ইগো
শিপ্রা এস রায়
কি হলো ? আমি লোকটার জন্য প্রাণপণ দৌড়াচ্ছি আর তিনিই কিনা আমাকে তুই-তুকারি করছেন! অয়ন হাতে তুলে নেওয়া ঢিলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে টিফিন নিয়ে হস্টেলে ফিরে এলো। অপেক্ষারত বন্ধুরা খিদের জন্য মারমুখী হতেই দেরির কারণটা বলতে লাগল, ফেরার পথে একটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দে- দৌড়। আর তার পিছনে চোর চোর বলে কিছু লোক। আমার মনে হলো চোরটা আমাকে চ্যালেঞ্জ করলো, মেজাজ গেল বিগড়ে আমিও দিলাম দৌড়। প্রায় ধরি ধরি তো ঠিক সেই সময় মালিক বলতে লাগল ধর্ বেটাকে ধর্। আমি কি লোকটার আত্মীয় কিংবা বন্ধু নাকি যে তুই বলবে? ধ্যাৎ।
আমরা--আরে মাথা গরমের কি হলো? অয়ন বলল, গরম হবে না মানে? যার জন্য DPC স্যার আমাকে প্র্যাকটিকেলে একজন পেশেন্টকে দাদু সম্বোধন করে case history নিচ্ছিলাম বলে নাম্বার কমিয়ে দিয়েছিলেন মনে নেই? বলেছিলেন তোমার আত্মীয় নাকি? মানুষকে আগে সম্মান দেবে।
আমরা---ও তাই এই হবু ডাক্তার বাবুর ইগোতে লেগেছে। অয়ন---একদম তাই। আমরা মানুষ, মহামানব নই।
ধীরেন বাস্কে
মলয় সরকার
ধীরেন বাস্কে ব্যাঙ্কে এসেছিল টাকার জন্য। বলল, মেয়ের বিয়ের জন্য লাগবে।
‘'মেয়ের বয়স কত?”
-বারো বছর।
“এত অল্পবয়সে বিয়ে দিচ্ছ, আইনে ধরবে তো-”
“না বাবু, ওসব আইন ফাইন এখানে লাগে না। তা ছাড়া কম বয়সে দিলে কম টাকা লাগবে, বেশি বয়সে দিলে অনেক বেশি টাকা লাগবে। কোথা পাব অত টাকা?”
বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরুপায় মেয়েটার নীরব চোখে জল দেখে আমি নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা দিই নি। ধীরেন রেগে গিয়েছিল আমার উপর।
টাকার অভাবে মেয়েটার বিয়ে হল না।
অনেক বছর পর, বিডিও অফিসে একটা কাজে যেতে হঠাৎ বিডিও মেয়েটি চেয়ার থেকে নেমে আমাকে প্রণাম করায় চমকে উঠলাম।
বলল, সেদিন আপনি বাবাকে লোন না দেওয়ার জন্যই আমি আজ এই চেয়ারে।
আমার মুখে কথা আটকে গেল। ওর মাথায় হাত দিয়ে প্রার্থনা করলাম ওর জন্য।
লটারি
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
তোরষার পাড়ে দাঁড়িয়ে প্লাবন ভাবছিল জীবনটা এক অনিশ্চিত লটারি। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে তার একমাত্র স্বপ্ন—মেয়ে তৃষাকে সরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা। বেসরকারি স্কুলের ফি জোগাতে সে হিমশিম খাচ্ছিল। ইতিহাসের স্নাতকোত্তর প্লাবন এখন এক দোকানের কর্মচারী, যেখানে ভাগ্যের চেয়ে সংগ্রামই বেশি স্পষ্ট।
ভর্তির লটারির দিন স্কুলের সামনে উৎকণ্ঠার ভিড়। একে একে নাম ঘোষণা হতে থাকে। তৃষার প্রিয় বান্ধবী সাহানাজের নাম তালিকায় উঠলেও, তৃষার নাম আর এলো না। ফেরার পথে বিষণ্ণ তৃষা প্রশ্ন করে, “আমি কি খারাপ ছাত্রী?” প্লাবন উত্তর দেয়, “লটারি ভাগ্য দেখে, মানুষকে নয়।”
সে রাতে তৃষা ডায়েরিতে নিজের আক্ষেপ কবিতার ছন্দে লিখে রাখে। মেয়ের জেদ দেখে প্লাবন নতুন শক্তি পায়। পরদিন দোকানে মালিককে সে হাসিমুখেই জানায়—তৃষার নাম তালিকায় না উঠলেও, তার স্বপ্ন অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। প্লাবন বোঝে, কিছু মানুষ লটারিতে হেরেও জীবনের যুদ্ধে জিতে যায়।
খুশি
শুভব্রত ব্যানার্জী
মায়ের সাথে নববর্ষের হালখাতা করতে গিয়ে টয় হাউস থেকে পছন্দের পুতুলটা কিনে হাসি খুব খুশি হয়। আট বছরের হাসি নতুন কেনা পুতুলটা নিয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটছিল। রাস্তার ধারে একটা দোকানে তার মা মল্লিকা কিছু জিনিস কিনতে দাঁড়ালে সেও দাঁড়ায়। হঠাৎ 'বু-বু হিক-হিক' শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখে একটা পুঁচকে বাচ্চা তার পুতুলটা দেখে মায়ের কোল থেকে ঐরকম শব্দ করে হাসছে।
সে পুতুলটা দেখিয়ে বলে- নিবি?
পুঁচকে একমুখ হেসে আবার বলে- বু-বু হিক-হিক।
তার কাণ্ড দেখে হাসি তার হাতে পুতুলটা দিলে সে হাঁ করে পুতুলটাকে চুমু খায়। তার কায়দা দেখে হাসি খিল খিল করে খুব হাসে।
মল্লিকা দেখতে পেয়ে চিৎকার করে- এতো বায়না করে পুতুলটা কিনে শেষে ওকে দিয়ে দিলি?
- আমার তো অনেক পুতুল আছে মা, ওর বোধহয় একটাও নেই। পুতুলটা পেয়ে ও কত খুশি হয়েছে দেখো!
মল্লিকা নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে- আমার পুঁচকে মেয়েটা কবে এতো বড় হয়ে গেল!
স্বাস্থ্যবিধিসম্মত খাবার
সনৎ সিংহ
১৬ই ফেব্রুয়ারি সহদেবদা ছেলের বৌভাতে আমাদের নেমন্তন্ন করেছেন।
স্টার্টারের পকোড়া থেকে দুটো দিতে বলতে একটা দিল। শুনতে পায়নি ভেবে আবার বলতে যাচ্ছি; নবনীতা বলল, “ছাড়ো। মেন কোর্সে ভালো করে খাব”।
মেন কোর্সের আগে সহদেবদা এসে বললেন, “ক্যাটারারদের বলা আছে। স্বাস্থ্যবিধিসম্মত অনেক খাবার। ভালোভাবে খাবেন। খাসির মাংস আছে। লজ্জায় হয়তো চাইবেন না। ক্যাটারারের লোক নিজে থেকেই দেবে”।
প্রথমে দেশলাই সাইজের ফিস কাটলেট খেয়ে ডাল আলুভাজা (কীসব নাম যেন) না নিয়ে ভাত রেখে মাংসের জন্য অপেক্ষা করছি। ভাতটা বেশ কয়েকবার দিতে চাইল। মাংসের চর্বির একটা ছোট্ট টুকরোর সাথে থালা ভর্তি ঝোল দিলে আমি আর এক পিস মাংস চাইতে বলল, “পরে এসে দিচ্ছি”। আর এল না। শেষে রসগোল্লা এলে বললাম, ‘আমি মিষ্টি খাই না’। নবনীতাকে একটা দেওয়ার পর ও আর একটা চাইলে না শোনার ভান করে চলে গেল।
এতক্ষণে বুঝলাম সুদেবদার কথা। স্বাস্থ্যবিধিসম্মত খাবার নয়, পরিবেশন !
পরিহাস
বিমল চন্দ্র পান্ডা
হীরাপুর ব্লক অফিসের বাইরে শিমূলতলায় বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ - বৃদ্ধার ভিড়। তাঁরা বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। একজন বুড়িমা ভিজে - উদাস চোখে তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে বৃদ্ধা মায়ের জায়গা হয়নি। এদিকে ছেলে উচ্চ বেতনের সরকারি চাকুরে বলে তাঁর বার্ধক্য ভাতার আবেদন বিবেচনা করা হয়নি। তাই তিনি আজ বিডিও স্যারের সাথে এ বিষয়ে অনুরোধ করতে এসেছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর স্যারের সাথে দেখা পাওয়ার সুযোগ হলো বিধবা মায়ের। তিনি স্যারকে করজোড়ে মিনতি করে বললেন,"আমার বার্ধক্য ভাতাটি যেন হয়, একটু দেখবেন স্যার। নইলে দুমুঠো খাবারও জুটবে না।" হ্যাঁ যে কথাটি বলা হয়নি, সেই বিডিও স্যারই হলেন এই সহায় - সম্বলহীনা বৃদ্ধারই ছেলে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন