শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

ছোট গল্প : ঘামের নিজস্ব কোনো রং নেই, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল

চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুতে হাওড়ার এই গলিগুলোতে সাধারণত বাতাস ঢোকে না। যা ঢোকে, তাকে একধরনের পোড়া মবিলের মতো ভ্যাপসা রোদ বলা যেতে পারে। গঙ্গার ধারের জুটমিলটা বন্ধ হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। সাইরেনের সেই বুক-কাঁপানো শব্দটা এখন আর এই তল্লাটের মানুষের স্নায়ুতে কোনো প্রত্যাশা বা ভীতির কম্পন তোলে না। মাধবের বয়স বাষট্টি পেরিয়েছে। তার ডান হাতের দুটো আঙুল কাটা পড়েছিল নব্বই সালের এক উত্তাল ধর্মঘটের দিন। পুলিশের লাঠির ঘায়ে নয়, কারখানার একটা পুরনো, জং-ধরা তাঁত মেশিনের চাকায়। আজ, মে দিবসের ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে, সেই কাটা আঙুলের ডগায় একটা অদ্ভুত, ভোঁতা শিরশিরানি টের পাচ্ছে সে। হয়তো এটা কোনো স্নায়বিক স্মৃতি, অথবা নেহাতই এই গুমোট আবহাওয়ার একটা অবচেতন শারীরিক প্রতিক্রিয়া।

একসময় এই পয়লা মে-র সকালগুলো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। লাল শালুর পতাকায় একটা আক্ষরিক অর্থের তেজ থাকত বলে মনে হতো তখন। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা ঘুম, আর আট ঘণ্টা বিনোদন—শিকাগোর সেই বহু-চর্চিত, রক্তস্নাত স্লোগানটা মাধবদের কাছে একসময় ধর্মগ্রন্থের আয়াতের চেয়েও বেশি অমোঘ মনে হতো। কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত এক জাদুকর। পুঁজিবাদের দাঁত ও নখ যত ধারালো এবং সুকৌশলী হয়েছে, শ্রমিকের লড়াইয়ের ভাষা ততটাই যেন ভোঁতা আর আপসকামী হয়ে পড়েছে। এখনকার মে দিবস মানে তো পাড়ার মোড়ে একটা ফাটা মাইকে কিছু পুরোনো গণসঙ্গীতের রেকর্ড বাজানো। বিকেলে নেতাদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পরানোর এক নির্লজ্জ উৎসব। মাধব তার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের দাওয়ায় বসে বিড়ি ধরাল। সস্তা তামাকের ধোঁয়ায় একটা পোড়া, তেতো স্বাদ।

গেটের মরচে-ধরা লোহার পাল্লাটা বিকট শব্দ করে খুলে গেল। সুমিত ঢুকল। মাধবের একমাত্র ছেলে। বয়স ছাব্বিশ ছুঁইছুঁই। তার পরনে একটা জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপের উজ্জ্বল কমলা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের পিঠে ঘামের দাগটা শুকিয়ে একটা অস্পষ্ট মানচিত্রের আকার নিয়েছে। সুমিতের চোখদুটো গর্তে বসা। কাল রাত আড়াইটে পর্যন্ত লগ-ইন ছিল সে।

আধুনিক কর্পোরেট দাসত্বের সম্ভবত এটাই সবচেয়ে নিখুঁত এবং ভয়াবহ রূপ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট কারখানা নেই। কোনো অত্যাচারী ফোরম্যান বা ম্যানেজার নেই যাকে ঘিরে ধরে ঘেরাও করা যায়, বা যার কলার চেপে ধরা যায়। এখানে শোষক সম্পূর্ণ অদৃশ্য। সে লুকিয়ে থাকে একটা স্মার্টফোন স্ক্রিনের পেছনে, কিছু জটিল অ্যালগরিদমের আড়ালে।

"আজও এত দেরি?" মাধব বিড়ির ছাই ঝাড়ল মাটির মেঝেতে।

সুমিত বাইকের চাবিটা চৌকির ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সিলিং ফ্যানটা ফুল স্পিডে চালিয়ে দিল। ফ্যানের ব্লেডগুলো থেকে একটা একটানা, বিরক্তিকর ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। "টার্গেট ছিল। আরও দুটো ডেলিভারি মারলে ইনসেনটিভটা পেতাম। কিন্তু বাইকের পেছনের টায়ারটা পাংচার হয়ে গেল মাঝরাস্তায়। বাইক ঠেলে গ্যারাজ অবধি নিয়ে যেতেই জীবন বেরিয়ে গেছে।"

ছেলের এই যান্ত্রিক হিসেবনিকেশের মধ্যে মাধব কোনো মানবিক স্পন্দন বা যৌবনের তেজ খুঁজে পায় না। "পরশু তো পয়লা মে। তোদের কোম্পানি ছুটি-ছাটা কিছু দেয় না?"

প্রশ্নটা শুনে সুমিত এমনভাবে তাকাল, যেন মাধব কোনো ভিনগ্রহের ভাষায় কথা বলছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, প্রায়-বীভৎস হাসির রেখা ফুটে উঠল। "মে দিবস? ওসব তোমাদের আমলের ফ্যাশন ছিল বাবা। আমাদের আবার ছুটি! লগ-অফ করলেই তো পকেট গড়ের মাঠ। কোম্পানি পরিষ্কার মেসেজ দিয়ে দিয়েছে, পয়লা মে-তে ডিমান্ড বেশি থাকে। ওইদিন যারা পনেরো ঘণ্টা ডিউটি টানবে, তাদের জন্য এক্সট্রা বোনাস রেট।"

মাধব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা সময় ছিল যখন মালিকপক্ষকে বাধ্য করা হতো কারখানা বন্ধ রাখতে। ধর্মঘট মানে ছিল একটা কালেক্টিভ জোর। শ্রমিক শ্রেণির একটা যৌথ মেরুদণ্ড। আজ এই নতুন অর্থনীতির জাঁতাকলে পড়ে শ্রমিক নিজেই নিজের শোষক হয়ে উঠেছে। সুমিতরা জানে না 'ট্রেড ইউনিয়ন' কাকে বলে। তারা শুধু বোঝে 'কাস্টমার রেটিং', 'ক্যানসেলেশন চার্জ', আর 'লগ-ইন আওয়ার্স'। এই ছেলেগুলোর খাতায়-কলমে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। তারা শ্রমিক নয়, কোম্পানির কর্পোরেট ভাষায় তারা নাকি 'ডেলিভারি পার্টনার'। শব্দের এই মায়াজাল তৈরি করে পুঁজিবাদ অত্যন্ত সুকৌশলে শ্রমিকের অধিকারের ধারণাটাকেই সম্ভবত মগজ থেকে মুছে ফেলেছে।

"তুই তো পার্টনার, তাই না?" মাধবের গলায় একটা সূক্ষ্ম, তীরের মতো শ্লেষ। "পার্টনারের আবার বোনাস কীসের রে? পার্টনার তো ব্যবসার লাভের বখরা পায়। তুই পাস?"

সুমিত গেঞ্জিটা খুলে ঘামে ভেজা শরীরটা গামছা দিয়ে মুছতে লাগল। তার পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট গোনা যায়। "তোমাদের ওই বস্তাপচা পলিটিক্যাল লজিকগুলো এখন আর খাটে না। তোমরা ইউনিয়ন করে, লাল ঝান্ডা উড়িয়ে জুটমিলটার বারোটা বাজিয়েছ। আজ যদি কারখানাটা চলত, আমাকে এই চৈত্র মাসের রোদে পুড়ে বাইক নিয়ে লোকের দরজায় দরজায় খাবার দিয়ে আসতে হতো না। তোমরা লড়েছ শুধু নেতাদের পকেট ভরাতে। আজ সেই নেতারাই তো প্রোমোটারি করছে।"

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মাধবের চামড়ায়। এটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। আটের দশকের সেই উত্তাল শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে যে নীরব পচনটা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটা নগ্ন, কুৎসিত সত্য। কারখানার অনেক নেতাই তো পরে মেশিনের পার্টস বেচে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় নেমেছে। মাধবরা শুধু দাবার ঘুঁটি ছিল। তবে কি তাদের ওই রক্ত, ঘাম, পুলিশের লাঠি খাওয়া—সবটাই একটা অর্থহীন প্রহসন ছিল?

সুমিত একটু শান্ত হয়ে চৌকিতে বসল। "জানিস বাবা, আজ সাউথ সিটির একটা ফ্ল্যাটে পিৎজা দিতে গিয়েছিলাম। পঁয়ত্রিশ তলায়। লিফটম্যান আমাকে প্যাসেঞ্জার লিফটে উঠতে দিল না। বলল সার্ভিস লিফটে যেতে। সেখানে আবার মেইনটেন্যান্সের কাজ চলছে। পনেরো মিনিট লেট হলো। কাস্টমার খাবারটা নিয়ে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। টিপস তো দূর, অ্যাপে ওয়ান-স্টার রেটিং দিয়ে একটা কমেন্ট ঠুকে দিল। এর জন্য কাল আমার পেমেন্ট থেকে পঁচিশ টাকা কাটা যাবে।"

মাধবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মুচড়ে উঠল। এই অপমানটা তার খুব চেনা। আশির দশকে বড় সাহেবরা যখন তাদের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাত, তখন মাধবদের মনে হতো মেশিনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু সুমিত কার ওপর রাগ দেখাবে? সেই অদৃশ্য কাস্টমারের ওপর, নাকি ওই অ্যাপের ওপর? আধুনিক সমাজ একটা অদ্ভুত কাঁচের দেওয়াল তুলে দিয়েছে মানুষ আর মানুষের মাঝখানে।

পয়লা মে-র সকালটা শুরু হলো পরিচিত কোলাহলে।

পাড়ার মোড়ে একটা ছোট স্টেজ বাঁধা হয়েছে। ওপরের লাল ফ্লেক্সে কাস্তে-হাতুড়ির ছবি, আর তার নিচে সাদা হরফে লেখা, 'শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ'। অথচ স্টেজের সামনের সারিতে যারা বসে আছে, তাদের হাতে কোনোদিন কড়া পড়েনি। তারা স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাথা। পাড়ার রিয়েল এস্টেট ব্রোকার। মাধব নিজের জানলার ফাঁক দিয়ে দূর থেকে দেখছিল দৃশ্যটা। তার হঠাৎ করে নিজের কাটা আঙুলগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। একটা তীব্র বমি-পাওয়া অনুভূতি তার গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠতে চাইছে।

সুমিত বাইক বের করছে। আজ তাকে পনেরো ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হবে। তার বাইকের হ্যান্ডেলের একপাশে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের লাল পতাকা কে বা কারা হয়তো রাতে বেঁধে দিয়ে গেছে। সুমিত চরম বিরক্তি নিয়ে সেটা ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দিল।

"সাবধানে যাস," মাধব শুধু এইটুকুই বলতে পারল।

"চিন্তা কোরো না। আজ ট্রাফিক কম থাকবে। সবাই তো তোমাদের মতো বিপ্লব করতে স্টেজে উঠেছে।" সুমিত হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে নিল।

বাইকের স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজে মাধব বুঝতে পারল, একটা যুগ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। পুরোনো স্লোগানগুলো এখন কেবলই কয়েকটা ফাঁপা, প্রাণহীন শব্দ। মে দিবস এখন আর কোনো প্রতিবাদের দিন নয়। এটা হয়তো একটা শোকপালনের দিন। মৃত অধিকার এবং হারানো মেরুদণ্ডের শোক।

মাধব ধীর পায়ে নিজের অন্ধকার ঘরের দিকে হাঁটা লাগাল। রোদের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। গঙ্গার দিক থেকে আসা হাওয়াটা এখন রীতিমতো তপ্ত। ঘামের আসলে কোনো নিজস্ব রং থাকে না। সেটা মাধবের মতো বাতিল মিল-শ্রমিকের ঘাম হোক, বা সুমিতের মতো আধুনিক ডেলিভারি বয়ের। শরীর নিংড়ে বেরোনো এই নোনতা জলের হিসেব কোনোদিন কোনো লাল খাতায় লেখা থাকে না। স্টেজের ওপর থেকে তখন এক নেতা মাইকে গলা ফাটিয়ে বলছেন, "দুনিয়া কা মজদুর এক হো..."।

মাধব জানলার পাল্লাটা ভেতর থেকে সজোরে বন্ধ করে দিল। বাইরের এই মেকি, উৎসব-মুখর প্রহসন আর তার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্তত নিজের এই গুমোট, চার দেওয়ালের ভেতরে তার এই নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যানটুকু তো কোনো নেতা বা কোনো অ্যালগরিদম কেড়ে নিতে পারবে না। ঘরের অন্ধকারে, চৌকির তলায় রাখা একটা পুরোনো, ধুলো-পড়া লাল শালুর দিকে তাকিয়ে মাধবের মনে হলো, অধিকারের লড়াইটা বোধহয় শেষ হয়নি, শুধু তার ফ্রন্টলাইনটা বদলে গেছে—এবং সেই নতুন ফ্রন্টলাইনে মাধবরা আজ ভীষণভাবে একা এবং অপ্রাসঙ্গিক।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...