বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

হাসির গল্প : পয়লায় পাউট, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

কমলপুর শহরটা চিরকালই একটু ঘুমন্ত গোছের। এখানকার ঘড়ির কাঁটা এবং মানুষের হাঁটার গতি, দুই-ই কলকাতা বা শিলিগুড়ির চেয়ে অন্তত আধ ঘণ্টা দেরিতে চলে। কিন্তু এই কমলপুরেই গত সপ্তাহে মেন রোডের ধারে উদ্বোধন হয়ে গেল একটি ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁর— 'ক্যাফে বং-কানেকশন'। নামটার মধ্যেই একটা আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক ব্যাপার আছে। ক্যাফের মালিক সুমিত ছেলেটি এমবিএ পাশ করে এসে বুঝেছে, আধুনিক বাঙালি আর যাই করুক, স্রেফ খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁয় যায় না। তারা যায় 'ভাইব' চেক করতে, 'অ্যাসথেটিক' খুঁজতে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রমাণ রাখতে যে তারা বেঁচে আছে এবং ভালোই আছে।

আজ পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। কমলপুরের পুরনো মিষ্টির দোকানগুলোতে হালখাতার ভিড় থাকলেও, আসল উত্তেজনা ওই 'ক্যাফে বং-কানেকশন'-এ। বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। ভিড়ের চরিত্রটা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, এরা কমলপুরের সেই চেনা ভিড় নয়। এরা হলো জেন-জি (Gen Z)। নববর্ষ উপলক্ষে এদের সাজগোজের মধ্যেও একটা অদ্ভুত ফিউশন বা জগাখিচুড়ি ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ছেলেরা পরেছে পাঞ্জাবি, কিন্তু তার সঙ্গে নিচে ডেনিমের ছেঁড়া জিন্স, পায়ে সাদা স্নিকার্স। মেয়েদের পরনে তাঁত বা জামদানির শাড়ি, কিন্তু ব্লাউজের জায়গায় ক্রপ টপ, চোখে রোদচশমা (যদিও সূর্য আড়াই ঘণ্টা আগে অস্ত গেছে), এবং কানে বিশাল আকারের ঝুমকো। দু-চারজন বয়স্ক মানুষ, অর্থাৎ সেই পুরনো আমলের কাকা-জ্যাঠারাও সস্ত্রীক এসেছেন নববর্ষের সন্ধ্যায় একটু ভালোমন্দ খাওয়ার আশায়, কিন্তু এই বিপুল তরুণ প্রজন্মের ভিড়ে তাঁরা যেন সংখ্যালঘু এবং কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্ত।

রেস্তোরাঁর ভেতরের পরিবেশটা ভারি অদ্ভুত। ছাদ থেকে ঝুলছে মাটির ভাঁড়, দেওয়ালে কুলো আঁকা, আর একপাশে বিশাল বড় নিয়ন আলোয় ইংরেজিতে লেখা— "Ami Bangali"। এই নিয়ন আলোর নিচেই আসল যুদ্ধটা চলছে।

ক্যাফের এক কোণের টেবিলে বসেছে রিমঝিম আর অর্ক। অর্কর চুলের দু'পাশে সবুজ রঙ করা, দেখলে মনে হয় যেন কচি কলাপাতা গজিয়েছে। রিমঝিম এসেই মেনু কার্ডের দিকে না তাকিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে একটা রিং-লাইট বের করে টেবিলের ওপর ফিট করল।

রেস্তোরাঁর পুরনো ওয়েটার নিতাই। সে কুড়ি বছর কমলপুরের 'মা অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেল'-এ ডাল-ভাত-মাছের ঝোল পরিবেশন করেছে। এই নতুন ক্যাফেতে বেশি মাইনের আশায় যোগ দিয়ে তার গত এক সপ্তাহে রাতের ঘুম উড়ে গেছে। নিতাইয়ের পরনে এখন আর সেই আধময়লা ফতুয়া নেই, সুমিত তাকে পরিয়েছে কালো টি-শার্ট, যার বুকে লেখা "Food Buddy Nitai"। নিতাই ট্রে-তে করে দু'গ্লাস জল নিয়ে রিমঝিমদের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

"দাদা, কী দেব?" নিতাই বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।
অর্ক হাত তুলে নিতাইকে থামিয়ে দিল। "শশশ! জাস্ট আ মিনিট আঙ্কেল। ডোন্ট রুইন দ্য ফ্রেম।"

নিতাই হতবাক হয়ে দেখল, অর্ক তার মোবাইল ফোনটা অদ্ভুত একটা অ্যাঙ্গেলে ধরেছে, আর রিমঝিম জলের গ্লাসটার দিকে এমন একটা উদাস এবং করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন গ্লাসের ভেতর জল নেই, তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব ভাসছে।

"ক্লিক! ক্লিক! ক্লিক!"

টানা পনেরোটা ছবি উঠল। রিমঝিম ছোঁ মেরে অর্কর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। "ইয়াক! অর্ক, তুই জাস্ট পারিস না! আমার ডাবল চিন দেখা যাচ্ছে। লাইটিংটা একদম পাথেটিক। তুই ওই পাশটায় যা, আমি এদিক থেকে 'ক্যানডিড' পোজ দিচ্ছি। তুই এমন ভাবে ছবি তুলবি যেন আমি জানতেই পারিনি।"

নিতাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল। তার হিন্দু হোটেলের খদ্দেররা জল দেওয়ার সাথে সাথে এক নিঃশ্বাসে সেটা গিলে ফেলে হাঁক পাড়ত— "কই হে, ভাত আনো!" আর এরা জলের গ্লাস নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে!

পাশের টেবিলে আরেক কাণ্ড। সেখানে বসেছে চারজন উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে। তাদের টেবিলে এখনও খাবার আসেনি, কিন্তু ছবি তোলা পুরোদমে চলছে। একজন মেয়ে তার শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে টেনে ধরে বসেছে যেন প্রবল ঝড়ে সে উড়ে যাচ্ছে, আর বাকি তিনজন তিনটে আলাদা ফোন থেকে তার ছবি তুলছে।

নিতাইয়ের চোখ গেল রেস্তোরাঁর ঠিক মাঝখানের টেবিলটায়। সেখানে বসে আছেন অবিনাশবাবু এবং তাঁর স্ত্রী। অবিনাশবাবু কমলপুর হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার। নববর্ষের দিন গিন্নিকে নিয়ে একটু চাউমিন আর চিলি চিকেন খেতে এসেছেন। কিন্তু চারপাশের এই অদ্ভুত জিমন্যাস্টিকস দেখে তিনি রীতিমতো আতঙ্কিত।

অবিনাশবাবু ফিসফিস করে স্ত্রীকে বললেন, "হ্যাঁ গো, এরা কি সবাই মৃগী রোগী? ওই দ্যাখো, মেয়েটা কেমন মুখটা বাঁকিয়ে চোখ দুটো ট্যারা করে ফেলল!"

স্ত্রী ধমক দিয়ে উঠলেন, "আহ! আস্তে কথা বলো। ওটা মৃগী নয়, আমার নাতনি বলছিল ওটাকে নাকি 'পাউট' করা বলে। ঠোঁট ফুলিয়ে ছবি তোলে।"

অবিনাশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "খাবার দোকানে এসে কেউ ঠোঁট ফোলায়? খিদে পেলে তো পেট ফোলা উচিত!"

এদিকে রিমঝিম আর অর্কর টেবিলে অবশেষে অর্ডারের পালা এল। রিমঝিম মেনু কার্ডটা উল্টেপাল্টে দেখে বলল, "আঙ্কেল, আপনাদের এখানে সবচেয়ে 'ইনস্টাগ্রামেবল' খাবার কোনটা?"

নিতাই আকাশ থেকে পড়ল। "আজ্ঞে? ইনসটান... মানে? আমাদের এখানে মোগলাই পরোটা আছে, ফিশ ফ্রাই আছে..."

"নো নো!" রিমঝিম নাক কুঁচকালো। "ফিশ ফ্রাইয়ের কোনো কালার প্যালেট নেই। বড্ড ব্রাউন। লুকস সো বোরিং। এমন কিছু দিন যেটা দেখতে খুব ভাইব্র্যান্ট। মাল্টিকালার কিছু আছে? ধরুন এমন কিছু যেটায় ধোঁয়া বেরোবে, বা ধরুন লাল-নীল রঙের গ্রেভি?"

