সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

অনুগল্প (অনুষ্কা মোদক, উত্তম কুমার ঘোষ, অঞ্জনা মজুমদার, উজ্জ্বল দত্ত, রঞ্জন কুমার বণিক)


অক্ষয় খাতা 
অনুষ্কা মোদক 

রোদঝলমলে নববর্ষের সকালে জীর্ণ দাওয়ায় বসে পুরোনো ডায়েরিটা ওল্টাচ্ছিলেন বৃদ্ধ অবিনাশ বাবু। এক সময় এই বাড়িতে পয়লা বৈশাখের এলাহি আয়োজন হতো, কিন্তু এখন সবটাই স্মৃতি। ছেলে সুদীপ শহরে থিতু হওয়ার পর থেকেই উৎসবগুলো এই উঠোনে আর পা রাখে না।

হঠাৎ গেটে একটা ট্যাক্সি থামার শব্দে তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। নামল এক চিলতে রোদ—তাঁর নাতি অয়ন। পেছনে ব্যাগ হাতে অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে সুদীপ। অবিনাশ বাবু অবাক হয়ে চাইলেন। সুদীপ কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, "বাবা, প্রতি বছর নতুন খাতা তো খুলি, কিন্তু সম্পর্কের হিসেবটা মেলাতে ভুলে যাই। এ বছর ঠিক করেছি, অফিসের আগে তোমার আশীর্বাদের হালখাতাটা খুলে নেব।"

বৃদ্ধের ঝাপসা চোখে জল চিকচিক করে উঠল। অয়ন ততক্ষণে ঠাকুরদাকে জড়িয়ে ধরে নতুন পাঞ্জাবির আবদার জুড়েছে। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো এক নিমেষে দূর হলো সব একাকীত্ব। ভাঙা দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটা যেন আজ হাসছে। নতুন বছর শুধু তারিখ বদল নয়, আজ সত্যি একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো।


বিষন্ন স্মৃতি 
উত্তম কুমার ঘোষ 

কদমতলা তখন শুনশান !  চৈত্রের কাঠফাটা রোদে ধুলো উড়িয়ে একটি বাস এসে থামল। অনন্যা বাস থেকে নেমে রিক্সার খোঁজ করতেই রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এলো,... দিদি কোথায় যাবেন?.... নিউ সার্কুলার লেন !  চৈত্রের দাবাদহ ভ্যাপসা গরমে আর ঘামে অনন্যার শরীরটা যেন ফুটে উঠেছিল, ঠোঁট থেকে লিপস্টিকটা অনেকটা হালকা হয়ে ঠোঁটের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে আসছিল। বাবা-মায়ের সাথে সেই ছোটবেলায় এসেছিল। ছোট্ট জনপদ বীরপাড়া থেকে ঝুমুর, তিস্তা পেরিয়ে দু -ঘন্টার জার্নি ।... একি ! তুমি জানাওনি তো তুমি আসবে ! আমার চিঠি তুমি পাওনি ?... না পাইনি। কেন এসেছ? আমি থাকতে আসিনি.... জয়শ্রীর থেকে শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে ? কি ! সত্যি? কনক শুধু বলল হ্যাঁ। অনন্যার চোখ দুটি জলে ভিজে গেল.... জীবনে নেমে এলো এক গভীর অন্ধকার, পৃথিবীর শেষ প্রান্তের এক গভীর খাদ...

কনক চিঠিতে লিখেছিল প্রিয় অনন্যা, তোমাকে আমি বিয়ে করতে পারছি না, তুমি আমাকে ভুলে যেও'।... চল্লিশ বছর আগেই কনক চলে গেছে কঠিন রোগে। আজ অনন্যা কদমতলায় ... পাল্টে গেছে শহরটা। শপিং মল , রঙিন আলো ,অনেক লোকজন আর টোটোর জ্যাম....।



নতুন বছরের ভোর
অঞ্জনা মজুমদার 

বছর শেষের নৈশভোজে অনেক খাবার বেঁচেছে হালদার বাড়িতে। নিয়মমতো সব খাবার ডাস্টবিনে ফেলতে যাচ্ছিল রামুকাকা।  রোশনের ইঙ্গিতে অবশিষ্ট খাবার নিয়ে পেছনের দরজা খুলে বাইরে। সেখানে কাকাই এর পেছনে বস্তির গোটাদশেক ছেলেমেয়ে। সবাই কাকাইএর নাইট স্কুলের ছাত্রছাত্রী। নিঃশব্দে সব খাবার ভাগ হয়ে গেল। বস্তির বুড়োদাদু বললেন, খুব ভালো করেছো বাবারা, খাবার নষ্ট হযনি। সবাই হাসিমুখে বাড়ি ফিরে চলল।

দরজা খুলে বাড়িতে পা দিয়েই সবার পা থেমে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে দাদামশাই বাড়ির সবাই। 

কাকাই কিছু বলবার আগেই দাদামশাই বললেন, আমাকে কোনও কৈফিয়ত দিতে হবে না। সব জানতে পেরেছি। লুকিয়ে কিছু করা যায় না। 

বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, বড়খোকা, কাল থেকে প্রতিটি নববর্ষের উৎসবে, প্রত্যেকটি বস্তিবাসীর জন্য একটা করে খাবারের প্যাকেট থাকবে। আর রামু এখন থেকে প্রতিদিনের বেঁচে যাওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে যাদের দরকার তুমি তাদের যত্ন করে খাইয়ে দিও।

রোশন আর রিমি দাদামশাইকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে বলল, আমাদের দাদামশাই ইজ দ্য বেস্ট।

বাইরে তখন নতুন বছরের সূর্য উঠছে।




একটু সহানুভূতি
উজ্জ্বল দত্ত 

ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল সাড়ে দশ ছুঁই ছুঁই, আমি সেদিন বাঁকুড়া বড়বাজারের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোন কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ পেতেই পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি একটি চলন্ত রিকসা থেকে এক জনৈক সত্তরোর্ধ প্রৌঢ় যাত্রী হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।

 আমি যেই মূমূর্ষূকে তুলে ধরি দেখি তিনি অবচেতন অবস্থায়, মনে হলো একটি মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। পরক্ষণেই তাঁর মুখে চোখে জলের ছিটে দিতেই জ্ঞান ফিরে আসে। 

জানতে পারি তাঁর নাম কৃপাসিন্ধু বোস, তিনি দেড় কিমি দূরে থাকেন, ডাক্তার দেখিয়ে  প্রেসকিপশন অনুসারে ঔষধপত্র ক্রয় করে ফের রিকসা করে তাকে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিই, ওনার স্ত্রী সবকিছু অবগত হয়ে গভীর আবেগে বলে ওঠেন--"মানবতা হারিয়ে যায়নি এখনও, এই পৃথিবীতে আপনাদের মতো মানব দরদী মানুষ  আছেন বলে আজ আমাদের মতো নিঃসহায় মানুষ প্রাণে বেঁচে যায়, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন বাবা" বুড়িমায়ের আশীর্বাদ কুড়িয়ে পরমানন্দে বাড়ী ফিরলাম পদব্রজে।

হ্যাঁ কৃপাসিন্ধুবাবুর সহধর্মিনী ঠিকই বলেছেন যে মানবতা এখনও হারিয়ে যায়নি, তাই বোধ হয় বিখ্যাত গীতিকার সেই গানটি রচেছিলেন--"মানুষ মানুষেরই জন্য,জীবন জীবনেরই জন্য,একটু সহানুভূতি কি..পেতে পারে না ও বন্ধু".....



হাতি ঠাকুর
রঞ্জন কুমার বণিক

সকাল থেকেই তিন্নি বায়না ধরেছে আজ মিলির বাড়িতে হাতি ঠাকুর পুজোয় নিয়ে যেতে। বাচ্চাদের মায়ের স্কুলগেটে ছুটি পর্যন্ত জমায়েত এক পরিচিত দৃশ্য এবং এখানেই দেবীকা, মানে তিন্নির মা আর মিলির মার পরিচয়, সখ্যতা গড়ে।

"জানো মা, আংকেল আমাকে বলেছে মিলির বাড়ির হাতি ঠাকুর নাকি শুড় দিয়ে লাড্ডু দেয়। যাবে মা?", তিন্নি শিশুসুলভ খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ে।

"রাতে বাবা আসলে যাবো।", নিজ গর্ভের নিষ্পাপ শিশুটিকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে চোখ মুছে দেবীকা।

দেবীকা তখন সবে আঠারোতে পা দিয়েছে। প্রায়ই পিৎজার অনলাইন অর্ডার দেয়। চঞ্চল মতি দেবীকা বুঝতেই পারেনি কীভাবে নীলেশের কাছে বাঁধা পড়ে গেছে। শেষমেশ পালিয়ে বিয়ে, কঠোর রক্ষণশীল পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ। প্রেমের জোয়ারে ভেঁসে গিয়ে দরিদ্রতার অথৈ সাগরে পড়ে।

সেদিন যানজটে আটকা পড়ে সময় মত পিৎজা পৌছানোর তাগিদে বাইক এক্সিডেন্ট করে ছয়মাস বিছানায় কাটে নীলেশের। পরিণামে চাকরিচ্যুতি। মিলিদের মুদির দোকানে হাজার বিশেক বাকি।

নাছোড় তিন্নির বারবার মর্জিতে মাথা ঠিক থাকেনি দেবীকার। সজোরে চড় কষে তিন্নির গালে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা : কবি মানেই রবি, কলমে : পিনাকী রঞ্জন পাল

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য :  আজও যখন শব্দ খুঁজে পাই না, কোনো অজানা ভোর এসে কানে কানে বলে - “লিখে ফেলো, ভয় কিসের?” ...