ক্ষমা প্রার্থনা
গৌতম ঘোষ দস্তিদার
হঠাৎ একদিন অদ্রিজা ধ্রুপদের ব্যাংকে এলো হন্তদন্ত হয়ে। বলল, হঠাৎ করে ফিরতে হচ্ছে, যুদ্ধের অজুহাতে বার্ষিক ছুটি বাতিল হয়েছে।
ধ্রুপদ বলল, আমি আকাশপানে চেয়ে রইলাম… সেই ডিসেম্বরে শীতের ছুটিতে দেখা হবে।
ফিরে গিয়ে অদ্রিজা জানাল, সব শুনে বাবা-মা রাজি হয়েছে – ডিসেম্বরে বিয়েটা চুকিয়ে নিতে হবে।
ব্যস, তারপর আর কোনো কথা নেই। ধ্রুপদ ভাবল, মরুদেশের শুষ্কতায় ফিরে গিয়ে অদ্রিজার মন পাল্টে গিয়েছে নিশ্চয়ই।
ধ্রুপদের বিয়ে অন্যত্র ঠিক হতে দেরি হল না। অদ্রিজাকে ছাড়া যে দিন যাবে না বলে ধ্রুপদ একদিন ভেবেছিল, সে দিনও দিব্যি গেল…
একদিন আকাশ ভেঙে একদম সেই আগের মতন কোত্থেকে আবার বৃষ্টি এসে হাজির। এক সহকর্মী হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে আধভেজা একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে ক্যাশ-কাউন্টারের সামনে নিয়ে এলেন।
ভদ্রলোক ধ্রুপদকে হাত জোর করে নমস্কার করলেন। বললেন, আমি অদ্রিজার হতভাগ্য বাবা। কলকাতা থেকে ফিরে যাওয়ার দু'দিন পরেই মিসাইলের টুকরো গায়ে লেগে সব শেষ হয়ে গিয়েছে। অদ্রিজার বাবা হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে গেলাম! আপনি ওকে ক্ষমা করবেন!
বৈভব
অরিন্দম মন্ডল
সিগন্যালে দাঁড়ালো অটোটা। ত্রিদিব ইন্টারভিউ এর টেনশন চাপা দিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে যতটা পারা যায়। যথেষ্ট সময় আছে হাতে, সিগন্যালে দেরি হলেও অসুবিধা নেই। ডানদিক থেকে ময়লা, ছেঁড়া গেঞ্জি পরা একটা বছর ৭-এর ছেলে হাত বাড়াল, দাবী সামান্য ও স্পষ্ট। অন্যদিন হলে হয়ত কিছু দিত, আজ ভীষণই চাপে ত্রিদিব। সেই চাপেই হয়তো ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। নির্ভুলভাবে, ওর নিস্তবতাধাকে প্রত্যাখ্যান ভেবে ছেলেটা পাশের সারির গাড়িগুলো টপকে চলে গেল। ত্রিদিব দেখলো ছেলেটা সবে টেক-অফ করা একটা পলিথিনের টুকরো নিয়ে খেলছে, যেন সব প্রত্যাখ্যান সহাস্যে উড়িয়ে দিয়েছে প্লাস্টিক টুকরোর সাথে।
সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। স্বভাবগত নার্ভাসনেস খানিক প্রশমনের জন্য যা যা রিচুয়াল ফলো করে থাকে, সে সবের সময় পেয়েছিল ঠিকঠাক। ইন্টারভিউ খারাপ যায়নি, বরং মোটের ওপর ভালোই বলা চলে। আটোটা এসে দাঁড়িয়েছে সেই সিগন্যালে। শুকনো বাতাসে এখন চিন্তাগুলো অনেকটাই মিলিয়ে গেছে।
ত্রিদিবের বিশেষ ভাবনা বলতে এই যে - আমার বৈভব আছে, রিজেকশন এলে প্লাস্টিকের মত উড়িয়ে দেওয়ার?
শেষ চিঠি
রণতোষ কুমার দেব
ডাকপিয়ন আজও দরজায় কড়া নাড়ল।বৃদ্ধ অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে দরজা খুলে চিঠিটা নিলেন।
হাত কাঁপছিল, প্রেরকের নামটা তিনি খুব ভালো করেই চেনেন।
“মেঘলা…”
তিন বছর আগে মেঘলা চলে গেছে। তবুও প্রতি মাসে, একই তারিখে, একটা চিঠি আসে।
চিঠিটা খুলে তিনি পড়তে শুরু করলেন— “বাবা, তুমি একা আছো জানি। কিন্তু আমি তো আছি, তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে…”
অনিরুদ্ধর চোখ ভিজে উঠল। তিনি জানেন, এই চিঠিগুলো মেঘলার লেখা নয়— এগুলো তাঁর নিজের লেখা।
মেঘলা মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেই এই চিঠিগুলো লিখে, প্রতি মাসে পোস্ট করে দিতেন—
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, একটুখানি ভরসার জন্য।
কিন্তু আজকের চিঠিটা আলাদা। শেষ লাইনে লেখা— “বাবা, এবার তুমি বিশ্রাম নাও। আমি নিতে এসেছি…”
অনিরুদ্ধ থমকে গেলেন। হঠাৎ ঘরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠল। পেছন থেকে ভেসে এল মৃদু কণ্ঠ—
“চলো বাবা…”
তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা— ঠিক আগের মতোই, মিষ্টি হাসিতে।
টেবিলে খোলা চিঠিটা পড়ে রইল— আর নিঃশব্দ ঘর ভরে উঠল এক অদ্ভুত শান্তিতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন