ধূপগুড়ি ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুটা ভেতরে জংলি পথ ধরলে 'ছায়াঝোরা' চা-বাগান। এমনিতে এই বাগানের নামডাক খুব একটা নেই, তবে বাগানের পুব দিকের পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরি ঘরটার একটা আলাদা 'সুনাম' আছে। সূর্যাস্তের পর ওই তল্লাটে শেয়ালও ঘেঁষে না। কারণ জায়গাটা হলো ডুয়ার্সের সমস্ত অশরীরী, ভূত, প্রেত আর অপদেবতাদের অলিখিত হেডকোয়ার্টার।
আজ সন্ধেবেলা ফ্যাক্টরির ভাঙা চিমনির নিচে এক জরুরি এবং অতি-গোপন মিটিং ডাকা হয়েছে। নভেম্বরের শেষ দিক, নদীর দিক থেকে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া আর কুয়াশা ঢুকছে। এর মধ্যেই মিটিংয়ে হাজির হয়েছে এলাকার তাবড় তাবড় সব 'পোস্ট-লাইফ সিটিজেন' বা মরণোত্তর নাগরিকেরা।
মিটিংয়ের সভাপতি হিসেবে ভাঙা বয়লারের ওপর বসে আছেন বাঞ্ছারামবাবু। উনি উনিশশো বিরাশি সালে এই ছায়াঝোরা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। ম্যালেরিয়ায় মারা যাওয়ার পর থেকে এই চত্বরেই আছেন, পদমর্যাদায় তিনি এখন এলাকার সবচেয়ে সিনিয়র ব্রহ্মাদৈত্য। তাঁর বাঁ দিকে বসে আছে নিমা তামাং। সে একসময় চা-পাতার ট্রাকে খালাসির কাজ করত, পাহাড়ি রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে সে এখানকার লোকাল ভূত। আর ডানদিকে শ্যাওলা-ধরা দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ঘেঁটি পিসি। আদ্যিকালের পেত্নী।
বাঞ্ছারামবাবু একটা আধপোড়া খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরে গম্ভীর গলায় বললেন, "পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ! নির্বাচন কমিশন এবার একটা ভয়ঙ্কর জিনিস চালু করেছে। যার নাম এসআইআর (SIR) বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন!"
নিমা তামাং তার নিজস্ব কায়দায় একটা অদৃশ্য বিড়িতে টান দিয়ে বলল, "স্যার ব্যাপারটা কী? ইটা কি নতুন কোনো পুলিশের দারোগা নাকি?"
বাঞ্ছারামবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, "আরে না হে! এটা হলো ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার যজ্ঞ। বিএলও (BLO) বা বুথ লেভেল অফিসাররা নাকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজবে কারা মারা গেছে, কারা ঠিকানা বদলেছে। তারপর লাল কালিতে দাগ মেরে ভোটার লিস্ট থেকে সব নাম কেটে দেবে!"
ঘেঁটি পিসি এতক্ষণ নিজের লম্বা নখ দিয়ে দাঁত খুঁটছিল, কথাটা শুনে সে প্রায় দশ ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠল। "বলিস কী রে বাঞ্ছা! নাম কেটে দেবে? মানে আমি আর ভোট দিতে পারব না? গত চল্লিশ বছর ধরে আমি ছায়াঝোরা বাগানের ৩ নম্বর বুথে নিয়ম করে প্রথম ভোটটা দিয়ে আসছি। বুথ কর্মীরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমি ইভিএম-এর বোতাম টিপে দিয়ে আসি। আমার নাম কাটবে কোন সাহসে?"
বাঞ্ছারামবাবু গলা খাঁকারি দিলেন। "সাহসটা নির্বাচন কমিশনের, পিসি। মুশকিলটা হলো, আমাদের তো আর কোনো ভ্যালিড অ্যাড্রেস নেই। এই ধরো, নিমা থাকে ওই পুরোনো বটগাছটায়। এখন বিএলও যদি গিয়ে বলে, 'নিমা তামাংয়ের আধার কার্ড আর ইলেকট্রিক বিল দেখান', বটগাছ কি ইলেকট্রিক বিল দেবে? তাছাড়া, আমরা খাতায়-কলমে 'মৃত'। সরকারি ফর্মে নাকি ৭ নম্বর ফর্ম ফিলাপ করে মৃতদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।"
"মৃত! কীসের মৃত?" ঘেঁটি পিসি রীতিমতো ফুঁসে উঠল। তার নাসারন্ধ্র দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে। "মৃত বলে কিছু হয় না। আমরা হলাম 'পার্মানেন্টলি ইনভিজিবল সিটিজেন' বা স্থায়ী অদৃশ্য নাগরিক! সরকারের লজ্জাও করে না? আমরা ভূতেরা হলাম দেশের সবচেয়ে আদর্শ ভোটার। আমরা রাস্তা চাই না, পানীয় জল চাই না, একশো দিনের কাজের টাকা চাই না! আমরা শুধু পাঁচ বছরে একবার বুথে গিয়ে অন্ধকারে আঙুলে একটু কালি লাগাতে চাই। তাতেই সরকারের এত জ্বলুনি?"
নিমা তামাং মাথা নেড়ে সায় দিল, "একদম ঠিক কথা! আমি তো পাহাড়ে কোনোদিন ভোট দিতে পারিনি, মরে ভূত হওয়ার পর সমতলে এসে প্রথমবার ভোটার কার্ডের ছবি তুললাম। সেই ছবিতে আমার মুখটা একটু ঝাপসা এসেছিল ঠিকই, কিন্তু কার্ডটা তো আমার গর্ভ (গর্ব)! ওটা ক্যানসেল হলে আমি ডিএম অফিসে গিয়ে ঘাড় মটকাবো বলে দিলাম!"
বাঞ্ছারামবাবু হাত তুলে সবাইকে শান্ত করলেন। একজন অভিজ্ঞ আমলার মতোই তিনি অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ, থুড়ি, ভূত। "দেখো, ঘাড় মটকে সমস্যার সমাধান হবে না। খবর পেয়েছি, কাল সকালেই আমাদের এই ৪২ নম্বর পার্টের বিএলও, হরিশ মাস্টার, খাতাপত্র নিয়ে ভেরিফিকেশনে আসছে। লোকটা এমনিতেই ব্লাড-প্রেসারের রোগী, বেশি ভয় দেখালে ওখানেই পটল তুলবে, আর আমাদের ঘাড়ে একটা নতুন আনাড়ি ভূত এসে জুটবে। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে।"
ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে এক চিলতে কুয়াশা যেন একটু বেশিই গাঢ় হয়ে ফ্যাক্টরি ঘরের ভেতর ঢুকল। সেটা আসলে রতন। রতন হলো এই বাগানের একসময়ের পাম্প-খালাসি, বছর পাঁচেক আগে সাপের কামড়ে মারা গিয়ে ভূত হয়েছে। তার ডিউটি ছিল রাস্তার মোড়ে নজরদারি করা।
রতন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "স্যার! সর্বনাশ হয়ে গেছে! হরিশ মাস্টার কাল সকালের জন্য ওয়েট করেনি। সে ওই এসআইআর-এর ডিউটির ঠেলায় আজ রাতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ওই তো, বস্তির রাস্তা পার হয়ে ফ্যাক্টরির দিকেই আসছে। ওর হাতে একটা বিশাল খাতা, আর একটা টর্চ!"
ঘেঁটি পিসি খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। "আসুক! আজ ওর ওই খাতায় আমি এমন ৭ নম্বর ফর্ম ফিলাপ করাবো যে, ব্যাটা সাইকেল ফেলে সোজা ভুটান বর্ডারে গিয়ে থামবে!"
বাঞ্ছারামবাবু কড়া গলায় বললেন, "খবরদার পিসি! এটা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। এখানে ভয় দেখালে চলবে না। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা এখানেই থাকি এবং আমরা যথেষ্ট 'জীবন্ত'!"
নিমা তামাং অবাক হয়ে বলল, "জীবন্ত? কিন্তু স্যার, আমার তো বুকের বাঁ পাঁজরটা অ্যাক্সিডেন্টে পুরো গুঁড়িয়ে গেছিল। আমি জীবন্ত প্রমাণ দেব কী করে?"
"সেটা আমি দেখছি।" বাঞ্ছারামবাবু নিজের অদৃশ্য ধুতির কোঁচাটা কোমরে গুঁজে নিলেন। "তোমরা শুধু আমার ইনস্ট্রাকশন ফলো করো। আজ রাতে ডুয়ার্সের এই ছায়াঝোরা বাগানে একটা ঐতিহাসিক এনকাউন্টার হতে চলেছে— 'ভূত বনাম বিএলও'!"
কুয়াশা মাখা ভাঙা ফ্যাক্টরির সামনে তখন হরিশ মাস্টারের সাইকেলের চেন পড়ার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। হরিশ মাস্টার টর্চ জ্বেলে আপনমনেই বিড়বিড় করছেন, "এই বাগানের ভোটার লিস্টটা নির্ঘাত গাঁজা খেয়ে বানিয়েছে! এই ফ্যাক্টরি তো বিশ বছর ধরে বন্ধ, এখানে আবার ৬২ জন ভোটার থাকে কী করে?"
হরিশ মাস্টার তখনও জানেন না, ওই ৬২ জন 'ভোটার' একটু পরেই তার সামনে 'জীবন্ত' প্রমাণ দেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়াতে চলেছে!
****
হরিশ মাস্টারের সাইকেলের চেনটা ঠিক ভাঙা ফ্যাক্টরির গেটের সামনে এসেই পড়ে গেল। ডুয়ার্সের এই নভেম্বরের কনকনে ঠান্ডাতেও তাঁর কপালে ঘাম। একে তো ব্লাড-প্রেসার, তায় আবার নির্বাচন কমিশনের 'গারুদা অ্যাপ'। ছায়াঝোরা বাগানের এই বাঁশবাগানের কাছে মোবাইল নেটওয়ার্ক এমনিতেই থাকে না, তার ওপর অ্যাপ খুললেই গোল গোল ঘুরছে।
হরিশ মাস্টার খাতা-পেন বগলে চেপে সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে ফ্যাক্টরির আধভাঙা দরজায় টর্চ মারলেন। "হ্যালো! ভেতরে কেউ আছেন? আমি বিএলও হরিশচন্দ্র দাস। ভোটার লিস্ট ভেরিফিকেশনের জন্য এসআইআর করতে এসেছি!"
হঠাৎ ফ্যাক্টরির ভেতরটা একটা অদ্ভুত, নীলাভ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। হরিশ মাস্টার অবাক হয়ে দেখলেন, ভেতরটা একদম পরিষ্কার। পুরোনো চা-পাতার প্যাকিং বাক্সগুলোকে সাজিয়ে একটা লম্বা টেবিল মতো করা হয়েছে, আর তার ওপাশে একজন বেশ কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক বসে আছেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। তাঁর দু'পাশে আরও জনা দশেক বিচিত্র চেহারার মানুষ।
হরিশ মাস্টার গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। "আপনারা এখানে থাকেন? কিন্তু পঞ্চায়েতের খাতায় তো এই জায়গাটা পরিত্যক্ত!"
টেবিলের ওপাশ থেকে বাঞ্ছারামবাবু অত্যন্ত ভদ্রভাবে, একেবারে পুরোনো আমলার মতো হেসে বললেন, "আজ্ঞে আসুন হরিশবাবু। পঞ্চায়েতের খাতায় যা-ই থাক, ইলেকশন কমিশনের খাতায় আমরা এই ৪২ নম্বর পার্টের পার্মানেন্ট ভোটার। আমার নাম বাঞ্ছারাম চট্টোপাধ্যায়। এই ছায়াঝোরা বাগানের ভূতপূর্ব... থুড়ি, মানে একসময়ের হেডমাস্টার।"
হরিশ মাস্টার খাতা মেলালেন। "হ্যাঁ, নাম তো আছে দেখছি। সিরিয়াল নম্বর ৫৪২। কিন্তু বাঞ্ছারামবাবু, আপনার বয়স তো এখানে দেখাচ্ছে ১১২ বছর! আর এই আপনার ভোটার কার্ডের ছবিটা কেমন যেন ঝাপসা।"
বাঞ্ছারামবাবু একটুও না ঘাবড়ে বললেন, "বয়সটা ওই আধার কার্ড লিঙ্ক করার সময় ডেটা এন্ট্রির লোক ভুল করেছিল বুঝলেন! আর ছবি ঝাপসা হবে না? ওই গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে তো মানুষ... মানে মানুষের আত্মাই বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। তা আপনি ভেরিফিকেশনটা শুরু করুন।"
হরিশ মাস্টার নিজের স্মার্টফোনটা বের করে বললেন, "আচ্ছা, সিরিয়াল নম্বর ৫৪৩, নিমা তামাং! পিতা লেট পাসং তামাং।"
নিমা তামাং তড়াক করে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকে বলল, "প্রেজেন্ট স্যার! আমি নিজেও 'লেট' হয়ে গেছি স্যার, তবে আজ মিটিংয়ে একটু তাড়াতাড়িই এসেছি।"
হরিশ মাস্টার ভ্রু কুঁচকালেন। "নিজে লেট মানে? যাই হোক, আপনার আধার কার্ড আর ইলেকট্রিক বিলটা দিন।"
নিমা মাথা চুলকে বলল, "স্যার, আধার কার্ড তো পাহাড়ে থাকতে বানাইনি। আর বিল? আমি তো বটগাছে... মানে একটা ন্যাচারাল, ইকো-ফ্রেন্ডলি হোমে থাকি। ওখানে তো সোলার সিস্টেমে কাজ চলে।"
হরিশ মাস্টার বিরক্ত হয়ে গারুদা অ্যাপে কীসব টিপতে লাগলেন। "এসব গাঁজাখুরি গল্প ইলেকশন কমিশন শুনবে না। আচ্ছা, সামনে আসুন। ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনের জন্য একটা ছবি তুলতে হবে।"
হরিশ মাস্টার মোবাইলটা তুলে নিমা তামাংয়ের মুখের দিকে তাক করতেই অ্যাপে লাল অক্ষরে লেখা উঠল— 'Face Not Detected'।
"অ্যাঁ! এ কী! আপনার মুখটা ক্যামেরায় ধরছে না কেন?" হরিশ মাস্টার মোবাইলটা ঝাঁকালেন।
ঘেঁটি পিসি আর থাকতে না পেরে পেছন থেকে খ্যাকখ্যাক করে বলে উঠল, "ক্যামেরায় ধরবে কী করে? ওর তো গত বছর অ্যাক্সিডেন্টে মুখের আধখানাই থেঁতলে গেছিল!"
হরিশ মাস্টার চমকে উঠে পিসির দিকে তাকালেন। "অ্যাঁ! আপনি কে? আর আপনার... আপনার পা দুটো ওরম পেছনের দিকে ঘোরানো কেন?"
ঘেঁটি পিসি জিভ কেটে ঘোমটা টানল। বাঞ্ছারামবাবু তাড়াতাড়ি সামাল দিয়ে বললেন, "আহা হরিশবাবু, বয়স্ক মানুষ। গাঁটে গাঁটে বাতের ব্যথা। তাতেই পা দুটো একটু ঘুরে গেছে। ওর নাম ঘেঁটুলতা দেবী। সিরিয়াল নম্বর ৫৪৫।"
হরিশ মাস্টারের ব্লাড-প্রেসারটা এবার একটু একটু করে চড়তে শুরু করেছে। তিনি খেয়াল করলেন, এই কনকনে ঠান্ডাতেও এই মানুষগুলোর মুখ থেকে কোনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। আর এদের কারোরই মাটির ওপর কোনো ছায়া পড়ছে না!
"আপনাদের... আপনাদের ছায়া কোথায়?" হরিশ মাস্টারের গলা কাঁপতে শুরু করেছে।
রতন হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে... হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে ভেসে সামনে এল। "স্যার, আমাদের তো অনেক কিছুই নেই। ছায়া দিয়ে কী হবে? আপনি শুধু খাতায় একটা টিক মেরে দিন না যে আমরা জ্যান্ত আছি!"
হরিশ মাস্টারের হাত থেকে রেজিস্টার খাতাটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি বুঝতে পেরেছেন তিনি কাদের পাল্লায় পড়েছেন। এসআইআর করতে এসে তিনি সোজা ভূত-পল্লীতে ঢুকে পড়েছেন! তিনি ভোঁ দৌড় লাগানোর জন্য সাইকেলের দিকে ঘুরতে যাবেন, এমন সময় বাঞ্ছারামবাবু তাঁর হাতটা ধরলেন। বরফের মতো ঠান্ডা হাত।
"হরিশবাবু, পালাবেন না। শুনুন, আমরা ভূত হতে পারি, কিন্তু আমরা অত্যন্ত লয়্যাল ভোটার।" বাঞ্ছারামবাবু অত্যন্ত শান্ত গলায় বোঝাতে শুরু করলেন। "আপনারা বিএলও-রা তো ভারী বিপদে থাকেন। ওপরতলা থেকে চাপ আসে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভোটার ভেরিফিকেশনের। আবার পলিটিক্যাল পার্টির লোক এসে চোখ রাঙায় যাতে তাদের ফেক ভোটারদের নাম না কাটে। তাই না?"
হরিশ মাস্টার কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "হ্যাঁ... তা ঠিক।"
"তাহলে আমাদের নাম কেটে ফর্ম ৭ কেন ফিলাপ করবেন?" বাঞ্ছারামবাবু যুক্তি দিলেন। "ফর্ম ৭ করতে গেলে তো ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে। আমার মৃত্যুর তো চল্লিশ বছর হয়ে গেল, এখন আমি ডেথ সার্টিফিকেট কোথায় পাব? তাছাড়া, ভোটের দিন যখন পোলিং এজেন্টরা দুপুরবেলা ভাত ঘুম দেয়, তখন আমরাই তো গিয়ে চুপিচুপি আপনাদের ইভিএম-এ ভোটিং পার্সেন্টেজটা বাড়িয়ে দিয়ে আসি। আমরা না থাকলে আপনাদের বুথে তো ভূত নাচবে! মানে... সত্যিকারের ভূত আর কী।"
হরিশ মাস্টার অবাক হয়ে ভাবলেন, কথাটা তো ভুল নয়! এই এসআইআর-এর ডিউটি করতে গিয়ে এমনিতেই তাঁকে পলিটিক্যাল লিডারদের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। এই ভূতেরা যদি ব্যালট বক্সে একটু সাহায্য করে, তাতে ক্ষতি কী? তাছাড়া এদের ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করা তাঁর কম্ম নয়। পাহাড়ি সরল মানুষের মতোই এই ভূতেদেরও একটা অদ্ভুত সারল্য আছে।
হরিশ মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাটি থেকে খাতাটা তুললেন। "ঠিক আছে বাঞ্ছারামবাবু। আমি আপনাদের নামগুলো 'ভেরিফায়েড অ্যান্ড অ্যালাইভ' হিসেবেই মার্ক করে দিচ্ছি। তবে শর্ত আছে।"
"কী শর্ত?" নিমা তামাং উৎসাহের সাথে জিজ্ঞেস করল।
"ভোটের দিন আপনারা কেউ দিনের বেলা বুথের ধারেকাছে যাবেন না। যা করার বিকেল পাঁচটার পর, রোদ পড়লে করবেন। আর ওই সেন্ট্রাল ফোর্সের জওয়ানদের অকারণে ভয় দেখাবেন না।"
ঘেঁটি পিসি ফোকলা দাঁতে হেসে বলল, "তথাস্তু বাবা! বেঁচে থাকো... মানে, আমাদের মতো নয়, জ্যান্ত হয়েই বেঁচে থাকো।"
হরিশ মাস্টার খাতা-পেন ব্যাগে ঢুকিয়ে সাইকেলে উঠলেন। ফেরার পথে আর তার ভয় করল না। বরং মনে হলো, ডুয়ার্সের এই ভূতেরা অন্তত সমতলের অনেক রক্তমাংসের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সৎ আর গণতান্ত্রিক।
পরদিন বিডিও অফিসে মিটিংয়ে যখন হরিশ মাস্টার ৪২ নম্বর পার্টের লিস্ট জমা দিলেন, তখন অফিসার অবাক হয়ে বললেন, "কী ব্যাপার হরিশবাবু! আপনার পার্টেই তো দেখছি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার ভেরিফিকেশন সাকসেসফুল! বাহ্!"
হরিশ মাস্টার শুধু মুচকি হাসলেন। তিনি জানেন, ছায়াঝোরা বাগানের ওই পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরির ভোটাররা আর যাই করুক, গণতন্ত্রের সাথে বেইমানি করবে না!
(সমাপ্ত)
ডিসক্লেইমার (Disclaimer):
এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও হাস্যরসাত্মক গল্প। এর চরিত্র বা ঘটনার সাথে বাস্তবের কোনো জীবিত (বা মৃত!) ব্যক্তি এবং নির্বাচন কমিশনের কোনো আধিকারিকের কোনো সম্পর্ক নেই। এস.আই.আর (SIR) প্রক্রিয়াটিকে কেন্দ্র করে নিছক বিনোদন ও হাসির ছলে গল্পটি রচিত, কোনো সরকারি প্রক্রিয়াকে অসম্মান করা বা কাউকে আঘাত করা লেখকের উদ্দেশ্য নয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন