপর কি হলো বলো।
তারপর তো মালুম করছো ভাইপো, আমি জাত ডাকাত। তিন চার বছর নিরাসক্ত ভাবে কাজ করে বিশ্বাস অর্জন করলাম। তারা যখন আমার উপর ভরসা করতে শুরু করল তখন প্রতিদিন গয়নার ভাঁড়ার থেকে দু-চার ভরি গয়না সরিয়ে রাখতে শুরু করলাম। গয়না সরিয়ে একটা গোপন জায়গায় জমা করে রাখতে রাখতে প্রায় এক ব্যাগ ভর্তি করে একদিন মহারাজকে বললাম, মহারাজ একটু তীর্থ ভ্রমণ করতে চাই।যদি অনুমতি দেন।
অনুমতি পেলে?
পেলাম মানে? মহারাজ আমাকে ভ্রমণের খরচ বাবদ দু'হাজার টাকাও দিলেন। একদিন ভোরবেলা মহারাজকে রত্ন ভান্ডারের চাবি দিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে এসে গয়নার ব্যাগ নিয়ে করমন্ডল এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। দু- দিন পরে সোজা বাড়ি।
তুমি ফিরে না গেলে যদি তাঁরা তোমার খোঁজ করে। বা যদি দেখে গয়না চুরি গেছে?
তুমি কেমন এম এল এ, বি এল এ পাশ ভাইপো? শিপু অশিক্ষিত হতে পারে। কিন্তু জাত ডাকাত। আমি ওখানে আমার ঠিকানা লক্ষ্ণৌ দিয়েছিলাম। আর গয়নার কথা বলছো? ওখানকার মহারাজরাও জানে না কত গয়না আছে। তার থেকে যে চুরি গেছে কিছু বুঝতেই পারবে না।
কথাগুলো বলেই শিপু খুড়ো ফিচিক ফিচিক হাসতে লাগল।
তা কত ভরি গয়না চুরি করেছিলে?
ধরে নাও, প্রায় দু'শ ভরি। তারমধ্যে কিছু বিক্রি করে বাড়ি বানিয়েছি। কিছু ছেলেকে দিয়েছি। সে একটা ইঁটভাটা করবে। বাকি গয়না এখনও একটা গোপন স্থানে রেখেছি।
যদি কেউ কোনদিন জানতে পারে?
কেউ জানে না ভাইপো। ঘটনাটা একমাত্র তোমাকেই বললাম। জানি তুমি পাঁচ কান করবে না। বলেই আমার দুটো হাত ধরে বলল, ভাইপো কথাগুলো বুকের মাঝে চাপ হয়ে বসেছিল। তোমাকে বলে হাল্কা হলাম। তুমি কাউকে যেন বলো না বাপ্।
কথাগুলো বলেই গগন ফাটিয়ে শিপু খুড়ো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
সন্ধ্যা বেলায় তার হাসি বাতাসকে চুরমার করে পলমী, বামুন পাড়া, লোটো, ধাদকা, নিমডিহা পেরিয়ে সাগেন পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগলো।
হাসি থামিয়ে বলল, ভাইপো, আমি এখন শিপতি ডাকাত নই। আমি এখন মহারাজ শিপ্রানন্দ।
বলেই আমার কাঁধ ঝাঁকিয়ে আর একপ্রস্থ হাসতে লাগলো।
------//*//------
উৎসর্গ
তপন তরফদার (খড়্গপুর)
উৎসর্গ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক দান-ধ্যানের মহান আদর্শ। আমারা বই খুললেই দেখি অত্যন্ত যত্ন করে শ্রদ্ধা মূলক সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করে প্রথম পৃষ্ঠাতেই ছাপা হয় পরিচিত প্রিয়জনের নামে বইটি “উৎসর্গ” করা হয়েছে। অনেক বইতে আবার আঁকাবাঁকা অক্ষরমালায় খোদাই করে লেখা হয় যাতে সবার নজরে আসে। এখন উৎসর্গ আবার সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উৎসর্গীকৃত করা হচ্ছে নিজের দলের বা অপ্রয়োজনীয় হলেও উৎসর্গ করে যাচ্ছে। এই নিয়ে সমাজ মাধ্যমে তোলপাড় হয়। কিন্তু এমন ঘটনা ও ঘটে যা নিঃশব্দে ঘটে যায়, হয়ে যায়, থেকে যায়, যা জানা যায় অনেক পরে। কাহিনি ও জানতে পারা যায় অনেক অনেক পরে নীরবে, নীরব আলোর মাধ্যমে। সেই কাহিনীর কথা এখন অবগত করা প্রয়োজন।
ধীরেনদা মরেই মুক্তি পেলো। মৃত্যু দুঃখদায়ক। এক্ষেত্রে আমরা দুঃখ পেলেও ধীরেনদার কাছে এই মৃত্যু পুরস্কার। ধীরেনদা পেলো এক প্রাণখোলা মুক্তির আকাশ। অসহনীয় কষ্টের মধ্যেই ধুকপুক করে শ্বাস প্রশ্বাস চলছিল। মৃত্যু সবার কাছে দুঃখদায়ক হয়না। মুখে দুঃখের ছাপ বজায় রেখে মনের অন্দরে আনন্দের খবর হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বৌদি মালা দেবীর কাছেও খুবই আনন্দের খবর। আমারা যারা ধীরেনদার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে মিশেছি তারা জানে, মালা বৌদি কখনোই ধীরেনদাকে মেনে নিতে পারেনি। কারন ধীরেনদা কোন করিতকর্মা আদমী ছিলনা। জীবনটা নিজে উপভোগ করেনি, উপভোগ করার উপকরণ যোগাড় করে দেয়নি। শুধুমাত্র দিনরাত এক করে দিস্তা দিস্তা কাগজে লিখে গেছে। মালা বৌদি বারন করেছে, ধীরেনদা শোনেনি। এমনকি ষড়যন্ত্র করে কাগজপত্র লুকিয়ে রেখেছে, তাও দমাতে পারেনি।
(২)
আমাদের জগৎবল্লভপুরের অন্যতম বর্ধিষ্ণু পরিবারের ছেলে ধীরেনদা। চক্রবর্তী পরিবারের যেমন চাষের জমি আছে তেমনি সত্যনারায়ণের চন্ডীপাঠ থেকে পারলৌকিক শ্রাদ্ধ্যবাড়ি থেকে র অনুষ্ঠানে স্বর্গের পথে প্রতিস্থাপন করা, মোবাইল থেকে টিভি, সাইকেল থেকে মটরসাইকেলর বিভিন্ন ধরনের রমরমা ব্যবসা ও করে। ধীরেনদারা পাঁচ ভাই। ধীরেনদাই ছোট। যাদের সংসার সম্পর্কে গভীর ধারণা আছে তারা জানে সংসারে ওই শেষের জন তেমন আদর যত্ন পায়না। বড়জন, সংসারের প্রথম উত্তরাধিকারী ছেলেরা যেমন আদর যত্নে মানুষ হয়, তার ছিটেফোঁটা ও পায়নি। গোদের উপর বিষফোঁড়া, পরিবার চেয়ে ছিল একটা রুপে লক্ষী গুণে সরস্বতী সংসারে আসুক। ছেলে আছে মেয়ে হোক। মেয়েরা পরের বাড়িতে গেলেও মা,বাবার জন্য হৃদয়ের ভালোবাসায় কখনও খামতি রাখেনা।
সময় থেমে থাকে না। সময় কারো কথা শোনেনা। সময় নিজের গতিতে চলে। এবং বড়কথা ধীরে ধীরে ধীরেন ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হলো।
এই কলেজে ভর্তি হয়েই ধীরেন অন্য মানুষে রুপান্তরিত হয়ে যায়। “কালো তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।“ পৃথিবীতে অনেক গবেষণা চলছে তাদের মধ্যে অন্যতম গবেষণা প্রেমে পড়া বা প্রেমিক প্রেমিকা কেন হয় তার উৎসর সন্ধানে। এখনো প্রকূত কারন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে অন্যতম, মানুষ কখন কার সঙ্গে, কি কারণে প্রেমে পড়ে কেউ জানেনা। এক কবি তার মনে আঁকা প্রেমিকার সঙ্গে দেখা এক স্টীমারে। দুর থেকে দেখা। প্রেমপত্র বিনিময় আকাশ কুসুম। কোনো কথাবার্তা বলার ও সুযোগ হয়নি নীল নয়না স্বর্ণকেশীর সঙ্গে। তাও তার প্রেমে হাবুডুবু হয়ে দু-দুটো মহাকাব্য লেখেন ইতালির কবি দান্তে আলিগিয়েরি, “দ্যা ডিভাইন কমেডি “ এবং “ দ্যা নিউ লাইফ”। অন্য একটি পৃথিবী খ্যাত কাহিনী। রাডইয়ার্ড কিপলিং বম্বেতে জন্মানো এক ইংরেজ সন্তান ২৪ বৎসরের তরুণ। সাংবাদিকতার সঙ্গে গল্প-কবিতা ও লিখতেন। মায়ানমারের মৌলামিন শহরের সুউচ্চ কায়াকথিন প্যাগোডার সিঁড়িতে এক বর্মি তরুণীর রুপে মুগ্ধতায় আবিষ্ট। তার সঙ্গে কথা বলার ও সুযোগ হয়নি। তাও প্রেমের বন্ধনে জড়িয়ে পরেন। ভুলতে পারেননি। এক বৎসর পরে কিপলিং “মান্দালয়” কবিতায় নামহীন তরুণীকে অমর করে গেছেন। তাকে উৎসর্গ করে লিখেছেন, “বাই দি ওল্ড মৌলামিন প্যাগোডা.... দেয়ার ইজ অ্যা বার্মিজ্ গার্ল।“ শতবর্ষ পরেও আজও তা প্রাসঙ্গিক। সিনেমা হয়েছে এমনকি কবিতাটা উপলক্ষ্য করে গান তৈরি হয়েছে। কোভিড ইত্যাদি ভাইরাস সনাক্ত করা গেলেও প্রেমের ভাইরাস এখনো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।
আমাদের ধীরেনদা প্রেমে পড়লো এক কৃষ্ণ কলির। এক মাথা ঘন-কোঁকড়ানো চুল। সামনের দিকে একটু চিরুনি চালিয়ে কেশ সজ্জা শেষ করে। আগোছলা “কুন্তলচূর্ন” কানের চারপাশে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। কাজল টানা চোখ যেখানে কাজলের প্রয়োজন হয়না। সুগঠিত দাঁতে সুখ স্পর্শের হাসি। মদিরায় ভেজানো ঠোঁট। চোখের দৃষ্টিতে দূর ভেদী প্রখরতা। রূপের আগুনে পুড়ে ছাই হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ লাস্যময়ীর নাম ও রুপা বেসরা। কালো মানিকের কথা যারা শুনেছে তারা স্বীকার করতে বাধ্য কালো মানিক আছে এখনো, থাকবেও। ওদের সমাজে গায়ের রঙ কালো বলে কেউ দুঃখ করেনা।
ধীরেনদা ওই কলেজে পড়তে পড়তে কালো মানিকের সঙ্গে কি ভাবে প্রেমের আঠায় সেঁটে গেল কেউ জানেনা। ধীরেনদাকে বেসরাদের কুটিরে দেখা গেছে। ওদের সঙ্গে হাঁড়িয়ার নেশায় না দেখা গেলেও ওদের মাটির ঘরের গোবর দিয়ে নিকানো আঙিনা, ভেষজ রঙ দিয়ে আলপনা আঁকা দাওয়ায় বসে দুজনে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপা আলোলোচনা চালিয়ে যায়। এই পল্লীর কয়েকজন লেখাপড়া শিখে চাকরি করছে। নিজেদের সংস্কৃতি বহাল রেখেও অপরকে আপন করতে পিছপা হয়না। সাঁওতালদের বেসরারা নাচে গানে খুবই পটু হয়। রূপার চেহারা যেমন ছিপছিপে, গানের গলাতেও মধু আছে। সব থেকে আশ্চর্যজনক ঘটনা ও মুখে মুখে গান রচনা করে গাইতে পারে। মনকে মাতিয়ে রাখে। “দুলৈড় তাম দ পালেন-ঝঁড়গাও ঞুরু ক:আ? / আলে ছাটকা দারে লাফাং ডৈর খন।/ আঁজলে আতাং কাতেঞ-লকা দারাম কেয়া / আটেৎ অসার কিয়ীঞ নোআ জিউয়ী মন।“ ভাবানুবাদ। “তোমার ভালোবাসা যদি হঠাত খসে পড়তো আমাদের বাড়ির উঠানের-আঙিনায় / আমি সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে/ দু’হাত বাড়িয়ে, হৃদয়ের অঞ্জলি পেতে লুফে নিতাম।“
(৩)
ধীরেনদার মনে এক কবির ভ্রুণ বাস করতো। এই কালো মানিকের সংস্পর্শে এসে তার পূর্ণ বিকশিত হয়। বাংলা ভাষার সাহিত্যের খুব গভীরে না হলেও কিছু জ্ঞান ছিল। কিন্তু সাঁওতাল ভাষার সাহিত্য ও যে ফেলনা নয়, তা এই রূপার সংস্পর্শে এসে জানতে পারে। কবির লেখায় যতই কালোমানিক সুন্দরী বলে কাব্য করলেও, নিজের জীবনের সঙ্গী নির্বাচন কখনো করেনা। তখন ওই ধবল সুন্দরীদের পছন্দ করে তাদেরই দ্বারস্থ হয়।
ধীরেনদা যখন নিজেই যেচে এগিয়ে এসেছে, রূপা খোলা মনেই মেশে এবং অন্তরঙ্গ হয়ে আলোচনা ও করে। ধীরেনদা ওদের সৃষ্টিতে আদিম সরলতা, অকৃত্রিম প্রাঞ্জলতা, মৌখিকভাবে প্রচারিত হওয়ার ক্ষমতা ও অন্যান্য লোকসাহিত্যের সমস্ত গুণগত উচ্চমানে গুণমুগ্ধ্য হয়ে যায়। এই সম্পর্কে বিশদে জানতে রূপার সঙ্গী হয়ে যায়। রূপাও প্রাণ খুলে অন্তঃস্থল থেকে আলোচনা করে।
রূপা শিক্ষিকার মতো ধীরেনদাকে বলে, সাঁওতাল জাতির পুরাতন তথ্য সংগ্রহ করে “হড়কোরেন মারে ‘হাপড়ামকোরেয়া কথা” বইটি ১৮৮৭ সালে রেভা স্টেফ্সরড কলে,বইটি প্রকাশ করেন। এরপর আরেকটি কালজয়ী বই রামদাস টুডুর “খেরোয়াল বংশা ধরম পুঁথি” প্রকাশ করেন প্রথম সাঁওতালি লেখক, রামদাস টুডু। বইটিতে সাঁওতালি পুরাণকথা ও সামাজিক রীতিনীতির বই হলেও, বইটির সাহিত্য মূল্য প্রচুর। রামচাঁদ মুর্মূর লেখা ও সুরে বাঁধা গান, “আদিবাসী বীর হো” সাঁওতালদের কাছে আজও জাতীয় সংগীতের মতো। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০-র মধ্যে সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা রচনা করেছিলেন। ধীরেনদা বলে, আমরাতো কিছুই জানিনা। রূপা বলে জানাবার চেষ্টা ও করা হয়নি। দেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে আমাদের অবদান আলোচিত হয়না। বৃটিশদের দেওয়া আদিবাসী তকমা ছেড়ে দিয়ে আমরা অধিবাসী হতে পারলাম না। ধীরেনদা বলে আমি তোমার সঙ্গে আছি আরও জানতে চাই। আমি তোমাদের নিয়েই দলিত সাহিত্যের অন্য ধারার গল্প লিখবো। যা উৎসর্গ করবো তোমাকেই।
রূপার মুখে হাসি। এ হাসির প্রকৃত অর্থ কি তা কেউই বলতে পারবেনা, যেমন মনোলিসার হাসি। রুপা দাওয়ার কোনায রাখা মাটির কলশি থেকে দু গ্লাস জল, ঘর থেকে দুটো বড়ো লালবাতাসা এনে ধীরেনদাকে একটা এগিয়ে দিয়ে বলে “খেয়ে লে।“
রূপা বলতে লাগলো – সাধু রামচাঁদ মনে করতেন সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্য ছাড়া পৃথিবীতে সাঁওতালদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। সাঁওতালি সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সাধু রামচাঁদের অপরিসীম অবদান আছে। এগিয়ে আসেন পাউল জুঝৌর সরেন, পন্ডিত রঘুনাথ মুর্ম, মঙ্গল সরেন। সাওঁতাল সংস্কৃতির উপর কয়েকটি বই লেখেন কবি নায়ক মঙ্গলচন্দ্র। জাতিকে আন্দোলিত করতে পন্ডিত রঘুনাথ মুর্ম অলচিকি বর্ণমালা তৈরি করেন। অলিচিকি আন্দোলন আদিবাসী সমাজে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। রঘুনাথ মুর্মর কবিতা আধ্যাত্মিক চেতনায় সম্পৃক্ত উন্নত র কবিতা। গোরাচাঁদ টুডুর কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রকৃতি ও মানব জীবনের অপার রহস্য তার কবিতায় বিশেষ ভাবে উল্লিখিত আছে। নারায়ণ সরেন অন্যতম শক্তিশালী কবি। তার ‘তড়ে সুউম’ কবিতায় মিস্টিক চেতনা ও ধ্যানমগ্নতার সুর মনকে ভীষণ নাড়া দিয়ে যায়। গল্প উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। তাঁর ‘তড়ে সুতীম’ লেখাটি সাঁওতালি ভাষার আধ্যাত্মিক চেতনার অন্যতম হাতিয়ার ও বলা যেতে পারে।
ধীরেন যত শুনছে ততই অবাক হচ্ছে। রুপা গালে হাত দিয়ে চোখ গোল গোল করে বলে আরও অনেক কবি-লেখকের সাহিত্য প্রচারের আলোয় আসলে অবাক হয়ে যাবে। ইদানিং আমরা গদ্য-কবিতার কথা বলি। কবি ঠাকুরদাস মুর্মর সমস্ত কবিতা গদ্যের আকারে লেখা। চিন্তা শীল প্রবন্ধ ও লেখাতে সিদ্ধহস্থ ছিলেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৯ আদিবাসী সমাজের নানা বঞ্চনার বিরুদ্ধে সেই সময়েই কলম ধরেছিলেন ঠাকুর প্রসাদ মুর্ম,। ডেমানচন্দ্র হাঁসদা, বাবুলাল মুর্ম সাঁওতাল ভাষার অন্যতম শক্তিশালী কবি। সারদাপ্রসাদ কিসকুর কথা কতজনে জানে, অথচ তিনি মাটির মানুষদের নিয়েই কাব্য লিখেছেন। এক নাগাড়ে বলে চলেছে রুপা। -- অনেকেই জানেনা রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ সাঁওতালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। সমালোচকরা প্রশংসা করে বলেছেন, “রবীন্দ্র কবিতার বিভাব তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়।“ ১৯৪০ থেকে ১৯৪৯ সাঁওতালি সাহিত্যের এক জোয়ার দেখা যায়। স্বাধীনতার স্বপক্ষে কলমে শান দিয়ে আগুন ঝরানো কবিতা লিখে প্রকৃত স্বাধীনচেতা হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল সাঁওতাল কবিরা। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে রুপা বলে - কিন্তু ইংরেজদের প্রবর্তিত ‘আদিবাসী’ শব্দটি আমাদের গায়ে সেঁটে থাকল। কবিরা প্রতিবাদ করেছিল, করে আসছে। কবি হেমব্রম, কাজলা সরেন, অসিত সরেন প্রমুখের কবিতা সাঁওতালি জনজাতির মতই চিত্রর্ধর্মী, রুচিশীল, স্নিগ্ধ অনুভূতি প্রবণ, অনাবৃত অরণ্য চেতনার নির্মল সবুজের সন্ধান পাওয়া যায়। বিশ্বায়নের লোভের পৃথিবীতে সাঁওতাল কবি-লেখকদের সাহিত্য সাঁওতাল সহ সমগ্র জাতিকে জাগ্রত করে তোলার সৃজনশীল সাহিত্যের সৃষ্টি করেছেনন। সাধারণ মানুষকে উৎসর্গ করেছেন।
রুপার অশ্রুজল মুক্তর মতো চিকচিক করছে। ধরা গলায় বলে, আমাদের কাছে অতীব দুঃখদায়ক। ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে অনেক নথিপত্র, বীরগাথা। বর্তমানে ইতিহাসের অন্বেষণে সাঁওতালি সমাজের, সাহিত্যের অনেক হারানো ইতিহাস ইতিহাসের পাতায় উঠে আসছে। রুপা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, - ধীরেনদা আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, জগ মাঝিদের কাছ থেকে অনেক নথিপত্র যোগাড় করেছি। তোমাকে দেখাবো। তোমার ভালো লাগবে। লেখালেখি করলে অনেকেই বাহবা দেবে। জান আমাদের সমাজে পুত্রদের অধিকার সমান, কিন্তু মেয়েদের কোন অধিকার নেই। তবে পিতা ইচ্ছা করলে মেয়েকে কিছু দিয়ে যেতে পারেন। তবে সম্পত্তি বিলি করার সময় বাবা প্রত্যেক মেয়েকে একটি করে সুস্থ সবল গাভী দেয়।। পুত্রহীন ব্যক্তির যাবতীয় সম্পত্তির মালিকানা তার সহোদর ভাইয়েরা পেয়ে থাকে। আমারতো ভাই নেই আমাদের সবকিছু কাকার ছেলেরা পাবে।
( ৪)
ধীরেন যত রুপার সঙ্গে মিশছে ততই অবাক হচ্ছে। কাগজে সবাই পড়ে আদিবাসীরা অসভ্য।এখনো আদিম চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকে। ধীরেন কিন্তু ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে প্রকৃতিকে এরা উপেক্ষা করেনা। সম্মান করে ভালোবাসে এবং প্রকৃতিকে, অরণ্যকে পুজো না করে নিজেদের একান্ত প্রয়োজনেও এরা ব্যবহার করে না। এই প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা আদিম মানুষরা ছিল আরন্যক এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। অরণ্য কমেছে, আদিম মানুষরা অন্য ধারার জীবনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। অর্ন্তজাল ঢুকে পড়ছে অন্দরমহলে। যুগের সঙ্গে খাপখাওয়াতে গিয়ে কিছু পরিবর্তন এসে গেছে। ইতিহাস বলে সে সর্বধর্ম ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের উদ্ভাবনীর সঙ্গে পরিস্থিতির সমাজে পরিবর্তন হয়ে অনেক কিছুই মেনে নেয়। কিন্তু আদিম সমাজ আদিম ভাবনার অনুষঙ্গ থেকে যায় মননে। সেই ভাবনাকে সম্মান জানাতে স্বীকৃতি দিতে পূর্বপুরুষদের রীতিকে শ্রদ্ধা করে, পালন করে বিভিন্ন রীতির মাধ্যমে। রুপা ধীরেনদাকে বলে আমাদের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নিয়ে যাবে। আমাদের মাঘবঙা অনুষ্ঠানে নিয়ে যাব। মাঘবঙা কবে কবে হবে তা ঠিক করে “পারানিক” এবং মাঝি। মাঝি ডাকুয়াকে ডেকে বলে দেয় সবাই কে খবর দিতে। আদিম সমাজেও প্রত্যেকের যে প্রয়োজন আছে প্রত্যেকে গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ, সেই ভাবেই নিয়ম-নীতি, রীতি তৈরি করা। ডাকুয়াকে বলা হয় “গোডেৎ”।যার কাজ প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে আমন্ত্রণ জানান। গোডেৎ প্রত্যেক বাড়ি থেকে চাল আর একটা ছোট মুরগি নেবে। নির্দিষ্ট দিনের ঠিক করার জায়গায় ও সময়ে পারানিক, মাঝি, গোডেৎ, জগমাঝি এবং নাইকি এই পাঁচজন গ্রামের অন্য পুরুষদের নিয়ে পুজোর জায়গায় যাবে। ধীরেনের কাছে “নাইকি” শব্দটি পরিচিত শব্দ। ধীরেন বলে ওঠে এখানে নাইকির কিসের প্রয়োজন বুঝতে পারছিনা। নাইকি মানে জুতো কোম্পানির বিঞ্জাপনের বিষয়টি ভাবছে। ওকে বুঝিয়ে দেয়, নাইকি মানে পুরোহিত।
রুপা ধীরেন কে নিয়ে আসে ওদের সমাজের পুজো দেখাবার জন্য। সবাই দেখছে পুজোর জন্য নতুন কুলোয় তেল সিঁদুর মেথি চালগুড়ি আতপ চাল। বলি দেয়ার জন্য মুরগি নিয়ে চলেছে। অবিবাহিত ছেলেরা নতুন মাটির ঘট ভর্তি জল নিয়ে চলেছে।
জঙ্গলের ঢোকার মুখেই ওদের পুজোরর জায়গা। জায়গাটা গোবর দিয়ে নিকানো হলো। সুতো দিয়ে ঘিরে তিনটে খোপ তৈরি করল। প্রত্যেক খোপে নকশা ওরাই কাটলো। ধীরেন লক্ষ্য করে নকশাগুলো কিন্তু এক নয় বিভিন্ন ধরনের। নকশার ভিতর আতপ চাল, মেথি ছড়িয়ে দিয়ে সিঁদুরের টিপ দিয়ে পুজো শুরু হল। প্রথমে “মারাং বুরু” পরের “জহর আয়ে”। মারাং বুরুর কাছে, করাতিফুল, ঝুঁটি ওলা সাদা মুরগির বাচ্চা বলি দেয়া হলো। সাদা মুরগি বলি দেওয়ার কারন ওরা মনে করে এই মুরগি বলি দিলে ছেলে মেয়েদের বিয়েতে কোন বাধা বিঘ্ন, অশান্তি হবেনা। গোডেৎ এর নাম গোবিন্দ সরেন। আমাদের মন্ত্রকে আমরা বলি বাঁখোড়।হাসি লেগে আছে। আমাকে বেশ খাতির ও করছে। মনে হয় রুপা কিছু ওকে বলে দিয়েছে। আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলে এই “বাঁখোটের” মানে বোঝেন। ধীরেন ম্লান হেসে বলে, কোন মন্ত্রের মানেই জানিনা। আমরা পুজো করি সংস্কৃত ভাষায়, বিয়ে হয় সংস্কৃত ভাষায়। পুরুত ঠাকুর বলে যায় বর বউ না বুঝেই বলে যায়। গোবিন্দ বলে আমরা কিন্তু আমাদের ভাষাতেই মন্ত্র বলি এবং আমাদের রীতি অনুযায়ী রীতিমতো ঈশ্বরের আরাধনা করি। এই যে বললো জহর গঁসাই মারাং বুরু / মা একখানে নো আয় মাগ মেগরে।“ কথাটা হলো আমাদের চলার পথে যেন কোন অসুবিধা না হয়, ভগবানের কাছে তাই এই পুজো, ভক্তি, প্রার্থনা।
নাইকি আমাদের বাঙালি হিন্দুদের পুরোহিতের মতো গম্ভীর হয়ে উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছে। গোবিন্দ বলল এই যে মন্ত্রটা পড়ল, “জোহার আয়ও জাহের এরা/ মা এখানে নঃ অয়ম মান সিম ঙ্চু তেলে।” কথাটার অর্থ আমাদের রোগজ্বালা যেন না হয়, যেন না ভুগি, তা তুমি দেখো, আমাদের অন্তরের এই আকুল প্রার্থনা। ধীরেন মনে মনে এদের তারিফ করে। কি সারল্য।তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষদের থেকে এরা অনেক এগিয়ে।
পুজো শেষ পুজোর জন্য ঘুরে ঘুরে যে চাল ডাল জোগাড় করা হয়েছে সেই চাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়। সবাই একসাথে খায় আর প্রার্থনা করে যেন গ্রামের সকলে একসঙ্গে থাকতে পারে। এই পূজা শেষ হলে ঘর ছাওয়া, বেড়া দেওয়া, জঙ্গল থেকে কাঠ কাটার অনুমতি সমাজের মাধ্যমে দেওয়া হয়। এই অনুমতি সরকারের ঘোষণার থেকেও বিশেষ জরুরী। গোবিন্দ বলে আমাদের মাঝি অনুমতি না দিলে আমরা জঙ্গলের কোনো পাতাই স্পর্শ করিনা। আমাদের গ্রামে যাবেন আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশলে, বুঝবেন আমাদের সমাজের বন্ধন কত অটুট, কোন খাদ মেশানো নেই। গোবিন্দ ধীরেনদা কে আমন্ত্রণ জানায় ওদের “সাগুন ঠেলি” অনুষ্ঠান দেখার জন্য।
(৫)
“সাগুন ঠেলি”। গোবিন্দের সঙ্গে ধীরেনদা গিয়েছে ওই “সাগুন ঠেলি” দেখতে।
এই অনুষ্ঠানে অবিবাহিত ছেলেরা মাথায় কাঠ নিয়ে পুরোহিতের ঘরের সামনে এসেছে।। ঘর থেকে এক অববাহিতা কিশোরী মেয়ে বেরিয়ে এসে ছেলেদের পায়ে প্রথমে জল ঢেলে পরিষ্কার করলো। তার পর তেল মাখালো। ধীরেনদার খুবই ভালো লাগছে। মেয়েরা আবার জল ঢেলে তেলটাকে খুব পরিপাটি করে পরিষ্কার করে দিল। তারপরে মেয়েটা হাঁটু গেড়ে বিশেষ এক ভঙ্গিমায় প্রণাম করলো।। লক্ষণীয় বিষয় প্রত্যেকবার কিন্তু মাটি ছুঁয়ে নিজের মাথায় বোলাচ্ছে।গোবিন্দ বলে, “মানুষকে প্রণাম করলেও আসলে প্রকৃতিকে প্রণাম করছে। প্রকৃতি হল আসল মা সবার রক্ষা কর্তা সবার প্রাণদায়িনী মা। ধীরেনদা নিজের মনেই বলে, “কত অজানা পৃথিবী।“
পুরোহিতের ঘরে মেয়েটা ঢুকে একটা বড় আকারের মাদুর বারান্দায় বিছিয়ে দিল। মাতব্বররা পার্টিতে বসলো। অন্যান্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো। আলোচনা শুরু হলো।গোবিন্দ ধীরেনদার কানে কানে রিলে করার ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল, “জগ মাঝি গ্রামের অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের সহ গ্রামের সকলের ভালোর জন্য পুজো পাঠ করবে। এই সময়ে পুরোহিতের চালায় কয়েকজন কিছু কাঠ গুঁজে দিল। গোবিন্দ বলে বুঝলেন কিছু। ধীরেনদা মাথা নড়িয়ে বলে না। ভূপেন বলে আপনারাই শুধু প্রতিকীর ব্যবহার করেন, আদিম বনবাসী রাও প্রতিকী ব্যবহার করে করতে জানে।। আমার মনে হল আদিম জনজাতি গোষ্ঠীই প্রথম “প্রতিকী”র সাহায্য নেয়। এই কাঠ গোঁজার অর্থ হল পুরোহিতের ঘর ছাওয়া বা রক্ষানবেক্ষনর দায় সবাই মিলে নিলাম। উনি যেমন গ্রামের ভালোর জন্য পুজো পাঠ করবেন, আমরাও উনার ঘর গোড়ে দেবো।
গোবিন্দ বললো, আমাদের সবারই কাজ, দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। যে যার কাজ করে যায়। প্রয়োজনে কঠোর শাস্তি দিতেও আমাদের সমাজ পিছপা হয় না। আমাদের জগমাঝি গ্রামের অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
(৬)
ধীরেন ও রুপার মেলা মেশা নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে চলে। ধীরেনের বাড়িতে এই অভিসারের খবর পৌঁছনোর লোকজন না থাকায় ওরা অন্ধকারেই থাকে। আদিবাসী পাড়া জানলেও ধীরেনদের বাড়িতে খবর পৌঁছায়নি। পৃথিবীতে সবকিছু মসৃন গতিতে চললে পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকবেনা। ধীরেন আর রুপার প্রেম গাথা সাঁওতাল সমাজ সহজ সরল হলেও সেখানে প্রেমের যেমন মন আছে প্রতিহিংসা ও আছে।
উপেন মূর্মর বাবা জগমোহন গ্রামের জগমাঝি, ওদের সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি। উপেনের নজর এখন রুপার উপর। একটু লেখাপড়া শিখে রেলের গ্যাংম্যান হয়েছে। উপেন ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়, “হাম কিসিসে কম নেহি।“ভয় এখন উপেনকে নিয়ে।“ ধীরেন বলে, আমি আছি, তোমার ভয়ের কিছু নেই। রুপা একটা এঁটো হাসি হেসে বলে, প্রত্যেক ধর্মেই শারীরিক বা আর্থিক বলশালীদের বিশেষ সুযোগ -সুবিধার ব্যবস্থা করা আছে। আমাদের অনেক ধরনের বিবাহ প্রথা আছে একটা বিয়ের রীতি রীতিমতো আমাদের পক্ষে ক্ষতিকারক। তোমাদের মতো আমাদের বিয়েতে দেনা পাওনা চলেনা সমাজে যেকোনো রকম পণপ্রথা পূর্ব কাল থেকেই নিষিদ্ধ। আমাদের সমাজে ছয় প্রকার বিবাহ রীতির প্রচলন থাকলেও বতর্মানে তিন ধরনের বিবাহের প্রচলন বেশি দেখা যায়। আসলি, রাজারাজি, হুর কাটারা বা ইতুঃবিবাহ। ধীরেনের মুখে মুচকি হেসে বলে, হিন্দুদের ও অনেক ধরনের বিয়ের রীতি আছে। কোনো কথা না বলে শান্ত ছেলের মতো শুনে যায়। রূপা গলায় সুর তুলে ছন্দ বজায় রেখে গড়গড় করে বলে আমাদের এক রীতির নাম আসলি বিবাহ। আসলি বিবাহ সম্ভ্রান্ত পরিবার ও শিক্ষিত সমাজের মধ্যেই প্রচলিত এ ধরনের বিবাহ কন্যার পিতা-মাতা পরিবারের সন্মতিতেই সম্পন্ন হয়।আর এক রকমের নাম রাজরাজি। প্রেম করে বিবাহ। গ্রামের হাটে কেনাবেচা করতে এসে সাঁওতাল যুবক যুবতীরা তাদের পছন্দসই প্রিয়জনের খোঁজ করে। মেয়েরা যখন হাটে যায় তখন তাদের সাথে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি থাকে। যাকে আমরা যোগমাঝি বলি। যোগমাঝি ছেলে-মেয়েদের পছন্দের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের ব্যবস্থা পত্র করে। ধীরেন বলে খুব ভালো ব্যবস্থা। প্রত্যেক সভ্য সমাজের উচিত তোমাদের দেখে শেখা।
রুপা গলার শির ফুলিয়ে বলে – মানুষের এই দোষ। ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্ত না শুনেই মতামত দেয়া। আমি শেষ করিনি। আমাদের আরও এক ধরনের বিয়ে হয়, যার নাম হুর কাটরা। হুর কাটরা বিয়ে হচ্ছে জোর করে বিয়ে করা। মেয়ের অপছন্দ সত্বেও যদি ছেলেটা মেয়েকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়, সাঁওতাল সমাজে অনত্র বিয়ে হতে পারে না। গ্রামের সালিশি সভা ডেকে যুবকের অর্থদণ্ড ধার্য্য করা হয়। অর্থ আদায় হলে ওদের বৈধ বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়। ধীরেন বলে এবার বুঝতে পারলাম তোমার অসুবিধা কোথায়।
(৭)
রাত না দিন বলা মুশকিল। আকাশের তারা আবছা হয়ে আসছে।ইঙ্ক ব্লু থেকে আকাশ রয়েল ব্লু হচ্ছে। ধীরে ধীরে আকাশ রুপোর ঝলকানি আলো আকাশের পুবের দিকে। মুরগি ভ্রান্ত হয়ে ডাকতে শুরু করেছে। পাখিরাও ডাকতে শুরু করবে। রুপা ধীরেনের সঙ্গে ধীরেনদের বাড়িতে এসেছিল। বাড়িতে সবাই জানে ধীরেন একজন ভালো ছেলে। পড়াশুনায় ক্লাসের সবাই কে টেক্কা মারে। রুপা কলেজের পড়ার কিছু নোট নিতে ধীরেনের বাড়িতে গিয়েছিল। রাস্তার ধারের কোন ঘরটায় ধীরেন শোয় রুপা তা জানে। একটা কঞ্চি যোগাড় করে জানলা দিয়েই ধীরেনের গায়ে আলতো করে টোকা দেয়। ধীরেনের ঘুম ভেঙ্গে যায় রুপা নিচু গলায় ধীরেন কে ডাকে। ধীরেন প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও ধাতস্থ হয়ে বলে, কি হয়েছে বল। রুপা বলে বিকেলে ওই হনুমানটা আমার মাথায় সিঁদুর ঘষে দিয়েছে। আমার খুবই বিপদ। আমি পালিয়ে বিলাসপুর চলে যাচ্ছি। আমি ওখানে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করে নান হব। এ জীবনে হয়তো তোমার সঙ্গে আর দেখা হবেনা। আমি আমাদের ইতিহাস, সাহিত্যের সম্পর্কের বই গুলো দিয়ে গেলাম। তুমি অনেক কিছু শিখতে পারবে। লিখতে পারবে। এই ব্যাগটায় সব আছে। যদি ভালো মনে করো আমাকে ঊৎসর্গ করে কিছু লিখ। কথা শেষ করেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল রুপা।
(৮)
রাতারাতি ধীরেনদার মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। পরমতম আত্মীয় স্বজন মত দিল সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে বিয়ে দিলে। ধীরেনদার আপত্তি থাকা সত্বেও বিয়েটা গিলে নিতে হলো ধীরেনকে।
বিয়ের কনে মালা, মালাবদল করে কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝতে পারে মানসিক ও শারীরিক দুদিকেই ঠকেছে। মনে মনে ঠিক করেছিল ওই বেকার বয়ফ্রেন্ড অচিন্ত্যর সঙ্গেই পালিয়ে যাবে। মা তপতী মেয়ের হাবভাবে বুঝতে পেরে যায় মেয়ের মতলব। মা মেয়েকে খুশি করতে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় হাবাগোবা বর হলে অনেক সুবিধা। নিজের খুশিমত কাজ করতে পারবি। এদের যে সম্পত্তি আছে হেসে খেলে সুখে খরচা করতে পারবি। মালার মা তপতী চিরদিন সেজেগুজে নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গল্প করে, নিজের সখ আহ্লাদ মিটিয়েই সময় কাটায়।
মালাও মায়ের পথ অনুসরণ করে। ধীরেনদাকে সবার সামনেও ওর ঘাড় কুঁজো করে লেখালেখিকে ব্যঙ্গ করতো। এমন অপদার্থ স্বামী যেন কারও ভাগ্যে না জোটে। ধীরেনদা ঘর থেকে আর বেরোয়না। নিজকে আবদ্ধ করে ঘরেই থাকতো। শুধু লেখা নিয়ে থাকতো। মানুষের সব থেকে বড় অসুখ মনের অসুখ, যা শরীর কে তছনছ করে দেয়। ধীরেনদা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো মালা বৌদি। শ্রাদ্ধর পরদিনই ধীরেনদার লেখা আর বইগুলো সেরদরে কাপাসওয়ালার কাছে বিক্রি করে দেয়। ঘরটা এখন ভদ্রস্থ দেখাচ্ছে।
(৯)
মালা বৌদির মামা তপেশ বোন তপতীর থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। কলকাতার নাম করা এক কলেজের অধ্যাপক। বিশেষ ব্যস্ততার জন্য শ্রাদ্ধের সময়ে আসতে পারেননি। দু একদিন ভাইঝির বাড়িতে থেকে ভাইঝিকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি ফিরবেন। হাত-মুখ ধুয়ে আয়েশ করে সান্ধ্য কালীন টিফিন খেয়ে বিছানায় বসলেন গল্প করবে বলে। কার সঙ্গে গল্প করবে সবাই ব্যস্ত। তাছাড়াও ওনার সঙ্গে ভারী ভারী বিষয় নিয়ে কথা বলার জ্ঞানের অভাব।
তপেশমামা আলমারিতে সাজানো কয়েকটি বই নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখে বইয়ের পিছনে পড়ে রয়েছে হাতে লেখা কাগজে ভর্তি একটা ফাইল ওপরে লেখা দশখন্ডের “আদিম আদিবাসীদের আলো-আঁধারি” উৎসর্গ করলাম, “ আমার হৃদয়ের রুপা বেসরা কে। মামা কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মালাকে ডাকতে থাকে। মালা মামার হাতে ধীরেনের হাতে লেখা কাগজের ফাইল দেখে ঘাবড়ে যায়। সব জঞ্জাল কে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা এলো কোথা থেকে। মামা বলে, ধীরেন যে এইসব লেখে আমাকে জানাসনি কেন। আদিবাসী দলিত সাহিত্যের এক অসাধারণ দলিল তৈরী করেছে। আমি বলছি জাতীয় পুরস্কার পাবেই। আর সব লেখা কাগজপত্র গুলো কোথায় আছে। দশটা খন্ডে লিখেছে। অন্য গুলো কোথায় আছে, দে আমাকে। চার-পাঁচ লাখ টাকা অনায়াসে পাওয়া যাবে।
মালা বৌদির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় বলতে পারেনা কি ভুল করেছে এই জীবনে। মামা মালাকে ধমকে বলে তোকে বইটা উৎসর্গ করেনি বলে অমূল্য লেখা গুলো নস্ট করে দিলি।
------//*//------
পরিযায়ী
অভিজিৎ সেন (কোচবিহার)
সঙ্গে আছে দুটো টিশার্ট, দুটো জিন্সের প্যান্ট, একটি গামোছা, একটি পাম বালিস,একটি বিছানায় পাতা চাদর, পাঁচ হাজার টাকা, মোবাইল(তবে টাচ্ মোবাইল নয়,মাত্র হাজার টাকা দামের)এবং মায়ের হাতের তৈরী রুটি-তরকারি নিয়ে বছর পনেরোর রূপ রবিদাস চলেছে ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লিতে। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। পড়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু আর এগোনো সম্ভব হলো না, তবে মেধার জন্য নয়, অর্থের জন্য। পরিবারে মোট আট জন সদস্য। মা,বাবা ছাড়া তিন ভাই ও তিন বোন । বাবা দিনমজুর। একটি ভাই দুই বছরের আর একজন তিন বছরের বড়ো রূপের থেকে । প্রাথমিক স্কুলের পর পড়া ছেড়ে দিয়েছে ওরা । বাবার সঙ্গে কাজে যেতো । বাবা এতই অসুস্থ কাজে যেতে পারে না। দাদাদেরও নিয়মিত কোন কাজ নেই। তিন বোনই রূপের থেকে বয়েসে ছোট। করোনা মহামারীর পর থেকে তাদের আর্থিক দুরবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থাভাব দূর করতে লেখাপড়ায় ইতি টেনে রূপ চলেছে নিজের গ্ৰাম, নিজের জন্মস্থান ছেড়ে একেবারে ভিন্ন পরিবেশে । রূপকে কাজের উদ্দেশ্যে যেতে হচ্ছে হিন্দি ভাষা অধ্যুষিত,আত্মীয় বন্ধু বর্জিত দিল্লির মতো মহানগরে । সেখানে একটি প্লাস্টিকের সামগ্ৰি প্রস্তুত কারক কোম্পানিতে চাকরী নিয়েছে মাসিক বারো হাজার টাকার বেতনে,থাকার ব্যবস্থা কোম্পানির। খাওয়া খরচ নিজেকে বহন করতে হবে। গ্ৰাম সম্পর্কের কাকু অবনী মন্ডল তাকে সঙ্গে নিয়ে চলেছে। অবনী বিগত পাঁচ বছর ধরে এখানেই কাজ করে আসছে। প্রতি বছর কোনো না কোন ছেলে অভাবের কারণে তার সঙ্গে কাজের জন্য যায় ।শর্ত শুধু এক বছর তার সঙ্গে কাজ করতে হবে সেখানে । তাদের কাছে লিখিত নিয়ে নেয় অবনী। তাদের প্রমাণ পত্র জমা রাখ এক বছর নিজের কাছে। অবনীর লাভ আছে তাতে সে। মালিকের কাছে কমিশন পেয়ে থাকে । মালিক সস্তা শ্রমিক পেয়ে যায় এবং বছর ধরে পরিশ্রম করিয়ে নেয়, মুনাফা তুলে নেয় কয়েক গুণ। প্রাণচঞ্চল রূপ বাধ্য হয়ে এই শর্ত মেনেই কাজ করতে চলেছে দিল্লিতে ।
রূপের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের এক অজ্ঞাত গ্ৰাম কোচবিহার জেলার মোহনপুরে। তার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ধরলা নদী।নদীর দুই তীরে তার বাল্য ও কৈশোরের ছড়িয়ে আছে অজস্র স্মৃতি। দুপুর জুড়ে বন্ধুদের সঙ্গে নদীর বুকে সাঁতার কেটে সময় কাটানো, ঘাটে বাঁধা সোলেমান চাচার ছোট খেয়াটি নিয়ে মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যাওয়া। চাচা জানতো এটা কে করেছে? সে পাড়ে বসে অপেক্ষা করতো । মিনিট দশেক পরে রূপ খেয়া নিয়ে এলে এক গাল হেসে চাচা বলতেন,''কেমন মজা পাইলা আব্বাজান ?" রূপ বলতো ''সেই মজা চাচা । তোমার কাজে একটু দেরি করে দিলাম"। চাচা আবার হেসে বলে,''আমার বেটা রহিম আর তুমি কি আলাদা? আমার কাজের কোন ক্ষতি হয় নাই বাপ'' ! এই বলে মাছ ধরতে নদীর বুকে ভেসে চলে যেত। নদীর তীরে বাড়ি, সেই কারণে বর্ষার সময় তাদের গ্ৰাম,জলে ডুবে যেত প্রতি বছর । এটা এখানের খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বছর বছর দুর্গা পূজার মতোই যেন ব্যাপারটি ! জল নেমে গেলে বন্ধুরা মিলে মাছ ধরায় নেমে পড়তো । রূপের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি ।
বর্ষা চলে যাওয়ার পর শরতকাল নরম সাদা কাশের দোলায় নদীর তীর আলো করে রাখতো । গভীর নীল আকাশ স্বচ্ছ আয়নায় মতো নদীর স্থির জলে অব্যক্ত প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করতো,রূপ সেই দৃশ্যের গভীর থেকে গভীরে হারিয়ে যেত ।এক সিগ্ধ মায়াঞ্জনে আচ্ছন্ন হয়ে যেত তার মন । এক সুরেলা আবেগের শিহরণ নদীর বুক থেকে উঠে এসে তার শিরা ধমনীর প্রবাহের সঙ্গে মিশে যেত। শরৎ ভোরের শিউলি ফুলের কোমল আবেশ, শিশির ভেজা ঘাসের রেশম-তুলতুলে আহ্বান,সবুজ কচি কচি চারা ধানের মৃদুল আলোড়ন,শাপলা শালুক ফুলের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য,পদ্মবনের মোহিনী মুগ্ধতা সবকিছু মিলেমিশে তার কানে,অনুরণনের মতো যেন কী একটা বেজে চলতো ! দিনরাত শারদীয় ঢাকের চির পরিচিত তাল ও বোল যেন শুনতে পেতো । তার মনে হতো আকাশে বাতাসে কে যেন নূপুর পায়েবেঁধে অতি ধীর লয়ে হেঁটে চলেছে । নিত্যদিনের ব্যথা বেদনা হতাশা ব্যর্থতা দূরে সরিয়ে রেখে গভীর ভালোবাসার টানে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে সপরিবারে দুর্গা মায়ের শারদ উৎসবে । শুরু হয়ে যেত বাঙালির আনন্দের উৎসব, দুর্গোৎসব--- রূপ এ আনন্দটুকুর জন্য অপেক্ষা করে থাকে বছর ধরে।
তাদের গ্ৰামেই খুব বড়ো করে পূজা হয় । সকলকেই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হতো। রূপ ও তার সমবয়সী বন্ধুরা চাঁদা সংগ্ৰহ, মূর্তি আনার কাজ করতো। পঞ্চমীর আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত তাদের আয়োজন। মূর্তি পাশের গ্ৰামের মদন পালের ওখান থেকে আসছে শুরু থেকেই। তার পরিবার সুনামের সঙ্গে একাজ করে চলেছে বংশপরম্পরা ধরে । সাবেকি ধাঁচের প্রতিমা, একটি কাঠামোতেই সপরিবারে মা দুর্গ । গ্ৰামের মানুষের অভাব থাকলেও এ কটি দিন আনন্দের ঘোরেই কাটিয়ে দেন তারা মাতৃ আরাধনায় । সপ্তমী,অষ্টমী,নবমী ভালই কেটে যায় দশমীর দিনে মায়ের নিরঞ্জনের সাথে সাথে বিষণ্ণতা নেমে আসে গ্ৰামবাসীর মনে। রূপের মনেও । সেদিন সারা রাত ধরে অতি উচ্চ স্বরে ডি.জে বাজিয়ে বন্ধুরা পিকনিকে মত্ত হয়ে উঠলেও শূন্য মন্ডপের সামনে এলে রূপের মনের ভেতরটা শূন্য হয়ে যেতো।ঔদাসীন্যের ঘূর্ণিঝড় তাকে যেন ঘিরে ধরতো । তাদের পাশের গ্ৰাম শিকারপুরে বেশ বড়ো আকারে কালীপূজা হয়। নানা রঙ্গের বৈদ্যুতিক আলোর রোশনাই দিনের মতো করে তোলে রাতের পথ । শহরের মতো বিগ বাজেটের পুজো না হলেও আমোদ আনন্দের তিল মাত্র অভাব থাকে না।
ট্রেনের কামরায় বসে অতীত কথাগুলো স্মৃতির পাতা বেয়ে যতই উঠে আসছিল ততই এক অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে ঘূণকীটের মতো করে দংশন করে চলেছিল। এ যেন উদ্বাস্তুদের স্বজন স্বদেশ হারানোর চাপা আর্তনাদ এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ধারাবাহিক কালকূট যাপন । কী এক ব্যথা তার বুকের উপর চেপে বসেছে ! অসহনীয় দারিদ্র্য ও অভাবের কাছে সম্পূর্ণ পরাভূত, এই প্রাণচঞ্চল কিশোরটি । শৈশবের, কৈশোরের অচ্ছেদ্য আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার বিসর্জন দিয়ে বাস্তবের কঠিন কঠোর মাটিতে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে আজ। নদীর বাঁকের মতো জীবন, জীবন বাঁক নিলে জীবনের চিত্রপট বদলে যায়। জীবন,কবিতার ব্যঞ্জনাময় লালিত্য ছেড়ে গদ্যের ঋজু তীক্ষ্ম পাথুরে পথে হেঁটে যেতে শুরু করে। বাল্য কৈশোরের ভাবনাহীন কল্পোলোক ছেড়ে রূপকথার, কার্টুনের আর খেলাধুলার জীবন ও জগৎ ছেড়ে রূপ লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের একজন আজ । দেশে,পরিযায়ী শ্রমিকের একটি সংখ্যা শুধু মাত্র বৃদ্ধি পেল !
নিউ কোচবিহার রেল স্টেশন থেকে
যাত্রা শুরু করেছে। ট্রেন একটু একটু করে গতি বাড়িয়ে চলেছে। তার চেনা পৃথিবীকে,সহজ আনন্দের জগতকে, আত্মীয়,বন্ধু,পরিবারের সকলকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে এক নতুন অচেনা মানুষের পৃথিবীতে। কিছুতেই মনকে শান্ত করতে পারছিলো না। আবার পিছিয়ে আসাও
সম্ভব নয়। পরিবারের সদস্যদের রক্তশূন্য মুখ,অভুক্ত রাত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ,বাবার অসুস্থতা, মায়ের নির্বাক চোখের আতঙ্ক, ছোট ছোট বোনেদের সারল্য মাখা মায়াবী চোখের অবুঝ আবদার তাকে কোথা থেকে যেন আসুরিক রকমের শক্তি যুগিয়ে চলেছে-- দূরে কাজে যেতে । বিভিন্ন স্টেশনে গাড়ি এসে দাঁড়াচ্ছে। কতো বিচিত্র মানুষ, কতো বিচিত্র পোশাক, ভাষা ও খাবার। জীবনে এতোকিছু সে একসাথে কোথাও দেখেনি। একবার কোচবিহারের মদনমোহন ঠাকুরের রাসের মেলায় এসেছিল। সেখানে দেখেছিল অনেক রকম মানুষকে । কিন্তু আজকের মতো এত বৈচিত্র্য আর কখনো দেখেনি । আজ জীবিকার প্রয়োজনে, অভাবের নির্মম চাবুকে রেসের মাঠের ঘোড়ার মতন ছুটে চলতে হচ্ছে যেন তাকে ।
মাতৃভূমি বাংলা পার হয়ে গেছে। হিন্দি ভাষা অধ্যুষিত এলাকায় গাড়ি ছুটে চলেছে। হিন্দি ভাষা বোঝে, কাজ চালানোর মতো বলতেও পারে । ট্রেনের কামরায় বসে জানালার ফাঁক দিয়ে দুরন্ত বেগে পেছনে ছুটে যাওয়া গাছ, মানুষ, নদী, বাজার, হাট, খেলার মাঠ, শ্মশান যা যা চোখে পড়েছে যতোটা পারছে মনের খাতায় ছবির মতো এঁকে নিচ্ছে। হঠাৎ অবনী কাকু বললো," কি রে কিছু খাবি ? অনেকক্ষণ কিছু তোর খাওয়া হয় নি।" মুড়িমাখা,চা দুজনে খেলো। অবনীর ধূমপানের অভ্যাস। কিন্তু ট্রেনে খায় না, জরিমানার ভয়ে। তামাক পাতার গুঁড়া হাতের তালুতে মিহি করে দলে তার কালো ঠোঁট ফাঁক করে দাঁতের গোড়ায় ঠেলে দিলো । ভাবুক স্বভাবের রূপ বিস্ময়ভরা চোখে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের অজানা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। রাতে মায়ের দেওয়া খাবার খেলো । গভীর রাতের শীতল স্নিগ্ধতা এতোটা রমনীয় ও কমনীয় হয় রূপের আগে এতটা অনুভব হয়নি, আজ যতটা হচ্ছে। হয়তো বাড়ি থেকে দূরে আছে বলে । বাড়ির আশেপাশের রাত্রিকালীন নীরবতাও মনে পড়ছে খুব গভীরভাবে । রাতের আঁধার ও নীরবতার বুক চিরে দুরন্ত গতিতে গাড়িটি প্রচন্ড শব্দ করে এগিয়ে চলেছে । পেছনে ছুটে চলে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত। বিচ্ছেদ যে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ,আজ বেশ বুঝতে পারছে রূপ । জীবনের কোন সম্পর্কই স্থায়ী নয়,অটুট নয় যেন এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সে বুঝতে পেরেছে ।
যখনই কোন স্টেশনে এসে দাঁড়াচ্ছে তখন কেউ জলের বোতল নিয়ে, কেউ কাগজের মতো পাতলা রুটি ও ঝাল ঝাল আলুর তরকারি নিয়ে, কেউ বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে, দই, মিস্টি নিয়ে ছুটে আসছে । গাড়ির কামরায় ঘুরে বিক্রি করছে । দুই বা তিন মিনিটের বিরতির ফাঁকে যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ প্ল্যাটফর্মে নেমে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে নিচ্ছে । ট্রেনের কামরায় হকাররা সূচ
থেকে শুরু করে চাদর,গামছা,পিলো, বাচ্চাদের খেলনা বেশি দামে বিক্রি করছে। কেউ কিনছে, কেউ দেখে ফিরিয়ে দিচ্ছে । স্টেশনে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ভিক্ষে করছে । অর্থ ও খাদ্য চেয়ে যাত্রিদের পা জড়িয়ে ধরছে । কেউ আবার রেলের কামরার নোংরা মেঝে ঝাড় দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। একদল কিন্নর তাদের কামরায় এলো । দুই হাতে তালি দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করল । রূপ এদের কথা শুনেছিল আগে দেখেনি আজ দেখলো কাছ থেকে । যারা দিচ্ছে মাথায় হাত দিয়ে আশিস্ দিচ্ছে না দিলে কেউ অশ্লীলভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে বা গালাগাল দিচ্ছে। রূপ যতো এগিয়ে চলেছে জীবনের রহস্য বর্ণময় হয়ে ধরা পড়ছে তার জিজ্ঞাসু কিশোর চোখে । অন্ধ ভিক্ষুক বাঁশি বাজিয়ে গান করছিল। রূপ তার হাতে দশ টাকা দিলো । গান শুনে রূপের উদাস মনও গুন্ গুনিয়ে উঠলো-- "কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম পাখির নেই স্থায়ী ঠিকানা/পাখি কাঁদে, আর কাঁদে পাখির আপনজনা ।" তিন দিন পরে তারা দিল্লি এসে পৌঁছায়। তাদের জায়গা কারখানার ভেতরে বস্তি এলাকার মতো ছোট ছোট ঘরে ।এক ঘরে দুজন করে থাকার ব্যবস্থা। দুটি চৌকি পাতার পরে মাঝে দুই হাত জায়গা অবশিষ্ট থাকে, সে সংকীর্ণ পথে দুজনকেই যাতায়াত করতে হয়। মোট ষাটজন শ্রমিক সেখানে থাকে । স্নানাগার ও শৌচাগার বেশ কয়েকটি আছে তবে সকলের জন্য । শ্রমিকদের মধ্যে দিল্লির কেউই নেই, বেশির ভাগই বাংলা, বিহার এবং ওড়িশা থেকে এসেছে। প্রত্যেকের সমস্যা এক একটি ট্র্যাজেডি।পরেরদিন সকাল আটটায় সাইরেন বাজে । সাইরিন বাজার দশ মিনিটের মধ্যে কাজে যেতে হবে । আগের দিন অবনী কাকু কারখানার নিয়ম বুঝিয়ে দিয়েছিল। রূপ সকাল পাঁচটায় প্রতিদিন ওঠে,প্রাতকৃত্য করে, সামান্য কসরতের পর ছোলা গুড় খায় । আজ তাই করে কাজের উদ্যোশে বেরোলো। বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ। মাঝে বেলা ১টা থেকে ১টা৩০ পর্যন্ত বিরতি। ভেতরে ক্যান্টিন আছে। দিনে ও রাতে খোলা থাকে। রূপের রান্নার সমস্যা থাকলো না । এখানেই খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা হয়ে গেল। খাওয়া খরচ অস্বাভাবিক নয়, এটাই রক্ষ্যা । দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। রূপ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। রূপের মতই পরিস্কার ও সরল মনের উজ্জ্বল মহাপাত্র নামের ষোল বছরের ছেলেটি। সে এই ঘরে থাকে । তার বাড়ি উড়িষ্যায়। রূপকে তারও ভালোই লেগেছে। তেমনি রূপেরও ।
রূপ, এখানে আলো ঝলমলে রাতের প্রশস্ত সরক দেখেছে, দ্রুতগামী যানবাহন দেখেছে, অগণিত বিদেশি পর্যটক দেখেছে, নানা ধরনের মনোলুব্ধকর খাদ্যের নিত্য আয়োজন দেখেছে,ভোগ বিলাসের স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষদের দেখেছে---সব ধরনের আয়োজন ছড়িয়ে আছে শুধু প্রয়োজন অপর্যাপ্ত অঢেল অর্থের। বিলাসিতায় গা
ভাসানোর অবকাশ ও মানসিকতা তার নেই। সহজ সরল জীবনযাপন করতেই বরাবর পছন্দ করে রূপ। সে এখানে কেন এসেছে একটি মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি, নাগরিক বিলাসিতায় প্রলুব্ধ হয়ে ভেসে যায়নি । মন দিয়ে সে কাজ করে। ফাঁকি দেয় না কাজে । অবনী কাকু এবং কারখানার মালিক দুজনেই তার প্রতি সন্তুষ্ট।
যখন বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিল তখন শ্রাবণ
মাস । আজ তার কাজের এক মাস পূর্ণ হলো। এটা ভাদ্র। শরতের সূচনা কাল । বাংলার আকাশে বাতাসে ঢাকের কাঠির বোল বাজতে শুরু করেছে। দিল্লির প্রকৃতি একেবারে ভিন্ন চরিত্রের । শুষ্কতা, ধোঁয়া । গগনচুম্বী ইমারত, দূষণযুক্ত শ্বাসরোধী বাতাস, কলুষিত যমুনার প্রবাহ, ঘিঞ্জি এলাকার মানুষের অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, আবেগ শূন্য ও আত্মকেন্দ্রিক,ভোগসর্বস্ব ও যান্ত্রিক জীবনে শরতের সামান্য ছোঁয়াটুক পর্যন্ত নেই। রবিবার ছুটি। দীপাবলিতে দুদিন ছুটি থাকে। দুর্গা পূজার কোন ছুটি নেই। এক রবিবারে উজ্জলকে নিয়ে যমুনার তীরে বেড়াতে এসেছিল। ছোট থেকেই তো সে মুক্ত পাখির মতন ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতো । যমুনার তীরে বসে তার বাড়ির পাশের নদীর কথা, নদীর দু ধারের সৌন্দর্যের কথা মনে পড়ছিল । শরতের সময় বাড়ি থেকে একটু দূরে মানসাই নদীর তীরে ত্রিকোণীয়ার ছোট্ট পার্কটিতে সাইকেল করে চলে আসতো । এ সময় নদী যেন স্বচ্ছ আয়না । ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকো ভেসে চলেছে। নীল আকাশের বুকেও ভেসে চলেছে পাল্লা দিয়ে সাদা বর্ণের মেঘ --নৌকার মতন।একেই স্বর্গের শোভা মনে হতো তার। মেঘখণ্ডগুলো যেন পৃথিবী থেকে বার্তা নিয়ে চলেছে কৈলাসের উদ্যেশ্যে । মা দুর্গা যেন পরিবার সমেত পৃথিবীর সন্তানদের সঙ্গে কয়েক দিন আনন্দে আবেগে কাটিয়ে যান । শারদীয়ার দুর্গোৎসব বাংলার সমগ্ৰ প্রকৃতি জুড়ে যে ধরনের মাদকতা ছড়িয়ে দেয়, এক অলৌকিক আবেগ সকলের মনের স্তর ধরে নামতে থাকে চৈতন্যের নানা স্তরে । অজস্র ইচ্ছারা জমাট বাঁধে মধুর চাকের মতন তখন থেকেই । বাংলার আকাশ বাতাসে, প্রতিটি ঘাসে, ভোরের শিশির বিন্দুতে, মাটির বুকে ছড়িয়ে থাকা শিউলি ফুলে পদ্মফুলের জলবিন্দুতে, শুভ্র অথবা খয়েরি রঙের অজস্র শাপলা-শালুকে, সবুজ কচি চারাধানের সুশীল শিহরনে, ভোরের হিমেল হাওয়ার দোলায় মায়ের আগমনের পদধ্বনি যেন প্রতিটি মুহূর্তে শুনতে পেয়ে থাকে বাঙ্গালী তার সমগ্ৰ সত্তা জুড়ে। রূপ, উজ্জ্বলকে বলছে," আর পনেরো দিন পরেই আমাদের ওখানে দুর্গাপূজা। পূজায় কতো যে আনন্দ হয় তোমাকে কী বলবো। এবার ভেবেছিলাম বন্ধুরা মিলে চপ,মোমোর দোকান দিবো, হলো না। পূজার কয়টি দিনই আমাদের আনন্দের দিন। বাকি দিনগুলো যন্ত্রণার কাঁটাই আমাদের পাথেয় । " এই বলে রূপ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো। দুর্গাপূজা চলে এলো। দুর্গাপূজায় ছুটি পাওয়া যায় না । গেলে বিনা বেতনে যেতে হবে। কাল পঞ্চমী । সে নেই।গ্ৰামে পূজার আয়োজন চলছে। সে নেই সে যন্ত্রণা শুধু তার নিজের। দিল্লিতে বাঙ্গালীরা মিলে কোথাও পূজা করে থাকলেও বাংলার মতো আনন্দ কোথায়? সবেতেই কৃত্তিমতা, যান্ত্রিকতা।
ষষ্ঠীও চলে গেল। আজ সপ্তমী। পঞ্চমীর আগে থেকেই দেবী দর্শনের জন্য বাংলার বুকে জনস্রোত বন্যার মতোই নেমে আসে। এখানে সেই আবেগ, উৎসাহ কোথায়?কাজ করতে করতে এসব ভাবছে । নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে পেল দূর থেকে একদল আকাশী-হলুদ রঙের বিদেশি পাখির ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেলো। পাখিগুলো দেখে সে চিনতে পেরেছে। এদের সে তাদের বাড়ির ওখানে নদীর পাড়ে দেখেছে । শরৎকালেই আসে বাংলায় এই পরিযায়ী পাখির দল,শরতের শেষে আবার ফিরে যায় । রূপ বাড়ি ফিরে যেতে পারলোনা পুজোর দিনে ! তাই যেন পাখিগুলোর ডানায় মনকে পাঠিয়ে দিল তার গ্ৰামে ।
বন্ধুদের মধ্যে একজন নবমীর রাতে রূপকে ফোন
করেছে । রূপের সঙ্গে কতো কথা হলো। সে বললো, "আমি ভিডিও কল করছি তুই গ্ৰামের পূজার আয়োজন দেখ্ । ও তোর ফোনে তো ভিডিও কল হবে না। অবনী কাকুর ফোনে হবে ।" রূপ ভিডিও কলে গ্ৰামের দুর্গা পূজার আয়োজন দেখলো কয়েক মিনিট, তারপরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল । পরিস্থিতি ও জীবনের কঠিন বাঁক রূপকে বাধ্য করেছে অনলাইনে নিজের গ্রামের দুর্গাপূজা দেখতে । জীবন কখন কাকে কোথায় এনে দাঁড় করাবে কেউ বলতে পারে না ! রূপ টাকা রোজগার করছে, বাড়িতে পাঠিয়েছে। বাড়ির আর্থিক দুরবস্থা ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করেছে। জীবন তার নানা পরীক্ষা নিয়ে চলেছে । তার ব্যবহারে আর কাজে মালিক খুশি।
কোম্পানিতে তার আয় বেড়েছে, পদোন্নতি হয়েছে। এখন সে অবনী কাকুর শর্ত থাকে মুক্ত । দেখতে দেখতে পাঁচ বছর চলে গেল। পরিযায়ী পাখির দলটি ঠিক সময়ে তার মাথায় উপর দিয়ে শব্দ করতে করতে উড়ে যায় । তারা তার গ্ৰামের নদীর চরে যাবে,আবার এ পথ ধরেই ফিরে আসবে । রূপ সেটাই দেখে প্রতিবছর । রূপের অনেক দায়িত্ব। অনেক টাকা উপার্জন করতে হবে। যখনই ওই পরিযায়ী পাখিগুলোকে দেখে তখন রূপের শৈশব, কৈশোর,নদীর চর,গ্রামের খেলার মাঠ সব যেন আবর্তিত হতে থাকে তার চৈতন্যের প্রতিটি স্তর ধরে। দিন রাতের মতো সে শুধু ঘুরে চলেছে চাকার মতো । তার বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা
পরিযায়ী পাখির ডানায় উড়তে থাকে,আর সে দিল্লির ছোট্ট ঘরটির সংকীর্ণ জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে উড়ে যাওয়া পরিযায়ী পাখিগুলির সাথে মনে মনে ! কোথায় যেন উড়ে যেতে থাকে ?
------//*//------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন