শনিবার, ২ মে, ২০২৬

গল্পের নাম : বেঁচে থাকার ভোট, লেখক : পিনাকী রঞ্জন পাল



চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ। আমোদপুর গ্রামের মোড়ে হারু কাকার চায়ের দোকানটা সবসময়ের মতো আজও সরগরম। তবে আজকের উত্তেজনা একটু অন্যরকম। সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। বাঁশ দিয়ে ঘেরা দোকানের বেঞ্চিতে বসে জোরদার তর্ক চলছে। একপক্ষ তিলক কাকা, গ্রামের পুরনো মাতব্বর। হাতে একটা আধপোড়া বিড়ি নিয়ে টেবিল চাপড়ে বলছেন, "আরে বোঝো না কেন? উন্নয়ন কি আর একদিনে হয়? এই যে পাকা রাস্তাটা হলো, মোড়ের মাথায় সোলার লাইট বসল—এসব কি এমনি এমনি হয়েছে?"

বিপরীত দিকে বসে থাকা যুবক সমীর ক্ষেপে উঠে বলল, "রাস্তা হয়েছে তো কী হয়েছে? তিন মাস না যেতেই তো পিচ উঠে সুরকি বেরিয়ে গেছে। ওটা তো উন্নয়নের রাস্তা নয় তিলক কাকা, ওটা হলো পকেটে টাকা ভরার রাস্তা। আমাদের পরিবর্তন চাই, নতুন মুখ চাই।"

এই তর্কের ঝড়ের মাঝখানে এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল রতন মিস্ত্রি। কঙ্কালসার চেহারা, গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। পরনে একটা মলিন লুঙ্গি আর ঘামে ভেজা গেঞ্জি। রতনের সামনে একটা মাটির ভাঁড়ে লিকার চা পড়ে আছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে একমনে বিড়ি ফুঁকছে আর ধোঁয়াগুলোর কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যাওয়া দেখছে। রতনের এই নীরবতা অনেক গভীর। গত বর্ষায় তার ভাঙা চালের খড়গুলো পচে জল পড়ে ঘরটা একপাশে নুয়ে পড়েছে। পঞ্চায়েত অফিসে বারকয়েক চক্কর কেটেছে সে, কিন্তু 'ঘর পাওয়ার তালিকায়' তার নামটা কোনো এক রহস্যময় কারণে বারবার বাদ পড়ে যায়।

রতন মিস্ত্রি একজন সাধারণ দিনমজুর। তার প্রতিদিনের লড়াই শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। কপালে জোটে কোনোদিন কাজ, কোনোদিন বা শুধু দীর্ঘশ্বাস। ঘরে তার স্ত্রী সরলা আর দশ বছরের মেয়ে মিনু। মিনু গত কয়েকমাস ধরে একটা অজানা জ্বরে ভুগছে। ডাক্তার বলেছে পুষ্টিকর খাবার আর দামী ওষুধ লাগবে। কিন্তু রতনের পকেটে তখন কেবল কয়েকটা খুচরো পয়সা।

দোকানের তর্কাতর্কি যখন চরমে, তখন তিলক কাকা রতনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? তুই তো কিছু বলছিস না? এবার কোন দিকে পাল্লা ভারি তোর?"

রতন বিড়ির শেষ অংশটুকু মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিল। তারপর একটা ম্লান হাসি হেসে বলল, "তিলক কাকা, আমাদের মতো মানুষের কোনো পাল্লা থাকে না। আমাদের পেটের খিদেটাই আসল পাল্লা। যে যখন আসে, স্বপ্ন দেখায়। আমরা সেই স্বপ্নে বাঁচি, আর ভোট ফুরোলে আবার যে কে সেই।"

ভোটের আগের রাত। সারা গ্রাম যেন এক থমথমে নিস্তব্ধতায় ঢাকা। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে অন্য এক উৎসব। রাত তখন বারোটা পার হয়েছে। রতনের ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে গ্রামের অন্ধকার গলিতে একটা কালো কাঁচ তোলা দামী গাড়ি এসে থামল। রতনের বুকটা একটু কেঁপে উঠল। সে জানে এরা কারা।

গাড়ি থেকে এক ব্যক্তি নামলেন। মুখে চড়া সুগন্ধি, পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। রতনের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। রতন বাইরে বেরিয়ে এল। লোকটা রতনের হাতে একজোড়া কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলেন। বললেন, "রতন, আমাদের দলের কথা তো জানোই। এবার জিতলে তোমার ঘরের ওই নুয়ে পড়া চালটা আর থাকবে না। একদম পাকা ছাদ হবে। শুধু কাল বোতামটা ঠিক জায়গায় টিপে দিও।"

রতন টাকার নোট দুটোর দিকে তাকালো। এই এক হাজার টাকায় মিনুর অন্তত সাত দিনের ওষুধ হয়ে যাবে। সে মাথা নিচু করে হাসল। সেই একই হাসি, যা সে গত দশ বছর ধরে প্রতিটা দলের নেতার সামনে হেসে এসেছে। সে জানে এই হাসির মানে ওরা বোঝে না। ওরা ভাবে এটা সম্মতির হাসি, কিন্তু রতন জানে এটা এক তীব্র করুণা আর বিদ্রূপের মিশ্রণ।

পরদিন সকালে প্রাইমারি স্কুলের বুথের সামনে লম্বা লাইন। কড়া রোদ মাথার ওপর জ্বলছে। লাইনে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের ছোট-বড় সব মানুষ। কারো হাতে রঙিন ছাতা, কেউবা গামছা দিয়ে মাথা ঢেকেছে। রতন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার চোখের সামনে ভাসছে মিনুর ফ্যাকাশে মুখটা। সকালে আসার সময় সরলা বারবার করে বলেছে, "ওষুধটা কিন্তু আজ আনতেই হবে।"

লাইনের মানুষের মধ্যে চাপা গুঞ্জন। নেতারা এদিক-ওদিক ঘুরছে, ভোটারদের উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু রতনের মনটা পড়ে আছে সেই জীর্ণ ঘরটার কোণে। অবশেষে তার পালা এল। বুথের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। যান্ত্রিক শীতলতা চারিদিকে। ভোটকর্মীদের হাতে নীল কালির দাগ। রতনের আঙুলে যখন সেই স্থায়ী কালি মাখিয়ে দেওয়া হলো, তার মনে হলো এটা কেবল একটা দাগ নয়, এটা এক অবহেলার ছাপ যা পাঁচ বছরে একবারই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

পর্দার আড়ালে ইভিএম মেশিনের সামনে দাঁড়ালো রতন। চোখের সামনে সারি সারি প্রতীক চিহ্ন। প্রতিটা প্রতীকের পেছনে একটা করে মুখ, একটা করে প্রতিশ্রুতি আর একটা করে মিথ্যে। রতন ভাবল সেই পাকা ছাদের কথা, যার আশ্বাস গত রাতে তাকে দেওয়া হয়েছে। আবার ভাবল সেই 'পরিবর্তন'-এর কথা যা সমীর বলেছিল। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠল সেই পুরনো তালিকাটা, যেখানে তার নাম কোনোদিন ওঠে না।

সে ভাবল, এই বোতামগুলো কি সত্যিই ভাগ্য বদলায়? নাকি এগুলো কেবল ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি? রতনের আঙুল একটা প্রতীকের ওপর স্থির হলো। তার মনে হলো, কোনো দলের ইশতেহারে তো তার মেয়ের ওষুধের দাম কমার কথা লেখা নেই। কোনো নেতা তো বলেনি যে পরের বার বৃষ্টিতে তার ঘরটা আর পড়বে না।

যান্ত্রিক একটা 'বিপ' শব্দ হলো। রতন বেরিয়ে এল বাইরে।

বুথ থেকে বেরোতেই তিলক কাকা আর সেই 'দাদা'র চেলাপেলে তাকে ঘিরে ধরল। সমীরও সেখানে ছিল। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তিলক কাকা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে রতন? ঠিক জায়গায় কাজটা করেছিস তো?"

রতন পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে খুব শান্ত গলায় বলল, "আজ্ঞে, চালের অভাব আর পেটের খিদে কোনো দলের প্রতীকেই লেখা থাকে না। তাই নিজের বিচারটাই দিয়ে এলাম।"

রতনের এই অস্পষ্ট উত্তর শুনে তিলক কাকা একটু ভড়কে গেলেন। সমীর ভাবল রতন হয়তো ওদেরই ভোট দিয়েছে। কিন্তু রতন জানে সে কাউকেই ভোট দেয়নি, সে আসলে নিজের অস্তিত্বের ভোটটা দিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, নেতারা জিতবে কি হারবে তাতে তার ভাগ্য এক চুলও বদলাবে না। ভোটের ফল যাই হোক, কাল সকালে তাকে আবার সেই কাস্তে-কোদাল নিয়েই বেরোতে হবে। পাকা ছাদের স্বপ্নটা আবার পাঁচ বছরের জন্য আলমারিতে বন্দি হবে।

সূর্য ডুবছে আমোদপুর গ্রামের দিগন্তে। ভোটের হট্টগোল কমে এসেছে। রতন ওষুধের দোকান থেকে মিনুর সিরাপটা কিনে বাড়ির পথ ধরল। অন্ধকার পথ। দূরে কোথাও জয়ের আগাম উল্লাস শোনা যাচ্ছে। মিছিলে আবির উড়ছে, কিন্তু সেই রঙের ছিটেফোঁটাও রতনের ঘরে পৌঁছাবে না।

রতন মিস্ত্রি জানত, আগামীকাল থেকে তাকে আবার একা লড়াই করতে হবে। প্রকৃতির সাথে, ক্ষুধার সাথে আর এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের সাথে। চতুর রাজনীতির এই বিশাল মঞ্চে রতনের মতো কোটি কোটি সাধারণ মানুষ কেবল দর্শক। কিন্তু তাদের এই নীরবতা, এই নির্বিকারভাবে বোতাম টেপা আর তারপর নিজের জীবনে ফিরে যাওয়া—এটাই আসলে গণতন্ত্রের সবথেকে বড় প্রতিবাদ।

বিজয় মিছিলে স্লোগান দেওয়া মানুষগুলো জানে না, রতনের মতো মানুষেরা কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক নয়, তারা কেবল বেঁচে থাকার সমর্থক। সেই রাতে ঘরে ফিরে রতন যখন মিনুর মুখে ওষুধের চামচ তুলে দিচ্ছিল, তখন তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই রহস্যময় হাসিটা ফুটে উঠল। এ হাসি কোনো নেতার জন্য নয়, এ হাসি নিজের টিকে থাকার সংকল্পের। রাজনীতির ময়দানে যেই রাজা হোক না কেন, রতন নিজের জীবন-যুদ্ধের ময়দানে নিজেই নিজের সেনাপতি।

আর এই উপলব্ধিটাই হলো রতন মিস্ত্রির আসল 'শেষ হাসি'।

সমাপ্ত


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...