নিতাইয়ের মাথা ঘুরতে শুরু করল। সে আমতা আমতা করে বলল, "আজ্ঞে, ধোঁয়া তো গরম চায়ে বেরোয়। আর লাল রঙের গ্রেভি তো চিকেন কষায় হয়, কিন্তু নীল রঙের তো কোনো তরকারি জীবনে দেখিনি দিদিমণি! পেনের কালি ছড়ানো খাবার কি কেউ খায়?"

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল, "উফ! এদের কোনো সেন্স নেই। লিটারেলি জিরো অ্যাসথেটিক। রিমঝিম, তুই বরং একটা 'ব্লু লেগুন মকটেল' আর একটা 'রেইনবো পেস্ট্রি' অর্ডার কর। ওটার সাথে তোর শাড়ির কনট্রাস্টটা জাস্ট ফাটাফাটি আসবে। হ্যাশট্যাগ নববর্ষ, হ্যাশট্যাগ বেঙ্গলি ভাইব।"

নিতাই খাতা-পেন্সিল নিয়ে অর্ডারটা লিখে নিল। সে বুঝতে পারল, এখানে খাবারটা আসলে খাবার নয়, ওটা একটা 'প্রপস'। নাটকের মঞ্চে যেমন তলোয়ার বা বন্দুক থাকে, এই ক্যাফেতে খাবারটা হলো ছবি তোলার একটা সরঞ্জাম মাত্র। এর স্বাদ কেমন, সেটা নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা শুধু ফিল্টার নিয়ে।

অর্ডার নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় নিতাই দেখল, রেস্তোরাঁর ঢোকার মুখে সেই "Ami Bangali" নিয়ন বোর্ডটার নিচে একটা ছোটখাটো দাঙ্গা বেধে যাওয়ার উপক্রম। চারটে আলাদা গ্রুপ একই সাথে ওই বোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চাইছে। একজন বলছে, "ভাই, আমি পনেরো মিনিট ধরে ওয়েট করছি একটা বুমেরাং নেব বলে।" অন্যজন বলছে, "এক্সকিউজ মি! আমার রিলস-এর অডিওটা জাস্ট শেষ হবে, তারপর আপনারা আসুন।"

নিতাই রান্নাঘরে ঢুকে শেফ রমেনকে বলল, "ওস্তাদ, কড়াইয়ে আগুন কমাও। আজ আর কেউ খাবে না, সবাই শুধু গিলবে। তবে মুখ দিয়ে নয়, ক্যামেরার লেন্স দিয়ে!"

রমেন কড়াই থেকে চোখ না তুলে বলল, "কেন রে? কী হলো?"

"আরে আর বোলো না! বাইরে একটা আস্ত পাগলাগারদ বসে আছে। সবাই নিজের মুখ নিজে মোবাইলে দেখছে আর হাসছে। আমার তো মনে হয় খাবারে নুনের বদলে একটু গ্লিসারিন আর মেকআপ পাউডার ছড়িয়ে দিলে এরা বেশি খুশি হবে!"

বাইরে তখন হৈহৈ আওয়াজ। কেউ একজন বোধহয় ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে সেলফি নিতে গিয়ে পাশের জনের ঘাড়ের ওপর পড়ে গেছে। পয়লা বৈশাখের পুণ্য সন্ধ্যায় 'ক্যাফে বং-কানেকশন'-এ তখন খাদ্যের চেয়ে ফ্রেমের কদর বেশি। অবিনাশবাবু একটা ফিশ ফ্রাই মুখে দিয়ে আপনমনেই বললেন, "এরা খাচ্ছেটা কী? পিক্সেল না মেগাবাইট?"

নিতাইয়ের মাথা এমনিতেই ভোঁ ভোঁ করছিল, তার ওপর শেফ রমেন হঠাৎ রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট ধরিয়ে দিল। প্লেটে একটা টলটলে নীল রঙের পানীয়, আর তার পাশে রামধনুর সাতরঙা একটা কেকের টুকরো। নিতাই মনে মনে ভাবল, এ তো খাবার নয়, যেন পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেলের ডেকরেশন!

ট্রে-টা নিয়ে সাবধানে ভিড় কাটিয়ে রিমঝিমদের টেবিলের দিকে এগোতে লাগল নিতাই। ক্যাফের ভেতরে ততক্ষণে আওয়াজের ডেসিবল আরও কয়েক মাত্রা বেড়েছে। কেউ হাসছে, কেউ হঠাৎ করে হাত-পা নেড়ে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করছে (যাকে এরা নাকি 'টিকটক ডান্স' বলে), আবার কেউ কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ আটকে রেখে সঙ্গীর দিকে না তাকিয়েই কথা বলে যাচ্ছে।

নিতাই রিমঝিমদের টেবিলে খাবারটা নামিয়ে রাখল। "এই নিন দিদিমণি, আপনাদের নীল লেবু-জল আর রঙিন কেক।"

রিমঝিম চোখ বড় বড় করে তাকাল। "ওয়াও! অর্ক, লুক অ্যাট দ্য প্রেজেন্টেশন! জাস্ট পারফেক্ট!"
অর্ক ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, কোমরটাকে একটু অদ্ভুত ভাবে বেঁকিয়ে, টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার মোবাইলটা খাবারের ঠিক চার ইঞ্চি ওপরে ঝুলছে।

"রিমঝিম, তুই জাস্ট ফোকের (কাঁটাচামচ) ডগা দিয়ে পেস্ট্রিটার একটা ছোট্ট স্লাইস কাট। একদম মুখে দিবি না কিন্তু! জাস্ট কাটবি, আর আমি স্লো-মোশনে ভিডিওটা নেব। রেডি? অ্যাকশন!"

নিতাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই সার্কাস দেখছিল। রিমঝিম কাঁটাচামচ দিয়ে সাবধানে কেকের একটা টুকরো কাটল, তারপর সেটা মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম, অত্যধিক উচ্ছ্বসিত হাসি দিল। অর্ক মিনিট দুয়েক ধরে সেই দৃশ্যটার ভিডিও করল।

"কাট!" অর্ক সন্তুষ্ট চিত্তে বলল। "এবার একটা ফ্ল্যাট-লে (Flat-lay) শট নেব। রিমঝিম, তোর হাতটা ফ্রেমের বাইরে রাখ।"

এরপর চলল পানীয়ের ছবি তোলার পালা। গ্লাসটাকে ডানদিকে সরাল, বাঁদিকে সরাল, পেছন থেকে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে ব্যাকলাইটিংয়ের চেষ্টা করল। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে এই 'ফোটোশুট' চলল। নিতাই দেখল, নীল পানীয়ের বরফ গলে সেটা ততক্ষণে সাধারণ জলের মতো দেখতে হয়ে গেছে, আর পেস্ট্রির চারপাশের ক্রিম গরমে গলে গিয়ে রামধনু থেকে কাদামাখা রাস্তার মতো দেখাচ্ছে।

"যাক বাবা, এবার হয়তো খাবে!" নিতাই মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু কোথায় কী! রিমঝিম আর অর্ক দুজনেই যার যার মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে পড়ল। ছবিগুলো এডিট করতে হবে তো! ফিল্টার লাগানো, ব্রাইটনেস কমানো-বাড়ানো, এবং মানানসই ক্যাপশন খোঁজা— এই সবই নাকি খাওয়ার চেয়েও জরুরি কাজ।

"ক্যাপশনটা কী দেব বল তো?" রিমঝিম জিজ্ঞেস করল। "ফিলিং ব্লেসড উইথ দিস কিউট ডেট? নাকি শুভ নববর্ষ ভাইবস?"

অর্ক ভ্রু কুঁচকে ভাবল। "না না, ওসব বড্ড ব্যাকডেটেড। দে— 'সুগার, স্পাইস, এন্ড এভরিথিং নাইস, বাট মাই অ্যাসথেটিক ইজ প্রাইসলেস।' সাথে একটা নীল হার্ট আর একটা রেইনবো ইমোজি।"
নিতাইয়ের ইচ্ছে করছিল মাথাটা দেওয়ালে ঠুকতে। খাবারগুলো সামনে পড়ে পড়ে শুকোচ্ছে, আর এরা ক্যাপশন নিয়ে গবেষণা করছে!

এদিকে, রেস্তোরাঁর মাঝখানের টেবিলে অবিনাশবাবু আর তাঁর স্ত্রীর চাউমিন আর চিলি চিকেন এসে গেছে। অবিনাশবাবু কাঁটাচামচ দিয়ে সযত্নে চাউমিন মুখে তুলতে যাবেন, ঠিক সেই সময় একটা জোরালো ফ্ল্যাশের আলোয় তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

চমকে উঠে তিনি দেখলেন, পাশের টেবিলের একটা ছেলে, যার চুলের অর্ধেকটা লাল আর অর্ধেকটা হলুদ, তার টেবিলের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে অবিনাশবাবুর চাউমিনের প্লেটের দিকে মোবাইল তাক করে আছে।
"কী ব্যাপার হে ছোকরা?" অবিনাশবাবু চশমাটা ঠিক করে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন। "আমার খাবারের ছবি তুলছ কেন? তোমার প্লেটে কি চাউমিন পড়েনি?"

ছেলেটা বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়ে দাঁত বের করে হাসল। "আরে দাদু, চিল করুন! আমার টেবিলে শুধু কফি অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কফির ছবি দিয়ে কি আর ফুড-ব্লগিং হয়? আপনার প্লেটটার লাইটিং ভালো আসছিল, তাই একটা শট নিয়ে নিলাম। ডোন্ট ওয়ারি, আপনাকে ফ্রেমে রাখিনি, শুধু নুডলস-এর 'ম্যাক্রো শট' নিয়েছি।"

অবিনাশবাবুর রাগ তখন সপ্তমে। "ম্যাক্রো শট! আমার টাকায় কেনা চাউমিন, আমার প্লেট, আর তুমি সেটার ম্যাক্রো শট নিচ্ছ? আর আমাকে বলছ 'চিল' করতে? আমি কি রেফ্রিজারেটর যে চিল করব? বেয়াদব কোথাকার!"

স্ত্রী অবিনাশবাবুর হাত চেপে ধরলেন। "আহা, ছাড়ো তো! বাচ্চা ছেলে, একটা ছবিই তো তুলেছে। খেতে দাওনি তো আর!"

অবিনাশবাবু গজগজ করতে লাগলেন। "বাচ্চা ছেলে! চুলে দেখেছ কেমন প্যালেট রং মেখেছে? আমার চাউমিনের ওপর যদি নজর লাগে, বদহজম হয়ে যাবে বলে দিলাম!"

ছেলেটি ততক্ষণে নিজের টেবিলে ফিরে গিয়ে মোবাইলে ব্যস্ত। সে সম্ভবত অবিনাশবাবুর চাউমিনের ছবিটা পোস্ট করে লিখছে— "ক্রিভিং সাম অথেন্টিক চাইনিজ অন পয়লা বৈশাখ!"

ঠিক এই সময়েই রেস্তোরাঁয় ঘটল একটা বড়সড় দুর্ঘটনা। ক্যাফের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট কৃত্রিম ফোয়ারা ছিল, যার চারপাশে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রাখা। সেটা মূলত সাজানোর জন্যই।

একটি মেয়ে, যার পরনে হাঁটু-ঝুল শাড়ি এবং পায়ে হাই-হিল, সে ঠিক করেছিল ওই ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে একটা 'বুমেরাং' ভিডিও বানাবে। সে তার বন্ধুকে নির্দেশ দিচ্ছিল, "তুই ঠিক ওই জায়গাটা থেকে নিবি। আমি যেই ঘুরে দাঁড়াব, তুই আমার শাড়ির আঁচলটা ফোকাস করবি।"

মেয়েটি নাটকীয়ভাবে ঘুরতে গেল, কিন্তু হাই-হিলের ব্যালেন্স আর ভেজা মেঝের হিসেব সে রাখতে পারেনি। "আঁক" করে একটা শব্দ করে সে সটান গিয়ে পড়ল সেই কৃত্রিম ফোয়ারার ভেতর!

মুহূর্তের মধ্যে ক্যাফেতে পিন-পতন নৈঃশব্দ্য। নিতাই হাঁ করে দেখল, মেয়েটি ফোয়ারার জলের ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছে, তার মেকআপ ধুয়ে গিয়ে মুখের আসল রূপ বেরিয়ে আসছে, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— তার বন্ধুরা তাকে তোলার বদলে, তাদের মোবাইল তাক করে এই পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভিডিও করতে ব্যস্ত!

"ওহ মাই গড! শ্রেয়া, তুই জাস্ট ভাইরাল হয়ে যাবি!" শ্রেয়ার এক বন্ধু চিৎকার করে উঠল। "এই ফলটা জাস্ট এপিক ছিল! হোল্ড অন, আমি আরেকটা অ্যাঙ্গেল থেকে নিচ্ছি!"

অবিনাশবাবু চাউমিনের কাঁটাচামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "গিন্নি, তাড়াতাড়ি খেয়ে চলো। এরা শুধু পাগল নয়, এরা ভয়ংকর পাগল। এরা জ্যান্ত মানুষের চেয়ে একটা জ্বলজ্বলে স্ক্রিনকে বেশি ভালোবাসে।"

নিতাই ছুটে গিয়ে শ্রেয়াকে ফোয়ারা থেকে টেনে তুলল। মেয়েটার তখন যা অবস্থা, দেখলে মনে হবে যেন তাকে চুবিয়ে স্নান করানো হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মুখে কোনো রাগ বা লজ্জা নেই। সে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করল, "ভিডিওটা ঠিকঠাক এসেছে তো? লাইটিং কেমন ছিল? আপলোড করে দে তাড়াতাড়ি, ক্যাপশনে দিবি— 'স্প্ল্যাশিং ইনটু দ্য নিউ ইয়ার লাইক!'"

নিতাই নিজের মাথায় হাত দিল। সে বুঝতে পারল, এই নতুন পৃথিবীতে খাবার, দুর্ঘটনা, আনন্দ, কান্না— সব কিছুই আসলে একটা 'কন্টেন্ট'। আর এই 'কন্টেন্ট'-এর বাজারে, আসল জীবনের কোনো জায়গা নেই।

শ্রেয়ার ফোয়ারায় পতনের পর ক্যাফে বং-কানেকশনের মালিক সুমিত ছুটে এল। তার এমবিএ পাশ করা কর্পোরেট মস্তিষ্ক তখন প্রমাদ গুনছে। কাস্টমার জলে পড়ে গেছে, নির্ঘাত এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একতারা রেটিং দিয়ে রেস্তোরাঁর বদনাম গাইবে, কিংবা ক্ষতিপূরণ চাইবে!

সুমিত হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, "ম্যাম, আর ইউ ওকে? আই অ্যাম সো সরি! আমাদের ফ্লোরটা একটু স্লিপারি ছিল। আমরা কি ফার্স্ট এইড আনব? না কি ড্রেস চেঞ্জ করার ব্যবস্থা..."

শ্রেয়া জল চপচপে শাড়িটা নিংড়াতে নিংড়াতে একগাল হেসে বলল, "আরে চিল ব্রো! আমি একদম ফাটাফাটি আছি। জাস্ট ফল-টা একটু হার্ড ছিল। কিন্তু আপনাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডটা একটু বলবেন? আমার 4K ভিডিওটা আপলোড হতে বড্ড টাইম নিচ্ছে। ফোর-জি নেটওয়ার্ক এখানে একদম জঘন্য!"

সুমিত হতবাক। ক্ষতিপূরণের বদলে মেয়েটা ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড চাইছে! সে ঢোঁক গিলে পাসওয়ার্ডটা বলে দিল— 'BongVibe2026'।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল কমলপুর শহরের সেই চিরপরিচিত মহাজাগতিক ঘটনাটি। যার জন্য জেন-জি, মিলেনিয়াল বা বুমার— কেউই প্রস্তুত ছিল না।

হঠাৎ করে একটা 'ভুসসস' শব্দ। আর তার পরেই গোটা রেস্তোরাঁ ঘুটঘুটে অন্ধকার।

কমলপুরের বিখ্যাত লোডশেডিং! নববর্ষের সন্ধ্যায় ট্রান্সফরমার জবাব দিয়েছে। সুমিতের ক্যাফেতে জেনারেটর আছে বটে, কিন্তু সেটা স্টার্ট নিতে অন্তত মিনিট দশেক সময় নেবে, কারণ সুমিতের ধারণা ছিল নববর্ষের দিন অন্তত ইলেকট্রিক অফিস দয়াদাক্ষিণ্য দেখাবে।

অন্ধকার নামতেই ক্যাফের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। তারপর শুরু হলো হাহাকার। তবে সেই হাহাকার অন্ধকারে ভূতের ভয়ে নয়।

অর্ক আর্তনাদ করে উঠল, "রিমঝিম! ওয়াইফাই রাউটারটা অফ হয়ে গেল! আর আমার ফোনের ব্যাটারি মাত্র দুই পার্সেন্ট! মাই লাইফ ইজ ওভার!"

চারপাশে তখন জনা পঞ্চাশেক স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইট জোনাকির মতো জ্বলছে। সেই আলোয় জেন-জি ছেলেমেয়েদের মুখগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা সদ্য কোনো যুদ্ধে সর্বস্বান্ত হয়েছে। কেউ হাত ওপরে তুলে সিগন্যাল ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কেউ বা অফলাইন হয়ে যাওয়ার শোকে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।

নিতাই এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। কুড়ি বছর 'মা অন্নপূর্ণা হিন্দু হোটেল'-এ কাজ করার সুবাদে সে জানে, কারেন্ট গেলে কী করতে হয়। সে পা টিপে টিপে স্টোররুমে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন সে ফিরে এল, তার দু'হাতে দুটো পুরনো আমলের কাচের চিমনিওয়ালা হ্যারিকেন লণ্ঠন।

সুমিত বাধা দিতে গেল, "আরে নিতাইদা, এসব কী? ধোঁয়া বেরোবে, ক্লায়েন্টরা কমপ্লেন করবে!"

নিতাই পাত্তা না দিয়ে অবিনাশবাবুর টেবিলে একটা আর রিমঝিমদের টেবিলে একটা হ্যারিকেন রেখে দিল। হ্যারিকেনের সেই আদিম, হলদেটে আলোয় ক্যাফের ভেতরটা হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত মায়াময় রূপ নিল।

রিমঝিম মুগ্ধ হয়ে হ্যারিকেনটার দিকে তাকিয়ে বলল, "ও মাই গড! দিস ইজ সো 'রাস্টিক কোর'! একদম ভিন্টেজ ভাইব। অর্ক, তোর ফোনটা দে, একটা সিল্যুয়েট পিকচার নেব।"

অর্ক করুণ গলায় বলল, "ফোন ডেড। সুইচড অফ।"
"হোয়াট!" রিমঝিমের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছবি তোলা যাবে না? তাহলে এই রেস্তোরাঁয় বসে থাকার মানে কী?

ঠিক এই সময় অবিনাশবাবু অন্ধকারে নিজের চাউমিনের প্লেটটা সাফ করে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। তারপর হ্যারিকেনের আলোয় রিমঝিমদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "ছবি তো আর তোলা যাবে না দিদিভাই, এবার অন্তত খাবারটা খেয়ে দ্যাখো। অন্ধকারে খাবারের স্বাদ বাড়ে, জানো? কারণ তখন চোখ দিয়ে নয়, মানুষ জিভ দিয়ে খায়।"

রিমঝিম আর অর্ক একে অপরের দিকে তাকাল। মোবাইল বন্ধ, ইন্টারনেট নেই, ছবি তোলা যাচ্ছে না। আর কিছু করার নেই। চরম বিরক্তি আর অসীম একঘেয়েমিতে রিমঝিম সেই গলে যাওয়া রামধনু রঙের কেকটা কাঁটাচামচে করে মুখে পুরল।

পরমুহূর্তেই তার মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। "ইয়াক! এটা কী? জাস্ট ডালডা আর সস্তা চিনির রস! আর এই নীল ড্রিংকসটা... মনে হচ্ছে যেন কাফ-সিরাপ আর ডিটারজেন্ট মেশানো!"

এতক্ষণ ফোটোশুটের চক্করে ওরা খাবারের স্বাদটা বোঝারই চেষ্টা করেনি। শুধু রঙের প্রেমে পড়েছিল। অর্ক থু থু করে কেকটা ফেলে দিয়ে বলল, "জঘন্য! জাস্ট আনইটেবল!"

নিতাই মুচকি হাসল। সে জানত এটা হবে। সে কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "দাদাবাবু, ওই নীল-লাল রং মেশানো খাবার তো ছবি তোলার জন্য। ওসব কি আর মানুষের পেটে সয়? আমি বরং শেফকে বলে দুটো গরমাগরম ফিশ ফ্রাই আর একটু কফি নিয়ে আসি? ছবি তো তুলতে পারবেন না, অন্তত নববর্ষের দিনে পেটটা শান্ত হোক।"

অর্ক আর রিমঝিম বাধ্য হয়ে মাথা নাড়ল। মিনিট পাঁচেক পর যখন ধোঁয়া ওঠা, মচমচে, সোনালি ফিশ ফ্রাই আর কাসুন্দি তাদের টেবিলে এল, তখন আর মোবাইল নেই। কাঁটাচামচ বাদ দিয়ে হাত দিয়েই ফিশ ফ্রাই ভেঙে মুখে দিল রিমঝিম।

"উমম!" রিমঝিমের চোখ বুজে এল। "অর্ক, এটা জাস্ট স্বর্গ! ভেতরের মাছটা কী সফট!"

অর্কও ততক্ষণে একটা গোটা ফিশ ফ্রাই সাবাড় করে দিয়েছে। "সত্যি! আমরা তো শুধু লাইক আর কমেন্টের চক্করে আসল মজাটাই মিস করছিলাম।"

ফোয়ারায় পড়ে যাওয়া শ্রেয়াও ততক্ষণে তোয়ালে জড়িয়ে একটা টেবিলে বসে গোগ্রাসে চিলি চিকেন খাচ্ছে। ক্যাফে জুড়ে এখন আর "ক্লিক ক্লিক" শব্দ নেই। শুধু কাঁটাচামচের টুংটাং আর তৃপ্তির সঙ্গে চিবনোর আওয়াজ। ওয়াইফাই না থাকায় ছেলেমেয়েগুলো বাধ্য হয়ে একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। কেউ হাসছে, কেউ জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছে।

অবিনাশবাবু গিন্নিকে নিয়ে ওঠার সময় বিলটা মেটানোর জন্য কাউন্টারে এলেন। সুমিতকে বললেন, "ভাই, তোমার এই ক্যাফের ডেকোরেশন ভালো, তবে আসল ম্যাজিকটা কিন্তু ওই হ্যারিকেনে আর তোমার ফিশ ফ্রাইয়ে। রোজ সন্ধ্যায় একবার করে মেইন সুইচটা অফ করে দিও। দেখবে, ছেলেপুলেগুলো মানুষের মতো খেতে শিখবে!"

ঠিক তখনই ঝকঝক করে আলো জ্বলে উঠল। জেনারেটর নয়, ট্রান্সফরমার ঠিক হয়েছে।
আলো আসার সাথে সাথেই ক্যাফের চরিত্র আবার বদলাতে শুরু করল। অর্ক ছিটকে গিয়ে চার্জার খুঁজতে দৌড়ল, শ্রেয়ার বন্ধুরা আবার ভিডিও অন করল।

নিতাই হ্যারিকেন দুটো নিভিয়ে স্টোররুমের দিকে এগোতে এগোতে আপনমনে হাসল। নববর্ষের এই একটা সন্ধ্যায় অন্তত পনেরো মিনিটের জন্য হলেও জেন-জি প্রমাণ করে দিয়েছে, পেটের ক্ষিদে আর জিভের স্বাদের কাছে মেগাপিক্সেল আর ফিল্টার— সব কিছুই আসলে নস্যি!

খাবারটা খাবারই, ওটা প্রপস নয়। আর কমলপুর, চিরকাল কমলপুরই থাকবে।

(সমাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...