লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল
প্রকাশক : ইলশেগুঁড়ি প্রকাশন
রাত সবসময় নিঃশব্দ নয়— কিছু রাত কথা বলে। কিছু রাত ডাকে। সেই ডাক কখনো স্মৃতির, কখনো অপরাধবোধের, কখনো বা এমন এক অজানা শূন্যতার, যার নাম দেওয়া যায় না। পিনাকী রঞ্জন পালের অনুগল্প সংকলন শেষ রাতের ডাক ঠিক সেই অদ্ভুত সময়েরই সাহিত্যিক দলিল, যেখানে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের মুখোমুখি হয়।
এই বইয়ের দশটি অনুগল্প যেন দশটি আলাদা জানালা— প্রত্যেকটির বাইরে আলাদা দৃশ্য, আলাদা অন্ধকার। কিন্তু সব জানালার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে একই ধরনের হিমেল হাওয়া— নিঃসঙ্গতা, ভয়, অনিশ্চয়তা আর অব্যক্ত প্রশ্ন। লেখক খুব সচেতনভাবেই গল্পগুলোকে অতিরিক্ত ঘটনার ভারে চাপিয়ে দেননি। বরং সংক্ষিপ্ত পরিসরের মধ্যেই তিনি তৈরি করেছেন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ, যা গল্প শেষ হওয়ার পরও পাঠকের সঙ্গে থেকে যায়।
পিনাকী রঞ্জন পালের গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার নীরবতা। এখানে চিৎকার নেই, নেই রক্তাক্ত নাটকীয়তা। ভয় আসে ধীরে, প্রায় অদৃশ্য পায়ে হেঁটে। কোনো গল্পে হয়তো একটি রাত, কোনো গল্পে একটি ডাক, কোনো গল্পে একটি স্মৃতি— এই সামান্য উপাদান থেকেই তৈরি হয় গভীর অস্বস্তি। লেখক বোঝাতে চান, ভয় সবসময় বাইরে থাকে না; অনেক সময় তা আমাদের ভেতরেই জমে ওঠে।
এই সংকলনের গল্পগুলোর মধ্যে অলৌকিকতার ছোঁয়া থাকলেও সেগুলো কখনোই মুখ্য হয়ে ওঠে না। বরং অলৌকিক এখানে এক ধরনের অনুষঙ্গ, যা বাস্তব জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ে। অতীতের কোনো ভুল, অমীমাংসিত সম্পর্ক, অপরাধবোধ বা হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষ— এসবই গল্পগুলোর আসল ভূত। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন, এখানে অন্ধকার মানে শুধু আলোহীনতা নয়; অন্ধকার মানে অনুচ্চারিত সত্য।
ভাষার দিক থেকে বইটি সংযত ও পরিমিত। কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকার নেই, আবার শুষ্কতাও নেই। লেখকের সাংবাদিক সত্তা ভাষাকে দিয়েছে স্পষ্টতা, আর সাহিত্যিক মন দিয়েছে আবেশ। ছোট ছোট বাক্যে, সংলাপের ফাঁকে, বর্ণনার ছায়ায় তিনি তৈরি করেন এক ধরনের নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য, যা অনুগল্পের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।
এই বইয়ের গল্পগুলো এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়— কিন্তু তার রেশ সহজে কাটে না। শেষ গল্প শেষ হওয়ার পর পাঠকের মনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়, সেগুলোই এই সংকলনের আসল সাফল্য। আমরা কি সত্যিই আমাদের চারপাশকে চিনি? রাত নামলে কি আমাদের পরিচিত মানুষগুলো একই থাকে? নাকি অন্ধকার তাদের মুখোশ খুলে দেয়?
শেষ রাতের ডাক কোনো প্রচলিত ভৌতিক গল্পের বই নয়। এটি বেশি করে একটি মানসিক অনুসন্ধান— যেখানে ভয়, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যারা চমক নয়, বরং ধীরে ধীরে জমে ওঠা অস্বস্তি পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বই নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।
স্বল্পমূল্যের এই ছোট সংকলনটি প্রমাণ করে, সাহিত্যিক গভীরতার জন্য পৃষ্ঠাসংখ্যা বা আড়ম্বর জরুরি নয়। প্রয়োজন সংবেদনশীল চোখ ও সতর্ক কলম— যা পিনাকী রঞ্জন পালের লেখায় স্পষ্টভাবে উপস্থিত। শেষ রাতের ডাক সেই পাঠকদের জন্য, যারা জানেন— কিছু ডাক কানে শোনা যায় না, তবু সারা জীবন মনে বাজতে থাকে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন