বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (সুব্রত চক্রবর্ত্তী, সুবীর কুমার ঘোষ, জনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমনাথ লাহা, মলয় চক্রবর্তী, সুমন চন্দ্র দাস)

বুড়োবাবা
সুব্রত চক্রবর্ত্তী 

গাজনের মেলা থেকে বেরিয়ে রতন চলেছে বাড়ির দিকে। কাল পয়লা বৈশাখ ছেলেকে বৌকে কিছু দিতে পারল না। বাজার খারাপ ভালো বেচাকেনা নেই। তবে যেটুকু হয়েছে তাই দিয়ে চাল ডাল তেল হয়ে যাবে। এরপর আর কিছু হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে রতন যখন বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে কেউ একজন রতনকে পিছন থেকে ডাক দিল। আলো অন্ধকারে রতন মুখটা দেখতে পায় না। সে জিজ্ঞেস করল উনি কে? ব্যক্তি কোন পরিচয় দিল না, শুধু বলল রতন যেন আগামীকাল সকালে মন্দির তলার মন্দিরে গিয়ে একটা বেল দিয়ে আসে। রতন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বলে কি লোকটা? এরপর সে আর কাউকে দেখতে পায় না।

বাড়িতে ঢুকে রতন ওর বৌকে সব বলে। শুনে রতনের বৌ বলে "এ নিশ্চয়ই বুড়ো বাবার কাণ্ড"। সে রাতে ওরা কোন কথা না বলে খেয়ে শুয়ে পড়ে। পরদিন সকালে রতন স্নান সেরে একটা বেল কিনে দিয়ে আসে মন্দিরে। পুরোহিত ওকে নতুন বস্ত্র দেয়। রতনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।


নববর্ষ
সুবীর কুমার ঘোষ

নতুন বছরের প্রথম সকালে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো অনির্বাণ। গত বছরের মতোই অনেক অপূর্ণতা, কিছু ভাঙা স্বপ্ন—সবই যেন তাকে নিঃশব্দে ঘিরে আছে। হঠাৎ টেবিলের উপরে রাখা পুরোনো চিঠিটার দিকে চোখ গেল। মা লিখেছিলেন, “সব হারালেও আশা হারিও না, নতুন বছর মানেই নতুন শুরু।”

চিঠিটা বুকে চেপে সে ধীরে ধীরে বাইরে বেরোল। নতুন সূর্যের কোমল আলোয় চারিদিক স্নিগ্ধ লাগছে, পাড়ার বাচ্চারা হাসছে, রঙিন ঘুড়ি উড়ছে নীল আকাশে। অনির্বাণ বুঝল, জীবন কখনও থেমে থাকে না। গতকালের দুঃখ আজকের আলোকে ঢেকে দিতে পারে না।

সে ঠিক করল, এবার ছোট ছোট আনন্দগুলোকে আঁকড়ে ধরবে—এক কাপ চায়ের উষ্ণতা, প্রিয় মানুষের হাসি, আর নিজের ওপর অটল বিশ্বাস। নতুন বছরের প্রথম সূর্যের আলোতে তার মনেও এক নতুন আশার আলো ফুটে উঠল।

হয়তো সব ঠিক হবে না, কিন্তু সে নতুন করে শুরু করার সাহস পেল—এই তো আসল নববর্ষ।


জেনারেশন গ্যাপ 
জনা বন্দ্যোপাধ্যায় 

"ও ঠাকুমা, তোমার নাম কাগজে উঠেছে! তোমার তৈরী হোমিওপ্যাথি দাতব্য চিকিৎসালয়ের কথাও লিখেছে!"

পিঙ্কি তার আশি বছরের বৃদ্ধা দিদাকে খবরটা দেয়। সুশীলা দেবী পিঙ্কির দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলেন, "কী এমন করেছি! বিপ্লবীদের মতো দেশের জন্য প্রাণ তো দিতে পারিনি! তোর দাদু বিনা চিকিৎসায় যখন চলে গেলেন, কটা টাকাই বা হাতে ছিল! বাজারে তরকারি বেচতে লাগলাম! কয়েকজন বাবু পেলাম, যারা রোজই কিনতেন। ব্যাংকের বইও করে দিলেন একজন বাবু। ওনারা খদ্দের নন, আমি মনে করি দেবতা। পনেরো বছর ধরে যেটুকু পারলাম টাকা জমালাম। তোর বাবা বলে ভস্মতে ঘি ঢেলেছি, তবু কাগজে নাম উঠল!" 

দশ বছর পর সরলা দেবী মারা গেলে তাঁর ছেলে দাতব্য চিকিৎসালয় বন্ধ করে নিজের মেয়ে পিঙ্কির নামে প্রসাধনীর দোকান খোলেন! জেনারেশন গ্যাপ  একেই বলে!


অনন্ত অন্তরাল
সোমনাথ লাহা

শনিবারের ব্যস্ত সকাল। দমদম জংশন সংলগ্ন মেট্রো চত্বরে অফিসযাত্রী আর-স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের ভিড়। খাবারের‌ দোকানের স্টল আর বাজারের হাঁকডাকের মাঝেই অমৃতবাজার থেকে ফিরছিল সুগত। মুদিখানার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতেই কানে বাজলো এক ক্ষীণ কন্ঠ—’’বাবা দু’টাকা দেবে?” 

সামনে শাঁখা-সিঁদুর পরা এক বৃদ্ধা। তাঁর মলিন বেশ আর অসহায় চাউনিতে সুগতর মনে মায়ার সঞ্চার হলো। মানিব্যাগ থেকে খুচরো টাকাটা দিতেই নিঃশব্দে চলে গেলেন মহিলা। পরের শনিবার সুগত যখন জোয়ান কিনছিল হঠাৎ আবার সেই এক‌ই আর্তি। বাধা দিলেন অপরিচিত এক ব্যক্তি। সরাসরি বললেন.. ‘’দেখুন বাঁচার অনেক পথ হয়েছে। কাজ করতে পারেন। ভিক্ষা পথ হতে পারে না’। মহিলা বিনা বাক্যব্যয়ে বিদায় নিল।

আরেক শনিবার দমদম স্টেশনে বৃদ্ধাকে দেখেই জনৈক যাত্রী বলেই উঠলেন, ‘সবাই আপনাকে চিনে ফেলেছে। অন্য জায়গায় যান। এখানে আর কিছুই মিলবে না।’ ধমক শুনেই মহিলার কোঁচকানো মুখে ফুটে উঠলো বিষণ্নতা। এরপর দমদমের সেই চেনা ভিড়ে শাঁখা-পরা হাত দুটোকে হাত পাততে দেখেনি সুগত। অপ্রাপ্তির চেয়ে‌ও চিনে ফেলার লজ্জা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বোধহয়।


ফিরিয়ে দাও...
মলয় চক্রবর্তী

মনে পড়ে কৈশোরের সেই দিন, সহজপাঠের দুটো লাইন ছোট খোকা বলে অ, আ

শেখেনি সে কথা কওয়া.....

সকাল থেকে রাত কত কথা কত কল্পনা, নীল আকাশের গাঁয়ে সদ্য প্রস্ফুটিত রামধনুর সাতটি রঙের মাঝে নিজের কল্পনা কে রাঙাতে কত ভাবনা, পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে এ মাঠ সে মাঠে ব্যাট বল নিয়ে নেমে পড়া... এ পাড়া থেকে ও পাড়ার গলি দিয়ে পায়চারি.. আকাশ কুসুম কল্পনার মাঝে নিজেকে ভাবিয়ে তোলা সেই সব স্মৃতি মধুর রোমাঞ্চকর  সুন্দর থেকে সুন্দর তম দিন মন হারানো সেই দিন গুলো.

তারপর.......

অনেক বছর অতিক্রান্ত. জীবন সায়াহ্নে আজ ও মন ভাবনায় ভালোবাসা ভালো লাগার দিন ফিরে পাবার তীব্র ব্যাকুলতা আজ, যদি ফিরে  পেতাম সেই দিন... রেখে দিতাম ল্যাপটপ এর অন্দরে..

দূরের নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে আজও ভাবি কেউ কি ফিরিয়ে দিতে পারেনা সেই মধুর দিন গুলো?

মনের অন্তস্থলে সেই স্মৃতি নিয়ে আজও বাঁচি, বেঁচে থাকতে চাই আজীবন..অনন্ত কাল।


শান্তিরক্ষী দধীচি
সুমন চন্দ্র দাস 

পাড়ার নববর্ষের বৈশাখী আড্ডায় অথর্ববাবু'র রবীন্দ্রসঙ্গীত-'তোমার হল শুরু ...সারা।' ভরাট গলায় শ্রুতিমধুর পরিবেশন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। 

শান্তিবৌদির মন অশান্ত। অথর্ববাবু অথর্বের অজুহাতে গতকাল চাকরী জীবনের অকাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেরেছেন। সংসারটা তো চালানোই দুষ্কর যুদ্ধলাগা দুর্মূল্যের বাজারে! 

~'আদিখ্যেতার গান- তার সব কাজ নাকি সারা হয়ে গেছে। আটান্ন, একটা বয়স। কোম্পানির এম-ডি এক্সটেনশনের অফারও দিয়েছিলেন। ডেইলি-ডিউটি নাকি অসম্ভব। বেড়াতে যাওয়ার কথায় অমনি যৌবন হাজির। পয়সা জুটবে কোত্থেকে?'

'তোমার মনে ভয়... হারা.......।' 

~'ভয় নেই? কলসীর জল শেষ হতে কদ্দিন! ছেলের বিয়ে, বয়সকালে ব্যাধি, পথ্য-চিকিৎসা, সীমাহীন খরচ। কে বোঝায়?' 

~'আহা কী দরদ!'... 'তোমায় আমায় মিলে... ধারা।'...'জামাইবাবু রেওয়াজ ছাড়াই কী সাবলীল, দিদি শুনলি।'-বোন অরুন্ধতি'র যেন ঘৃতাহুতি।

~'তুই শোন। আমাদের বাবা শ্রীকর্দম ঠাকুরের কৃপায় যে কর্দমে পড়েছি, সারাজীবন ওষ্ঠাগতপ্রাণ।'

~'সে যাই বল তুই। দধীচি'র মতো আমার বোনপো, কী ভালো চাকরি করছে।'

~'দ্যাখোনা মাসি, বোঝাচ্ছি কতো, বাবার বয়স বাড়ছে...- 

আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিষ্টি হাসি শান্তি ঠাকুরের। দধীচি-র হারমজ্জাই তবে শান্তিরক্ষী!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...